জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব

জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রসঙ্গে গৌরবময় বিপ্লবের পটভূমি, বিখ্যাত গ্রন্থ, প্রাকৃতিক অধিকার, শাসন ক্ষমতা, সরকার, সম্পত্তির অধিকার, বিরোধিতা ও বিপ্লব তার রাষ্ট্রচিন্তার ত্রুটি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাজন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব
পরিচিতিব্রিটিশ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ
দেশইংল্যান্ড
গ্ৰন্থটু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট
গৌরবময় বিপ্লব১৬৮৮ খ্রি
উদারনীতিবাদের জন্মদাতাজন লক
জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব

ভূমিকা :- জন লক হলেন আধুনিক উদারনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র- কাঠামোর প্রথম তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ।

গৌরবময় বিপ্লবের পটভূমি

ইংল্যান্ডের জনগণ ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে এক শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের মাধ্যমে ‘অধিকারের সনদ’ বা বিল অফ রাইট আদায় করে। ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে রক্তপাতহীন এই বিপ্লব “গৌরবময় বিপ্লব’ নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতকে গৌরবময় বিপ্লবের পটভূমিতে জন লক (১৬৩২- ১৭০৪ খ্রি.) ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করেন।

জন লকের বিখ্যাত গ্ৰন্থ

তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা বিষয়ক সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ‘টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট’ (‘Two Treatises of Government’)। এ ছাড়া ‘Second Treatise’ তাঁর লেখা অপর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

জন লকের রাষ্ট্রচিন্তা

জন লকের রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে উল্লেখ করা হল –

(ক) প্রাকৃতিক অধিকার

জন প্রাকৃতিক অধিকার বিষয়ে নিম্নলিখিত ভাবে আলোচনা করেছেন –

(১) প্রাক-রাজনৈতিক অবস্থা

লকের মতে, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার পূর্বে মানুষ প্রাক-রাজনৈতিক অবস্থায় বসবাস করত। এই অবস্থায় মানুষের জীবন ছিল সহজসরল ও স্বাভাবিক। তখন সমাজে সাম্য ছিল এবং সকলেই ছিল স্বাধীন। সকলেই তখন প্রাকৃতিক আইন মেনে চলত।

(২) রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা

পরবর্তীকালে সম্পত্তির অধিকারকে কেন্দ্র করে মানবসমাজে অসাম্য, জটিলতা ও সমস্যা বৃদ্ধি পায়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে।

(খ) শাসনক্ষমতা

এক্ষেত্রে লকের বিভিন্ন মতামত হল –

(১) জনগণের সম্মতি

চুক্তির মাধ্যমে যাদের হাতে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সমর্পিত হয় তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারী। লকের মতে, মানুষের কল্যাণসাধনের শর্তেই শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের শাসক বা শাসকগোষ্ঠী জনগণের সম্মতির অধীন। শাসক কর্তৃপক্ষ অক্ষম ও অযোগ্য হলে তাদের সরিয়ে দেওয়ার অধিকার জনগণের আছে।

(২) আইনসভার ক্ষমতাচ্যূতি

লক পার্লামেন্ট বা আইনসভাকেও চরম ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করেন নি। মানুষের আস্থা হারালে আইনসভা বা সরকারকে মানুষ ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকারী বলে লক স্বীকার করেছেন।

(গ) সরকার

এক্ষেত্রে জন লকের বিভিন্ন বক্তব্য হল –

(১) সরকারের কাজ

লক বলেছেন যে, সরকার রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক যাই হোক না কেন, সরকারকে সর্বদা রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্দিষ্ট রীতিনীতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সরকারের প্রধান কাজ হবে আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসন পরিচালনা।

(২) বিভিন্ন বিভাগ

সরকারের এই সব কাজের জন্য লক বিভিন্ন বিভাগ গঠনের কথা বলেছেন। সুশাসনের প্রয়োজনে তিনি আইন রচনা ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পৃথক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

(ঘ) সম্পত্তির অধিকার

লক সম্পত্তির অধিকারকে রাষ্ট্রব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর সকলের জন্য সমানভাবে প্রকৃতির সম্পদ ভোগ করার অধিকার দিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারে সরকারের কোনোরকম হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, যে সরকার সম্পত্তির প্রাকৃতিক অধিকার খর্ব করে সেই সরকার অবৈধ।

(ঙ) বিরোধিতা ও বিপ্লব

লক জনগণের সম্পত্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার কথা বলেছেন। যে রাষ্ট্র বা সরকার অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে তার বিরোধিতা করা জনগণের স্বাভাবিক অধিকার বলে লক মনে করতেন। তিনি এরূপ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বিপ্লব বা বিদ্রোহের কথা না বললেও রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতেই থাকবে বলে উল্লেখ করেছেন।

জন লকের রাষ্ট্রচিন্তার ত্রুটি

লকের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় বেশ কয়েকটি ত্রুটি উল্লেখ করা হয়। যেমন –

(১) স্ববিরোধিতা

লক একদিকে স্বাভাবিক অধিকারের কথা বললেও অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার স্বীকার করায় তাঁর মধ্যে স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়।

(২) সামাজিক বৈষম্য

লক সাম্যের আদর্শ প্রচার করলেও বাস্তবক্ষেত্রে সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বৈষম্যমূলক সমাজকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে তাঁর সাম্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার তত্ত্ব গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

(৩) বুর্জোয়া মানসিকতা

লক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের কথা স্বীকার করে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানকে পরোক্ষে সমর্থন করেছেন। এজন্য ম্যাকফারসন লককে ‘বুর্জোয়া চিন্তানায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন।

(৪) দাসদের প্রতি উদাসীনতা

লক শ্রমিক, ভৃত্য ও দাসদের রাজনৈতিক সমাজের স্বাধীন ও পূর্ণ সদস্য হিসেবে মেনে নেন নি।

লকের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব

লকের রাষ্ট্রচিন্তায় কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি লক্ষ্য করা গেলেও তাঁর তত্ত্বের বিভিন্ন গুরুত্বও অনস্বীকার্য। যেমন –

(১) অভিনবত্ব

লকের রাষ্ট্রচিন্তায় নতুনত্ব কম থাকলেও যথেষ্ট অভিনবত্ব ছিল। কেন-না, তাঁর পূর্ববর্তী বিভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের বিক্ষিপ্ত ও অসংলগ্ন তত্ত্বগুলিকে লক অসাধারণ দক্ষতা সহকারে সুসংবদ্ধভাবে এক জায়গায় উপস্থাপন করেন।

(২) প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে লকের রাষ্ট্রনৈতিক তত্ত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। লকের রাষ্ট্রচিন্তায় আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ছায়া লক্ষ্য করা যায়।

(২) দুই যুগের সংমিশ্রণ

ওয়েপারের মতে, লক ছিলেন একদিকে মধ্যযুগীয় বিশাল ঐতিহ্যের অন্যতম শেষ প্রবক্তা এবং অপরদিকে আধুনিক যুগের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি যেমন সম্পত্তির অধিকারকে পবিত্র অধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়ে মধ্যযুগীয় ধারাকে অনুসরণ করেছেন, তেমনি উদারনীতিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রভৃতির প্রচার করে আধুনিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

(৩) আইনের শাসন

লক ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে আইনের শাসনের অধীনে আনার যে চিন্তা করেছিলেন তা আধুনিক বুর্জোয়া রাষ্ট্রে আইনের শাসনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।

উপসংহার :- আধুনিক বস্তুনিষ্ঠ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রতত্ত্ব পূর্ণতা পায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জন লকের রচনাগুলির মধ্যে। তিনি ছিলেন উদারনীতিবাদের জন্মদাতা তথা সার্থক প্রবক্তা।

(FAQ) জন লকের রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জন লক কোন দেশের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ছিলেন?

ইংল্যান্ড।

২. উদারনীতিবাদের জন্মদাতা কাকে বলা হয়?

জন লক।

৩. জন লকের বিখ্যাত গ্ৰন্থের নাম কি?

‘টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট’।

৪. ইংল্যান্ডে গৌরবময় বিপ্লব সংঘটিত হয় কখন?

১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment