সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি

সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি প্রসঙ্গে সীমান্তে নিরাপত্তা বলয়, মিত্র রাজ্যের বেষ্টনী, প্রতিবেশী রাজ্য, সিংহল ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, সর্বদ্বীপ, শক-ক্ষত্রপ, বাকাটক শক্তি ও ডঃ গয়ালের অভিমত সম্পর্কে জানবো।

সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি

বিষয় সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
রাজা সমুদ্রগুপ্ত
পূর্বসূরি প্রথম চন্দ্রগুপ্ত
উত্তরসূরি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
উপাধি ভারতের নেপোলিয়ন
সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি

ভূমিকা :- ডঃ রায়চৌধুরী প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, সমুদ্রগুপ্ত একটি সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য স্থাপনের আদর্শ অনুসরণ করেন। এক্ষেত্রে তার পক্ষে উপযুক্ত সীমান্ত নীতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি সম্পর্কে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করা আবশ্যিক ছিল।

সীমান্তে নিরাপত্তা বলয়

  • (১) সীমান্তকে সুরক্ষিত না করলে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে একথা তিনি বুঝতেন। সুতরাং তিনি সীমান্তবর্তী উপজাতি ও রাজ্যগুলিকে স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার দিয়ে প্রতিবেশী দেশ এবং প্রত্যক্ষ শাসনাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করেন।
  • (২) এই নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তরালে তিনি তার প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখেন। সীমান্তে নিরাপত্তা বেষ্টনী পূর্ব ভারতে সমতট, দবাক, কামরূপ, নেপাল দ্বারা তৈরি করা হয়। পশ্চিমে রাজপুতানার মালব, পাঞ্জাবের অর্জুনায়ন খরপরিকগণ এই বেষ্টনী রক্ষা করে।
  • (৩) দক্ষিণের চারটি করদ রাজ্যও ছিল এই বেষ্টনীর ভেতর। এই রাজ্যগুলিকে তিনি তার প্রত্যক্ষ শাসনের বাইরে রাখেন। অবশ্য এদের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত কর আদায় করতেন।

মিত্র রাজ্যের বেষ্টনী

  • (১) নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে তার প্রতিবেশী রাজ্যগুলি তার পরাক্রম অনুভব করে তার সঙ্গে দ্রুত মিত্রতা স্থাপন করে। সমুদ্রগুপ্ত তার নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা রাখলেও এটা ছিল অনেকটা বিসমার্কীয় মিত্রতা চুক্তির মত। বিসমার্ক যে সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করতেন তারা প্রাশিয়ার বাহন অশ্ব এবং প্রাশিয়া তাদের সওয়ারে পরিণত হত বলে বিসমার্কের জীবনীকার বলেছেন।
  • (২) হরিষেণ, সমুদ্রগুপ্তের মিত্রতা নীতি সম্পর্কে অনুরূপ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি তাদের কাছ থেকে “কন্যোপায়ণ” অর্থাৎ রাজকন্যাকে উপহার স্বরূপ পেতেন অথবা ‘আত্মদান’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বশ্যতায় স্বীকৃতি পেতেন; অথবা মিত্রতা চুক্তি দ্বারা প্রতিবেশী রাজ্য তাঁর কাছ থেকে গরুড় চিহ্নিত সনন্দ পেত।
  • (৩) কোনো কোনো আধুনিক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, প্রতিবেশী রাজ্যগুলির ওপর এরূপ আধিপত্যের বর্ণনা দিয়ে হরিষেণ অতিশয়োক্তি করেছেন। যদি তারা সমুদ্রগুপ্তের নিকট ‘আত্মদান’ করবেন বা সনদ নেবেন তবে তাদের স্বাধীনতা কিভাবে থাকতে পারে? সমুদ্রগুপ্ত ভারতের ভেতর বহু অঞ্চল অবিজিত রেখে প্রতিবেশী দেশগুলিকে কিভাবে এতটা বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে সক্ষম হতে পারেন।

প্রতিবেশী রাজ্য

  • (১) যে প্রতিবেশী রাজ্যগুলির নাম হরিষেণ করেছেন সেগুলি হল উত্তর-পশ্চিমে দৈবীপুত্র শাহী শাহানুশাহী। ডঃ এস চ্যাটার্জীর মতে, ইনি ছিলেন উত্তর-পশ্চিমে কুষাণবংশীয় শাসক। সাসানীয় আক্রমণের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যে ইনি সমুদ্রগুপ্তের বশ্যতা স্বীকার করেন।
  • (২) ডঃ গয়ালের মতে, দৈবীপুত্র শাহী ছিলেন উত্তর-পশ্চিমের কিদর কুষাণ। শাহানুশাহী ছিলেন অন্য লোক, সম্ভবত সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় সাপুর। শক মুরণ্ড পশ্চিম ভারতের শক শাসক। মতান্তরে উত্তর-পশ্চিমের শক শাসক।

সিংহল ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া

  • (১) সিংহলের রাজা মেঘবর্ণ। সিংহল দ্বীপের সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল বলে ডঃ গয়াল অভিমত দিয়েছেন। বাংলার তাম্রলিপ্ত ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর সেখান থেকে সিংহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য চলত।
  • (২) ভারতের দক্ষিণে সিংহল দ্বীপের অবস্থানের জন্য পশ্চিম উপকূল, পূর্ব উপকূল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল সিংহল। বাংলা থেকে বাণিজ্য তরণীগুলি বঙ্গোপসাগর দিয়ে সিংহল যেত এবং এই পথে গুপ্ত সাম্রাজ্যের বাণিজ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত। সুমাত্রা, জাভায় গুপ্তযুগের মুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় একথা প্রমাণিত হয়।
  • (৩) চীনা পর্যটক ওয়াং হিউয়েন-সির বিবরণ হতে জানা যায় যে, সিংহলরাজ মেঘবর্ণ বোধগয়ায় সিংহল হতে আগত তীর্থযাত্রীদের থাকবার জন্য একটি মঠ ও চৈত্য নির্মাণ করতে অনুমতি চেয়ে প্রচুর উপঢৌকন সহ এক দূত পাঠান। সমুদ্রগুপ্ত এজন্য অনুমতি দেন এবং এই যাত্রী নিবাসের ব্যয় নির্বাহের জন্য পাঁচখানি গ্রাম দান করেন।
  • (৪) রোমিলা থাপারের মতে, সিংহল হতে আগত এই দৌত্যকে করদ রাজার বশ্যতার স্বীকৃতি ধরা উচিত হবে না।

সর্বদ্বীপ

হরিষেণ “সর্বদ্বীপবাসিন” কথাটি উল্লেখ করেছেন। এর আক্ষরিক অর্থ হল “অন্যান্য দ্বীপের অধিবাসীরা”। এই দ্বীপগুলির নাম না দেওয়ার জন্য দ্বীপগুলিকে সঠিক চিহ্নিত করা যায় নি। অনেকের মতে, ভারত মহাসাগরের অন্যান্য দ্বীপের কথা এর দ্বারা বোঝান হয়েছে, যাদের সঙ্গে সমুদ্রগুপ্তের সম্পর্ক ছিল। ডঃ মজুমদার মালব, সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি দ্বীপ বলে এর ব্যাখ্যা করেছেন।

শক-ক্ষত্রপ

সাক্ষ্য প্রমাণ দেখে মনে করা যায় যে ভারতের অভ্যন্তরে সমুদ্রগুপ্ত পশ্চিম ভারতের শক-ক্ষরপদের সঙ্গে সকল প্রকার সংঘাত এড়িয়ে চলতেন। তিনি শক-ক্ষত্রপদের জয় করার কাজ তাঁর উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের জন্য মুলতবী রেখে যান।

বাকাটক শক্তি

  • (১) গঙ্গা উপত্যকায় সমুদ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাগ ও বাকাটক রাজবংশ। তিনি নাগবংশীয় রাজাদের উচ্ছেদ করে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় তাঁর নিজ শক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরই তিনি মধ্যপ্রদেশে বাকাটক শক্তির সম্মুখীন হন।
  • (২) ডঃ রায়চৌধুরীর মতে, সমুদ্রগুপ্তের এরাণ লিপি থেকে প্রমাণ হয় যে, মধ্যপ্রদেশ থেকে তিনি বাকাটক শক্তিকে উচ্ছেদ করেছিলেন। এর ফলে বাকাটক শক্তি কেবলমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় শক্তিতে পরিণত হয়। অনেকে এই ব্যাখ্যায় আপত্তি করে বলেন যে, বাকাটক সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ ছিল এবং সমুদ্রগুপ্ত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারেননি।

ডঃ গয়ালের অভিমত

  • (১) ডঃ গয়ালের মত এ প্রসঙ্গে বিশেষ বিবেচ্য। তিনি বলেছেন যে, প্রথম রুদ্রসেনের পর বাকাটক শক্তিতে ভাঙন দেখা দেয়। এই প্রথম রুদ্রসেন ও হরিষেণ প্রশস্তির রুদ্রদেব ছিলেন একই লোক। সমুদ্রগুপ্ত এঁকে পরাস্ত করেন।
  • (২) রুদ্রসেনের পর পৃথিবীসেন স্বল্পকাল রাজত্ব করেন। তখন বাকাটক শক্তির অস্তগমনের সূচনা হয়েছে। এঁরা সম্রাট উপাধি ছেড়ে সাধারণ ‘মহারাজ’ উপাধি নিতে বাধ্য হয়েছেন। গয়াল বলেন যে, বাকাটকদের দমন বা বশ্যতায় রাজী না করিয়ে সমুদ্রগুপ্ত দাক্ষিণাতো অভিযান করেছিলেন একথা মনে করা যায় না।
  • (৩) কারণ দাক্ষিণাত্যে বাকাটকরা এমন একটি স্থানে রাজত্ব করতেন যেখান থেকে তারা ইচ্ছা করলে তাকে বিপদগ্রস্ত করতে পারতেন। এমতাবস্থায় এরনের যুদ্ধেই সমুদ্রগুপ্ত বাকাটক শক্তিকে চূর্ণ করে দক্ষিণে তার আপন কোটরে ফিরে যেতে বাধ্য করেন। অনেকে এই ব্যাখ্যায় আপত্তি জানান। তবে বেশীর ভাগ পণ্ডিত এই মতকে সমর্থন করেন।

উপসংহার :- বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমুদ্রগুপ্তের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। চৈনিক বিবরণ অনুসারে, সিংহলি রাজা মেঘবর্মন সমুদ্রগুপ্তকে একটি উপহার পাঠিয়েছিলেন এবং গয়াতে একটি বৌদ্ধমঠ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে সমুদ্রগুপ্তের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন।

(FAQ) সমুদ্রগুপ্তের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে?

সমুদ্রগুপ্ত।

২. ভারতের নেপোলিয়ন কাকে বলা হয়?

সমুদ্রগুপ্ত।

৩. দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রে সমুদ্রগুপ্ত কি নীতি গ্রহণ করেন?

গ্ৰহণ পরিমোক্ষ নীতি।

৪. এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে কার কথা জানা যায়?

সমুদ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »