ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা

পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার নেতৃত্বে ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে ম্যাৎসিনির অবদান, ক্যাভুরের অবদান, ভিক্টর ইমানুয়েল ও গ্যারিবল্ডির ভূমিকা, নেপোলিয়নের ভূমিকা, ম্যাৎসিনির মন্তব্য, ঐতিহাসিকদের মত, ইতালীয় জাতীয়তাবাদে আঘাত, ক্যাভুরের আবির্ভাব, রাশিয়ার বিরুদ্ধে, প্যারিসের শান্তি সম্মেলন, প্লোমবিয়ারের চুক্তি, চুক্তির শর্ত, অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি, জুড়িখের সন্ধি, মধ্য ইতালির রাজ্য সমূহ, ক্যাভুরের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ, সিসিলি ও নিপলস জয় ভেনেসিয়া, জয় রোম অধিকার এবং বীরত্ব ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা

ইতালির ঐক্যের জনকজোসেফ ম্যাৎসিনি
পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রীক্যাভুর
লালকোর্তা বাহিনীগ্যারিবল্ডি
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ১৮৫৪-৫৬ খ্রিস্টাব্দ
কার্বোনারি আন্দোলনইতালি
ইতালিতে নেপোলিয়ন১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ
ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা

সূচনা:- ইতালির ঐক্য আন্দোলন -এ ম্যাৎসিনি, ক্যাভুর, ভিক্টর ইমান্যুয়েল, গ্যারিবল্ডি এবং ‘কার্বোনারি’ ও ‘ইয়ং ইতালি আন্দোলন‘ সবার ভূমিকাই ছিল উল্লেখযোগ্য। তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের সাহায্য ব্যতীত এই ঐক্য সম্ভব হত না।

ম্যাৎসিনির অবদান

ম্যাৎসিনি ইতালীয় জনসাধারণ ও তরুণদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ প্রচার করে তাদের মধ্যে ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা গড়ে তোলেন।

ক্যাভুরের অবদান

কূটনীতিক ক্যাভুর তাঁর বিচক্ষণতাও কূটনীতির দ্বারা ইতালির ঐক্যকে বাস্তব রূপ দেন। তিনি ছিলেন পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী।

ভিক্টর ইমান্যুয়েল ও গ্যারিবল্ডির ভূমিকা

এ সম্পর্কে বাস্তববাদী ভিক্টর ইমান্যুয়েল এবং ‘সিংহ হৃদয়’ গ্যারিবল্ডির ভূমিকাও ছিল অতি উজ্জ্বল ও প্রশংসনীয়।

নেপোলিয়নের ভূমিকা

  • (১) খণ্ড-বিখণ্ড ইতালিতে নেপোলিয়নই প্রথম জাতীয়তাবাদের সঞ্চার করেন। ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম ইতালিতে পদার্পণ করেন। সমগ্র ইতালি তাঁর শাসনাধীনে আসে।
  • (২) তার অধীনে সমগ্র ইতালিতে একই ধরনের আইন-কানুন ও ভূমিব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। দেশের সর্বত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। এর ফলে সমগ্র ইতালিতে একটি ঐক্যবোধের সঞ্চার হয়।

ম্যাৎসিনির মন্তব্য

ম্যাৎসিনি নিজেই বলছেন যে, “ফরাসি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ সঞ্চারিত হল এবং আমাদের সম্মুখে জাতীয় সংহতির ছবি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।”

ঐতিহাসিকদের মতে

ওমেদিও, ডেনিস ম্যাক-স্মিথ প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, নেপোলিয়নই প্রথম পরোক্ষভাবে আধুনিক ইতালিতে জাতীয়তাবাদের সূচনা করেন।

ইতালীয় জাতীয়তাবাদে আঘাত

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলন নবজাগ্রত ইতালীয় জাতীয়তাবাদের উপর প্রবল আঘাত হানে। ইতালিতে প্রাক্-নেপোলিয়ন যুগের অবস্থা ফিরে আসে। দেশপ্রেমিকরা হতাশ হয়ে পড়েন।

ক্যাভুরের আবির্ভাব

এই পরিস্থিতিতে ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ক্যাভুর পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া রাজ্যের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করলে ইতালির ঐক্য আবার বাস্তব রূপ ধারণ করতে থাকে। তিনি উপলব্ধি করেন যে ইতালি থেকে অস্ট্রিয়াকে বিতাড়িত করতে হলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের সমর্থন অপরিহার্য।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৪-১৮৫৬ থ্রি) শুরু হলে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষে যোগদান করেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, এভাবে ইতালির ঐক্যের ব্যাপারে তিনি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সহযোগিতা লাভ করবেন।

প্যারিসের শান্তি সম্মেলন

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর তিনি ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সুযোগ পান এবং সেখানে ইতালির সমস্যা তুলে ধরে তিনি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সহানুভূতি লাভে সক্ষম হন। ইতালীয় সমস্যা আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়।

প্লোমবিয়ারের চুক্তি

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যাভুর ও ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন প্লোমবিয়ার নামক স্থানে মিলিত হয়ে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই চুক্তি প্লোমবিয়ারের চুক্তি (১৮৫৮ খ্রি:) নামে খ্যাত।

প্লোমবিয়ারের চুক্তির শর্ত

এই চুক্তি অনুযায়ী স্থির হয় যে,

  • (১) ইতালির ঐক্য আন্দোলনে ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে পিতমন্টকে সাহায্য করবে।
  • (২) অস্ট্রিয়া যদি পিডমন্টকে প্রথম আক্রমণ করে, তবেই এই সাহায্য মিলবে।
  • (৩) এই  সাহায্যের বিনিময়ে ফ্রান্স স্যাভয় ও নিস পাবে।

অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ক্যাভুর দেশে ফিরে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং যুদ্ধের জন্য অস্ট্রিয়াকে নানাভাবে উস্কানি দিতে থাকেন। উত্তেজিত অস্ট্রিয়া ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ফ্রান্সও যুদ্ধে যোগ দেয়। ম্যাজেন্টা ও সলফেরিনোর যুদ্ধেজয়লাভ করে ফরাসি বাহিনী অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে লম্বার্ডি ও মিলান উদ্ধার করে।

ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি

এই জয়ের মুহূর্তে তৃতীয় নেপোলিয়ন হঠাৎ উপলব্ধি করেন যে, ঐক্যবদ্ধ ইতালি ফরাসি স্বার্থের অনুকূল হবে না। তাই তিনি ক্যাভুর বা ভিক্টর ইমান্যুয়েল কারো সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই এককভাবে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

জুরিখের সন্ধি

ক্ষুব্ধ ক্যাভুর পিডমন্ট-রাজকে এককভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বাস্তববাদী ভিক্টর ইমান্যুয়েল উপলব্ধি করেন যে, অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে এককভাবে যুদ্ধ চালানো সম্ভব নয়। তাই তিনি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে জুরিখের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। লম্বার্ডি সার্ডিনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। ক্ষুব্ধ ক্যাভুর মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন।

মধ্য ইতালির রাজ্য সমূহ

ইতিমধ্যে মধ্য ইতালির পার্মা, মডেনা, টাস্কেনি, রোমানা প্রভৃতি রাজ্যগুলি পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করে। অস্ট্রিয়া ও তৃতীয় নেপোলিয়ন ঘোরতর আপত্তি জানায়।

ক্যাভুরের মন্ত্রীত্ব গ্ৰহণ

জাতীয় জীবনের সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ক্যাভুর আবার প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে এক বোঝাপড়ায় আসেন। স্থির হয় যে ফরাসি সম্রাট মধ্য ইতালির এই রাজ্যগুলির সংযুক্তি মেনে নেবেন, বিনিময়ে স্যাভয় ও নিস পাবেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরও এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। এরপর গণভোটের মাধ্যমে এই রাজ্যগুলি পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়।

সিসিলি ও নেপলস

  • (১) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ইতালির সিসিলি ও নেপলস্-এ প্রতিক্রিয়াশীল বুরবোঁ রাজা দ্বিতীয় ফ্রান্সিস-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং বিদ্রোহীরা সার্ডিনিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করে।
  • (২) তাঁরা ম্যাৎসিনি-শিষ্য গ্যারিবল্ডি-র কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। গ্যারিবল্ডি তাঁর এক হাজার ‘লাল কোর্তা’ বাহিনী নিয়ে সিসিলিতে পৌঁছান। তিনি সিসিলি ও নেপলস্ জয় করেন।
  • (৩) এই সময় তিনি ইংল্যান্ডের সাহায্য পান। একটি ব্রিটিশ জাহাজ গ্যারিবল্ডি ও তাঁর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সমুদ্র অতিক্রমে সাহায্য করেছিল।

ভেনেশিয়া জয়

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রো-প্রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। ইতালি প্রাশিয়ার পক্ষে যোগ দেয়। যুদ্ধে প্রাশিয়া জয়যুক্ত হয় এবং পুরস্কার হিসেবে ইতালি ভেনেশিয়া পায়। ইতালির ঐক্য আরেক ধাপ অগ্রসর হয়।

রোম অধিকার

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। ইতালি প্রাশিয়াকে সাহায্য করে। সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হয় এবং রোম থেকে ফ্রান্স তার সেনা প্রত্যাহার করে নিলে রোম ইতালির অধিকারে আসে। এইভাবে ইতালির ঐক্য সম্পন্ন হয়।

বীরত্ব ও আত্মত্যাগ

ইতালির ঐক্যসাধনে ম্যাৎসিনি, ক্যাভুর, ভিক্টর ইমান্যুয়েল, গ্যারিবল্ডি এবং হাজার হাজার দেশপ্রেমিকের উদ্যম, নিষ্ঠা, সাধনা, বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে উপেক্ষা করা যায় না।

উপসংহার:- স্বদেশীয়দের আত্মত্যাগ ও অবদানের পাশাপাশি ছিল বিদেশি শক্তিসমূহের ভূমিকা, যা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিদেশি  শক্তিগুলির অংশগ্রহণ না থাকলে ইতালির ঐক্য ঠিক কবে সম্পন্ন হত, তা বলা দুরূহ।

(FAQ) পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার নেতৃত্বে ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইতালির ঐক্যের জনক কাকে বলা হয়?

জোসেফ ম্যাৎসিনি।

২. ক্রিমিয়ার যুদ্ধ কখন হয়?

১৮৫৪-৫৬ খ্রিস্টাব্দে।

৩. ইতালির ঐক্যের সময় পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার রাজা কে ছিলেন?

ভিক্টর ইমান্যুয়েল।

৪. ইতালির ঐক্যের সময় পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

ক্যাভুর।

৫. কার সেনাদলের নাম ছিল লালকোর্তা বাহিনী?

গ্যারিবল্ডি।

Leave a Reply

Translate »