ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার কারণ

ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক পরিবেশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি বিপ্লব, কৃষি বিপ্লবের ফল, কাঁচামাল, বাজার ও মূলধন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক গতিশীলতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্য নির্ভরতা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, বাষ্প শক্তি, লৌহশিল্প, কয়লা ও পরিবহন সম্পর্কে জানবো।

ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার কারণ

ঘটনা শিল্প বিপ্লব
প্রথম সূচনা ইংল্যান্ড
সময়কাল অষ্টাদশ শতক
প্রথম ব্যবহার অগাস্তে ব্ল্যাঙ্কি
জনপ্রিয় করেন আর্নল্ড টয়েনবি
ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার কারণ

ভূমিকা:- ইউরোপীয় মহাদেশে ইংল্যান্ডেই প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, রাশিয়া বা আমেরিকা প্রভৃতি দেশে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় আরও অর্ধশতাব্দী পরে।

পণ্ডিতদের মতানৈক্য

ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়া সম্পর্কে পণ্ডিতরা কয়েকটি কারণের উল্লেখ করলেও সব বিষয়ে তাঁরা একমত নন। আসলে কোনও একটি বিশেষ কারণ দিয়ে এর ব্যাখ্যা করা যায় না।

ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প বিপ্লব

শিল্প বিপ্লব কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। নতুন মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে এই বিপ্লব আসে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে এর কিছু কিছু উপস্থিত থাকলেও একমাত্র ইংল্যান্ডেই এর সবগুলি ছিল। এই কারণে এখানে প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়।

প্রাকৃতিক পরিবেশ

অনেকে ইংল্যান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থানকে সে দেশে প্রথম শিল্পায়নের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন –

  •  (১) ইংল্যান্ডের স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়া বস্ত্রশিল্পের উপযোগী ছিল। এই ভিজে আবহাওয়ায় সুতো ভঙ্গুর হত না।
  • (২)  ইংল্যান্ডের নদী ও জলপ্রপাতগুলি জলশক্তিচালিত যন্ত্রচালনায় সুবিধা করেছিল।
  • (৩) দক্ষিণ ইংল্যান্ডে প্রবল বেগে বহমান বায়ুশক্তির দ্বারা বায়ুকলগুলি চালাতে সুবিধা হয়।
  • (৪) প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ইংল্যান্ডে কয়লা ও লোহার সঞ্চয় শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে। কয়লা ও লোহার খনির কাছাকাছি অবস্থানও শিল্পের পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হয়।
  • (৫) ইংল্যান্ডের খালগুলি বিভিন্ন নদীকে যুক্ত করায় কাঁচামাল ও পণ্য চলাচল অনেক সুবিধাজনক হয়। এইসব কারণে ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়।

সমালোচনা

(ক) অধ্যাপক হবসবম এই মতের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন যে,

  • (১) ইংল্যান্ডের মতো স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়া ইউরোপের অন্যান্য অনেক জায়গাতে থাকলেও সেই সব স্থানে শিল্প বিপ্লব ঘটে নি।
  • (২) জার্মানির সাইলেশিয়ায় কয়লা এবং রূঢ় জেলায় যথেষ্ট লোহা থাকা সত্ত্বেও সেখানে শিল্পের বিকাশ ঘটে নি।
  • (৩) স্কটল্যান্ডে যথেষ্ট জলশক্তি এবং হল্যান্ডে বায়ুশক্তি থাকা সত্ত্বেও ওই সব স্থানে শিল্প বিপ্লবের বিকাশ ঘটে নি।
  • (৪) ইংল্যান্ডে এইসব উপাদানগুলি থাকা সত্ত্বেও ১৭৬০ থেকে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ইংল্যান্ডে কেনই বা শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয় নি?

(খ) অধ্যাপক হবসবম -এর মতে, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের জন্য ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। এগুলি হল সহায়ক উপাদান মাত্র। ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই উপাদান ও সুবিধাগুলি শিল্প বিপ্লব আনয়নে সাহায্য করে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি

  • (১) অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। এই বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য গ্রামে কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল না। এই কারণে কর্মসংস্থানের আশায় তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে এবং কলকারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেয়।
  • (২) এই সময় ইংল্যান্ডে এনক্লোজার মুভমেন্ট বা বেষ্টনী প্রথা-র ফলে ধনী ভূস্বামীরা ছোটো ছোটো মালিকানাধীন জমি কিনে নিজেদের জমির আয়তন সম্প্রসারিত করে তা ঘিরে ফেলেন। এইসব জমিতে মেষপালন করে লাভজনক পশমের ব্যবসা শুরু হয়। এর ফলে বহু কৃষক কর্মচ্যুত হয়ে পড়ে।
  • (৩) একদিকে গ্রামের বর্ধিত জনসংখ্যা ও অন্যদিকে কর্মচ্যুত কৃষকেরা কর্মসংস্থানের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে থাকে এবং বিভিন্ন কলকারখানায় নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে যোগ দেয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকের জোগান যেমন সহজলভ্য হয়, তেমনি স্বল্প মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ শিল্প বিপ্লবের সহায়ক হয়।

কৃষি বিপ্লব

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৭৩০ থেকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জনসংখ্যা বাড়ে ৭%। এই সময় খাদ্য ও কৃষিজ দ্রব্যের উৎপাদন বাড়ে ১০%। এক কথায়, এই সময় ইংল্যান্ডে কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে যায়।

কৃষি বিপ্লবের ফল

  • (১) কৃষি বিপ্লবের ফলে শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও শ্রমিকদের জন্য সস্তায় খাদ্যের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। শিল্প বিপ্লবের সূচনায় শ্রমিকদের মজুরি ছিল খুব কম। কৃষি বিপ্লবের ফলে সস্তায় খাদ্য সরবরাহ না করা হলে, কম মজুরিতে শ্রমিক সংগ্রহ করা সম্ভব হত না।
  • (২) কৃষি বিপ্লবের ফলে গ্রামের কৃষকদের জীবনে স্বচ্ছলতা আসে। স্বচ্ছল কৃষকরা শিল্পদ্রব্যাদি কিনতে সক্ষম হয়। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে শিল্পদ্রব্যের বাজার তৈরি হয়।
  • (৩) কৃষি-খামারের মালিকরা শহরে খাদ্যসামগ্রী ও পশমজাত দ্রব্যাদি রপ্তানি করে বিরাট মুনাফা গড়ে তোলে। এই অর্থ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে শিল্পে লগ্নি করা হয়। এইভাবে কৃষি বিপ্লব শিল্প বিপ্লবের ভিত তৈরি করে।

কাঁচামাল, বাজার ও মূলধন

  • (১) শিল্প বিপ্লবের জন্য তিনটি প্রয়োজনীয় উপাদান হল – কাঁচামাল, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন বিস্তৃত বাজার ও মূলধন। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে এর কোনোটিরও অভাব হয় নি। উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইংল্যান্ডের উপনিবেশ স্থাপিত হয়।
  • (২) এইসব অঞ্চল থেকে ইংল্যান্ড অবাধে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল সংগ্রহ করত এবং তার উৎপাদিত পণ্যাদিও সেখানে বিক্রি করত। এইভাবে এইসব স্থানে ইংল্যান্ডের একচেটিয়া বাজার গড়ে ওঠে। এইসব বাজারে কার্যত একচেটিয়া বাণিজ্যের ফলে ইংরেজ বণিকরা প্রচুর মুনাফা অর্জন করে।
  • (৩) তারা ভারত ও চিন থেকে নানা বিলাস দ্রব্য আমদানি করে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত এবং প্রচুর মুনাফা লুঠত। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধ -এর পর বাংলার ধনভাণ্ডার ইংরেজ কোম্পানির হাতে আসে। এইসব কারণে ইংরেজ বণিকদের কখনোই মূলধনের কথা চিন্তা করতে হয় নি।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

  • (১) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কারণ। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের পরেও ইংল্যান্ড বেশ কিছু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, কিন্তু এই যুদ্ধগুলি ইংল্যান্ডের বাইরে সংঘটিত হওয়ায় যুদ্ধের কোনও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ইংল্যান্ডের উপর পড়ে নি।
  • (২) ইংল্যান্ডের নৌবাহিনী ছিল খুবই শক্তিশালী, যার সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশের নৌবাহিনীর কোনও তুলনা চলে না। ফ্রান্স ও জার্মানিতে তখন কোনও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল না। এর ফলে এইসব দেশে শিল্প বিপ্লবের অনুকূল পরিবেশ ছিল না।
  • (৩) প্রকৃতপক্ষে ইংল্যান্ডের বহু পূর্বেই ফ্রান্সে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়, কিন্তু ফরাসি বিপ্লব এই প্রচেষ্টার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিক এল. সি. এ. নোলেস বলেন যে, ফরাসি বিপ্লব -এর হলে ফরাসি শিল্পগুলি ধ্বংস না হলে ফ্রান্সই শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত হত।

সামাজিক গতিশীলতা

  • (১) ইংল্যান্ডের মুক্ত সমাজ ও সামাজিক গতিশীলতা শিল্প বিপ্লবের অন্যতম সহায়ক ছিল। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের দেশগুলি বিভিন্ন প্রকার মধ্যযুগীয় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।
  • (২) ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা প্রচলিত ছিল। অগণিত মানুষের বন্ধন ছিল ভূমির সঙ্গে। তাই মানুষ শিল্পের পথে অগ্রসর হতে পারে নি। ফ্রান্সের অভিজাত সমাজের মানদণ্ড ছিল ভূমি, শিল্প-বাণিজ্য নয়। অভিজাত সম্প্রদায় শিল্প-বাণিজ্যকে ঘৃণার চোখে দেখত।
  • (৩) অপরদিকে ইংল্যান্ডের সমাজে এ ধরনের কোনও বন্ধন ছিল না। ব্যক্তি-স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা শিল্পায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা

  • (১) ইংল্যান্ড ছিল সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপপুঞ্জ। সমুদ্রপথে সারা বিশ্বের সঙ্গে তার যোগাযোগ স্থাপন সহজ ছিল। তার ভালো এবং উন্নত মানের জাহাজ ও বন্দর ছিল। ইংল্যান্ডের দীর্ঘ উপকূলভাগ ছিল ভগ্ন। এর ফলে এইসব স্থানে গড়ে ওঠে প্রচুর বন্দর।
  • (২) বন্দরগুলি থেকে দেশের অভ্যন্তরে যোগাযোগের জন্য অনেক খাল খনন করা হয়। তাছাড়া, বহু রাস্তাও নির্মিত হয়। এক কথায়, স্বদেশ ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে এই যোগাযোগ শিল্প বিপ্লবের পক্ষে সহায়ক হয়।

বাণিজ্য-নির্ভরতা

  • (১) ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ইংল্যান্ডই সপ্তদশ শতকে কৃষি-নির্ভরতা ত্যাগ করে বাণিজ্য-নির্ভর হয়ে পড়ে। বহির্বাণিজ্যে তার ভূমিকা ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য। ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের ফলে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আসে।
  • (২) বাণিজ্য-লব্ধ বিপুল মুনাফা বিভিন্ন কলকারখানা ও শিল্পে বিনিয়োগ করা হতে থাকে। দেশ ও বিদেশে বিভিন্ন শিল্প-সামগ্রীর চাহিদা মেটাতে গিয়ে ইংল্যান্ডে ব্যাপক শিল্পায়ন শুরু হয়। অধ্যাপক হবসবম বিভিন্ন পরিসংখ্যান দিয়ে ইংল্যান্ডের বহির্বাণিজ্যের কথা তুলে ধরেছেন।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

  • (১) ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে গৃহযুদ্ধের ফলে মধ্যবিত্তদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। তারা ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব কায়েম করে এবং শিল্প বিপ্লবেও তাদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
  • (২) তারা পার্লামেন্টে সরকারকে শিল্পের উন্নয়নের জন্য সাহায্য করতে বাধ্য করে। ব্রিটিশ সরকারও দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের নানাভাবে সাহায্য করে। আমদানিকৃত বিদেশি পণ্যের উপর উচ্চহারে শুল্ক বসিয়ে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষিত করা হয়।

বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার

এই অনুকূল পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বেশ কিছু সময়োপযোগী আবিষ্কার, যা শিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল। এগুলি হল –

  • (১) ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্পেই প্রথম যন্ত্রভিত্তিক উৎপাদন শুরু হয়। ১৭৩৩ খ্রিস্টাব্দে জন কে উড়ন্ত মাকু বা ‘ফ্লাইং শাটল’ নামে কাপড় বোনার এক উন্নত মানের যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
  • (২) ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে জেমস হারগ্রিভস আবিষ্কার করেন সুতো কাটার উন্নত যন্ত্ৰ ‘স্পিনিং জেনি’ (Spinning Jeny)।
  • (৩) ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড আর্করাইট আবিষ্কার করেন জলশক্তিচালিত কাপড় বোনার যন্ত্র ‘ওয়াটার ফ্রেম’ (Water Frame)।
  • (৪) ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রম্পটন আবিষ্কার করেন ‘মিউল’ (Mule) নামে মসৃণ সুতো কাটার এক উন্নত ধরনের যন্ত্র।
  • (৫) ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে এডমন্ড কার্টরাইট আবিষ্কার করেন পাওয়ার লুম বা যন্ত্রচালিত তাঁত। এইসব আবিষ্কারের ফলে বস্ত্রশিল্পে এক যুগান্তর আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যে অধিক পরিমাণে বস্ত্র উৎপাদন সম্ভব হয়।

বাষ্প শক্তি

  • (১) এতদিন এই যন্ত্রগুলি জলশক্তি ও বায়ুশক্তির সাহায্যে চালানো হত। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে জেমস ওয়াট  বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার করলে উৎপাদন পদ্ধতিতে এক বিপ্লব ঘটে যায়। জল ও বায়ুশক্তির স্থান নেয় বাষ্পশক্তি। এই ইঞ্জিনের সাহায্যে ভারী যন্ত্রগুলি চালানো যেত।
  • (২) অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, যন্ত্রচালনায় বাষ্পশক্তির প্রয়োগ ছিল শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি। ম্যাথু বোল্টন নামে এক ব্যক্তি জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতে থাকেন। এর নাম বোল্টন ইঞ্জিন। এর ফলে যন্ত্রগুলিকে ইচ্ছামতো চালিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়।

লৌহশিল্প

  • (১) শিল্পের প্রসারে লোহা ও ইস্পাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ড ছিল লোহার অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্রথমে লোহা গলানো হত কাঠ ও কয়লা পুড়িয়ে। আব্রাহাম ডারবি কয়লা ও চুনাপাথর জ্বালিয়ে লোহা গলাবার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
  • (২) ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে জন স্মিটন আবিষ্কার করেন লোহা গলাবার চুল্লি বা ফার্নেস’। এর ফলে খুব কম খরচে লোহা উৎপাদন সম্ভব হয়। হেনরি বেসেমার আকরিক লোহাকে শোধন করে ইস্পাত তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন।
  • (৩) এইসব কারণে কয়লা, লোহা ও ইস্পাত শিল্পে বিপ্লব ঘটে যায়। লোহা গলিয়ে যে ইস্পাত পাওয়া গেল তা দিয়ে তৈরি হতে লাগল রেল লাইন, জাহাজ, ভারী যন্ত্রপাতি প্রভৃতি।
  • (৪) অধ্যাপক ফিলিস ডীন বলেন যে, সস্তায় লোহা পাওয়া গিয়েছিল বলেই ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইংল্যান্ডেই আগে শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল। তিনি বলেন যে, ইংল্যান্ডের শিল্পায়নে লৌহশিল্পের ভূমিকা ছিল ব্যাপ্তিশীল ও উদ্দীপক।

কয়লা

লোহার বাপক ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে কয়লার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। খনিগর্ভে নিরাপদে কাজ করার জন্য ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে হামফ্রে ডেভি আবিষ্কার করেন ‘সেফটি ল্যাম্প’।

পরিবহন

  • (১) উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া শিল্প বিপ্লব হতে পারে না। ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে টেলফোর্ড এবং জন ম্যাকডাম পাথরকুচি ও পিচ দিয়ে মজবুত রাজপথ তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন।
  • (২) ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে জর্জ স্টিফেনসন বাষ্পচালিত রেলইঞ্জিন তৈরি করেন। এর ফলে পরিবহন শিল্পে যুগান্তর আসে। উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে ডারহ্যাম থেকে স্টকটন বন্দর পর্যন্ত যে রেল যোগাযোগ শুরু হয়, সেটাই হল বিশ্বের প্রথম আধুনিক রেলপথ।
  • (৩) ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে ৬ হাজার মাইল রেলপথ ছিল। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তার পরিমাণ হয় ১৭ হাজার মাইল। রেলপথ আধুনিক শিল্প, সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
  • (৪) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ফুলটন তৈরি করেন বাষ্পীয় পোত বা স্টিমার। এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় পাঁচ মাইল। পরে অবশ্য এর গতি বৃদ্ধি পায়। জেমস ব্রিডলে খাল ও ক্যানাল খনন করেন।
  • (৫) এরপর বৈদ্যুতিক শক্তির মাধ্যমে টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের সাহায্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নতি ঘটে। এইসব আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ড প্রথম শিল্প বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়।

উপসংহার:- ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পশ্চাতে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের কৃষি বিপ্লব ও প্রারম্ভিক শিল্পায়ন, সহজলভ্য শ্রমিক ও মূলধনের প্রাচুর্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।

(FAQ) ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শিল্প বিপ্লব প্রথম কোথায় শুরু হয়?

ইংল্যান্ডে।

২. শিল্প বিপ্লব কথাটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

ফরাসি দার্শনিক অগাস্তে ব্ল্যাঙ্কি।

৩. শিল্প বিপ্লব কথাটি কে জনপ্রিয় করেন?

ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি।

৪. শিল্প বিপ্লবের ফলে কোন দুই শ্রেনীর উদ্ভব হয়?

শ্রমিক ও মালিক শ্রেণী।

Leave a Reply

Translate »