বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ

বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ প্রসঙ্গে সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, ঋগ্বেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা, যজুর্বেদ সংহিতা ও অথর্ববেদ সংহিতা সম্পর্কে জানবো।

বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ

ঐতিহাসিক বিষয়বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণীবিভাগ
ঋগ্বেদ১০২৮ মন্ত্র
জৈমিনীয় ব্রাহ্মণসামবেদ
শতপথ ব্রাহ্মণযজুর্বেদ
গোপথ ব্রাহ্মণঅথর্ববেদ
বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ

ভূমিকা :- ভারতে আর্যদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত। বৈদিক সভ্যতায় সাহিত্যের সম্ভার ছিল অভাবনীয়। বৈদিক সাহিত্য চারটি ভাগে বিভক্ত। যথা – সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ।

সংহিতা

বৈদিক সাহিত্যের সংহিতা অংশ কতকগুলি স্তোত্র, প্রার্থনামন্ত্র আশীর্বচন, যজ্ঞবিধি ও সামাজিক উপাসনা মন্ত্রের সমষ্টি। সংহিতার মন্ত্রগুলি চার ভাগে বিভক্ত। যথা –

(১) ঋগ্বেদ সংহিতা

সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হল ঋগ্বেদ সংহিতা। ঋগ্বেদের বর্তমান মন্ত্রসংখ্যা ১০২৮। এই মন্ত্রগুলি দশটি মণ্ডলে বিভক্ত। এই মন্ত্রগুলির কিছু অংশ প্রথম থেকেই যজ্ঞ ও উপাসনার মন্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হত। কিন্তু অন্যান্য মন্ত্রও আছে যাদের সাথে যজ্ঞবিধির কোনও সম্পর্ক নেই। “এই সকল মন্ত্রে সত্যকার আদিম আধ্যাত্মিক কাব্যানুভূতির আমেজ পাওয়া যায়।”

(২) সামবেদ সংহিতা

সামবেদ সংহিতায় মন্ত্রের সংখ্যা ১৫৪৯। মাত্র ৭৫টি ব্যতীত সামবেদের অন্যান্য সকল মন্ত্রই ঋগ্বেদ থেকে গৃহীত। এই ৭৫টি মন্ত্র অন্যান্য সংহিতাতেও পাওয়া যায়। যজ্ঞকালে সঙ্গীত রূপে এই মন্ত্রগুলি ব্যবহৃত হত।

(৩) যজুর্বেদ সংহিতা

কেবল মন্ত্রের সমষ্টি নয়, যজুর্বেদ সংহিতা গদ্যাংশও (যজুঃ) আছে। এই গদ্যাংশগুলির কিছু অংশ ছন্দোময় এবং কখনও কখনও কবিত্বমণ্ডিত। যজুর্বেদের অধিকাংশ মন্ত্র ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়।

(৪) অথর্ববেদ সংহিতা

৭৩১টি মন্ত্রের সমষ্টি হল অথর্ববেদ সংহিতা। এই মন্ত্রগুলি ২০টি মণ্ডলে বিভক্ত। এদের একাংশ ঋগ্বেদ থেকে হুবহু গৃহীত হয়েছে। অথর্ববেদের বর্তমান রূপ নিঃসন্দেহে ঋগ্বেদের তুলনায় পরবর্তী কালের রচনা। অথর্ববেদের প্রধান গুরুত্ব এই যে, এটি পুরোহিততন্ত্রের প্রভাবমুক্ত। “এটি সত্যিকার লৌকিক বিশ্বাসসমূহ, বহু ভূতপ্রেত, অপদেবতা ও উপদেবতার অস্তিত্বে বিশ্বাস, এবং আভিচারিক মন্ত্রাদি সম্বন্ধে অমূল্য জ্ঞানের উৎস, এটি নৃতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে গবেষণার তাৎপর্যপূর্ণ।”

ব্রাহ্মণ

  • (১) বৈদিক সাহিত্যের ব্রাহ্মণ অংশ গদ্যে রচিত। এতে যাগযজ্ঞ সম্বন্ধীয় অনুষ্ঠানের বর্ণনা পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ অংশ সেই যুগের রচনা যখন আর্য সমাজের সমস্ত মানসিক তৎপরতা যাগযজ্ঞ, তাদের নিয়ম-প্রণালী, মূল্যবোধ, উৎস ও তাৎপর্য সম্বন্ধে আলোচনার কেন্দ্রীভূত ছিল।
  • (২) প্রাচীনতম ব্রাহ্মণগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঋগ্বেদের অন্তর্ভুক্ত ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ও কৌশিকী ব্রাহ্মণ; সামবেদের অন্তর্ভুক্ত তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ও জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ, এবং যজুর্বেদের অন্তর্ভুক্ত তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ও শতপথ ব্রাহ্মণ। অথর্ববেদের অন্তর্ভুক্ত ব্রাহ্মণগুলি অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের রচনা। এদের মধ্যে গোপথ ব্রাহ্মণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

আরণ্যক

  • (১) বৈদিক সাহিত্যের তৃতীয় অংশ আরণ্যক নামে পরিচিত। যারা বৃদ্ধ বয়সে সংসার ত্যাগ করে অরণ্যবাসী হতেন, এবং অরণ্যে উপযুক্ত উপকরণের অভাবে আড়ম্বর সহকারে যাগযজ্ঞ করতে পারতেন না তাঁদের ধর্মজীবন যাপনের পথ প্রদর্শনের জন্মই সম্ভবতঃ ‘আরণ্যক’গুলি রচিত হয়েছিল।
  • (২) তাদের পক্ষে যাগযজ্ঞের পরিবর্তে ধ্যান শ্রেষ্ঠতর, এই ধারণা ক্রমশঃ প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। এইভাবে বিচক্ষণ ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানের সার্থকতা সম্বন্ধে বিশ্বাস হ্রাস পেতে থাকে এবং তার পরিবর্তে সত্যের স্বরূপ সম্বন্ধে দার্শনিক চিন্তার সূত্রপাত হয়। আরণ্যক ভাগ ব্রাহ্মণ ভাগের পরিশিষ্ট। যেমন – ঐতরেয় আরণ্যক ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ধারাবাহী রচনা।

উপনিষদ

  • (১) একান্ত বৈঠকে শিষ্যের প্রতি গুরুর গুহ্য উপদেশাবলী বিবৃত হয়েছে উপনিষদ গুলিতে। প্রাচীন উপনিষদগুলি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘ষআরণ্যকের অংশ মাত্র, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরণ্যকের সাথে নতুন সংযোজন। বস্তুতঃ, আরণ্যক ও উপনিষদের মধ্যে প্রভেদ করা প্রায়ই কঠিন।
  • (২) উপনিষদ যাগযজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রতিক্রিয়াবিশেষ। উপনিষদে পরম সত্য ও সত্তার রূপ নির্ণয় করা হয়েছে। এই সত্যের জ্ঞান মানুষের মুক্তির জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হত। উপনিষদগুলি সচরাচর গদ্যে রচিত, তবে কোনো কোনো উপনিষদ সম্পূর্ণতঃ অথবা খণ্ডতঃ পদ্যে রচিত।
  • (৩) প্রধান উপনিষদগুলির মধ্যে ‘ঈশ’, ‘কেন’, ‘কণ্ঠ’, ‘প্রশ্ন’, ‘মুণ্ডক’, ‘মাণ্ডুক্য, তৈত্তিরীয়’, ‘ঐতরেয়’, ‘ছান্দোগ্য, ‘বৃহদারণ্যক’, ‘শ্বেতাশ্বতর’, ‘কৌশিতকী’ প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার :- বৈদিক সাহিত্য বিভিন্ন দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই বৈদিক সাহিত্য থেকে বৈদিক ভারতের ধর্মজীবনের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

(FAQ) বৈদিক সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৈদিক সাহিত্য কয় ভাগে বিভক্ত কি কি?

চার ভাগে, সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ।

২. ঋগ্বেদের বর্তমান মন্ত্রসংখ্যা কত?

১০২৮ টি।

৩. সামবেদের বেশীরভাগ মন্ত্র কোথা থেকে গৃহীত হয়েছে?

ঋগ্বেদ।

৪. বৈদিক সাহিত্যের ব্রাহ্মণ অংশ কিসে রচিত?

গদ্যে।

৫. দুটি উপনিষদের নাম লেখ।

ছান্দোগ্য ও বৃহদারণ্যক।

Leave a Comment