সামবেদ

আজ সামবেদ -এর ভাষা, বিভাগ, আর্চিকের ভাগ, মন্ত্র, রচনাকাল, ভারতীয় দর্শনে সামবেদের প্রভাব, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎস, স্বরলিপি, শাখা, উপনিষদ্ সম্পর্কে জানবো।

সামবেদ

পরিচিতিচতুর্বেদ -এর দ্বিতীয় বেদ
বৈশিষ্ট্যসংগীত ও মন্ত্রের সমষ্টি
রচনাকালআনুমানিক ১২০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব
সামবেদ

ভূমিকা :- সংগীত ও মন্ত্রের বেদ হল সামবেদ। সামবেদ সনাতনধর্মের সর্বপ্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদের দ্বিতীয় অংশ। এটি একটি প্রার্থনা মূলক ধর্মগ্ৰন্থ।

ভাষা

সামবেদ বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় রচিত।

বিভাগ

সামবেদকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। আর্চিক ও গান।

(১) আর্চিক

শুধুমাত্র সংগীতের সংকলনগুলো যাতে আছে তা আর্চিক।

(২) গান

যে অংশে সংগীতের স্বরলিপি আছে তার নাম গান। এই গানের চারটি ভাগ – গ্রামগেয়, অরণ্যগেয়, ঊহ ও উহ্য।

আর্চিক-এর ভাগ

আর্চিক আবার দুভাগে বিভক্ত। পূর্বার্চিক ও উত্তরার্চিক।

(১) পূর্বার্চিক

পূর্বাচিকের মন্ত্রগুলো দেবতা ও ছন্দ অনুসারে পরপর সাজানো।

(২) উত্তরার্চিক

উত্তরার্চিকের মন্ত্রগুলো যজ্ঞবিধি অনুসারে সাজানো।

মন্ত্র

সামবেদের কৌথুম শাখায় ১৮৭৫টি মন্ত্র আছে। এই মন্ত্রগুলির অধিকাংশ মূলত বেদের প্রথম ভাগ ঋগ্বেদ থেকে গৃহীত।

ভারতের সামবেদের পাণ্ডুলিপি

এটি একটি প্রার্থনামূলক ধর্মগ্রন্থ। বর্তমানে সামবেদের তিনটি শাখার অস্তিত্ব রয়েছে। এই বেদের একাধিক পাণ্ডুলিপি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে।

রচনাকাল

এই বেদের যে অংশটির অস্তিত্ব এখনও পর্যন্ত রয়েছে, সেটি পরবর্তী-ঋগ্বৈদিক মন্ত্র পর্যায়ে রচিত। এই অংশের রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি কোনো এক সময়।

ভারতীয় দর্শনে প্রভাব

বহুপঠিত ছান্দোগ্য ও কেন উপনিষদ সামবেদের অন্তর্গত। এই দুই উপনিষদ প্রধান উপনিষদগুলির অন্যতম এবং ভারতীয়দর্শনের (প্রধানত বেদান্ত দর্শন) ছয়টি শাখার উপর এই দুই উপনিষদের প্রভাব অপরিসীম।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎস

সামবেদকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যকলার মূল বলে মনে করা হয়।

শ্রীকৃষ্ণের মন্তব্য

চার বেদের মাঝে সামবেদের গুরুত্ব বোঝাতে ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে সামবেদ বলে বর্ণনা করেছেন।

স্বরলিপি

সামবেদে স্বরলিপিভুক্ত সুর পাওয়া যায়। এগুলিই সম্ভবত বিশ্বের প্রাচীনতম স্বরলিপিভুক্ত সুর, যা আজও পাওয়া যায়। এই স্বরলিপি সামবেদের শাখা অনুসারে অক্ষর বা সংখ্যার আকারে নিবদ্ধ।

শাখা

মহর্ষি পতঞ্জলি সামবেদের ১০০০টি শাখার কথা বলেছিলেন। শাখা হল বেদের পাঠ ও বিন্যাস পদ্ধতি। বর্তমানে সামবেদের মাত্র তিনটি শাখা উপলব্ধ আছে। যথা –

(১) কৌথুম শাখা

এই শাখাটি গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশায় প্রচলিত। কয়েক দশক ধরে এটি বিহারের দারভাঙ্গা অঞ্চলেও প্রচলিত রয়েছে।

(২) রাণায়নীয় শাখা

কৌথুম ও রাণায়নীয় শাখাতে মন্ত্রের সংখ্যা ১৮৭৫টি। এই শাখাটি মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, গোকর্ণ ও ওড়িশার কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত।

(৩) জৈমিনীয় শাখা

এই শাখাতে মন্ত্রের সংখ্যা ১৬৮৭টি। কৌথুম ও রাণায়নীয় শাখাতে নেই এমন ঋচাও এই শাখাতে পাওয়া যায়, যা ঋগ্বেদে আছে। এই শাখাটি কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও কেরল অঞ্চলে প্রচলিত।

সূত্রপাত

সামবেদের আদি সংকলনটি বৈদিক দেবতা অগ্নি ও ইন্দ্রের স্তোত্র দিয়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে তাত্ত্বিক আলোচনা ও দর্শনতত্ত্বে উপনীত হয়েছে এবং মন্ত্রের ছন্দ ধীরে ধীরে নিম্নগামী হয়েছে।

উদ্দেশ্য

সামবেদের উদ্দেশ্য হল আনুষ্ঠানিক। এই বেদের স্তোত্রগুলি ‘উদ্‌গাতৃ’ বা গায়ক পুরোহিতদের দ্বারা গাওয়া হয়।

ঋগ্বেদ থেকে গৃহীত মন্ত্র

সামবেদে ১৫৪৯টি একক মন্ত্র রয়েছে। এগুলির মধ্যে ৭৫টি বাদে বাকি সবগুলিই ঋগ্বেদ থেকে গৃহীত। ঋগ্বেদের নবম ও অষ্টম মণ্ডল থেকেই প্রধানত এই মন্ত্রগুলি গ্রহণ করা হয়েছে।

খেয়ালে রচিত নয়

সামবেদে সংগীত, শব্দ, অর্থবোধ ও আধ্যাত্মিকতার একটি প্রথা এক সৃজনশীল সামঞ্জস্যের প্রতীকে নিহিত। অর্থাৎ গ্রন্থটি হঠাৎ খেয়ালে রচিত হয়নি।

সামবেদীয় ব্রাহ্মণ

সামবেদের মোট ১১টি ব্রাহ্মণগ্রন্থ পাওয়া যায়। তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ, ষড্বিংশ ব্রাহ্মণ, সামবিধান ব্রাহ্মণ, দেবতাধ্যায় ব্রাহ্মণ, আর্ষেয় ব্রাহ্মণ, মন্ত্র ব্রাহ্মণ, সংহিতোপনিষদ্ ব্রাহ্মণ, বংশ ব্রাহ্মণ, জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ, জৈমিনীয় আর্ষেয় ব্রাহ্মণ, জৈমিনীয় উপনিষদ্ ব্রাহ্মণ

উপনিষদ্

সনাতনধর্মের দুটি প্রধান উপনিষদ্ সামবেদের অন্তর্গত। এদুটি হল ছান্দোগ্য উপনিষদ ও কেন উপনিষদ‌। দুটি উপনিষদ‌ই উচ্চমানের ছন্দোময় সাংগীতিক গঠনের জন্য বিখ্যাত।

ছান্দোগ্য উপনিষদ্

ছান্দোগ্য উপনিষদ্ সামবেদের তাণ্ড্য শাখার অন্তর্গত। এটি সামবেদের নবীনতম স্তরের ধর্মগ্রন্থ। বিভিন্ন মত অনুসারে, ভারতে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এটি রচিত হয়।

কেন উপনিষদ্

সামবেদের তলবকার ব্রাহ্মণ শাখার শেষ পর্যায়ে কেন উপনিষদ‌ নিহিত আছে। দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্নগুলির বিচারের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ছান্দোগ্য উপনিষদেরই মতো।

সামবেদ পঠনের ধারা

সামবেদ পাঠের প্রায় ১২টি ধারা রয়েছে। এখনও অস্তিত্বশীল তিনটি সংস্করণের মধ্যে জৈমিনীয় ধারাটি সামবেদ পাঠের প্রাচীনতম অস্তিত্বমান ধারাটিকে রক্ষা করে চলেছে।

প্রকাশনা

  • (১) সামবেদের কৌথুম শাখার সংহিতা, ব্রাহ্মণ, শ্রৌতসূত্র ও অতিরিক্ত সূত্রগুলি মূলত বি. আর. শর্মা কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।
  • (২) জৈমিনীয় শাখার কিছু অংশ এখনও অপ্রকাশিত। ডব্লিউ. ক্যালান্ড সামবেদ সংহিতার প্রথম অংশের একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন।
  • (৩) রঘু বীর ও লোকেশ চন্দ্র সামবেদ ব্রাহ্মণের কিছু অংশ প্রকাশ করেন। তারা সামবেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বল্প-পরিচিত উপনিষদগুলি প্রকাশ করলেও শ্রৌতসূত্রের সামান্য কিছু অংশ মাত্র প্রকাশ করেন।
  • (৪) ১৮৪৮ সালে থিওডোর বেনফি সামবেদের কৌথুম শাখার একটি জার্মান সংস্করণ প্রকাশ করেন।
  • (৫) সত্যব্রত সামাশ্রমী ১৮৭৩ সালে একটি সংস্কৃত সংস্করণ প্রকাশ করেন।
  • (৬) ১৮৯৩ সালে র্যা লফ গ্রিফিথ সামবেদের একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন।

প্রাচীন সংগীত গ্ৰন্থ

সামবেদ পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন সংগীত গ্রন্থ। গাই বেকের মতে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের মূল সামবেদ, উপনিষদ‌ ও আগম শাস্ত্রের ধ্বনি ও সংগীত-সংক্রান্ত দিক‌নির্দেশিকার মধ্যে নিহিত।

বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ

গান ও মন্ত্রপাঠ ছাড়াও সামবেদে বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। বাদ্যযন্ত্রগুলি বাজানোর নিয়ম ও নির্দেশিকা গন্ধর্ববেদ নামে পৃথক একটি সংকলনে পাওয়া যায়। এটি সামবেদের সঙ্গে যুক্ত একটি উপবেদ।

ভারতীয় সংগীতে অবদান

সামবেদে বর্ণিত মন্ত্রপাঠের গঠন ও তত্ত্ব ভারতীয় শাস্ত্রীয় শিল্পকলার গঠনগত আদর্শগুলিকে প্রভাবিত করেছে। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সামবেদের অবদান সংগীতজ্ঞরা বহুলভাবে স্বীকার করে থাকেন।

উপসংহার :- সামবেদ ঋগ্বেদের মতো গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। কারণ, সাংগীতিক সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতা এবং ৭৫টি শ্লোক ছাড়া এই গ্রন্থ মূলত ঋগ্বেদ থেকেই গৃহীত। সেই কারণে ঋগ্বেদ পাঠই যথেষ্ট মনে করা হয়।

(FAQ) সামবেদ হতে জিজ্ঞাস্য ?

১. ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎস কোন বেদ?

সামবেদ।

২. সামবেদের অন্তর্গত উপনিষদ দুটির নাম লেখ?

ছান্দোগ্য উপনিষদ্ ও কেন উপনিষদ্।

Leave a Reply

Translate »