নবম লুই

ফরাসি সম্রাট নবম লুই প্রসঙ্গে তার জন্ম, অভিষেক অনুষ্ঠান, শাসনকাল, জাতীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা, তার অভিভাবক ব্যক্তিগত শাসনতান্ত্রিক সূচনা, ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে নবম লুইয়ের অংশগ্রহণ, বিবাহ, মোঙ্গলদের সঙ্গে সম্পর্ক, নবম লুইয়ের সংস্কৃতি মনস্কতা, স্বর্ণযুগ, সামরিক বাহিনী নবম লুইয়ের সময় পোপতন্ত্র ও ফ্রান্সের সম্পর্ক, জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থানে অবদান ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

ফরাসি সম্রাট নবম লুই

ঐতিহাসিক চরিত্রনবম লুই
পরিচিতিফ্রান্সের সম্রাট
অন্য নামসেন্ট লুই
জন্ম২৫ এপ্রিল ১২১৪ খ্রি
রাজত্বকাল১২২৬-১২৭০ খ্রি
মৃত্যু২৫ আগস্ট ১২৭০ খ্রি
ফরাসি সম্রাট নবম লুই

ভূমিকা:- অষ্টম লুইয়ের পর ফ্রান্স -এর সিংহাসনে আরোহণ করেন নবম লুই। নবম লুই এর রাজত্বকালে ফ্রান্সের মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র চরম সীমায় পৌঁছেছিল।

নবম লুইয়ের জন্ম

১২১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ফ্রান্সের পোইসিতে নবম লুই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন অষ্টম লুইয়ের সন্তান। তিনি সাধারণভাবে “Saint Louis” নামে পরিচিত ছিলেন।

নবম লুইয়ের শাসনকাল

তার শাসনকাল ছিল ১১২৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ই নভেম্বর থেকে ১২৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে আগস্ট পর্যন্ত।

নবম লুইয়ের অভিষেক অনুষ্ঠান

১২২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে নভেম্বর নবম লুইয়ের অভিষেক হয়েছিল।

জাতীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা

তিনি ফ্রান্সে জাতীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। প্যারিসের সংসদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। Jean de Joinville-এর লেখা নবম লুই-এর বিখ্যাত জীবনী গ্রন্থের নাম ছিল “Life of Saint Louis”।

নবম লুইয়ের অভিভাবক

১২২৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ই নভেম্বর নবম লুইয়ের বয়স যখন ১২ বছর তখন তার পিতার মৃত্যু হয়েছিল। অল্প বয়সে সম্রাট হওয়ার জন্য তার মাতা সমস্ত কার্যভার নিয়েছিলেন এবং নবম লুইয়ের অভিভাবক হিসাবে রাজকার্য চালিয়েছিলেন।

নবম লুইয়ের ব্যক্তিগত শাসনতন্ত্রের সূচনা

Beaulieu-এর Geoffrey এবং William-এর লিখিত লুইয়ের জীবনী গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১২৩৪ খ্রিস্টাব্দে তার ব্যক্তিগত শাসনতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল। তার মাতা অবশ্য পরামর্শদাতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ১২৫২ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তার মাতার কার্যকরী ভূমিকা ছিল।

নবম লুইয়ের বিবাহ

১২৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে মে নবম লুই প্রোভিন্সের মার্গারেটকে বিবাহ করেছিলেন।

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে নবম লুইয়ের অংশগ্রহণ

সম্রাট নবম লুই দুটি ক্রুসেডে অংশ নিতে পেরেছিলেন। ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত সপ্তম ক্রুসেড এবং ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে অষ্টম ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ফরিস্কু-এর যুদ্ধে পরাজিত নবম লুই

Tyerman বলেন, ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে নবম লুই দামিয়েত্বা অধিকার করেছিলেন। Trevor N. Dupuy-এর লিখিত “The Harper Encyclopedia of Military History” নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের ৬ই এপ্রিল নবম লুই ফরিস্কু-এর যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন এবং ইজিপ্ট এই অঞ্চলটি অধিকার করেছিল।

ক্রুসেডগাদের সুরক্ষায় নবম লুই

নবম লুই প্রায় ৪ বছর Acre, Caesarea এবং Jaffe তে সময় অতিবাহিত করেছিলেন। নবম লুই তার সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করেছিলেন ক্রুসেডগাদের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবার জন্য।

মোঙ্গলদের সঙ্গে নবম লুইয়ের সম্পর্ক

নবম লুই মোঙ্গল শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। মঙ্গোলিয়ার Guyuk Khan বা বিখ্যাত খান-এর দরবারে তিনি দূত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ-এর আগেই Guyuk Khan-এর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর নবম লুই উইলিয়ামকে মোঙ্গলিয়ার Mongke Khan-এর দরবারে পাঠাতে পেরেছিলেন।

রাজশক্তি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে নবম লুইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

নবম লুইয়ের সময়কালে রাজতন্ত্র শক্তিশালী ভিত্তির উপর স্থাপিত ছিল। রাজশক্তি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে নবম লুই যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা প্রশংসনীয় ছিল।

নবম লুইয়ের সংস্কৃতি মনস্কতা

সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক রূপে নবম লুইয়ের কৃতিত্ব ছিল। গথিক শিল্পশৈলীর ক্ষেত্রে যে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছিল নবম লুই সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্যারিসের “Sainte-Chapelle”-এর শিল্পশৈলী অনুকরণ করা হয়েছিল। মধ্যযুগীয় অঙ্কনশৈলীর ক্ষেত্রে “Morgan Bible” ছিল উল্লেখযোগ্য।

সেন্ট লুইয়ের স্বর্ণযুগ

ফ্রান্সে জাতীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নবম লুই বা সেন্ট লুইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সেন্ট লুইয়ের শাসনকালকে বলা হত সেন্ট লুইয়ের স্বর্ণযুগ। এই সময়কালে ইউরোপে ফ্রান্স বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ফ্রান্স ইউরোপের অগ্রণী দেশ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল।

নবম লুইয়ের সামরিক বাহিনী

সম্রাট নবম লুইয়ের সামরিক বাহিনী ছিল বিশেষ শক্তিশালী এবং সামরিক দিক থেকে তিনি তার বাহিনীকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

নবম লুইয়ের সময় সম্পদশালী ফ্রান্স

ইউরোপের সম্পদশালী দেশ হিসাবে ফ্রান্সকে গড়ে তুলেছিলেন নবম লুই। সার্থক শিল্পশৈলীর অন্যতম নিদর্শন “Sainte Chapelle” তার সময়ে নির্মিত হয়।

নবম লুইয়ের সময় পোপতন্ত্র ও ফ্রান্সের সম্পর্ক

পোপতন্ত্র এবং ফ্রান্স-এর পারস্পরিক সম্পর্ক দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতকে অন্যতম উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বেশিরভাগ ক্রুসেড আহ্বান করা হয়েছিল ফ্রান্সের থেকে আগত পোপদের দ্বারাই।

ফ্রান্সে জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থানে নবম লুইয়ের অবদান

নবম লুই একজন আদর্শ খ্রিস্টান সম্রাট হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ফ্রান্সের বুরবোঁ বংশের অনেক সম্রাটই লুই নামে পরিচিত। নবম লুই ফরাসী সম্রাট হিসাবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তার প্রচেষ্টার ফলেই সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ফ্রান্স উন্নত হয়েছিল এবং জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থান সম্ভব হয়েছিল।

শক্তিশালী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নবম লুইয়ের ভূমিকা

  • (১) John de Joinville তাঁর “Memoirs of Louis IX, King of France” গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, নবম লুই সেন্ট লুই হিসাবে পরিচিত হলেও সাম্রাজ্যকে সুগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। নবম লুই শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
  • (২) নবম লুই ধর্মীয় অনুরাগী হলেও বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রপরিচালনা করেছিলেন। নবম লুই দুবার ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নবম লুই নতুন কোনো অঞ্চল জয় করতে না পারলেও যে অঞ্চলগুলি তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন।
  • (৩) নবম লুই শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামন্তপ্রভুদের সহায়তা পেয়েছিলেন। সামন্তপ্রভুরা নবম লুইকে প্রবলভাবে সমর্থন করেছিলেন। নবম লুই তার সাম্রাজ্যে প্রজাদের উপর যাতে কোনোরকম অত্যাচার না হয় তার জন্য কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পরিবর্তে উদারপন্থী রাজতন্ত্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
  • (৪) ধর্মীয় দিক থেকে তিনি কঠোর ছিলেন। খ্রিস্টান বিরোধীদের চরম শাস্তি দিতেও কোনোরকম সংশয় তার মধ্যে ছিল না। নবম লুইয়ের শাসনকালে ইউরোপে ফরাসীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নবম লুই ছিলেন ন্যায়পরায়ণ সম্রাট। নবম লুইয়ের মতে, পোপ ধর্মগুরু হলেও বিচক্ষণ ব্যক্তিদের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। নবম লুই পোপের সমালোচনা করেছেন এবং বিশপকেও সমালোচনা করেছেন।
  • (৫) নবম লুই তার সাম্রাজ্যে প্রজাদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ফলে প্রজাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। যাজক ও পোপরা প্রজাদের উপর অত্যাচার করে যে অর্থ আদায় করতেন তার বিরোধিতাও করেছেন। নবম লুই-এর শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিল্প রীতির পৃষ্ঠপোষকতা ছিল উল্লেখযোগ্য।
  • (৬) নবম লুই ইউরোপীয় ইতিহাসে সেন্ট লুই নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি একজন বিচক্ষণ শাসক ছিলেন। তিনি তার সাম্রাজ্যে রাজকীয় কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। তার স্থানীয় ক্ষেত্রে বা শাসনতান্ত্রিক যে কোনো সমস্যার সমাধান করবার জন্য উদ্যোগী ছিলেন। নবম লুই-এর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় শাসনব্যবস্থার বিকাশে সহায়তা করা।
  • (৭) নবম লুই-এর শাসনকালে শহুরে জীবন ধারার উন্নতি হয়েছিল। তার সময়কালে ১২৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের চুক্তির দ্বারা ইংল্যান্ডের সঙ্গে সংঘাতের অবসান হয়েছিল। নবম লুই যেহেতু ধর্মীয় দিক থেকে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তাই প্যারিসে চার্চ নির্মাণের ক্ষেত্রেও উদ্যোগী হয়েছিলেন। তার উদ্যোগে প্যারিসের চার্চ “Sainte-Chapelle” নির্মিত হয়েছিল।
  • (৮) নবম লুই রাজকীয় বিচারালয়গুলিতে আইন বিষয়ে যাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে নজর দিয়েছিলেন। রাজকীয় বিচারালয়ের মধ্যে দিয়ে সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার করেছিলেন।

নবম লুইয়ের মৃত্যু

১২৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে আগস্ট তার মৃত্যু হয়েছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারী ছিলেন তার সন্তান তৃতীয় ফিলিপ।

নবম লুইয়ের মৃত্যুর কারণ

বিউবোনিক প্লেগে নবম লুইয়ের মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করা হলেও আধুনিক পণ্ডিতবর্গ মনে করেন, পেটের সমস্যাজনিত রোগে তার মৃত্যু হয়েছিল। কারণ বিউবোনিক প্লেগ ইউরোপে ১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দের আগে দেখতে পাওয়া যায় নি।

উপসংহার :- নবম লুইয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র তৃতীয় ফিলিপ ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহন করেন। পিতা নবম লুইয়ের গুণ তার মধ্যে বিশেষ ছিল না।

(FAQ) ফরাসি সম্রাট নবম লুই সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. নবম লুই কে ছিলেন?

ফ্রান্সের বুরবোঁ বংশের বিখ্যাত রাজা ছিলেন নবম লুই।

২. নবম লুই ইউরোপের ইতিহাসে কি নামে পরিচিত ছিলেন?

সেন্ট লুই।

৩. নবম লুইয়ের রাজত্বকাল কত?

১২২৬-১২৭০ খ্রিস্টাব্দ।

৪. নবম লুইয়ের অভিভাবক কে ছিলেন তার মা?

তার মাতা।

৫. নবম লুইয়ের মৃত্যু হয় কখন?

 ২৫শে আগস্ট ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment