ঝালা মানসিংহ

মহারানা প্রতাপ সিংহের বিশ্বস্ত অনুচর ঝালা মানসিংহ প্রসঙ্গে ঝালা আজাজি, খানুয়ার যুদ্ধ, হলদিঘাটের যুদ্ধ, পরিবার, চেহারা ও আকৃতি, আকবরের সেনাবাহিনী, মহারানা প্রতাপের সৈন্য, মোগলদের শিবির স্থাপন, রক্ত তালাই, মোগল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, মোগল হস্তীবাহিনীকে বিভ্রান্ত, মানসিংহের হাতির নিধন, রানা প্রতাপ সিংহকে ঘিরে ফেলা, আহত চেতক, ঝালা মানসিংহ কর্তৃক রানা প্রতাপের বেশ ধারণ, ঝালা মানসিংহের পরামর্শ, মুঘল বাহিনীর উদ্দেশ্য, মহারানা প্রতাপের যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ, ঝালা মানসিংহের বীরগতি লাভ, মেবার পুনরুদ্ধার, ঝালা রাজবংশের অবদান ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

ঝালা মানসিংহ

অপর নামঝালা মান্না
বংশঝালা রাজবংশ
পরিচিতিমহারানা প্রতাপ -এর বিশ্বস্ত অনুচর
যুদ্ধহলদিঘাটের যুদ্ধ
ঝালা মানসিংহ

ভূমিকা:- রাজপুতদের ইতিহাসে একজন স্বামীভক্ত সৈনিক ছিলেনঝালা মানসিংহ।তার মতো চরিত্রের উদাহরণ খুব কমই আছে। রাজস্থানের ইতিহাসে তার আত্মত্যাগ তাকে অমর করে রেখেছে।

ঝালা আজাজি

১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানওয়ার ময়দানে যখন বাবর ও রানা সঙ্গর বাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল তখন এই যুদ্ধে রানা সঙ্গর সেনাপতি ছিলেন ঝালা আজাজি।তার নাতি ছিলেন ঝালা মানসিংহ।

খানুয়ার যুদ্ধ

১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানুয়ার যুদ্ধ -এর ময়দানে রানা সঙ্গকে উদ্ধার করার সময় ঝালা আজাজি বীরগতি লাভ করেন।

হলদিঘাটের যুদ্ধ

খানুয়ার যুদ্ধের ৫০ বছর পর ১৫৭৬ সালের ১৮ জুন, খানুয়ার যুদ্ধে ঝালা আজাজি যেভাবে মহারানা সঙ্গকে রক্ষা করেছিলেন, ঠিক একইভাবে হলদিঘাটের যুদ্ধে ঝালা আজাজির নাতি ঝালা মানসিংহের জন্য মহারানা প্রতাপ রক্ষা পেয়েছিলেন।

পরিবার

ঝালা মানসিংহের আরেক নাম ছিল ঝালা মান্না। ঝালা মানসিংহ বদি সাদরির একটি রাজপুত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং সাদরির জায়গির ছিল। ঝালা মানসিংহের পিতার নাম ছিল রাজরানা সুরতন সিং ঝালা। চম্পাবাই ঝালা নামে তার একটি বোন ছিল, যার বিয়ে হয়েছিল মহারানা প্রতাপের সাথে।

চেহারা ও আকৃতি

হলদিঘাটের যুদ্ধে ঝালা মানসিংহ মহারানা প্রতাপের সেনাবাহিনীর বাম দিকের নেতৃত্বে ছিলেন। ঝালা মানসিংহ চেহারায় এবং আকারে প্রায় মহারানা প্রতাপের মতোই ছিলেন।

আকবরের সেনাবাহিনী

হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবর -এর সেনাবাহিনীতে ৫০ হাজারের বেশি সৈন্য ছিল এবং হাতির সংখ্যাও ছিল বেশি।

মহারানা প্রতাপের সৈন্য

মহারানা প্রতাপের সৈন্য সংখ্যা ছিল১৫ হাজার। কিন্তু ঘোড়ার সংখ্যা মোগলদের তুলনায় মহারানা প্রতাপের সেনাবাহিনীতে বেশি ছিল।

মোগলদের শিবির স্থাপন

আকবরের বাহিনী হলদিঘাট -এ সমতলের কাছে খোলা জায়গায় তাদের শিবির স্থাপন করেছিল এবং তারপরে হাকিম খান সুরের নেতৃত্বে মহারানা প্রতাপের অগ্রগামী বাহিনী আকবরের সেনাবাহিনীকে পদদলিত করে।

রক্ত তালাই

আকবরের বিশাল বাহিনী আতঙ্কিত হয়ে প্রায় ৫ কিমি পিছু হটে এক খোলা মাঠে রক্ত ​​তালাই নামক স্থানে মহারানা প্রতাপ এবং আকবরের সেনাবাহিনীর মধ্যে ৫ ঘন্টা ধরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়।

মোগল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব

মহারানা প্রতাপের বিরুদ্ধে আকবরের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন রাজা মানসিংহ।

মোগল হস্তীবাহিনীকে বিভ্রান্ত

মুঘল সেনাবাহিনীতে হাতির সংখ্যাবেশি থাকার কারণে চেতক -এর মাথায় হাতির মুখোশ স্থাপন করা হয়েছিল, যাতে হাতিদের বিভ্রান্ত করা যায়।

মানসিংহের হাতির নিধন

হলদিঘাটের যুদ্ধে মহারানা প্রতাপ শত্রুদের নির্মূল করতে গিয়ে মানসিংহের হাতির কাছে পৌঁছে যান। মানসিংহ -এর সেই হাতির কাঁধে তলোয়ার বাঁধা ছিল। মহারানা প্রতাপ চেতকের সহায়তায় সরাসরি মানসিংহের হাতির মাথায় চড়েন, কিন্তু মানসিংহ মহারানা প্রতাপকে দেখে লুকিয়ে পড়েন। এই সময় মহারানা প্রতাপের প্রচণ্ড আঘাতে মানসিংহের হাতি নিহত হয়।

রানা প্রতাপকে ঘিরে ফেলা

সেনাপতির উপর আক্রমণ দেখে মুঘল বাহিনী একই সাথে চারদিক থেকে মহারানা প্রতাপকে ঘিরে ফেলে এবং সামান্য আঘাত করে।

আহত চেতক

হাতি থেকে নামার সময় হাতির কাঁধে বাঁধা তরবারির আঘাতে চেতকের একটি পা কেটে যায়। ফলে মহারানা প্রতাপ যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্যম হারিয়ে ফেলেন।

ঝালা মানসিংহের মহারানা প্রতাপের বেশ ধারণ

মহারানা প্রতাপকে শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত দেখে সাদরি সর্দার ঝালা মানসিংহ মহারানা প্রতাপের কাছে পৌঁছান এবং জোরপূর্বক আহত মহারানা প্রতাপের পাগড়ি ও ছাতা নিয়ে নিজে ধারণ করেন।

ঝালা মানসিংহের পরামর্শ

তিনি মহারানা প্রতাপকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বলেছিলেন যে আমরা মুঘলদের পিঠ ভেঙে দিয়েছি তবে তারা সংখ্যায় বেশি তাই সম্ভবত তারা আপনার ক্ষতি করতে পারে।

মুঘল বাহিনীর উদ্দেশ্য

মুঘল সেনাবাহিনীর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মহারানা প্রতাপকে হত্যা করা বা তাকে জীবিত বন্দী করা।তাই ঝালা মানসিংহ তাকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে চলে যেতে অনুরোধ করেন।

মহরানা প্রতাপের যুদ্ধ ক্ষেত্র ত্যাগ

মুঘল বাহিনী ঝালা মানসিংহকে মহারানা প্রতাপ হিসাবে আক্রমণ করতে শুরু করে। মহারানা প্রতাপের ছাতা এবং পাগড়ি পরিহিত ঝালা এক অনন্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, যার কারণে মহারানা প্রতাপ যুদ্ধের ময়দান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পান।

বীরগতি লাভ

ঝালা মানসিংহকে মুঘলদের দ্বারা বেষ্টিত দেখে রামশাহ তোমর এগিয়ে আসেন এবং সঙ্গীদের নিয়ে মুঘলদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করেন। এইভাবে ঝালা মানসিংহ এবং রামশাহ তোমর মুঘলদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে বীরগতি লাভ করেন।

মেবার পুনরুদ্ধার

ঝালা মানসিংহের এই আত্মত্যাগের কারণেই মহারানা প্রতাপ পরবর্তীতে মেবারকে মুঘলদের হাত থেকে মুক্ত করতে সফল হন।

ঝালা রাজবংশের অবদান

মেবারের শাসকদের উপর কঠিন সময় উপস্থিত হলে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ঝালা রাজবংশের সন্তানরাই এগিয়ে এসেছে।এক্ষেত্রে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। যথা –

  • (১) খানুয়ার যুদ্ধের সময় রানা সঙ্গকে উদ্ধার করার জন্য ঝালা আজাজি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
  • (২) ১৫৩৫ সালে যখন বাহাদুর শাহ চিতোরগড় আক্রমণ করেছিলেন তখন আজাজির পুত্র সিংহজিও মাতৃভূমির প্রতিরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছিলেন।
  • (৩) ১৫৬৮ সালে আকবরের মুঘল সেনারা চিতোরগড় আক্রমণ করলে আজাজির নাতি বীর সুরতন সিং মুঘলদের সাথে ভয়ানক যুদ্ধ করেন এবং শাহাদাত বরণ করেন।
  • (৪) ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রানা প্রতাপ সিংহকে উদ্ধার করতে গিয়ে ঝালা মানসিংহ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ঝালা রাজবংশের গুরুত্ব

যখনই মহারানা প্রতাপ এবং হলদিঘাটের যুদ্ধের কথা বলা হবে ঝালা মানসিংহের নাম অবশ্যই থাকবে। যখনই মেবার রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে ঝালা রাজবংশের নাম সর্বদা সূর্যের মতো জ্বলবে।

উপসংহার:- হলদিঘাটের ভয়াবহ যুদ্ধে ঝালা মানসিংহই মহারানা প্রতাপের জীবন রক্ষা করেছিলেন। ঝালা মানসিংহ মুঘল সেনাবাহিনী দ্বারা বেষ্টিত মহারানা প্রতাপের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। হলদিঘাটের এই অদম্য যোদ্ধা ঝালা মানসিংহ তাঁর বীরত্ব ও প্রভূভক্তির জন্য পরিচিত।

(FAQ) ঝালা মানসিংহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঝালা মানসিংহ কে ছিলেন?

মেবারের মহারানা প্রতাপের বিশ্বস্ত অনুচর ঝালা মানসিংহ হলদিঘাটের যুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গ করে রান প্রতাপকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন।

২. ঝালা মানসিংহ কোন যুদ্ধে রানা প্রতাপের ছদ্মবেশে যুদ্ধ করেন?

হলদিঘাটের যুদ্ধ।

৩. হলদিঘাটের যুদ্ধ কখন হয়?

১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »