ইতিহাসের গুরুত্ব

ইতিহাসের গুরুত্ব প্রসঙ্গে ইতিহাস রচনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, মানবজাতির অতীত কান্ড, ইতিহাসের গুরুত্ব হিসেবে অতীতের আয়না, জ্ঞানের বিকাশ, ধারাবাহিকতা, বর্তমান যুগের ভিত্তি, স্থিতিশীলতার গুরুত্ব, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নতির সোপান, ধর্ম সহিষ্ণুতা, সংস্কৃতি অগ্রগতি, জাতীয়তাবোধের বিকাশ, আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ, দুর্যোগ সম্পর্কে সতর্কতা, ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরী, উইনস্টন চার্চিল ও সেবাইনের মন্তব্য সম্পর্কে জানবো।

ইতিহাসের গুরুত্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাইতিহাসের গুরুত্ব
সুল ই কুলআকবর
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর১৭৭০ খ্রি
পঞ্চাশের মন্বন্তর১৯৪৩ খ্রি
ফরাসি বিপ্লব১৭৮৯ খ্রি
রুশ বিপ্লব১৯১৭ খ্রি
ইতিহাসের গুরুত্ব

ভূমিকা :- সমাজবিজ্ঞানের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল ইতিহাস। ইতিহাস হল সমাজবিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাগুলির মধ্যে অন্যতম শাখা। ইতিহাস পাঠের নানা গুরুত্ব রয়েছে। তবে ইতিহাসকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে গেলে সেই ইতিহাস অবশ্যই সুসংবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রচিত হওয়া উচিত।

ইতিহাস রচনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের সময় থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক যথার্থ ও বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস লেখার সুসংবদ্ধ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছেন। সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে ইতিহাস রচিত হলে আমাদের জীবনে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

মানব জাতির অতীত কর্মকাণ্ড

ইতিহাস হল মানবজাতির অতীত কর্মকাণ্ডের কালানুক্রমিক ও ধারাবাহিক লিখিত বিবরণ। ইতিহাস থেকে আমরা অতীতের কোনো দেশ বা জাতির অতীত সম্পর্কে জানতে পারি।

ইতিহাসের গুরুত্ব

বর্তমান শতাব্দীতে ব্যাবহারিক বিজ্ঞানে চরম অগ্রগতি ঘটলেও ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব মোটেই হ্রাস পায়নি। সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হিসেবে ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্ব সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল।

(ক) অতীতের আয়না

ইতিহাস হল অতীতের আয়না। ইতিহাসে অতীতের কাহিনি সংরক্ষিত থাকে। –

(১) অতীত কাহিনি সংরক্ষণ

অতীতে ঘটে যাওয়া কাহিনিগুলি সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখে ইতিহাস। বিভিন্ন সভ্যতার ক্রমবিকাশ, বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতন, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও রাজা-বাদশার কর্মকাণ্ড প্রভৃতি সব ঘটনাই ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়। সংরক্ষিত ইতিহাসের কল্যাণকর দিকগুলি অনুসরণ করে বর্তমান প্রজন্ম সুপথে পরিচালিত হতে পারে।

(২) ধারাবাহিক বিবরণ

সুদূর অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান – এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মানব-ইতিহাসে নানা পরিবর্তন ঘটে গেছে। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব, তাদের বন্য বা অসভ্য দশা, অসভ্য জীবন থেকে ক্রমে সভ্যতায় পদার্পণ, সভ্যতার ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রভৃতি সবকিছুই আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি।

(খ) জ্ঞানের বিকাশ

  • (১) সমাজজীবনের বিভিন্ন শাখা থেকে আমরা প্রতিনিয়ত জ্ঞান সময় করে থাকি। তবে এসব শাখাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো জ্ঞানের ভাণ্ডার হল ইতিহাস। জ্ঞানের জগতের প্রায় সর্বদিক নিয়েই ইতিহাস আলোচনা করে থাকে।
  • (২) মানবসমাজের বিবর্তন, সভ্যতার উত্থান ও পতন, সাম্রাজ্য ও রাজবংশের উত্থান-পতন, ধর্মনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানের অগ্রগতি, সংস্কারকার্য, বিপ্লব, আন্দোলন, মহাপুরুষদের কর্মকাণ্ড প্রভৃতি সবকিছুই ইতিহাসের আলোচনায় স্থান লাভ করে।

(গ) ধারাবাহিকতা

  • (১) সুদূর অতীত থেকে শুরু করে মানুষের অসভ্য জীবন, সভ্যতার বিকাশ, প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের সুত্রপাত প্রভৃতি নানা পর্ব অতিক্রান্ত হয়েছে। ইতিহাস প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলি পরবর্তী মধ্যযুগের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, মধ্যযুগের নিদর্শনগুলি আবার আধুনিক যুগের মানুষের কাছে উপস্থাপন করে।
  • (২) এভাবে ইতিহাস বিভিন্ন যুগের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে ইতিহাসের বিভিন্ন যুগ ও ঘটনাকে ধারাবাহিক করে তোলে। বর্তমান প্রজন্ম এই ধারাবাহিকতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারে ইতিহাস থেকে।
  • (৩) যেমন – প্রাচীন ভারতে মানুষ কবে এবং কীভাবে মেহেরগড় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, বৈদিক সভ্যতা প্রভৃতি সভ্যতার প্রতিষ্ঠা করল এবং ভারতের ইতিহাসে কীভাবে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের উত্তর ঘটল তার ধারাবাহিক কাহিনি ইতিহাস থেকেই জানা যায়।

(ঘ) বর্তমান যুগের ভিত্তি

  • (১) ইতিহাস হল অতীতের সাক্ষী। অতীতের সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মানুষ বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে। তাই বলা যায় যে, বর্তমান মানবজাতির মূল শিকড় ইতিহাসের সুদূর গভীরে গাথা রয়েছে। অর্থাৎ অতীতের ভিতের ওপর বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে আছে এবং ইতিহাস হল বর্তমান যুগের ভিত্তি।
  • (২) তাই বর্তমানকে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে গেলে অতীত ইতিহাসকে অবশ্যই ভালো করে জানা ও বোঝা দরকার। একমাত্র ইতিহাসই বর্তমানকে ভালো করে জানার সেই সুযোগ করে দেয়। যেমন – বর্তমান ভারত নানা ভাষা ও ধর্মের দেশ। ভাষা ও ধর্মের এই বিভিন্নতার ভিত্তি লুকিয়ে আছে ভারতের সুপ্রাচীন অতীতে।

(ঙ) স্থিতিশীলতার গুরুত্ব

  • (১) যে-কোনো দেশ বা জাতির সার্বিক অগ্রগতির জন্য সেখানকার সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। যে সমাজ, দেশ বা জাতির জীবন যত বেশি স্থিতিশীল তারা তত বেশি উন্নতি করতে পেরেছে। দেশ ও জাতির উন্নতির পথে অস্থিতিশীলতা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।
  • (২) অতীতের কোনো দেশ বা জাতির অস্থিতিশীলতা ও পশ্চাৎগতির কারণ লুকিয়ে থাকে ইতিহাসে। ইতিহাস থেকে সেসব কারণ উপলব্ধি করে এবং অতীতের ত্রুটিগুলি দূর করে বর্তমান দেশ ও জাতিকে স্থিতিশীল ও উন্নয়নশীল করে তোলা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, প্রাচীন ভারতে গুপ্তযুগে সামাজিক স্থিতিশীলতার ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যে শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছিল।

(চ) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উন্নয়ন

  • (১) ইতিহাস থেকে অতীতের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শাসকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ সম্পর্কে জানা যায়। কোনো শাসকের কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ ভুল ছিল বা কোন ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে সেখানকার জাতীয় জীবনে বিপদ ঘনিয়ে এসেছিল অথবা কোনো শাসক কোন পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিরতা ও প্রশাসনিক উন্নতি ঘটাতে পেরেছিলেন তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা ইতিহাসে পাওয়া যায়।
  • (২) বর্তমানকালে একে কাজে লাগিয়ে বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অগ্রগতি ঘটানো সম্ভব। যেমন – মোগল সম্রাট আকবরের যেসব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলি সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সহায়তা করেছিল তা অনুসরণ করে পরবর্তীকালের কোনো শাসক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সহজেই উন্নতি ঘটাতে পারেন।

(ছ) অর্থনৈতিক উন্নতির সোপান

  • (১) মানবসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অর্থনীতি। আধুনিক বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেমন – ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব, ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের রুশ বিপ্লব প্রভৃতির পিছনে অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।
  • (২) ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলির সামুদ্রিক অভিযান ও ভৌগোলিক সম্প্রসারণ, উপনিবেশের প্রসার প্রভৃতির পিছনেও অন্যতম কারণ ছিল অর্থনীতি।
  • (৩) কী ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে বা কোন আর্থিক ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণ সাধিত হয়, তার সুস্পষ্ট চিত্র ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়।
  • (৪) বর্তমানকালে কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেশে গ্রহণ করা উচিত সেই শিক্ষাও ইতিহাসই আমাদের দিতে পারে। এই শিক্ষার ভিত্তিতে কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটানো সম্ভব। যেমন – ইংরেজরা বাংলার চাষিদের নীলচাষে বাধ্য করার ফলে চাষিদের ওপর কীরূপ দুর্গতি নেমে এসেছিল তা ইতিহাস থেকে জানা যায়।

(জ) ধর্মসহিঞ্চুতা

ইতিহাস অতীতের মানুষের ধর্মীয় জীবন নিয়েও আলোচনা করে। এর দুটি দিক পরিস্ফুট হয়। যেমন –

(১) ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কুফল

মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মে পোপ ও যাজকদের অনৈতিক কার্যকলাপ, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে ২০০ বছর ধরে চলা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ত্রিশবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধিজির ধর্মকে (খিলাফৎ আন্দোলনের সঙ্গে) জাতীয় আন্দোলনকে যুক্ত করা প্রভৃতি দেশ, সমাজ ও জাতির কীরূপ ক্ষতি করেছিল তা ইতিহাস থেকেই জানা যায়।

(২) ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সুফল

ইতিহাস থেকেই আমরা জানতে পারি যে, সম্রাট অশোকের ধর্মবিজয় নীতি এবং সম্রাট আকবরের ‘সুল-ই-কুল’ বা ধর্মসহিষ্ণুতার নীতি জাতি ও রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছিল। এভাবে ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মকে ধর্মসহিষ্ণুতার সুফলগুলি উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।

(ঝ) সাংস্কৃতিক অগ্রগতি

ইতিহাসের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জনজাতির সাংস্কৃতিক জীবনের অগ্রগতি ঘটতে থাকে। ইতিহাস জানতে সাহায্য করে যে, আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি অতীতের সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিবর্তনের পরিণাম বা ফল। অর্থাৎ অতীতের সংস্কৃতির ওপরই কোনো দেশ বা জাতির বর্তমান সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে।

(ঞ) জাতীয়তাবোধের বিকাশ

  • (১) নিজের দেশ ও জাতির প্রতি কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর ভালোবাসার প্রকাশকে জাতীয়তাবাদ বলা হয়। ইতিহাস কোনো দেশ বা জাতিকে তার অতীত ঐতিহ্য ও মহত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। আবার ইতিহাসের চেতনা যে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটায় তা লিপিবদ্ধ হয় ইতিহাসেই।
  • (২) জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ কোনো দেশ বা জাতি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভালোবাসে। এর ফলে। তারা বহিরাগত ও ঔপনিবেশিক শক্তির অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
  • (৩) আমরা ইতিহাস থেকেই বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করি। স্পেনের বিরুদ্ধে ওলন্দাজদের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সংগ্রাম, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি ঘটনা জাতীয়তাবাদের বিকাশের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।

(ট) আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ

  • (১) ইতিহাস কোনো জাতির জীবনে আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। অতীতে বিভিন্ন মানব জাতি বা মহান ব্যক্তি কী বিপুল কর্মকাণ্ড করে গেছেন তা ইতিহাস থেকে বর্তমান প্রজন্মের মানুষ জানতে পারে। এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ ঘটে। তারা উপলব্ধি করতে পারে যে, “মানুষ যা করেছে মানুষ তা করতে পারে।”
  • (২) অতীতে মানুষ যে মহান কাজ করে গেছে তা এখনকার এবং আগামী দিনের মানুষও চেষ্টা করলে করতে পারবে – এই প্রত্যয় মানুষকে গঠনমূলক কর্ম সম্পাদনে উদ্যোগী করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, মারাঠা জাতির অতীত কর্মকাণ্ড ও বিপুল শক্তি শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা জাতিকে মোগলদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করেছিল।

(ঠ) দুর্যোগ সম্পর্কে সতর্কতা

  • (১) বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে অতীতকালে বহু জনজাতির সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে – ইতিহাস সেসব ঘটনার সাক্ষী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশদের ত্রুটিপূর্ণ ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০ খ্রি.) এবং পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৯৪৩ খ্রি.) নামে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়। এতে অনাহারে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়।
  • (২) পরবর্তীকালে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তাঁদের গবেষণায় উক্ত দুর্যোগের কারণ এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যেত, তার উপায়গুলি উল্লেখ করেন। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ ইতিহাসের সেসব আলোচনা থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সম্ভাব্য ভয়াবহ ধ্বংস ও মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে।

(ড) পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে জ্ঞান লাভ

  • (১) ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈদেশিক সম্পর্ক অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। পররাষ্ট্রনীতির ইতিবাচক, নেতিবাচক প্রভৃতি সবদিকই ইতিহাসের আলোচনায় স্থান লাভ করে।
  • (২) কোন ধরনের পররাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করে বা কোন ধরনের পররাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন দেশের মধ্যে শত্রুতা বৃদ্ধি করে, তা ইতিহাস পড়লে জানা যায়। এ বিষয়ে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকালের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে।

ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরি

বর্তমানকালে ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশা বা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়। মানবসমাজের ধারাবাহিক বিবর্তন, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতি সবকিছুই ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়। এসব বিষয় সম্পর্কে সার্বিক জ্ঞানলাভের জন্য ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরি।

উইনস্টন চার্চিলের মন্তব্য

এজন্য উইনস্টন চার্চিল বলেছেন যে, “তুমি সুদূর অতীতে ফিরে তাকাতে পারলে সুদূর ভবিষ্যতেও তাকাতে পারবে।”

ইতিহাসের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সোয়েইনের বক্তব্য

ইতিহাসের গুরুত্ব উল্লেখ করতে গিয়ে জে. ই. সোয়েইন বলেছেন যে, “বর্তমানের শিকড় অতীতের কতটা গভীরে প্রোথিত আছে তা একজন সচেতন পর্যবেক্ষক নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন। যদি আমাদের সমস্ত অতীত অভিজ্ঞতার জ্ঞান হারিয়ে যায়, তবে সম্ভবত বড়ো শহরগুলির ৯/১০ অংশ বাসিন্দা এক মাসের মধ্যেই মারা যাবে এবং যারা বেঁচে থাকবে তারা শীঘ্রই আদিম জীবনে ফিরে যাবে।”

উপসংহার :- ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্ব হল এই যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে মানবসমাজ আরও সুন্দর ও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। তাই হেগেল আক্ষেপ করে বলেছেন, “ইতিহাসের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।”

(FAQ) ইতিহাসের গুরুত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সংঘটিত হয় কখন?

১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে।

২. পঞ্চাশের মন্বন্তর সংঘটিত হয় কখন?

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে।

৩. সুল ই কুল নীতি গ্রহণ করেন কে?

মোগল সম্রাট আকবর।

৪. “ইতিহাসের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।” – কার উক্তি?

হেগেল।

Leave a Comment