হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস প্রসঙ্গে অর্জুনের সিংহাসন দখল, চীনা দূতের আগমন, চীনা দূতকে আক্রমণ, তিব্বত রাজার অভিযান, কনৌজ অধিকার নিয়ে সংঘর্ষ, কনৌজের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাস, ত্রিশক্তি সংগ্ৰাম, যশোবর্মনের অধীনে কনৌজ সম্পর্কে জানবো।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস

বিষয়হর্ষবর্ধনের পর কনৌজের ইতিহাস
হর্ষবর্ধনপুষ্যভূতি বংশ
রাজধানীকনৌজ
মৃত্যু৬৪৭ খ্রি
চীন-এর দূতহিউয়েন সাঙ
হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস

ভূমিকা :- ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য অল্পকালের মধ্যেই ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। কারণ তাঁর সাম্রাজ্য সুশাসিত ছিল না এবং শাসনযন্ত্রও সুগঠিত ছিল না।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর অর্জুন কর্তৃক কনৌজের সিংহাসন দখল

এই শোচনীয় অবস্থায় হর্ষরর্ধনের এক মন্ত্রী অর্জুন কনৌজের সিংহাসন অধিকার করেন কিন্তু তিনি এই অধিকার বেশিদিন রাখতে সমর্থ হন নি।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজে চীনা দূতের আগমন

চীনের সম্রাট হিউয়েন সাঙ -এর নিকট হতে উদারচেতা হর্ষবর্ধন সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁর রাজসভায় ওয়াং-হিউয়েন-সিকে দূত হিসাবে প্রেরণ করেন। ওয়াং-হিউয়েন-সি হলেন হর্ষবর্ধনের রাজসভায় তৃতীয় চীনা দূত। তবে ওয়ান-হিউয়েন-সি ভারত-এ হর্ষবর্ধনের রাজসভায় পৌঁছাবার পূর্বেই হর্ষবর্ধনের মৃত্যু হয়।

কনৌজে আগত চীনা দূতকে আক্রমণ

এই সময় কনৌজের শাসক অর্জুন ওয়ান-হিউয়েন-সিকে আক্রমণ করেন এবং তাঁর নিকট হতে হর্ষবর্ধনকে প্রেরিত সব উপহার কেড়ে নেন। এই পরিস্থিতিতে ওয়াং-হিউয়েন-সি বাধ্য হয়ে চীন সম্রাটের জামাতা তিব্বতের রাজা স্ট্রং-সান-গামপোর আশ্রয় গ্রহণ করেন।

কনৌজের বিরুদ্ধে তিব্বত রাজার অভিযান

রাজা অর্জুনের ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ হয়ে তিব্বতরাজ কনৌজের শাসক অর্জুনের বিরুদ্ধে এক অভিযান প্রেরণ করেন এবং অর্জুনকে পরাজিত ও বন্দি করে চীনে নিয়ে যান।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের অধিকার নিয়ে সংঘর্ষ

সম্রাট হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর থেকে তুর্কি অধিকারের প্রাক্কাল পর্যন্ত কনৌজের অধিকার নিয়ে বহু সংঘর্ষ চলেছিল। কনৌজের অপর নাম ছিল ‘মহোদয়শ্রী’। ভারতের ও বিদেশিদের কাছে ‘মহোদয়শ্রী’ বা কনৌজ লাভ ছিল গর্বের বিষয়।

রাজা অর্জুনের পরবর্তীতে কনৌজের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাস

অর্জুনের কনৌজ ত্যাগ করার পর কনৌজের গৌরব অস্তমিত হয়ে যায় এবং প্রায় পঁচাত্তর বছর কনৌজের ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়।

কনৌজের অধিকার নিয়ে ত্রিশক্তি সংগ্ৰাম

অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত কনৌজের আধিপত্য নিয়ে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে তিনটি রাজবংশ – পাল সাম্রাজ্য, প্রতিহার বংশ এবং রাষ্ট্রকূট বংশ এক দীর্ঘকালীন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে এই সংঘর্ষ ‘Triangular Contest’ বা ত্রিশক্তি সংগ্ৰাম নামে পরিচিত।

যশোবর্মনের অধীনে কনৌজ

অষ্টম শতাব্দীর প্রথমার্ধে যশোবর্মন নামে এক পরাক্রান্ত নরপতির অধীনে কনৌজ কিছুকালের জন্য তার পূর্ব গৌরব ফিরে পায়।

কনৌজের রাজা যশোবর্মনের পরিচয়

রাজা যশোবর্মনের বংশ পরিচয় বা তাঁর পূর্ব পরিচয় তেমন জানা যায় না। যশোবর্মনের কার্যাবলীর বিবরণ তাঁর সভাকবি বাকপতিরাজের গৌড়বহো নামে প্রাকৃত ভাষায় রচিত ঐতিহাসিক এক কাব্য থেকে জানা যায়।

কনৌজের রাজা যশোবর্মনের পরাক্রম

যশোবর্মনের পরাক্রম প্রায় হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তুলনীয় । তিনি গৌড়রাজের বিরুদ্ধে অভিযান করে তাঁকে রণক্ষেত্রে নিহত করেন। তারপর তিনি মগধ ও বঙ্গদেশ জয় করে নর্মদার তীরে উপনীত হন।

কনৌজের রাজা যশোবর্মনের পরাজয়

চালুক্যরাজ নিলয়াদিত্যের নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে যশোবর্মন রাজপুতনার মরুভূমি ও থানেশ্বরের মধ্য দিয়ে কনৌজে প্রত্যাবর্তন করেন।

কাশ্মীরের রাজার সাথে কনৌজের রাজার মিত্রতা

তিনি কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্য-এর সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং ৭৩১ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের ন্যায় তিনিও চীন সম্রাটের নিকট দূত পাঠিয়েছিলেন।

কনৌজের উপর আরব ও তিব্বতের আক্রমণ রোধে প্রয়াস

আধুনিক ঐতিহাসিকগণ মনে করেন যে তিনি কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্যের ও চীনের সম্রাটের সাহায্য নিয়ে আরব ও তিব্বতের আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

কাশ্মীররাজের কনৌজ দখল

অল্পকালের মধ্যেই ললিতাদিত্যের সঙ্গে মিত্রতার পরিবর্তে যশোবর্মনের সঙ্গে এক তিক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর ফলে তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে কাশ্মীররাজ ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় তাঁর রাজ্য আক্রমণ করে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করেন। যশোবর্মন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন এবং ললিতাদিত্য কনৌজ দখল করেন।

রাজতরঙ্গিনীর বর্ণনায় কনৌজের যুদ্ধ

কলহণের রাজতরঙ্গিণী থেকে কাশ্মীর ও কনৌজের যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। রাজতরঙ্গিণী থেকে জানা যায় যে, উত্তর রামচরিত রচয়িতা ভবভূতি ও বাকপতিরাজ যশোবর্মনের সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন।

উপসংহার :- যশোবর্মনের সিংহাসন আরোহণকাল সুনিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও তিনি ৭৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সগৌরবে রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

(FAQ) হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হর্ষবর্ধনের মৃত্যু হয় কখন?

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজ দখল করেন কে?

হর্ষরর্ধনের মন্ত্রী অর্জুন।

৩. হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কার অধীনে কনৌজ তার পূর্ব গৌরব ফিরে পায়?

যশোবর্মন।

৪. অষ্টম শতকে কোন স্থানকে কেন্দ্র করে ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব শুরু হয়?

কনৌজ।

Leave a Comment