তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য

তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য প্রসঙ্গে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা, দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের সূচনা, উত্তর ভারতের রাজনৈতিক দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় শক্তির বিবর্তন, মধ্যে সাথে সম্পর্ক, অবহেলিত মানুষের নতুন আশ্বাস, সামাজিক সাম্য, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক গভীর তাৎপর্য সম্পর্কে জানবো।

তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য

বিষয়তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য
বিবাদমান পক্ষমহম্মদ ঘুরী ও তৃতীয় পৃথ্বিরাজ চৌহান
তরাইনের প্রথম যুদ্ধ১১৯১ খ্রি:
ফলাফলমহম্মদ ঘুরীর পরাজয়
তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ১১৯২ খ্রি:
ফলাফলমহম্মদ ঘুরীর জয় লাভ
তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য

ভূমিকা :- আদি মধ্যযুগের ভারতে চৌহান বংশের নরপতি তৃতীয় পৃথ্বীরাজ তাঁর রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ করেছিলেন একজন পরাক্রান্ত শাসকরূপে। তাঁর সাম্রাজ্যবাদী প্রভুত্বকে উত্তর ভারতে অপ্রতিদ্বন্দ্বীরূপে স্থাপন করার উদ্দেশ্যে সমকালীন শাসকবর্গের বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

সুদক্ষ যোদ্ধা পৃথ্বীরাজ

সমকালীন ভারতীয় শাসকবর্গের বিরুদ্ধে এবং ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের প্রথম যুদ্ধে সামরিক সাফল্য প্রমাণ করে যে, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ যোদ্ধা।

নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা

তাঁর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার জন্য ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তিনি মহম্মদ ঘুরির নিকট পরাজয় বরণ করে ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রথম সুযোগ করে দিয়ে ভারতের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেন। তিনি পরাজিত হয়ে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধকে ভারত ইতিহাসের এক যুগান্তকারী তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনায় পরিণত করেন।

পৃথ্বীরাজের অদূরদর্শিতা

তরাইনের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তৃতীয় পৃথ্বীরাজ মহম্মদ ঘুরিকে বন্দি করেন কিন্তু তিনি তাঁকে পরক্ষণেই মুক্তি দিয়ে গজনি ফিরে যাবার অনুমতি দেন।

মহম্মদ ঘুরীর জয় লাভ

সহজেই মুক্তি লাভের ফলে মহম্মদ ঘুরি ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের প্রথম যুদ্ধের পরাজয়কে পরাজয় বলে মেনে না নিয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এবার ভাগ্যদেবী মহম্মদ ঘুরির প্রতি সুপ্রসন্ন হন এবং তিনি জয়লাভ করেন।

দুই যুদ্ধের দুই দিক

  • (১) তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরি পরাজিত হয়ে যদি গজনি প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না পেতেন তাহলে ভারত ইতিহাসে দুটি তরাইনের যুদ্ধের কোনো গুরুত্ব বা ঐতিহাসিক কোনো তাৎপর্যই থাকত না। ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত।
  • (২) কিন্তু তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির জয়লাভ ভারত ইতিহাসে এই যুদ্ধ অভাবনীয় ও সুদূরপ্রসারী এক রাজনৈতিক মর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পরিণত হয়।

সীমা মীমাংসক যুদ্ধ

প্রকৃতপক্ষে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির সাফল্য ভারত ইতিহাসে এই যুদ্ধকে একটি ‘সীমা-মীমাংসক’ যুদ্ধে পরিণত করে। কারণ, তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির জয়লাভই ভারতবর্ষে একদিকে ভারতীয় রাজপুত জাতির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করে দেয়, অপরদিকে ভারতের রাজনৈতিক মঞ্চে বহিরাগত তুর্কি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের সূচনা

মহম্মদ ঘুরির এই সাফল্যই ভারতে দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের সূচনা করে এবং ভারতবর্ষের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। তাছাড়া, এই যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির সাফল্য ভারতীয় সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেয়।

উত্তর ভারতের রাজনৈতিক দুর্বলতা

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে চৌহানরাজ তৃতীয় পৃথ্বীরাজের পরাজয় শুধুমাত্র চৌহান রাজবংশের দুর্বলতাই প্রকট করে নি, সমগ্র উত্তর ভারতের অন্তঃসারশূন্য রাজনৈতিক অবস্থা তুর্কিদের নিকট উন্মুক্ত হয়ে যায়।

দিল্লি পর্যন্ত তুর্কী আধিপত্য

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজের পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া থেকে সমগ্র ভারত ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। এই যুদ্ধে মহম্মদ ঘুরির সাফল্যের ফলেই তুর্কি অধিকার প্রায় দিল্লির উপকণ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

উত্তরাধিকার মনোনয়ন

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের ফলেই ভারতের সামরিক শক্তির মর্যাদা বিনষ্ট হয়। তরাইনের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মহম্মদ ঘুরি সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন নি সত্য কিন্তু তিনি তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবউদ্দিন আইবককে অধিকৃত ভারতীয় অঞ্চলের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান।

রাজনৈতিক মর্যাদার অধিকারী দিল্লি

বিশ্বস্ত সৈনিক কুতুবউদ্দিন গজনি প্রত্যাবর্তন না করে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিকে ভারতের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজনৈতিক দিক থেকে দিল্লি সেদিন যে রাজনৈতিক মর্যাদার অধিকারী হয়, তা আজও অক্ষুণ্ণ আছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দিল্লি

প্রকৃতপক্ষে, এখন থেকেই ভারতবর্ষ যে-কোনো ধরনের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে যাত্রা শুরু করে। কালক্রমে দিল্লি, কায়রো, বাগদাদ, কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক কেন্দ্র দিল্লি

দিল্লিকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষে এক নতুন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিবর্তনের যুগের সূচনা হয় এবং দিল্লি এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। দিল্লির সেই মর্যাদা আজও অক্ষুণ্ণ আছে।

কেন্দ্রীয় শক্তির বিবর্তন

এই সময় উত্তর ভারত ছিল কয়েকটি বিবদমান রাজপুত খণ্ডবিখণ্ড রাজ্যসমূহের সমষ্টিমাত্র। কেন্দ্ৰীয় শক্তি বলে কিছুই ছিল না। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের কিছুকাল পরেই কুতুবউদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতে কেন্দ্রীয় শক্তির প্রবর্তন ঘটে। এই কেন্দ্রীয় শক্তিকে কেন্দ্র করেই ভারতে পুনরায় রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক এক বিবর্তনের ইতিহাস শুরু হয়।

মধ্য এশিয়ার সাথে যোগসূত্র

তুর্কি শক্তির কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখলের ফলেই ভারতে ‘ইতা-ব্যবস্থার’ প্রবর্তন হয় এবং সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটে। দিল্লিকে কেন্দ্র করেই মধ্য-এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র গড়ে ওঠে। সপ্তম শতক হতে ভারত যেভাবে বহির্বিশ্ব হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তা দ্বাদশ শতক থেকে অর্থাৎ তুর্কিদের অধিকারের ফলে পুনরায় সেই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে।

অবহেলিত মানুষের নতুন আশ্বাস

তরাইনের যুদ্ধের ফলেই ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন তুর্কিজাত মহম্মদ ঘুরির বিশ্বস্ত ক্রীতদাস কুতুবউদ্দিন আইবক। একজন ক্রীতদাসের সিংহাসনে আরোহণ ভারতবর্ষের উৎপীড়িত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত অবহেলিত মানুষের কাছে মুক্তির নতুন আশ্বাস বলে বিবেচিত হয়।

সংস্কৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্ব

  • (১) তুর্কিরা সাথে করে এনেছিল মিশর, ইরাক, ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঞ্চিত সমন্বিত সংস্কৃতি। এই ইসলামীয় সংস্কৃতির অভিঘাতে ভারতবর্ষের চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে যে ঝড় তুলেছিল তা উল্লেখ করতে গিয়ে আহম্মদ শরীফ তাঁর বাংলার সুফী সাহিত্য নামক গ্রন্থে যা বলেছেন তা তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্যের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এই বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • (২) তিনি বলেছেন “আরব বিজয়ে দাক্ষিণাত্যে ও তুর্কি বিজয়ে উত্তর ভারতে এক যুগান্তর ঘটে যায়। চিরকালই ভারতে নতুন চিন্তা-চেতনার ও সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে পরাজয়ের গ্লানি থেকে। অর্থাৎ ইসলামের সাম্যের প্রভাবেই পুরাতন যুগের অবসান এবং নতুন যুগের সূচনা হয়। আরব-তুর্কি বিজয়ের কালকে মধ্যযুগ বলে অভিহিত করি বটে কিন্তু তাৎপর্যে বরং এক অর্থে রেনেসাঁস যুগ। কেননা তুর্কি বিজয়ের প্রত্যক্ষ অভিঘাতে যে ভাব-তরঙ্গ উত্থিত হয়, তাতে ভারতবর্ষের চিন্তা, চেতনা ও মননে এক নতুন ঝড় তোলে।”

হিতেন্দ্র মিত্রের অভিমত

হিতেন্দ্র মিত্র তাঁর Tagore without Illusion গ্রন্থে বলেছেন, “তুর্কি বিজয়ের ফলে এঁরা প্রথম দেখলেন বাজারের ক্রীতদাস নিজের যোগ্যতায় প্রভুর জামাতা, সেনাপতি, অমাত্য এবং সুলতান হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিজীবনে এই আত্মপ্রতিষ্ঠার জীবন যন্ত্রণাই অস্পৃশ্য নিম্নবর্ণের ও নিম্নবর্গের মানুষদের গভীরভাবে বিচলিত করে। ব্যক্তিজীবনের আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই তাদের ব্রাহ্মণশাস্ত্র ও সমাজদ্রোহী করেছিল।”

সামাজিক সাম্য

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তুর্কি বিজয় ভারতবর্ষে সামাজিক সাম্যের দিক নির্দেশ করে। কারণ তুর্কিরা জাতিভেদ প্রথা স্বীকার করে নি। তাই কেউ কেউ তুর্কি বিজয়কে বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সমন্বয় সাধনের কাজ

তুর্কিরা প্রথমদিকে আক্রমণকারীর ভূমিকা গ্রহণ করলেও পরবর্তীকালে একটি সুদৃঢ় রাষ্ট্রীয় সংগঠনের প্রয়োজনে তরবারির ফলাকে লাঙলের ফালে রূপান্তরিত করে ভারতবর্ষে এক শান্ত-সমাহিত জীবনযাপন প্রণালী ও সমন্বয়ের সাধনার কাজে আত্মনিয়োগ করে।

ঐতিহাসিক গভীর তাৎপর্য

  • (১) তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধই প্রমাণ করে যে ভারতীয় রণনীতি অচল, সেই তুলনায় তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনী অনেক শক্তিশালী, ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন ও কার্যকরী। তুর্কি বিজয়ের পরই সেনাবাহিনীর দরজা কোনো বিশেষ শ্রেণীর অধিকারভুক্ত না করে যোগ্য ব্যক্তির সম্মুখে উন্মুক্ত করা হয়।
  • (২) এর ফলে যোগ্য সেনাবাহিনীর দ্বারা সমগ্র ভারতে কেন্দ্রীয় শক্তি সুদৃঢ়ভাবে প্রথিত করা সহজ হয়। নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীয় শক্তি স্থাপিত হওয়ায় ভারতবর্ষে এক নতুন ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়। এখানেই তরাইনের যুদ্ধের ঐতিহাসিক গভীর তাৎপর্য নিহিত আছে। 

উপসংহার :- ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ বলেছেন “It may be regarded as the decisive contest which assured the ultimate success of Mohammadan attack on Hindustan.”

(FAQ) তরাইনের যুদ্ধের তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তরাইনে কতগুলি যুদ্ধ সংঘটিত হয়?

দুটি।

২. তরাইনের যুদ্ধে বিবাদমান পক্ষ কারা ছিলেন?

মহম্মদ ঘুরী ও তৃতীয় পৃথ্বীরাজ চৌহান।

৩. তরাইনের প্রথম যুদ্ধ কখন হয়?

১১৯১ খ্রিস্টাব্দে।

৪. তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ কখন হয়?

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment