গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা

গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা প্রসঙ্গে ডঃ সালাতোরের অভিমত, রাজতন্ত্রের ক্ষমতার পার্থক্য, মন্ত্রীদের ক্ষমতার তুলনা, আমলাতন্ত্রের তুলনা, জনপদ বনাম বিষয় শাসন, কেন্দ্রিকতা বনাম বিকেন্দ্রিকতা, রাজস্ব নীতি সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা

বিষয় গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ রাজা সমুদ্রগুপ্ত
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মৌর্য সাম্রাজ্য
গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা

ভূমিকা :- একথা সত্য যে, কোনো রাষ্ট্রনীতিবিদ খালি প্লেটের ওপর লিখবার সুযোগ কদাচিৎ পান। আগেকার যুগের ব্যবস্থাকে সমূলে উম্মূল করে পুরোপুরি নতুন ব্যবস্থা সর্বদা চালান সম্ভব নয়। গুপ্ত শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তা সম্ভব হয়নি। মৌর্য যুগে শাসন ব্যবস্থার যে কাঠামো তৈরি হয় তার কিছুটা গুপ্ত যুগেও দেখতে পাওয়া যায়।

ডঃ সালাতোরের অভিমত

ডঃ আর এন সালাতোর তাঁর লাইফ ইন গুপ্ত এজ গ্রন্থে বলেছেন যে, “গুপ্ত শাসন ব্যবস্থাকে সঠিক অর্থে মৌলিক বলা যায় না” অর্থাৎ তিনি বলেছেন যে, মৌর্য ও সাতবাহন শাসনব্যবস্থা থেকে গুপ্তরা অনেক কিছু গ্রহণ করেন।

রাজতন্ত্রের পার্থক্য

গুপ্ত সম্রাটরা শাসনযন্ত্রে অনেকগুলি পরিবর্তন ঘটান। মূল কাঠামো মৌর্য যুগের মত হলেও, শাসনব্যবস্থার পরিচালনায় তাঁরা উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন। এই কারণে ডঃ আরডি ব্যানার্জী বলেছেন যে, “গুপ্ত সম্রাটরা মৌর্যদের কাছ থেকে খুব বেশী কিছু ঋণ গ্রহণ করেননি। যেমন –

  • (১) মৌর্য শাসনব্যবস্থা ছিল ঘোরতর কেন্দ্রীভূত। গ্রাম ও জেলাস্তরে অশোকের গুপ্তচররা কেন্দ্রের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করত। মহামাত্ররা সরাসরি কেন্দ্রের অধীনে ছিল। গুপ্ত শাসনব্যবস্থা ছিল। বিকেন্দ্রীভূত। প্রদেশ ও জেলা স্তরে গুপ্ত শাসনব্যবস্থায় বহু ক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মৌর্য যুগে এই ব্যবস্থা ছিল না।
  • (২) গুপ্ত সম্রাটরা মৌর্য সম্রাট অপেক্ষা আড়ম্বরপূর্ণ উপাধি নিতেন। এমন কি তাঁরা ঐশ্বরিক ক্ষমতাও দাবী করতেন। মৌর্য সম্রাটরা এইরূপ উপাধি নিতেন না। তাঁরা “দেবনাম প্রিয়” উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে রাজা দেবতার অংশ একথা বলা হয়নি।
  • (৩) বাস্তবক্ষেত্রে গুপ্তসম্রাটরা মৌর্য সম্রাটদের অপেক্ষা কম ক্ষমতা ভোগ করতেন। কারণ, গুপ্ত যুগে বংশানুক্রমিক মন্ত্রী ও অমাত্য থাকার জন্য রাজার ক্ষমতা স্বভাবতই সংকুচিত হয়েছিল। মৌর্য যুগে এই পদগুলি বংশানুক্রমিক ছিল না। যোগ্যতা অনুসারে পদে লোক নিয়োগ করা হত।
  • (৪) গুপ্ত যুগে প্রদেশ ও জেলাগুলিতে স্থানীয় শাসনের অধিকারের গণ্ডী স্থির করে দেওয়ার জন্য রাজার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। মৌর্য যুগে রাজার ক্ষমতা এতটা সঙ্কুচিত ছিল না। গুপ্ত সম্রাটদের মৌর্য সম্রাটদের মত গুপ্তচর বাহিনী ছিল না, যারা রাজ্যের সর্বত্র নজর রাখত। গুপ্ত শাসনব্যবস্থা ছিল অনেক উদার।

মন্ত্রীদের ক্ষমতার তুলনা

  • (১) মৌর্য সম্রাটরা মন্ত্রীণ বা মন্ত্রী পরিষদের পরামর্শ মানতে বাধ্য ছিলেন না। শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল রাজার। গুপ্তযুগে রাজার সঙ্গে মন্ত্রী ও উচ্চ কর্মচারীরা ক্ষমতা ভাগ করে নিত। বংশানুক্রমিক মন্ত্রীপদ হওয়ায় রাজার পক্ষে সহসা মন্ত্রীকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হত না।
  • (২) গুপ্ত যুগে মন্ত্রী পরিষদ সম্ভবত ছিল না। মৌর্যযুগে মন্ত্রী পরিষদ ছিল। গুপ্ত সম্রাটরা মন্ত্রীদের কাছ থেকে আলাদাভাবে পরামর্শ নিতেন। মন্ত্রীরা সম্মিলিতভাবে কোনো নীতি স্থির করতে পারত না।
  • (৩) গুপ্ত যুগের মন্ত্রীরা ছিল বংশানুক্রমিক। এজন্য তাদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত ছিল না। তাছাড়া গুপ্তরা মন্ত্রী ও কর্মচারীদের মৌর্য সম্রাটদের মত সর্বদা নগদ বেতন দিতেন না। জমি বা জাগীর দ্বারা তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হত। এর ফলে মন্ত্রী তথা কর্মচারীরা খুবই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে।
  • (৪) মৌর্যযুগে রাজাই ছিলেন আইনের প্রণয়নকারী। রাজশাসন বা রাজার আদেশই ছিল আইন। গুপ্তযুগে রাজা আইন প্রণয়ন করতে পারতেন না। তিনি ধর্মশাস্ত্র ও চিরাচরিত প্রথা এবং মন্ত্রীদের পরামর্শ মেনে কাজ করতে বাধা ছিলেন।

আমলাতন্ত্রের তুলনা

  • (১) কেন্দ্রে ও প্রদেশে যে আমলাতন্ত্র ছিল তা অনেকটা মৌর্য যুগের মতই। অনেকক্ষেত্রে কর্মচারী বা আমলাদের নাম ছিল মৌর্য যুগের মতই, যথা আযুক্ত, সচিব, অমাত্য, কুমারমাত্য প্রভৃতি। মৌর্যযুগের মত কর্মচারীরা সম্রাটের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য জানাত, তারা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য জানাত না।
  • (২) তবে গুপ্ত যুগে কয়েকটি নতুন পদ সৃষ্টি হয়, যথা মহাদণ্ডনায়ক, সন্ধি-বিগ্রহিক, অক্ষপটলাধিকৃত, মহাতালবর, গোপ্তৃ, বিনয়-স্থিতি-স্থাপক প্রভৃতি। এই পদগুলির কথা মৌর্য যুগে জানা যায় নি।
  • (৩) এই নতুন পদগুলির কয়েকটি যেমন মহাদণ্ডনায়ক, মহাবলাধিকৃত কুষাণ, সাতবাহন যুগে দেখা যায়। গুপ্ত যুগে তা পরিণতি লাভ করে। মৌর্য যুগের মহামাত্র, রাজুক প্রভৃতি কর্মচারীর নাম গুপ্ত যুগে দেখা যায় নি।

জনপদ বনাম বিষয় শাসন

  • (১) প্রদেশের শাসন সম্পর্কে মৌর্য যুগ অপেক্ষা গুপ্তযুগের জন্য বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায়। প্রদেশ বা ভুক্তির শাসন ভার থাকত সাধারণত রাজপুত্র বা রাজবংশীয় শাসকদের হাতে। অশোকের আমলের কুমারমাত্যের সঙ্গে এদের তুলনা করা যায়।
  • (২) প্রদেশের শাসনে গুপ্তযুগে কুমারমাত্য, আযুক্ত, বিষয়পতিরা দায়িত্ব পেত। মৌর্য যুগে জনপদ ছিল শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রে, গুপ্তযুগে এর কেন্দ্রে ছিল বিষয় বা জেলাগুলি। গুপ্ত সম্রাটরা প্রদেশ ও জেলা শাসনে মৌর্য যুগ অপেক্ষা নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করেন।
  • (৩) গুপ্ত যুগে স্থানীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিনিধি সভা গঠন ছিল এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। মৌর্যযুগে অতিকেন্দ্রীকতার দরুন কোনোরূপ স্থানীয় প্রতিনিধি সভা গঠনের কথা ভাবা হয়নি। কিন্তু গুপ্ত যুগে স্থানীয় শ্রেষ্ঠী প্রধান, প্রথম কুলিক, প্রথম কায়স্থ প্রভৃতিদের নিয়ে নগর পরিষদ গঠিত হত। এই প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হতেন অথবা মনোনীত হতেন তা জানা যায়নি।
  • (৪) গুপ্ত বিচার ব্যবস্থা ও ফৌজদারী আইন ছিল মৌর্য যুগ অপেক্ষা অনেক উদার। মৌর্য যুগে পাটলিপুত্র নগরের শাসনের জন্য যেমন ত্রিশ জন সদস্যের সমিতি ছিল এবং এই সমিতি ছয়টি উপসমিতিতে বিভক্ত ছিল; গুপ্ত যুগে এই ব্যবস্থা ছিল না। মৌর্য যুগে এই সমিতির সদস্যরা রাজার দ্বারা নিযুক্ত হত।
  • (৫) গুপ্ত যুগে নগর পরিষদ থাকলেও তা ছিল পরামর্শদানের জন্য। মৌর্য যুগে যেরূপ সমিতিগুলি লোক গণনা, বাড়ি-ঘরের হিসেব, শিল্প-বাণিজ্যে তদারকি করত গুপ্ত যুগে তা করা হত না। গুপ্তযুগের শাসন অনেক উদার ছিল। লোকেদের জীবনযাত্রায় সহসা হস্তক্ষেপ করা হত না।

কেন্দ্রীকতা বনাম বিকেন্দ্রীকতা

  • (১) গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে মৌর্য শাসন ব্যবস্থার আর একটি মৌলিক প্রভেদ এই যে, কেন্দ্রের নীতির বিরোধী না হলে প্রদেশ বা বিষয়ের শাসনকর্তারা স্থানীয় ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করতেন। কেন্দ্র তাতে হস্তক্ষেপ করত না।
  • (২) মৌর্যযুগে এরকম সম্ভব ছিল না। সকল কিছুরই নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজধানী পাটলিপুত্রে রাজার হাতে। গুপ্ত সামরিক সংগঠনে সামন্ত শ্রেণীর যথেষ্ট প্রাধান্য ছিল। শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সামন্তরা এর দায়িত্ব বইত। মৌর্যযুগে সামন্ত প্রথার অস্তিত্ব দেখা যায়নি।

প্রাদেশিক শাসকের উপাধি

গুপ্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তারা গোপ্ত‌ বা উপারিক উপাধি নেন। মৌর্য যুগে এঁরা প্রদেষ্টি নামে পরিচিত ছিলেন। মৌর্য মহামাত্রগণ গুপ্ত যুগে অনুপস্থিত দেখা যায়। তবে প্রদেশের শাসনে তাঁরা মৌর্য যুগের মতই রাজ পরিবারের বা অন্য বিশ্বাসভাজন লোকেদের নিয়োগের নিয়ম বহাল রাখেন।

করদ রাজ্য

মৌর্য যুগে সাম্রাজ্যের একান্ত প্রত্যন্ত প্রদেশ ছাড়া আর কোনো অঞ্চলে সামন্ত বা করদ প্রথা স্বীকার করা হত না। গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি বৃহৎ অংশ করদ রাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল। এখানে করদ রাজা স্বায়ত্বশাসনের অধিকার ভোগ করতেন।

ভূমি রাজস্ব

মৌর্য ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল গুপ্তদের অপেক্ষা কঠোর। মৌর্য সম্রাটরা সীতা জমি হতে ফসলের ১/৪ ভাগ নিতেন; এক্ষেত্রে গুপ্ত সম্রাটরা ১/৬ ভাগ নিতেন।

উপসংহার :- গুপ্ত সম্রাটরা শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেমন মৌর্যদের কাছ থেকে বেশ কিছু নীতি গ্ৰহণ করেছেন তেমনি নতুন কিছু পন্থাও অবলম্বন করেছেন। মোটকথা গুপ্ত যুগের শাসন ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা ও উদারতান্ত্রিক।

(FAQ) গুপ্ত ও মৌর্য শাসন ব্যবস্থার তুলনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

শ্রীগুপ্ত।

২. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম সার্বভৌম রাজা কে ছিলেন?

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।

৩. গুপ্ত সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?

সমুদ্রগুপ্ত।

৪. লিচ্ছবি দৌহিত্র এবং ভারতের নেপোলিয়ন কাকে বলা হয়?

সমুদ্রগুপ্ত।

৫. শকারি কে ছিলেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »