গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ

গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে গৌড় ও বঙ্গ, বঙ্গরাজ্য, গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব, বঙ্গরাজ্যের পতন, ভদ্র বংশ, খড়্গ বংশ, সামন্ত রাও বংশ, পরবর্তী গুপ্ত রাজবংশ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শশাঙ্ক সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ

বিষয় গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ
পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা  বঙ্গ বা সমতট
উত্তর ও পশ্চিম বাংলা গৌড়
গৌড় রাজ শশাঙ্ক
গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ

ভূমিকা :- গুপ্ত যুগের সময়কালে বাংলার বিশেষ উন্নতি ঘটেছিল। গুপ্তযুগের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত বাংলায় অবস্থান করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। কিন্তু গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের পর বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়।

গৌড় ও বঙ্গ

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় গৌড় ও বঙ্গ নামে দুই রাজ্যের উদ্ভব হয়। সাধারণভাবে উত্তর বাংলা ও পশ্চিম বাংলাকে নিয়ে গৌড় রাজ্য গঠিত হয় এবং পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা নিয়ে বঙ্গ বা সমতট রাজ্য গঠিত হয়। তবে উভয় রাজ্যের নির্দিষ্ট কোন সীমারেখা ছিল না। তবে পুরাতন নামগুলি যথা পুণ্ড্র, সুস্থ, সমতট এখন থেকে লোপ পায়। বাংলার গৌড় ও বঙ্গ এই নামই এর পর থেকে প্রচলিত হয়।

বঙ্গরাজ্য

বৈন্যগুপ্ত সমগ্র পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবাংলার কিছু অংশ নিয়ে রাজত্ব করতেন, যা বঙ্গ রাজ্য নামে পরিচিত।

গোপচন্দ্র

  • (১) ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে সমতট বা বঙ্গ রাজ্যে গোপচন্দ্র নামে এক রাজার উদ্ভব হয়। কোটালিপাড়া ও মল্লরসুল লিপি থেকে গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেবের কথা জানা যায়। এই তিন রাজাই “মহারাজাধিরাজ” উপাধি নেন। এজন্য মনে করা হয় যে, এঁরা স্বাধীন রাজা ছিলেন।
  • (২)  মহারাজা বিজয় সেন প্রথমে বৈন্যগুপ্ত ও পরে গোপচন্দ্রের অধীনে সামন্ত রাজা ছিলেন বলে জানা যায়। এজন্য বৈন্যগুপ্তের পরেই গোপচন্দ্রের অভ্যুদয় হয় বলে মনে করা হয়। তিনি পূর্ব ও নিম্ন বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এই তিন রাজার মধ্যে কোন রক্ত সম্পর্ক ছিল কিনা তা জানা যায় নি।
  • (৩) ঢাকা জেলায় প্রাপ্ত মুদ্রা ও গোপচন্দ্রের কোটালিপাড়া লেখের সাহায্যে মনে করা হয় যে, তিনি অন্তত ১৮ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর সিংহাসনে বসার কাল হল ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ। বর্ধমান থেকে ত্রিপুরা পর্যন্ত তাঁর অধিকার বিস্তৃত ছিল। বর্ধমানে তার শাসনকর্তার নাম ছিল বিজয় সেন।

ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব

গোপচন্দ্রের পর রাজত্ব করেন ধর্মাদিত্য। তারপর সমাচারদেব সিংহাসনে বসেন। সমাচারদেব অন্তত ১৪ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বের শেষ বছর হল আনুমানিক ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশীয় কেউ রাজা হন কিনা জানা যায়নি।

বঙ্গ রাজ্যের পতন

কি কারণে বঙ্গ (পূর্ব বাংলা) রাজ্যের পতন ঘটে তা সঠিক জানা না গেলেও, পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, দক্ষিণ হতে চালুক্য রাজ কীর্তিবর্মণের আক্রমণে এবং তিব্বতীয় রাজা স্ট্রংসান গাম্পোর আক্রমণে এই রাজ্যের পতন ঘটে। বঙ্গ রাজ্যের যেটুকু ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল গৌড় রাজ্যে শশাঙ্কের ক্ষমতা বিস্তারের দরুন তার অবসান ঘটে।

ঐতিহাসিক গুরুত্বহীন বংশ

এর পর বঙ্গ বা পূর্ব বাংলায় একাদিক্রমে ভদ্রবংশ, খড়গবংশ, নাগবংশ অস্থায়ীভাবে শাসন করে। তবে এই বংশগুলির তেমন কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল না।

ভদ্র বংশ

হিউয়েন সাঙ বাংলায় ব্রাহ্মণ ভদ্র রাজাদের নাম উল্লেখ করেছেন। প্রথম দিকে এঁরা কিছুকাল বাংলা বা সমতটে রাজত্ব করেন। নালন্দার পণ্ডিত শীলভদ্র এই বংশের লোক ছিলেন। ভাস্করবর্মার নিধনপুর লিপিতে জেষ্ঠভদ্রের নাম পাওয়া যায়।

খড়্গবংশ

  • (১) পরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী খড়্গবংশ, ভদ্রবংশকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করে। আসরফপুর ও দেউলবাড়ি লিপি থেকে খড়্গবংশ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। খড়্গ্যোদ্যম মতান্তরে খড়্গযম, জাতখড়্গ মতান্তরে জটাখড়্গ দেবখড়্গ ও রাজ-রাজভট ছিলেন খড়্গ বংশের রাজা।
  • (২) অনেকের মতে খড়্গরা নেপাল থেকে এসেছিল। খড়্গ বংশের কালপঞ্জী সঠিক জানা যায়নি। সম্ভবত বড়কামতা কুমিল্লা জেলায় খড়্গ বংশের রাজধানী ছিল। দেবখড়্গের দুটি তাম্রপট কর্মান্তবাসক বা বড়কামতায় পাওয়া গেছে।
  • (৩) খড়্গ বংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিল এবং বৌদ্ধবিহার তৈরির জন্য ভূমিদান করে। ই-সিং খড়্গ রাজ রাজভটকে ‘উপসক’ আখ্যা দিয়েছেন। দেবখড়্গ আচার্য সঙ্ঘমিত্রকে মঠের জন্য ভূমিদান করেন।

সামন্ত রাও বংশ

খড়্গ বংশের শত্রু ছিল সামন্ত রাও বংশ। জীবধারণ ও শ্রীধরণ ছিলেন রাওবংশের দুই শাসক। শেষোক্ত ব্যক্তিও বুদ্ধের উপাসনার জন্য ভূমিদান করেন।

পরবর্তী গুপ্ত রাজবংশ

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের সুযোগ নিয়ে, বিশেষত, বৈন্যগুপ্তের মৃত্যুর পর কনৌজের মৌখরী বংশ গৌড় বা উত্তর বাংলা দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টাকে ব্যাহত করে পরবর্তী গুপ্ত বংশ গৌড় রাজ্য তাদের অধিকারে আনে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা

মৌখরী বংশের সঙ্গে পরবর্তী গুপ্তবংশের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে। ঈশানবর্মনের মৌখরীর লিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি গৌড়বাসীদের বিতাড়িত করে সমুদ্রে আশ্রয় নিতে (সমুদ্রাশ্রয়ী) বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তী গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্ত কামরূপের রাজা সুস্থিতবর্মনের আক্রমণ প্রতিহত করে গৌড়ে তাঁর অধিকার রক্ষা করেন।

শশাঙ্ক

কলচুরী শক্তির হাতে মহাসেন গুপ্ত পরাজিত হলে গৌড়ের ওপর পরবর্তী গুপ্তবংশের অধিকার দুর্বল হয়ে যায়। এই সুযোগে শশাঙ্ক বাংলার অধিপতি হন।

উপসংহার :- শশাঙ্ক বাংলার অধিপতি হলে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমুল পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পুনরায় বাংলায় অরাজকতা দেখা যায়, যা ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় নামে পরিচিত।

(FAQ) গুপ্ত যুগের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গৌড়াধিপতি কাকে বলা হয়?

শশাঙ্ক।

২. গুপ্ত যুগের পতনের পর বাংলায় কোন কোন রাজ্যের উদ্ভব ঘটে?

বঙ্গ ও গৌড়।

৩. প্রাচীন যুগে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা কি নামে পরিচিত ছিল?

বঙ্গ বা সমতট রাজার।

৪. প্রাচীন যুগে উত্তর ও পশ্চিম বাংলা কি নামে পরিচিত ছিল?

গৌড়।

Leave a Reply

Translate »