বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি

চীনে সংঘটিত বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি প্রসঙ্গে বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে চিনে বিদেশি শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি, বিদেশি শক্তির লুণ্ঠন নীতি, সাধারণ মানুষের প্রতি দুর্ব্যবহার, সাধারণ মানুষের প্রতিশোধ প্রবণতা, খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিদ্বেষ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনরোষ, চিনের জনজীবনে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষির সংকট, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও চীন-জাপান যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানবো।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি

ঐতিহাসিক ঘটনাবক্সার বিদ্রোহের পটভূমি
দেশচীন
সময়কাল১৮৯৯-১৯০১ খ্রি
বিদ্রোহের নামবক্সার বিদ্রোহ, আই হো চুয়ান
বিদ্রোহীদের আখ্যাবক্সার
বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি

ভূমিকা :- ঐতিহাসিকেরা একটি বিষয়ে মোটামুটি সুনিশ্চিত যে, বক্সার বিদ্রোহ ছিল মূলত বিদেশি-বিরোধী অভ্যুত্থান। বিদ্রোহীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশিদের চীন থেকে বিতাড়িত করে চীনের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে চিনে বিদেশি শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি

প্রথম আফিম যুদ্ধ ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে চীনের পরাজয়ের পর থেকেই চীনে বিদেশি শক্তি নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের হস্তক্ষেপ এবং অর্ধশতাব্দী ধরে বিদেশিদের সদম্ভ উপস্থিতি চীনের মানুষকে পীড়িত করেছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে বিদেশি শক্তির লুণ্ঠন নীতি

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ চীনে যে নির্লজ্জ লুণ্ঠনের নীতি গ্রহণ করেছিল তারই প্রতিক্রিয়া হিসাবে চীনের অর্থনীতি মারাত্মক রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে সাধারণ মানুষের প্রতি দুর্ব্যবহার

বদমেজাজি বিদেশি মন্ত্রী ও কনসালেরা এবং আগ্রাসী খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রায়ই চীনের সাধারণ মানুষদের সাথে দুর্ব্যবহার করতেন, ফলে চীনাদের জাতীয়তাবাদী দম্ভ এবং আত্মমর্যাদা আহত হয়েছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে সাধারণ মানুষের প্রতিশোধ প্রবণতা

স্বাভাবিকভাবেই চীনারা বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠেছিলেন এবং বিদেশিদের বিরুদ্ধে তাঁদের রোষ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল। এই পটভূমিকার সাথে অবশ্যই যুক্ত হয়েছিল কতকগুলি সামাজিক, রাজনৈতিক, ও ধর্মীয় কারণ এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে চীনে বক্সার বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিদ্বেষ

  • (১) কনফুসীয় মতবাদ, তাওবাদ এবং বৌদ্ধধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত চিনারা খ্রিস্টধর্মের অনুপ্রবেশ কখনোই ভালো চোখে দেখে নি। খ্রিস্টান মিশনারিরা চিনে যখন খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিলেন, তখন চিনের সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই এটিকে তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন।
  • (২) তাছাড়া, খ্রিস্টান মিশনারিরা ধর্মান্তরিত করার ব্যাপারে কখনো অহিংস মনোভাবের পরিচয় দেন নি। তাঁরা সর্বদাই কামানবাহী পোতে ঘুরে বেড়াতেন এবং বাধাবিপত্তি বা বিরুদ্ধাচরণের সম্মুখীন হলেই কামানবাহী পোতের সাহায্যে প্রতিশোধ নিতে কুণ্ঠিত হতেন না।
  • (৩) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের তিয়েনসিনের চুক্তির মাধ্যমে খ্রিস্টান মিশনারিরা চিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়েছিলেন, এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে কনভেনশন অফ পিকিং-এর মাধ্যমে তাঁরা চিনে জমি কেনা-বেচার অধিকার লাভ করেছিলেন। ফলে তাঁদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছিল।
  • (৪) চিনাদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। মিশনারিরা দরিদ্র চিনাদের ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে আর্থিক সাহায্য দিতেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাতেও সফল না হলে কামানবাহী পোতের আশ্রয় নিতেন। ফলে চিনারা মিশনারিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করতেন। যে সমস্ত চিনা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছিলেন তাঁদের প্রতিও সাধারণ চীনারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন।
  • (৫) চিনা জেন্ট্রিরা খ্রিস্টধর্মকে সামাজিক সংহতি নাশক, প্রবঞ্চক এবং চীনের প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধাচরণকারী ধর্ম বলে মনে করতেন। ঐতিহাসিক ইম্যানুয়েল সু যথার্থই বলেছেন, প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধাচরণকারী ধর্ম হিসাবে খ্রিস্টধর্মই চিনে বিদেশি বিরোধিতার মূল কারণে পরিণত হয়েছিল।
  • (৬) চিনের জনসাধারণ এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের মধ্যে ১৮৬০-এর দশক থেকেই তিক্ত সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। তবে ১৮৯০-এর দশকে এই তিক্ততা সংঘর্ষে রূপান্তরিত হয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে গুজব রটে যে, বিদেশিরা খুব শীঘ্রই সেচুয়ান আক্রমণ করবে। এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে চেং ডু এবং তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে প্রবল হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকে।
  • (৭) আগস্ট মাসে শ্বেতপদ্ম সমিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত “নিরামিষাশী গোষ্ঠী”র সদস্যরা ফুজিয়ানের অন্তর্ভুক্ত গুচিয়ান শহরে প্রচুর খ্রিস্টান গির্জা অগ্নিদগ্ধ করেন এবং ৯ জন খ্রিস্টান মিশনারিকে হত্যা করেন। ১৮৯৬ এবং ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ ধরে হুনান, হুপেই, কিয়াংসু, সেচুয়ান, শানটুং প্রভৃতি অঞ্চলে বহু অনুরূপ ঘটনা ঘটে।
  • (৮) শানটুং অঞ্চলে দুজন মিশনারি নিহত হলে জার্মানি উক্ত ঘটনাকে সামরিক অভিযান চালানোর অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে। এর পরেই পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ চীনকে নিজেদের “প্রভাবাধীন অঞ্চলে” ভাগ করে নেয়। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকালে ইউ ডং চেন নামে এক ব্যক্তি সেচুয়ান অঞ্চলে একটি সশস্ত্র বিদেশি-বিরোধী অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন।
  • (৯) বিদেশিদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার সময় তিনি মাঞ্চু রাজদরবারের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ইউ ডং চেনের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান প্রায় ত্রিশটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ায় চীনা কর্তৃপক্ষ এই সশস্ত্র অভ্যুত্থানে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন এবং তা দমন করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে।
  • (১০) ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও হুনান, হুপেই এবং দক্ষিণের প্রদেশগুলিতে বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকে। মিশনারিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নিঃসন্দেহে বক্সার বিদ্রোহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পটভূমিকা হিসাবে কাজ করেছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনরোষ

  • (১) ১৮৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিদেশি শক্তিবর্গ যখন চিনকে নিজেদের প্রভাবাধীন অঞ্চলে ভাগ করে নেয়, তখন চিনারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের স্বাধীনতা লুপ্তির আশঙ্কায় আশঙ্কিত হয়ে ওঠেন।
  • (২) চিনের সংস্কার আন্দোলনের (১৮৯৮) নেতা কাং ইউ ওয়েই ১৮৯৮-এর ১৭ই এপ্রিল জাতীয় সুরক্ষা সমিতির সদস্যদের সামনে একটি বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এইভাবে বিদেশি অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে চিন অচিরেই বর্মা, আন্নাম, ভারতবর্ষ বা পোল্যান্ডের মতো একটি পরাধীন দেশে পরিণত হবে।
  • (৩) প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিনের সাধারণ মানুষ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকেই বিদেশিদের হত্যা করতে আরম্ভ করেন।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে চিনের জনজীবনে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব

  • (১) আফিম যুদ্ধ চিনের অর্থনীতিকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না । বিদেশি পণ্যে চিনের বাজার ছেয়ে গিয়েছিল। বিদেশি বস্ত্র চিনা বস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে পাওয়া যেতে লাগল। ফলে এই অসম প্রতিযোগিতার সামনে চীনা হস্তশিল্প ভেঙে পড়ে।
  • (২) তাইপিং পরবর্তী যুগে চিনের বাজারে বিদেশি পণ্যের অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পায়। ১৮৬১-১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহুসংখ্যক বিদেশি ধাঁচের উদ্যোগ ও শিল্প চিনে গড়ে ওঠে। চিনে বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। ফলে চিনের আর্থিক স্বাধীনতা ব্যাহত হয়। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে চিনের বাণিজ্যিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৯ মিলিয়ন টেইল।
  • (৩) সরকারি বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ হয় ১২ মিলিয়ন টেইল (সরকারি ব্যয় ১০১ মিলিয়ন টেইল এবং রাজস্ব বাবদ আয় ৮৯ মিলিয়ন টেইল)। এই ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার করের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। করভারে জর্জরিত সাধারণ মানুষ দস্যুবৃত্তির আশ্রয় নেন অথবা বিভিন্ন গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন।
  • (৪) ১৮৮৫-১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বৈদেশিক বাজারের ঘটনাস্রোতের জন্য সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চিনের চা উৎপাদকেরা। ভারতবর্ষ, সিংহল ও জাভাতে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিশ্বের বাজারে চিনা চা-এর মূল্য হ্রাস পেতে থাকে। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে চিনের উৎপাদিত কালো চা-এর ৫০ কিলোগ্রামের মূল্য ছিল ২২.১৪ ডলার।
  • (৫) ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে সমপরিমাণ কালো চা-এর মূল্য হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১১.০৯ ডলার। বৈদেশিক বাজারে চিনের সাধারণ চা-এর চাহিদা একেবারেই কমে যায়। সাম্রাজ্যবাদ চিনের সাবেকি হস্তশিল্পকেই কেবল ধ্বংস করে নি, সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবের ফলে চিনের প্রথাগত কৃষি-অর্থনীতিও ভেঙে পড়ে।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষির সংকট

  • (১) ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি চিনে কৃষির সংকট বাড়িয়ে তুলেছিল। অ্যালবার্ট ফুয়েরওয়ার্কারের ‘The Chinese Economy-1870-1911’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, ১৮৭৩-১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চিনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল ৮ শতাংশ, অথচ একই সময়ে চিনের কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ১ শতাংশ।
  • (২) জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি অত্যন্ত নগণ্য। ফলে জমিতে ভিড় উপচে পড়ে এবং চাষিদের কৃষিজমির মাপ ক্রমশ ছোটো হতে থাকে। তৎকালীন চিনে কৃষিতে পুঁজির বিনিয়োগ ছিল অত্যন্ত সামান্য। ফলে উন্নতমানের সার, বীজ বা প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল না।
  • (৩) ভাড়াটে চাষিদের উৎপাদনের অর্ধেক বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আট-দশমাংশ পর্যন্ত কর দিতে হত। এতে একজন ভাড়াটে চাষির পক্ষে তাঁর পরিবারের ভরণপোষণ করা অতি কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা তখন মহাজনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হতেন এবং ঋণের ভারে জর্জরিত হতেন।
  • (৪) কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের ভূমিচ্যুত করা হত। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভূমিহীন চাষি, ভবঘুরে এবং ভিখারির সংখ্যা চিনে বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এঁরাই পরবর্তীকালে বক্সার বিদ্রোহে যোগদান করেন।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে প্রাকৃতিক বিপর্যয়

  • (১) চিনের অভ্যন্তরীণ সংকটকে ঘনীভূত করার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ইয়েলো নদী হুনান থেকে শানটুং-এর দিকে গতি পরিবর্তন করে, ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে শানটুং অঞ্চলে মাঝে মাঝে বন্যা হতে থাকে।
  • (২) ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে এক বিধ্বংসী বন্যার ফলে শানটুং-এর প্রায় শতাধিক গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেচুয়ান, কিয়াংসি, কিয়াংসু, আনহুই প্রভৃতি অঞ্চলও অনুরূপ বিধ্বংসী বন্যার শিকার হয়। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে উত্তর চীনে মারাত্মক খরা দেখা দেয়। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে চীনের জনসাধারণের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে।
  • (৩) এই অবস্থায় চীনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন পণ্ডিতেরা ও রাজপুরুষেরা প্রচার করতে থাকেন যে, বিদেশি ও খ্রিস্টধর্মের কুপ্রভাবের ফলেই চীন নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। ফলে চীনের সাধারণ মানুষের বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি রূপে চিন-জাপান যুদ্ধের (১৮৯৫) ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া

  • (১) জাপানি সৈন্যবাহিনী চিনাদের পরাজিত করার পর চিনের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত, উত্তর চিনের গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়। এই ধ্বংসলীলার ফলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তদুপরি জাপান বিজিত চিনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের এক বিশাল অঙ্ক দাবি করেছিল। এই ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য চিনা রাজসভা জনসাধারণের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
  • (২) খ্রিস্টান মিশনারিদের অপকীর্তি, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের কুপ্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং কৃষির সংকট গ্রামাঞ্চলের মানুষদের বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তার মধ্যে বর্ধিত করভার তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকেই চিনের গ্রামাঞ্চল হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। মিশনারিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষজনিত দাঙ্গা, করভার বৃদ্ধির বিরুদ্ধে দাঙ্গা, দস্যুবৃত্তি গ্রামাঞ্চলে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
  • (৩) শানটুং অঞ্চলে এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা তীব্র রূপ ধারণ করেছিল। একেই প্রাকৃতিক বিপর্যয় শানটুং-কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, তার মধ্যে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে চিনের কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে যে, সীমান্ত রক্ষার জন্য শানটুং অঞ্চল থেকে প্রতি বৎসর ৯০,০০০ টেইল অধিক কর আদায় করা হবে। এই ঘোষণার সাথে সাথেই শানটুং-এর মানুষ তাদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেয়।
  • (৪) শানটুং ছিল কনফুসিয়াসের জন্মস্থান। অথচ এখানেই প্রোটেস্ট্যান্ট এবং রোমান ক্যাথলিক মিশনারিদের কার্যকলাপ ছিল অত্যন্ত বেশি। শানটুং-এর প্রায় ৮০,০০০ চিনা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। তদুপরি মিশনারিরা এখানে বেআইনিভাবে জমি দখল, অপরাধীদের মদত দেওয়া, অখ্রিস্টানদের ওপর অত্যাচার করা, অসাধু ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত থাকা প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত ছিল।
  • (৫) সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই মিশনারিদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং করের বোঝা বৃদ্ধি যখন তাঁদের অবস্থা শোচনীয় করে তোলে, তখন তাঁদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে অসাধু খ্রিস্টান মিশনারিদের উপর।

উপসংহার :- ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে গ্রামাঞ্চলে যে হিংসাত্মক ঘটনা চলেছিল, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তা একটি বিদেশি-বিরোধী বিদ্রোহে রূপ নিয়েছিল। শানটুং অঞ্চলে মিশনারিদের ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়েই বক্সার অভ্যুত্থানের সূত্রপাত ঘটেছিল।

(FAQ) বক্সার বিদ্রোহের পটভূমি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বক্সার বিদ্রোহ সংঘটিত হয় কোথায়?

চিনে।

২. বক্সার বিদ্রোহের সময়কাল কত?

১৮৯৯-১৯০১ খ্রিস্টাব্দ।

৩. বক্সার বিদ্রোহ চিনে কি নামে পরিচিত ছিল?

আই হো চুয়ান।

৪. বিদ্রোহীদের চিনারা কি নামে আখ্যায়িত করে?

বক্সার।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment