বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব

বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব প্রসঙ্গে মির্জা হায়দারের অভিমত, গুলবদন বেগম-এর অভিমত, স্মিথের অভিমত, লেনপুল-এর অভিমত, বাবরের বিভিন্ন গুণাবলী, আদর্শ স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, দুর্বল প্রশাসক, বাবরের পক্ষে যুক্তি ও মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বাবরের কৃতিত্ব সম্পর্কে জানবো।

বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব (Character and Achievements of Babur)

রাজত্বকাল১৫২৬-১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ
অবদানভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা
আত্মজীবনীতুজুক-ই-বাবরী
মৃত্যু১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ
উত্তরসূরিহুমায়ুন
বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব

সূচনা :- কেবলমাত্র ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র মধ্যযুগের ইতিহাসে জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর ছিলেন এক চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন নানা গুণের অধিকারী এবং তাঁরমধ্যে মোঙ্গল ও তুর্কিদের শৌর্য-বীর্য, কঠোরতা ও দক্ষতার সঙ্গে পারসিকদের উদার সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।

মির্জা হায়দারের অভিমত

বাবরের জ্ঞাতিভ্রাতা মির্জা হায়দার তাঁর ‘তারিখ-ই-রসিদী’ গ্রন্থে বাবরকে বিভিন্ন গুণের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে বাবরের মধ্যে মানবতা ও দুর্জয় সাহসের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।

গুলবদন বেগম-এর অভিমত

বাবর-কন্যা গুলবদন বেগম তাঁর ‘হুমায়ুন নামা’ গ্রন্থে বাবরের বিভিন্ন গুণাবলীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। আধুনিক যুগের ঐতিহাসিকরাও তাঁর সম্পর্কে একই ধরনের মতামত প্রকাশ করেছেন।

স্মিথ-এর অভিমত

ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ-এর মতে “সমকালীন যুগে বাবর ছিলেন এশিয়ার নরপতিদের মধ্যে সর্বাধিক প্রতিভাসম্পন্ন এবং পৃথিবীর যে কোনও দেশ ও যুগের নরপতিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসনলাভের অধিকারী।”

লেনপুল-এর অভিমত

ঐতিহাসিক লেনপুল-এর মতে বাবর ছিলেন “প্রাচ্য ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় চরিত্র ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নরপতি।” হ্যাভেল-এর মতে তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।

বিভিন্ন গুণাবলী

বাবরের মধ্যে নানা গুণের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। অসাধারণ শৌর্য-বীর্যের অধিকারী বাবর ছিলেন সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও সমরনায়ক। বিদ্যাচর্চা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প প্রভৃতির ওপর তাঁর স্বাভাবিক অনুরাগ ছিল।

আদর্শ স্থানীয় মানুষ

মানুষহিসেবেও তিনি ছিলেন আদর্শ-স্থানীয়। মাতা, স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের প্রতি তিনি ছিলেন স্নেহশীল ও কর্তব্যনিষ্ঠ। ধর্মের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন উদারও পরধর্মমতসহিষ্ণু।

সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক

  • (১) শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি বাবরের প্রবল অনুরাগ ছিল। তুর্কি, ফারসি ও আরবি ভাষায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তুর্কি ভাষায় রচিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘দিওয়ান’ এক স্মরণীয় সৃষ্টি।
  • (২) তিনি তাঁর পুত্র কামরানের জন্য ‘মুবায়িন’ নামে এক ‘মসনভী’ রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থে প্রায় দু’হাজার কবিতা আছে। তিনি ‘রিজালা-ই-উরুজ’ নামে অলঙ্কারশাস্ত্রের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
  • (৩) তিনি ‘খাৎ-ই-বাবরী’ নামে এক নতুন তুর্কি হরফের প্রচলন করেন। তিনি ফারসি ও তুর্কি ভাষায়বেশ কিছু সংগীত রচনা করেন। তিনি আইনশাস্ত্রের ওপর একটি মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেন। তুর্কি ভাষায় রচিত বাবরের আত্মজীবনী তুজুক-ই-বাবরী’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
  • (৪) শিল্প ও ভাস্কর্যের ওপরেও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তাঁর নির্দেশে আগ্রা, ঢোলপুর, গোয়ালিয়র ও অন্যান্য স্থানে বেশ কিছু সৌধ নির্মিত হয়।
  • (৫) আগ্রায় রাজধানীপ্রতিষ্ঠাকালে তিনি কনস্টান্টিনোপল থেকে একজন স্থপতি নিয়ে আসেন। ফল ও উদ্যান সম্পর্কেও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল এবং এ জন্য তাঁকে ‘উদ্যানের রাজা’ বলে অভিহিত করা হয়।

ধর্ম নীতি

  • (১) বাবর ছিলেন নিষ্ঠাবান সুন্নি মুসলিম। শিয়া সম্প্রদায় ও হিন্দুদের তিনি ‘ভ্রান্ত-পথের পথিক’ বলে মনে করতেন এবং রানা সংগ্রাম সিংহ ও মেদিনী রাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধগুলিকে তিনি ‘জেহাদ’ বলে ঘোষণা করেন।
  • (২) তিনি মুসলিম ব্যবসায়ীদের ‘বাজ’ ও ‘তমঘা’ নামক শুষ্ক থেকে অব্যাহতি দেন এবং ভারতে বেশ কিছু মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে ধর্মান্ধ বলা যায় না।
  • (৩) তিনি সুফি সম্ভদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তদানীন্তন খলিফার কর্তৃত্ব অস্বীকার করেছিলেন এবং তাঁর দরবারে মৌলবিদেরও কোনও প্রাধান্য ছিল না।
  • (৪) তিনি তাঁর পুত্র হুমায়ুনকে পরামর্শ দেন যেন তিনি সর্বধর্মের বাসভূমি ভারতে একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং সকল সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলির রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
  • (৫) আসলে ব্যক্তিস্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করলেও বাবর ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী বলেন যে, “আকবর -এর রাষ্ট্রনীতির বীজ তাঁর সুবিখ্যাত পিতামহ-ই রোপণ করেন।”

দুর্বল প্রশাসক

  • (১) বাবর সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি ছিলেন বিখ্যাত সেনাপতি ও সাহিত্যিক, কিন্তুরাজনীতিজ্ঞ হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য নয়। লেনপুল -এর মতে বাবর ছিলেনএকজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিক — সাম্রাজ্যের সংগঠক নন।
  • (২) রাশরুক উইলিয়মস্ বলেন যে, “তিনি ছিলেন বিজয়ের সংগঠক, রাষ্ট্রনীতির সংগঠক নন। তিনি ছিলেন মহান বিজেতা, কিন্তু সাম্রাজ্যের সংগঠক নন।”” বলা বাহুল্য, এই বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা আছে।
  • (৩) কাবুল থেকে গোগরা এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত ভারতের এক বিস্তৃত অংশে বাবর তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতে মোট চার বছর রাজত্ব করেন।
  • (৪) এই সময় তিনি ইব্রাহিম লোদির ভেঙ্গে পড়া শাসনব্যবস্থায় কোনও মৌলিক পরিবর্তন আনেন নি। স্থানীয় জমিদার, জায়গিরদার, প্রশাসক এবং পার্বত্য ও সীমান্ত অঞ্চলের শাসকরা নিজ নিজ অঞ্চলে কার্যত স্বাধীনভাবেই রাজত্ব চালাত।
  • (৫) তিনি নিজে তাঁর রাজ্যের বিভিন্ন অংশ তাঁর আমিরদের মধ্যে ভাগ করে দেন। এই সব অঞ্চলে কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ঐক্য গড়ে ওঠে নি। দেশের এক এক অঞ্চলে এক এক ধরনের আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
  • (৬) ঐতিহাসিক আর্সকিন (Erskine) বলেন যে, “বাবরের আমলে ভারতবর্ষ ছিল নিয়মিত ও সুশাসিত রাষ্ট্রের পরিবর্তে এক রাজার অধীনে কয়েকটি রাজ্যের সমষ্টিমাত্র।”
  • (৭) রাজ্যকে শক্তিশালী করার জন্য যে সুদৃঢ় প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা দরকার, তিনি তার কিছুই করেন নি। রাজস্ব ব্যবস্থা বা কৃষির উন্নতির জন্যও তিনি কোনও ব্যবস্থা নেন নি।
  • (৮) তিনি জনহিতকর কোনও ব্যবস্থাও গ্রহণ করেন নি, যাতে জনগণ মোগল শাসনের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তাই রাশব্রুক উইলিয়মস্ বলেন যে, “বাবর তাঁর পুত্রের জন্য উত্তরাধিকার হিসেবে যে রাজতন্ত্র রেখে যান, তা কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমেই কার্যকর ছিল, শান্তির সময় তা ছিল দুর্বল কাঠামোহীন এবং মেরুদণ্ডহীন।”
  • (৯) দিল্লি, আগ্রা, গোয়ালিয়র প্রভৃতি স্থান জয়ের পর তিনি যে ধনরত্ন পান, তা তিনি আমির, ওমরাহ ও সেনাদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। এর ফলে তাঁর রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে এবং এ জন্য হুমায়ুনকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
  • (১০) আর্থিক অনটনের জন্য হুমায়ুন সেনাদল তৈরি করতে পারেন নি। তাই তাঁর পতনের জন্য বাবরকে দায়ী করা হয়। এই সব কারণে বলা হয় যে, যোগ্য সেনাপতি হলেও প্রশাসক হিসেবে তিনি ব্যর্থ।

বাবরের পক্ষে যুক্তি

  • (১) বাবরের সমর্থনেও অবশ্য কিছু যুক্তি আছে। বাবর ভারতে মাত্র চার বছর রাজত্ব করেন এবং এই স্বল্প সময়ে তিনি মূলত আফগান ও রাজপুতদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। এত স্বল্প সময়ে এত বড় দেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কাজে হাত দেওয়া সম্ভব ছিল না।
  • (২) মোগলরা ছিল বিদেশি। ভারতীয়রা তখনও তাদের মেনে নিতে পারে নি। ভারতীয় ঐতিহ্য, প্রথা, সংস্কার এবং আইন-কানুন সম্পর্কে মোগলদের তখনও কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
  • (৩) সুতরাং ভারতীয় জনজীবনে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকা বাবরের পক্ষে যুক্তিযুক্ত ছিল। ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী বলেন যে, বাবরের কৃতিত্ব আলোচনায় বিচার্য হওয়া উচিত ভারতে তাঁর সাফল্যের দিকগুলি—ব্যর্থতা নয়।

মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

  • (১) বাবরকে ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় কিনা, এ নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। ডঃ এস. আর. শর্মা, ডঃ এস. রায়, জন রিচার্ডস্, ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে বাবর-ই হলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
  • (২) অপরপক্ষে, কর্নেল টড-এর মতে আকবর-ই হলেন এই গৌরবময় স্থানটির অধিকারী। আকবরের কৃতিত্বকে কোনওভাবে খাটো না করে বলা যায় যে, মধ্য এশিয়ার রাজনীতি থেকে বাবরই প্রথম মোগলদের ভারতমুখী করেন।
  • (৩) পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়া ও গোগরার যুদ্ধে আফগান ও রাজপুত শক্তিকে ধ্বংস করে উত্তর ভারতে মোগল শক্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (৪) বাবর যদি মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে না আসতেন বা খানুয়ার যুদ্ধ -এ জয়লাভ না করতেন, তাহলে ভারতের ইতিহাস অন্য পথে প্রবাহিত হত এবং ভারতবাসী আকবরের কৃতিত্বের কোনও পরিচয়ই পেত না।

উপসংহার :- রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা ও সাম্রাজ্য-সংগঠক হিসেবে আকবরকে যোগ্য মর্যাদা দিয়েও বলাযায় যে, “বাবর ভারতে একটি রাজবংশ ও রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রবর্তন করেন।” আকবরের হাতে এই রাজবংশ ও রাষ্ট্রীয় আদর্শ নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। তাই বাবরকেই মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা যুক্তিযুক্ত।

(FAQ) বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোন যুদ্ধের মাধ্যমে বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন?

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে।

২. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়?

দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদি ও ফরঘানার শাসক জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবরের মধ্যে।

৩. বাবরের মৃত্যু কখন হয়?

১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »