ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি

ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য যাত্রা, দাক্ষিণাত্য যাত্রার উদ্দেশ্য, বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযানের কারণ, বিজাপুর জয়, গোলকুণ্ডা জয়, শিবাজির বিরুদ্ধে অভিযান, শিবাজির উত্তরাধিকারীগণ, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু, ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির ব্যর্থতার কারণ ও ফলাফল সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি (The Deccan Policy of Aurangzeb)

রাজত্বকাল১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
দাক্ষিণাত্য যাত্রা১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ
উদ্দেশ্যবিজাপুর ও গোলকুণ্ডা জয় এবং মারাঠাদের দমন
পুরন্দরের সন্ধি১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি

ভূমিকা :- ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি হল তাঁর পূর্ববর্তী মোগল সম্রাটদের দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির অনুসরণ-মাত্র।

দাক্ষিণাত্য যাত্রা

১৬৮১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের মধ্যে উত্তর ভারতের সমস্যাগুলিকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এনে সেপ্টেম্বর মাসে ঔরঙ্গজেব সমস্যা-সংকুল দাক্ষিণাত্যে যাত্রা করেন।

ঔরঙ্গজেবের সমস্যা

দাক্ষিণাত্যের উদীয়মান মারাঠা শক্তি, বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার সঙ্গে মারাঠা রাজ্যের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং ঔরঙ্গজেবের পুত্র আকবরের বিদ্রোহ ও মারাঠা দরবারে তাঁর আশ্রয় গ্রহণ ঔরঙ্গজেবের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে।

দাক্ষিণাত্য যাত্রার উদ্দেশ্য

বিজাপুর, গোলকুণ্ডা রাজ্যদু’টি জয় করা এবং মারাঠাদের দমন—এই ত্রিবিধ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে রওনা হন এবং তাঁর জীবনের শেষ ছাব্বিশ বছর দাক্ষিণাত্যে অতিবাহিত হয়। বলা বাহুল্য, দাক্ষিণাত্যেই তাঁর নিজের ও তাঁর সাম্রাজ্যের সমাধি রচিত হয়।

পূর্বে বিজাপুর, গোলকুণ্ডা জয় অধরা

শাহজাহানের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা থাকাকালে ঔরঙ্গজেব বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা রাজ্যদু’টি জয় করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দারা ও জাহানারার বিরোধিতা এবং শাহজাহানের হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয় নি।

উত্তর ভারতের সমস্যা

১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে নিজে সিংহাসনে বসার পর উত্তর ভারতের সমস্যা নিয়ে তিনি এত ব্যস্ত ছিলেন যে, দক্ষিণ ভারতের দিকে নজর দেবার মতো তিনি বিশেষ সময় পান নি। এর ফলে দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যদু’টি মোগলদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির হাত থেকে রক্ষা পায়।

বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযানের কারণ

১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে এক ভিন্নতর পরিস্থিতিতে তিনি বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই রাজ্যদু’টি জয়ের পশ্চাতে বিভিন্ন কারণের কথা বলা হয়। যেমন –

  • (১) বলা হয় যে, ‘শিয়া’ সম্প্রদায়ভুক্ত এই রাজ্য দু’টির স্বাধীন অস্তিত্ব ‘সুন্নি’ ঔরঙ্গজেবের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ঐতিহাসিক ফেরিস্তা বলেন যে, ‘শিয়াপন্থী’-রা মসজিদে মূর্তিপূজা এবং গান-বাজনা করত। এতে ক্ষুব্ধ ঔরঙ্গজেব বিজাপুর-গোলকুণ্ডার কিছু মসজিদ ধ্বংস করেন।
  • (২) বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিককালে এই শিয়া-বিরোধী মতবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উত্থিত হয়েছে। বলা হয় যে, মোগল দরবারে শিয়া মতাবলম্বীরা বহু উচ্চপদে নিযুক্ত ছিলেন। আকবরের মাতা হামিদাবানুও ছিলেন শিয়া’। তাই শিয়া-সুন্নি বিরোধ নয়—আধুনিক ঐতিহাসিকরা এই ব্যাপারে ভিন্নতর কারণের কথা বলেন।
  • (৩) এই রাজ্যদুটি মোগলদের বিরুদ্ধে মারাঠাদের নানাভাবে সাহায্য করত।
  • (৪) চুক্তি অনুযায়ী তারা মোগল বাদশাহকে কর দিচ্ছিল না।
  • (৫) মোগল বাদশাহকে উপেক্ষা করে তারা পারস্যের সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করত।
  • (৬) এই সময় নানা কারণে সাম্রাজ্যের বার্ষিক আয় কমে গিয়েছিল। প্রাদেশিক শাসনকর্তারা অনেকেই রাজস্ব প্রদান বন্ধ করেছিল। এই অবস্থায় বিজাপুর-গোলকুণ্ডার বিপুল ধনভাণ্ডার ঔরঙ্গজেবকে প্রলুব্ধ করে।
  • (৭) হীরের খনি ও উন্নততর ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে গোলকুণ্ডা প্রভৃত সম্পদশালী হয়ে ওঠে। বিজাপুরের আর্থিক অবস্থাও ছিল যথেষ্ট উন্নত। এই সব কারণে ঔরঙ্গজেব এই রাজ্য দু’টির বিরুদ্ধে অভিযান পাঠান।

বিজাপুর জয়

  • (১) ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে শাহজাদা আজম বিজাপুর অবরোধ করেন। মারাঠা ও গোলকুণ্ডা রাজ্যের সাহায্য নিয়ে বিজাপুর সুলতান সিকান্দর আদিল শাহ মোগল-বিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যান।
  • (২) বিজাপুর অভিযান পরিচালনার জন্য ১৬৮৫খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ঔরঙ্গজেব নিজে শোলাপুরে উপস্থিত হন এবং বিজাপুর সুলতানের কাছে একটি ‘ফরমান’ পাঠান।
  • (৩) এই ফরমানে বিজাপুর সুলতানকে মোগলদের বশ্যতা স্বীকার, মন্ত্রী সারাজ খাঁ-কে পদচ্যুত করা, বিজাপুরের মধ্য দিয়ে মোগল সেনার যাতায়াতের সুযোগ দান এবং মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধে পাঁচ-ছয় হাজার অশ্বারোহী সেনা দিয়ে মোগলদের সাহায্য করার দাবি জানানো হয়।
  • (৪) বিজাপুর সুলতান এই সব দাবিপ্রত্যাখ্যান করেন এবং মোগলরা বিজাপুরের যে সকল স্থান দখল করেছিল সেগুলি প্রত্যার্পণের দাবি জানান। দীর্ঘ ১৮ মাস অবরোধের পর দুর্ভিক্ষ, মহামারি প্রভৃতি কারণে বিজাপুর আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় (সেপ্টেম্বর, ১৬৮৬ খ্রিঃ)।
  • (৫) প্রায় দুই শতাব্দীর স্বাধীন অস্তিত্বের পর ইউসুফ আদিল শাহ প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের পতন ঘটে এবং বিজাপুর মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

গোলকুণ্ডা জয়

  • (১) এরপর ঔরঙ্গজেব গোলকুণ্ডার দিকে নজর দেন। গোলকুণ্ডার হীরে ও লোহার খনি এবং সমৃদ্ধ বন্দর ঔরঙ্গজেবকে যথেষ্ট প্রলুব্ধ করেছিল।
  • (২) মারাঠা ও বিজাপুরের সঙ্গে গোলকুণ্ডার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং মদন্না ও আকল্লা নামে দুইব্রাহ্মণকে মন্ত্রিত্বে নিয়োগ বাদশাকে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করে। তিনি বিধর্মী মন্ত্রীদ্বয়কে অপসারিত করার দাবি জানালে কুতুবশাহি সুলতান আবুল হাসান তা প্রত্যাখ্যান করেন।
  • (৩) এই অবস্থায় ঔরঙ্গজেব গোলকুণ্ডা দুর্গ অবরোধ করেন। দীর্ঘ আট মাস অবরোধ সত্ত্বেও মোগল বাহিনীর পক্ষে কোনও সফলতা অর্জন করা সম্ভব হল না।
  • (৪) শেষ পর্যন্ত আবদুল্লা পান্নি নামে জনৈক আফগান দুর্গরক্ষীর বিশ্বাসঘাতকতায় মোগল বাহিনী দুর্গ দখল করে (২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৬৮৭ খ্রিঃ)। গোলকুণ্ডা মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরাজিত সুলতানকে বন্দি করে দৌলতাবাদে পাঠানো হয়।

শিবাজির বিরুদ্ধে অভিযান

বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা জয়ের পর ঔরঙ্গজেব পূর্ণ শক্তিতে মারাঠাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। দাক্ষিণাত্যে শাসনকর্তাথাকাকালীন তিনি শিবাজিকে দমন করার চেষ্টা করেন। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মারাঠা বীর শিবাজি তাঁর ক্ষমতা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি করেন।

(ক) শায়েস্তাখাঁর অভিযান

সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ঔরঙ্গজেব তাঁর মাতুল শায়েস্তা খাঁ-র ওপর শিবাজিকে দমনের দায়িত্ব অর্পণ করেন (১৬৬০ খ্রিঃ)। প্রাথমিক কিছু সাফল্যের পর লাঞ্ছিত শায়েস্তা খাঁ কোনওক্রমে প্রাণ নিয়ে দাক্ষিণাত্য ত্যাগ করেন (১৬৬৩ খ্রিঃ)।

(খ) জয়সিংহের অভিযান

  • (১) এরপর ঔরঙ্গজেব শিবাজিকে দমনের জন্য সুদক্ষ সেনাপতি অম্বর-রাজ জয়সিংহ ও দিলীর খাঁ (দিলওয়ার খাঁ)-কে পাঠান। জয়সিংহ শিবাজি সম্পর্কে এক ভিন্নতর নীতি গ্রহণ করেন।
  • (২) তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শিবাজিকে মোগলদের মিত্রে পরিণত করা। তিনি মনে করতেন যে, যতদিন বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা স্বাধীন থাকবে, ততদিন শিবাজিকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না।
  • (৩) শিবাজি কখনও মোগল, কখনও বিজাপুর, আবার কখনও গোলকুণ্ডার পক্ষে যোগ দিয়ে নিজ শক্তি বৃদ্ধি করবেন, কিন্তু বিজাপুর বা গোলকুণ্ডা কখনোই মোগলদের পক্ষে যোগ দেবে না।
  • (৪) তাই জয়সিংহ শিবাজিকে বিজাপুরের অধীনস্থ জায়গির দখল করার সুযোগ দেবার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, এর ফলে শিবাজি মোগল সীমান্তের পরিবর্তে বিজাপুরের দিকে দৃষ্টি দেবেন এবং এই সুযোগে মোগল সীমান্তকে সুদৃঢ় করা যাবে।
  • (৫) বিজাপুরের পতন হলে মিত্রহীন শিবাজি মোগল অধীনতা মেনে নেবেন। তাই জয়সিংহ একদিকে শিবাজির কাছে মিত্রতার প্রস্তাব দেন এবং অপরদিকে কূটনীতির মাধ্যমে তাঁকে মিত্রহীন করার চেষ্টা করতে থাকেন।
  • (৬) তিনি একের পর এক শিবাজির দুর্গগুলি দখল করতে থাকেন। শিবাজির অনুগতবহু জায়প্রিরদার মোগল পক্ষে যোগদান করে এবং মোগল বাহিনী মহারাষ্ট্রের গ্রামগুলিতে লুঠতরাজ শুরু করে।

(গ) পুরন্দরের সন্ধি

জয়সিংহের কৌশলে শেষ পর্যন্তশিবাজি পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন (জুন, ১৬৬৫ খ্রিঃ)। সন্ধির শর্ত অনুসারে,

  • (১) শিবাজি মোগল সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন।
  • (২) ২৩টি দুর্গ ও কয়েকটি জেলা, যেখান থেকে বার্ষিক ২০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হতে পারে, মোগলদের ছেড়ে দেন।
  • (৩) তাঁর পুত্র শম্ভুজি মোগল দরবারে পাঁচ হাজারি মনসবদার নিযুক্ত হন।
  • (৪) তিনি বিজাপুরের বিরুদ্ধে মোগলদের সাহায্যদানে সম্মত হন।

(ঘ) শিবাজির আগ্রা যাত্রা

সন্ধি সম্পাদনের কিছুদিন পরেই জয়সিংহের অনুরোধে শিবাজি শিশুপুত্র শম্ভুজি-সহ আগ্রায় যান (১২ই মে, ১৬৬৬ খ্রিঃ)। জয়সিংহ ঔরঙ্গজেবকে অনুরোধ করেছিলেন যে, তিনি যেন শিবাজিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেন, কারণ তাঁর পেছনে আছে সমগ্র মারাঠা জাতি।

(ঙ) শিবাজিকে নজরবন্দী

ঔরঙ্গজেব জয়সিংহের নীতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন নি। শায়েস্তা খাঁ, জাহানারা, দিলীর খাঁ ও যশোবন্ত সিংহের পরামর্শে শিবাজিকে আগ্রা দুর্গে নজরবন্দি করে রাখা হয়। সুচতুর শিবাজি শিশুপুত্র সহ কৌশলে সেখান থেকে পলায়ন করে নিজ রাজ্যে ফিরে আসেন।

(চ) রাজা উপাধি প্রদান

শিবাজিকে কোনোভাবেই পরাজিত করা সম্ভব নয় দেখে ঔরঙ্গজেব তাঁকে ‘রাজা’ বলে স্বীকার করেন এবং জায়গির হিসেবে বেরার দান করেন (১৬৬৮ খ্রিঃ)।

(ছ) মোগলদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ

দাক্ষিণাত্যে মোগল সেনাপতিদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বিদ্রোহ দমনে সম্রাটের ব্যস্ততার সুযোগে ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শিবাজি মোগলদের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করেন।

(জ) শিবাজির অভিষেক

পুরন্দরের সন্ধির শর্ত হিসেবে যে ২৩টি “দুর্গ তিনি মোগলদের ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলি একে একে তিনি পুনরুদ্ধার করেন। ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ছত্রপতি’ ও ‘গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক’ উপাধি ধারণ করে রায়গড় দুর্গে মহাসমারোহে তিনি নিজ অভিষেক সম্পন্ন করেন।

শিবাজির উত্তরাধিকারীগণ

  • (১) শিবাজির মৃত্যুর পর ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুত্র শম্ভুজি মারাঠা রাজ্যের সিংহাসনেবসেন। পিতার সামরিক প্রতিভা তাঁর ছিল না। ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মোগল বাহিনীর হাতে বন্দি হন এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়।
  • (২) এরপর মোগল বাহিনী বহু মারাঠা দুর্গ- এমনকী রাজধানী রায়গড় দখল করে। রায়গড় দখলকালে শম্ভুজির শিশুপুত্র শাহু ও পরিবারের অন্যান্যরা বন্দি হন। শম্ভুজির কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাজারাম কোনওক্রমে পলায়ন করে কর্ণাটকে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
  • (৩) শম্ভুজির মৃত্যুর পর মারাঠা সংগ্রাম নতুন রূপ ধারণ করে এবং প্রকৃত অর্থেই ‘জনগণের যুদ্ধ’ শুরু হয়। রাজারামের নেতৃত্বে মারাঠারা মোগলদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
  • (৪) রাজারামের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা পত্নী তারাবাঈ শিশুপুত্র তৃতীয় শিবাজি-কে সিংহাসনে বসিয়ে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকেন। মারাঠা বাহিনী দাক্ষিণাত্যের মোগল অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে অতর্কিত আক্রমণ চালাতে থাকে।
  • (৫) মোগল বাহিনী আত্মরক্ষামূলক নীতি গ্রহণে বাধ্য হয়। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যুদ্ধ চালিয়েও ঔরঙ্গজেব মারাঠাদের বিরুদ্ধে কোনও সাফল্য অর্জন করতে পারেন নি।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু

দেহ-মনে রিক্ত নব্বই বছরের বৃদ্ধ বাদশার ক্লান্ত আত্মা শেষ পর্যন্ত ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ আহম্মদনগরের মাটিতে চিরশান্তি লাভ করে। দাক্ষিণাত্যই হল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দেহ ও সাম্রাজ্যের সমাধিস্থল।

ব্যর্থতার কারণ

ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির ব্যর্থতার জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করা যায়। যেমন –

  • (১) দাক্ষিণাত্যের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে মারাঠা, বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে গেলে যে সুপরিকল্পিত ও উন্নত রণনীতির প্রয়োজন ছিল, তা ঔরঙ্গজেবের ছিল না।
  • (২) বারংবার সেনাপতি বদল শিবাজি সম্পর্কে জয়সিংহের পরামর্শ উপেক্ষা করা, রণক্লান্ত সেনাদের নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, শাহজাদা শাহ আলমের কথার গুরুত্ব না দিয়ে তাঁকে বন্দি করা প্রভৃতিই ঔরঙ্গজেবের রণনীতির দুর্বলতা প্রমাণ করে।
  • (৩) সেনাপতি মির্জা জয়সিংহের পরামর্শ মতো ঔরঙ্গজেব যদি শিবাজির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে তাঁকে যোগ্য সম্মান দিতেন তাহলে শিবাজি মোগল বিরোধিতার পথ ত্যাগ করতেন। শিবাজিকে বন্দি করায় ক্ষুব্ধ মারাঠারা বিপুল উদ্যমে মোগলদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
  • (৪) ঔরঙ্গজেব যদি শিবাজির সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করে বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতেন তাহলে তাঁকে এই দুই রাজ্যের বিরুদ্ধে এত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হত না।
  • (৫) শম্ভুজির প্রাণদণ্ড ছিল ঔরঙ্গজেবের আরেকটি মারাত্মক ভুল। তাঁর মৃত্যুদণ্ড মারাঠাদের নবচেতনায় জাগ্রত করে। গুরু তেগবাহাদুরের হত্যা শিখদের মধ্যে যে উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল, শম্ভুজির হত্যাকাণ্ডও মারাঠাদের অনুরূপ মোগল-বিরোধী সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করে। ঔরঙ্গজেব মারাঠা জাতীয়তাবাদের স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন নি।
  • (৬) উত্তর ভারতে যখন প্রবল রাজনৈতিক অসন্তোষ চলছে, তখন কর্ণাটক আক্রমণ করে বৃদ্ধ বাদশাহ নতুন করে মারাঠা যুদ্ধ শুরু করেন। সেনাপতি বাহাদুর শাহ তাঁকে দিল্লি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি তা উপেক্ষা করেন।
  • (৭) ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে তারাবাঈ সন্ধির প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাদশাহ সসম্মানে দিল্লি প্রত্যাবর্তন করতে পারতেন, কিন্তু নিয়তি তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

দাক্ষিণাত্য যুদ্ধের ফলাফল

ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ মোগল ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল। দাক্ষিণাত্যে তিনি একটি অকারণ ও দীর্ঘকালব্যাপী বৃথা যুদ্ধে তাঁর জীবনের বহু মূল্যবান সময় ও প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ (V. Smith)-এর মতে, দাক্ষিণাত্য ঔরঙ্গজেবের দেহ ও সাম্রাজ্যের সমাধিস্থল।

  • (১) ঐতিহাসিক স্মিথ ও এলফিনস্টোন-এর মতে ঔরঙ্গজেবের বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা জয় ছিল একটি মারাত্মক ভুল।কারণ, এই রাজ্য দু’টির কর্মচ্যুত হাজার হাজার অশ্বারোহী সেনা মারাঠা বাহিনীতে যোগ দিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে।
  • (২) এই রাজ্যদুটি স্বাধীন থাকলে নিজেদের নিরাপত্তার তাগিদেই তারা মারাঠা শক্তিকে দমন করত এবং ঔরঙ্গজেব এই দু’টি মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলে মারাঠা রাজ্যকে ধ্বংস করতে পারতেন।
  • (৩) ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার এই মতের বিরোধিতা করে বলেন যে, দাক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলি জয়ের নীতি আকবরই প্রথম গ্রহণ করেন—ঔরঙ্গজেব নন।
  • (৪) দাক্ষিণাত্যের ক্ষয়িষ্ণু ও পতনোন্মুখ রাজ্য দু’টির পক্ষে নবজাগ্রত মারাঠা রাজ্যকে ধ্বংস করা কোনওক্রমেই সম্ভব ছিল না। ডঃ সতীশ চন্দ্র-ও এই মত সমর্থন করেন।
  • (৫) ডঃ সতীশ চন্দ্র বলেন যে, জায়গিরদারি সংকটের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই ঔরঙ্গজেব এই রাজ্যদু’টি জয় করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এই রাজ্য দু’টিকে ‘খালসা’ জমিতে পরিণত করে কিছু জমি জায়গির হিসেবে মনসবদারদের দেওয়া।
  • (৬) মোগলদের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের স্বাধীন রাজ্যগুলির বিরোধ ছিল চিরস্থায়ী। সেক্ষেত্রে মোগলদের সঙ্গে তাদের প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
  • (৭) দাক্ষিণাত্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয়ের পর মোগল সাম্রাজ্য এই সময় সর্বাপেক্ষা বিশাল আকৃতি ধারণ করে। কাবুল থেকে চট্টগ্রাম এবং কাশ্মীর থেকে কাবেরী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এত বড় সাম্রাজ্যকে একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে বা একজন শাসকের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল না।
  • (৮) আপাতদৃষ্টিতে ঔরঙ্গজেব এই সময় সব কিছু লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে তখন যেন সবই হারিয়ে গেল। এটা ছিল তাঁর পতনের শুরু। দাক্ষিণাত্য এমনিতেই ছিল উপদ্রুত এলাকা এবং এই উপদ্রুত অঞ্চলে নতুন প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে সম্রাট নিজ সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলেন।
  • (৯) দীর্ঘদিন যুদ্ধের ফলে কৃষিকার্য, বনাঞ্চল, তৃণভূমি, গ্রামীণ শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জায়গিরদাররা রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হন। মানুচি-র বিবরণেও এই কথার সমর্থন মিলে।
  • (১০) রাজধানী থেকে সম্রাটের দীর্ঘ অনুপস্থিতির ফলে উত্তর ভারতে বিদ্রোহীরা মাথা তোলে, আমলারা স্ব স্ব স্বাধীন হয়ে পড়ে, প্রশাসন শিথিল ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সম্রাট কর্মচারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
  • (১১) দাক্ষিণাত্যের বিরামহীন যুদ্ধে রাজকোষ নিঃশেষ হয়ে যায় এবং সরকার দেউলিয়া হয়ে পড়ে। বেতনের অভাবে সেনাদল বিদ্রোহ ঘোষণা করে। প্রাদেশিক শাসনকর্তারা রাজস্ব পাঠানো বন্ধ করে দেন এবং এই সময় বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ প্রেরিত রাজস্বই ছিল সম্রাটের পরিবার ও সেনাবাহিনীর একমাত্র ভরসা।

উপসংহার :- ‘স্পেনীয় ক্ষত’ (‘Spanish ulcer’) যেমন ফরাসি সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নের ধ্বংসের কারণ ছিল, তেমনি ‘দাক্ষিণাত্য ক্ষত’ (‘Deccan ulcer) ছিল ঔরঙ্গজেবের ধ্বংসের কারণ (“The Deccan ulcer ruined Aurangzeb.”)।

(FAQ) ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য যাত্রা করেন কখন?

১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে।

২. দাক্ষিণাত্য ক্ষত কথাটি কোন মোগল সম্রাটের সাথে জড়িত?

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব।

৩. কখন কাদের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়?

১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে শিবাজি ও মোগল সেনাপতি জয়সিংহের।

৪. কখন কোথায় ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়?

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে।

Leave a Reply

Translate »