ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন

ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন প্রসঙ্গে যবন নামের উৎপত্তি, বাহ্লীক যবন, ইন্দো-গ্ৰীক, এ্যান্টিওকাসের অভিযান, ইউথিডেমসের ভারত অভিযান, ডিমিট্রিয়াসের ভারত অভিযান ও মিনান্দারের অভিযান সম্পর্কে জানবো।

ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন

বিষয় ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন
সময়কাল মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনকাল
প্রথম অভিযান এ্যান্টিওকাস
বিখ্যাত রাজা মিনান্দার
রাজধানী শিয়ালকোট
ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন

ভূমিকা :- মৌর্য যুগের পর যে বৈদেশিক জাতিগুলি ভারতে এসেছিল তাদের মধ্যে কালানুক্রম অনুযায়ী ব্যাকট্রিয় গ্রীক বা যবনরাই প্রথমে আসে। সুতরাং ব্যাকট্রিয় গ্রীকদের আগমনের কথা এখানে প্রথমে বলা হয়।

যবন নামের উৎপত্তি

  • (১) সাধারণভাবে ভারত ইতিহাসে যবন বা ম্লেচ্ছ শব্দটি বহিরাগত জাতিদের সম্পর্কে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যবন শব্দটির আদি উৎপত্তি আইয়োন বা আইয়োনীয় থেকে হয়েছিল।
  • (২) প্রাচীন গ্রীক জাতির একটি শাখার নাম ছিল আইওনীয় (Ionian)। পারস্যে এই আয়োনীয় শব্দটির ” যোন” শব্দে রূপান্তরিত হয়। “যোন” বলতে সকল গ্রীকদের মনে করা হত। ভারতে যোন কথাটি “যবনে” রূপান্তরিত হয়।

বাহ্লীক যবন

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হলে হিন্দুকুশের অপর পার ব্যাকট্রিয়া হতে গ্রীক অধিবাসীরা ভারতে ঢুকে পড়ে। ভারতে এদের নাম হয় “বাহ্লীক যবন”। ব্যাকট্রিয়ার ভারতীয় নাম ছিল বালখ্ বা বাহ্লীক দেশ। সেই দেশ হতে আগত গ্রীকদের নাম হয় বাহ্লীক যবন। ভারত ইতিহাসে এরা ব্যাকট্রিয় গ্রীক বা ইন্দো-গ্রীক নামে পরিচিত।

ইন্দো-গ্ৰীক

ব্যাকট্রিয়া থেকে এই গ্রীকরা ভারতে বাস করতে চলে আসে এই অর্থে এদের ইন্দো-গ্রীক বলা হয়। তবে মনে রাখা দরকার যে, এই গ্রীকরা মূল গ্রীক দেশ থেকে ভারতে আসেনি।

ব্যাকট্রিয়ার অবস্থান

ব্যাকট্রিয়া দেশটি দক্ষিণে ও পূর্বে হিন্দুকুশ এবং উত্তরে অক্ষু (Oxus) নদীর মধ্যে অবস্থিত ছিল। ব্যাকট্রিয়ার পশ্চিমে হেরাট। ব্যাকট্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছিল অক্ষু নদী।

বিচ্ছিন্ন ব্যাকট্রিয়া

আলেকজাণ্ডারের আক্রমণের সময় থেকে বহু গ্রীক ব্যাকট্রিয়ায় বসবাস করত। এই গ্রীকরা তাদের মূল দেশ গ্রীস থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। আলেকজাণ্ডারের সাম্রাজ্য তাঁর সেনাপতিদের মধ্যে ভাগ হলে, ব্যাকট্রিয়া সেই থেকে সেলুকাসের ভাগে পড়েছিল। সেলুকাস ও তাঁর বংশধররা যে সেলুকীয় রাজবংশ স্থাপন করেন তার কেন্দ্র ছিল সিরিয়া।

এ্যান্টিওকাসের অভিযান

সেলুকাসের বংশধরদের রাজত্বকালে ব্যাকট্রিয়া ও পার্থিয়া এই দুই রাজ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেলুকাসের বংশধর তৃতীয় এ্যান্টিওকাস (Antiochus III) ব্যাকট্রিয়া পুনরুদ্ধারের জন্যে অভিযান চালান।

বিদ্রোহী নেতা

ব্যাকট্রিয়ার বিদ্রোহের নেতা ছিলেন ডিওডোটাস নামে এক গ্রীক। তৃতীয় এ্যান্টিওকাসের আক্রমণ আসন্ন হলে ২১২ খ্রিস্ট পূর্বে ইউথিডেমস নামে অপর এক উচ্চাকাঙ্খী গ্রীক ডিওডোটাসকে হত্যা করে ব্যাকট্রিয়ার নেতৃত্ব নেন। তিনি সেলুকাসের বংশধর তৃতীয় এ্যান্টিওকাসের বিরুদ্ধে প্রবল বাধা দেন। কিন্তু এ্যান্টিওকাস তার রাজধানী অবরোধ করেন।

ব্যাকট্রিয়ার সঙ্গে সন্ধি

এই পরিস্থিতিতে ইউথিডেমস তার পুত্র ডিমিট্রিয়াসকে সন্ধি স্থাপনের জন্যে সিরিয়ায় পাঠান। ডিমিট্রিয়াসের দৌত্যের ফলে যে সন্ধি (২০৬ খ্রিস্ট পূর্ব) স্থাপিত হয় তার দ্বারা এ্যান্টিওকাস ব্যাকট্রিয়ার স্বাধীনতা কার্যত মেনে নেন। তিনি তার কন্যার সঙ্গে ডিমিট্রিয়াসের বিবাহ দেন।

এ্যান্টিওকাসের ভারত অভিযান

এ্যান্টিওকাস ব্যাকট্রিয়ার সাহায্য নিয়ে ভারত সীমান্তে অভিযান করেন বলে জানা যায়। তখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের বা গান্ধারের শাসনকর্তা ছিলেন সুভগসেন। লামা তারানাথের মতে, এই সুভগসেন ছিলেন মৌর্য সম্রাট অশোকের প্রপৌত্র। তিনি মৌর্য অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। সুভগসেন, শেষ পর্যন্ত এ্যান্টিওকাসের বশ্যতা স্বীকার করে কিছু অর্থ এবং কিছু সংখ্যক রণহস্তী দেন। এর পর এ্যান্টিওকাস সিরিয়ায় ফিরে যান।

ইউথিডেমসের ভারত অভিযান

এ্যান্টিওকাসের পর ব্যাকট্রিয়ার অধিপতি ইউথিডেমস হিন্দুকুশের দক্ষিণে ভারত সীমান্তের দিকে বিস্তার নীতি নেন। ইউথিডেমস ভারতের সীমান্ত পার হয়ে কত দূর পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করেন তা সঠিক জানা যায়নি। তিনি দক্ষিণ আফগানিস্থান পর্যন্ত রাজত্ব করতেন বলে তার তাম্রমুদ্রা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।

ডিমিট্রিয়াসের ভারত অভিযান

ভারতে ব্যাকট্রিয় অধিকার বিস্তারের কাজে ডিমিট্রিয়াস উল্লেখ্য ভূমিকা নেন। প্রথমে তিনি হিন্দুকুশের দক্ষিণ থেকে সিন্ধুনদ পর্যন্ত অঞ্চল জয় করেন। তারপর তিনি সিন্ধুনদ পার হয়ে পাঞ্জাব ও সিন্ধু দেশ জয় করেন বলে অনুমান করা হয়। তার রাজধানী ছিল শাকল বা শিয়ালকোট।

ইউক্যাটিডিসের ভারত অভিযান

ব্যাকট্রিয়া দখলের পর ইউক্র্যাটিডিস ব্যাকট্রিয়ায় তাঁর ক্ষমতাকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন অথবা শক আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাকট্রিয়া রক্ষার চেষ্টায় তার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্যয় করেননি। তিনি ডিমিট্রিয়াসের বংশধরদের ভারত থেকে উচ্ছেদের জন্যে হিন্দুকুশ পার হয়ে অভিযান চালান। তাঁর মুদ্রাগুলি থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ্যাপোলোডোটাসের ভারত অভিযান

ডিমিট্রিয়াসের বংশের ইন্দো-গ্রীক রাজাদের মধ্যে এ্যাপোলোডোটাস ও মিনান্দারের নাম বিশেষ পরিচিত। ইউক্যাটিডিস, এ্যাপোলোডোটাসের মুদ্রার পুনর্মুদ্রণ করেন। এ্যাপোলোডোটাস সম্ভবত কপিশ-গান্ধার, সিন্ধু ও সৌরাষ্ট্র জয় করেন।

মিনান্দারের ভারত অভিযান

ইন্দো-গ্রীক রাজাদের মধ্যে মিনান্দার ছিলেন বিশেষ বিখ্যাত। ভারতীয় সাহিত্যে তার নাম পাওয়া যায়। গ্রীক ঐতিহাসিকরা তাঁর নাম বারে বারে উল্লেখ করেছেন। কাবুল থেকে মথুরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মিনান্দারের মুদ্রার প্রাপ্তি তাঁর রাজত্বের বিশালতা প্রমাণ করে। শিনকোট পেটিকা লিপি থেকে পাঞ্জাব, পেশোয়ার ও কাবুল অঞ্চলে তার আধিপত্য প্রমাণিত হয়। তার মুদ্রা সিন্ধু, পশ্চিম-উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্চাল অঞ্চলে পাওয়া গেছে।

এ্যান্টিয়ালকিডাসের অভিযান

সর্বশেষ বিখ্যাত ইন্দো-গ্রীক রাজা ছিলেন এ্যান্টিয়ালকিডাস। তার দূত হেলিওডোরাস বিদিশার (বেসনগর) শুঙ্গ রাজা কাশীপুত্র ভাগভদ্রের দরবারে আসেন। ডঃ ডি. সি. সরকারের মতে, মিনান্দারের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যেই এ্যান্টিয়ালকিডাস শুঙ্গ রাজা কাশীপুত্র ভাগভদ্রের সাহায্য ভিক্ষা করেন। এ্যান্টিয়ালকিডাসের রাজধানী ছিল তক্ষশিলা।

হারমাইয়স

শেষ ইন্দো-গ্রীক রাজার নাম ছিল হারমাইয়স। তার মুদ্রা থেকে জানা যায় যে তিনি শক, পার্থীয় ও ইউচিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তার রাজ্য হারান।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক রাপসন বলেন যে, কুজুল কদফিসেস প্রথমদিকে হারমাইয়সকে প্রভু হিসেবে রেখে ক্ষমতা নেন। পরবর্তী মুদ্রায় তিনি নিজেই সার্বভৌম ক্ষমতা ঘোষণা করেন।

(FAQ) ব্যাকট্রিয় গ্ৰীক বা যবনদের আগমন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতে বিদেশী জাতি সম্পর্কে কোন শব্দটি ব্যবহার করা হত?

যবন বা ম্লেচ্ছ।

২. ইন্দো-গ্ৰীকরা কোথা থেকে ভারতে এসেছিল?

ব্যাকট্রিয়া।

৩. ভারতে রাজত্বকারি দুজন ইন্দো-গ্ৰীক রাজার নাম লেখ।

ডিমিট্রিয়াস ও মিনান্দার।

৪. মিনান্দারের রাজধানী কোথায় ছিল?

শাকল বা শিয়ালকোট।

Leave a Reply

Translate »