ইসলামী রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা

ইসলামী রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা প্রসঙ্গে তিনটি পন্থা, জিম্মি প্রজা, মুসলমান আইনজ্ঞের মন্তব্য, জিজিয়া কর, হিন্দুদের উপর নির্যাতন, হিন্দুদের মনোবল হ্রাস ও ইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দু সাহায্যকারীর অভাব সম্পর্কে জানবো।

ইসলামী রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনাইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা
অমুসলিম প্রজাজিম্মি
হিন্দু রাজস্ব সংস্কারকটোডরমল
জিজিয়া প্রবর্তনসিন্ধুর আরব বিজেতা
ইসলামী রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা

ভূমিকা :- দিল্লী সুলতানি রাষ্ট্রে হিন্দুদের প্রকৃত অবস্থা কি ছিল তা সঠিক ভাবে বলা যায় না। তবে এখানে সকল নাগরিক ধর্ম নির্বিশেষে সমান মর্যাদার অধিকারী ছিল না।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে তিনটি পন্থা

মুসলমানগণ যখন কোনো অমুসলমান রাজ্য জয় করত, তখন বিজিত জনগণকে তিনটি পন্থার একটি বেছে নিতে বলা হত – ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, জিজিয়া কর প্রদান ও মৃত্যু বরণ।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে জিম্মি প্রজা

নিজ ধর্মের প্রতি যাদের অনুরাগ থাকত তারা স্বভাবতঃই জিজিয়া কর প্রদান করে বিজেতাদের সাথে আপোষ করত। ইসলামীয় রাষ্ট্রে এই অমুসলমান প্রজাদের বলা হত ‘জিম্মি’ (অর্থাৎ আশ্রিত জনগণ)।

মুসলমান আইনজ্ঞের মন্তব্য

একজন মুসলমান আইনজ্ঞ বলেন, ‘যে জিজিয়া কর দেয়, এবং মুসলমান রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলে, তাকেই বলে জিম্মি।’

ইসলামীয় রাষ্ট্রে জিজিয়া কর

সিন্ধুর আরব বিজেতাগণ হিন্দুদের থেকে জিজিয়া কর আদায়ের প্রথা প্রচলন করেন। আকবর এই কর তুলে না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লীর শাসকগণ এই প্রথা অনুসরণ করেন।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে অবমাননাজনক জিজিয়া কর

সাধু-সন্ন্যাসী, বিত্তহীন ব্যক্তি এবং ক্রীতদাসদের থেকে জিজিয়া কর আদায়ের প্রথা ছিল না। এই কর প্রদান ছিল অবমাননাকর ও হীনতাজনক।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণদের উপর জিজিয়া কর

কয়েক শতাব্দী যাবৎ ব্রাহ্মণগণ এই কর প্রদানের দায় থেকে মুক্ত ছিলেন। কিন্তু ফিরোজ শাহ তুঘলক তাঁদের কাছ থেকেও জিজিয়া আদায় করেন।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দুদের শ্রমিক পর্যায়ে নমন

কোনো কোনো শাস্ত্রজ্ঞ মুসলমান মৌলানা হিন্দুদের শ্রমিক মজুরের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাইতেন। আলাউদ্দিন খলজির রাজত্বকালের কাজী মুঘিসউদ্দীন তাদেরই একজন ছিলেন।

আলাউদ্দিন খলজির প্রতি মিশরীয় টিকাকারের মন্তব্য

ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্রের জনৈক মিশরীয় টীকাকার ভারত ভ্রমণের সময় আলাউদ্দিন খলজিকে লিখেছিলেন, ‘আমি শুনেছি যে আপনি হিন্দুদের এরূপ দুর্দশাগ্রস্ত করেছেন যে তাদের স্ত্রীপুত্রকন্যা মুসলমানদের দুয়ারে ভিক্ষা করে খায়। এরূপ কাজের ফলে আপনি ধর্মের যথেষ্ট সেবা করছেন। আপনার এই একমাত্র পুণ্য কাজের জন্য আপনার সকল পাপেরই মার্জনা হবে’।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে অনমনীয় মনোভাবের প্রতিফলন

তবে এই অনমনীয় মনোভাব আইন ও শাসন-ব্যবস্থায় সব সময় প্রতিফলিত হয় নি। আলাউদ্দিন হিন্দুদের আর্থিক দুর্গতি ঘটিয়েছিলেন। ফিরোজ তুঘলক ও সিকান্দর লোদী তাদের ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু আলাউদ্দিন এবং মহম্মদ বিন তুঘলক উলেমাদের রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করারও চেষ্টা করেন।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দুদের উপর নির্যাতন

প্রকৃতপক্ষে কোনো সময়ই হিন্দুদের উপর পরিকল্পিত ভাবে নির্যাতন, বা তাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সাধনের চেষ্টা করা হয় নি। তবে কোনো সুলতানই হিন্দুদের শাসন-ব্যবস্থার অংশীদার করে সুলতানী সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে প্রসারিত করার চেষ্টা করেন নি।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দুদের মনোবল হ্রাস

সেই ধর্মীয় গোঁড়ামির যুগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা কেবলমাত্র শাসক সম্প্রদায়ের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। ফলে হিন্দুদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। তাদের প্রকৃত আনুগত্য এবং প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের অভাবে সুলতানী সাম্রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হল। হিন্দুদের উচ্চ পদে নিয়োগ করা হত না।

ইসলামীয় রাষ্ট্রে হিন্দু সাহায্যকারীর অভাব

মান সিংহ ও মীর্জা রাজা জয়সিংহ যেরূপে মুঘল সাম্রাজ্যের সেবা করেছিলেন, কোনো রাজপুত রাজা সেরূপে সুলতানী সাম্রাজ্যের সেবা করে নি। সুলতানদের সময়ে টোডরমলের ন্যায় কোনো হিন্দু রাজস্ব সংস্কারকের আবির্ভাব হয় নি।

উপসংহার :- নিম্ন শ্রেণীর নাগরিক রূপে হিন্দুদের অবস্থান থেকে প্রমাণিত হয় যে আধুনিক ভারতের ন্যায় সুলতানী সাম্রাজ্য এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছিল না, যেখানে সকল নাগরিক ধর্মনির্বিশেষে সমান মর্যাদার অধিকারী।

(FAQ) ইসলামী রাষ্ট্রে হিন্দুদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জিজিয়া কর চালু করেন কারা?

সিন্ধুর আরব বিজেতাগণ।

২. জিম্মি কাদের বলা হত?

ইসলামীয় রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জিম্মি বলা হত।

৩. কোন সুলতান ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে জিজিয়া কর আদায় করতেন?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

Leave a Comment