ক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য

ক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য প্রসঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন, শিল্প-বাণিজ্য ও শহরের বিকাশ, সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন, পোপের মর্যাদা বৃদ্ধি, জ্ঞানের বিকাশ, ইউরোপের তুলনায় মুসলিম দুনিয়ার পিছিয়ে পড়া, ধ্বংস ও মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

ক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য

ঐতিহাসিক ঘটনাক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য
পতনসামন্ততন্ত্র
প্রতিষ্ঠাজাতীয় রাষ্ট্র
শক্তিশালীজাতীয় চেতনা
সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিনারী
ক্রুসেডের অবসান ঘোষণাএলেনবাই
ক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য

ভূমিকা :- মুসলিমদের হাত থেকে জেরুজালেম তথা প্যালেস্টাইন পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ প্রায় দুশো বছর ধরে (১০৯৬-১২৯১ খ্রি.) মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধাদের মধ্যে ক্রুসেডগুলি সংঘটিত হয়। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্রুসেড-যোদ্ধাদের পক্ষে মুসলিমদের হাত থেকে প্যালেস্টাইন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। তাই অধ্যাপক হিট্টি ক্রুসেডকে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দীর্ঘকালীন বিরোধের একটি মধ্যযুগীয় অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও মধ্যযুগের ইউরোপে ক্রুসেড গুলির ফলাফল ও তাৎপর্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

(ক) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে যেমন –

(১) সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয়

ক্রুসেডে অংশগ্রহণকারী ইউরোপের বহু সামন্তপ্রভু তাদের সম্পত্তি ধনী বণিক ও মহাজনদের কাছে বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে ক্রুসেড যাত্রার জন্য অর্থ জোগাড় করেছিলেন। যুদ্ধে অনেক সামন্তপ্রভুর মৃত্যু হয়। বাকিদের অনেকেই যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হয়ে অভিযান থেকে ঘরে ফেরেন। ফলে তারা হতদরিদ্র হয়ে পড়েন। এর ফলে ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে ক্রমে পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

(২) জাতীয় রাষ্ট্র গঠন

সামন্ততন্ত্রের পতনের ফলে ইউরোপে রাজতন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সেখানে একে একে শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

(৩) জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি

তা ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তের বহু মানুষ ক্রুসেডে যোগদানের ফলে দূরদেশে গিয়ে তাদের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয়। এভাবে ইউরোপের জাতীয় চেতনা শক্তিশালী হয়।

(খ) শিল্প, বাণিজ্য ও শহরের বিকাশ

মধ্যযুগে কৃষিই ছিল ইউরোপের মানুষের প্রধান জীবিকা। কিন্তু ক্রুসেডের ফলে ইউরোপে শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রগতির পথ সুগম হয়। যেমন –

(১) শিল্প

সেখানকার সামন্তপ্রথা দুর্বল হয়ে পড়লে গ্রামের বহু ভূমিদাস ও সাধারণ মানুষ শহরে চলে এসে শিল্পী ও কারিগর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করে। ফলে ইউরোপে শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। সুতি ও পশমের বস্ত্র, লৌহশিল্প প্রভৃতির বিকাশ ঘটে।

(২) বাণিজ্য

চতুর্থ ক্রুসেডের দ্বারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পশ্চিম ইউরোপের কর্তৃত্ব স্থাপিত হলে পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। প্রাচ্যের দেশগুলি থেকে ইউরোপে মণিমুক্তা, মূল্যবান বস্তু, কার্পেট, আসবাবপত্র ও অন্যান্য বিলাসদ্রব্যের আমদানি শুরু হয়। এর বিনিময়ে পাশ্চাত্যের বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা প্রাচ্যে আসে।

(৩) শহরের বিকাশ

ধর্মযুদ্ধ চলাকালীন যেসব অঞ্চল থেকে ধর্মযোদ্ধাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা হত, সেসব স্থানে জীবন-জীবিকার সুবিধার্থে বিভিন্ন পেশার মানুষ এসে বসবাস করতে শুরু করে। এভাবে বিভিন্ন পেশা, শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে নতুন নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা হয়। একইভাবে পুরোনো শহরগুলি ক্রুসেডের ফলে আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

(গ) সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ফলে সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন ঘটে। যেমন –

(১) বণিক ও মহাজন শ্রেণির উত্থান

ইউরোপের সামন্তপ্রভুরা ক্রুসেডে অভিযানের পূর্বে বণিক বা মহাজনদের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিলেন, অনেকেই তা পরিশোধ করতে না পারায় বণিক ও মহাজনরা সামন্তপ্রভুদের জমিগুলি দখল করে নেয়। ফলে বণিক ও মহাজনরা আর্থিক দিক থেকে খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সামন্তপ্রভুদের স্থলে তারাই ইউরোপীয় সমাজের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

(২) শ্রমিক শ্রেণির উত্থান

তা ছাড়া ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করে বহু ভূমিদাস দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করে। এরপর তারা শহরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাধীন শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করলে স্বাধীন শ্রমিক শ্রেণির উত্থান ঘটে।

(৩) নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি

ম্যানর প্রভু, জমিদার, অভিজাতরা ক্রুসেডে অংশ নেওয়ায় তাদের পত্নীরা ম্যানর বা জমিদারিগুলি পরিচালনার সুযোগ পায়। ফলে নারীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

(ঘ) পোপের মর্যাদা বৃদ্ধি

১০৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিভিন্ন ক্রুসেডের উদ্যোগ মূলত বিভিন্ন পোপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের নাইট ও সামন্তপ্রভুরা বারবার ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলে খ্রিস্টান ধর্ম ও সমাজে পোপতন্ত্র ও চার্চের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। এর দ্বারা তিনি খ্রিস্টান ধর্মীয় জগতের অবিসংবাদী নেতায় পরিণত হন। মুসলিমদের হাত থেকে খ্রিস্টান ধর্মকে রক্ষার বিষয়ে পোপের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে খ্রিস্টান সমাজে পোপের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

(ঙ) জ্ঞানের বিকাশ

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ফলে ইউরোপে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে-

(১) ইউরোপে ইসলামীয় জ্ঞানের স্থানান্তর

ক্রুসেডের পূর্বে খ্রিস্টান ইউরোপের তুলনায় ইসলামীয় সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় অনেক এগিয়েছিল। পরবর্তীকালে ইউরোপের বহু খ্রিস্টান ক্রুসেডে অংশ নিয়ে প্যালেস্টাইনে পৌঁছে ইসলামীয় সভ্যতার সংস্পর্শে আসে এবং ইসলামীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাদের মাধ্যমে ইসলামীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ইউরোপে পৌঁছোয়।

(২) কারিগরি কৌশলের স্থানান্তর

এশিয়ার কাগজ, কম্পাস, আতস কাচ, বারুদ প্রভৃতি তৈরি-সহ অন্যান্য বেশকিছু কারিগরি কৌশল এভাবে ইউরোপে পৌঁছোয়।

(৩) ইউরোপে বিদ্যাচর্চার অগ্রগতি

দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে ইবনে সিনা, ইবনে রুশদি, আল-খোয়ারিজমি প্রমুখ ইসলামীয় পণ্ডিতের রচনা পশ্চিম ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ানো শুরু হয়। ইসলামীয় পণ্ডিতরা প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টলের রচনার যে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেন তার মাধ্যমেই ইউরোপ গ্রিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়।

(৪) ইউরোপীয় সাহিত্যে ইসলামীয় প্রভাব

‘আরব্য রজনী’, ‘পঞ্চতন্ত্র’ সহ প্রাচ্যের সাহিত্যগুলি ইসলামীয় সভ্যতার মাধ্যমেই ইউরোপে পৌঁছোয় এবং পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সাহিত্যকে প্রভাবিত করে।

(৫) ভৌগোলিক জ্ঞানের বিকাশ

ক্রুসেডের ফলে ইউরোপীয়দের ভৌগোলিক জ্ঞানের প্রসার ঘটে এবং বিদেশি সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে তাদের মানসিক সংকীর্ণতা দূর হয়।

(৬) আধুনিকতার সূচনা

পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের নবজাগরণে ক্রুসেডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলেও অনেকে মনে করেন। ইতিহাসবিদ টয়েনবির মতে, “ক্রুসেডের ফলেই আধুনিক ইউরোপের জন্ম হয়েছে।”

(চ) ইউরোপের তুলনায় মুসলিম দুনিয়ার পিছিয়ে পড়া

  • (১) ক্রুসেডে অংশ নিয়ে ইউরোপীয় খ্রিস্টান বাহিনী তুর্কি মুসলিমদের যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তা ছাড়া মুসলিমদের উন্নত কৃষিপদ্ধতি ও শিল্পজীবনের সঙ্গেও ইউরোপীয়রা পরিচিত হয় যা ইউরোপের কৃষি ও শিল্প-প্রযুক্তির উন্নতি ঘটায়। তবে ইসলামীয় জগৎ জ্ঞান- বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উৎকর্ষ দেখালেও তারা যে আর্থসামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক কৌশল নেতৃত্বদানে ইউরোপের চেয়ে পিছিয়ে ছিল তা ক্রুসেডের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।
  • (২) তা ছাড়া, দীর্ঘকালীন ক্রুসেডে অংশ নিয়ে ইউরোপ নিঃস্ব হয়ে পড়লে তারা যুদ্ধনীতি ত্যাগ করে নতুন সমাজ গঠনের কাজে হাত দেয়। এরই ফল হল আধুনিক ইউরোপের আত্মপ্রকাশ। কিন্তু মুসলিম দুনিয়া এরূপ সমাজ গঠনের কাজে হাত না দেওয়ায় পরবর্তীকালে তারা ক্রমে পিছিয়ে পড়তে থাকে।

(ছ) ধ্বংস ও মৃত্যু

১০৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত – এই দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত বিভিন্ন ক্রুসেডের ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। যোদ্ধা ছাড়াও বহু সাধারণ মানুষ মারা যায়। নানাভাবে দুর্দশার শিকার হয় হাজার হাজার মানুষ। বিভিন্ন ক্রুসেডের মাধ্যমে খ্রিস্টান যোদ্ধারা মাঝেমধ্যে জেরুজালেম দখল করতে সক্ষম হলেও ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম চূড়ান্তভাবে মুসলমানদের দখলে আসে।

উপসংহার :- ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৬৭৫ বছর ধরে জেরুজালেম মুসলিম শাসনাধীনে থাকে। অবশেষে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ জেনারেল এলেনবাই সদলবলে জেরুজালেমে প্রবেশ করে ঘোষণা করেন যে এতদিনে ক্রুসেডের অবসান হল।

(FAQ) ক্রুসেডের ফলাফল ও তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ক্রুসেডের ফলে কাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়?

নারীদের।

২. ক্রুসেডের ফলে ধর্মীয় জগতের অবিসংবাদী নেতায় পরিণত হন কে?

পোপ।

৩. ক্রুসেডের অবসান ঘোষণা করেন কে?

ইংরেজ জেনারেল এলেনবাই।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment