সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রসঙ্গে সাম্রাজ্যের বিশালতা, সুলতানদের দাক্ষিণাত্য নীতি, মহম্মদ বিন তুঘলকের দায়িত্ব, ফিরোজ শাহ তুঘলকের দায়িত্ব, ফিরোজের জাগীর প্রথা প্রবর্তন ও তার কুফল, ফিরোজের উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতা, অভিজাতশ্রেণীর ক্ষমতা লোভ ও বিদ্রোহ, উত্তরাধিকার প্রথা ও তৈমুর লঙের ভারত আক্রমণ সম্পর্কে জানবো।

সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

ঐতিহাসিক ঘটনাদিল্লী সুলতানির পতনের কারণ
সাম্রাজ্যসুলতানি সাম্রাজ্য
সময়কাল১২০৬-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রতিষ্ঠাতাকুতুবউদ্দিন আইবক
শেষ সুলতানইব্রাহিম লোদী
সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

ভূমিকা :- তুঘলক বংশের গৌরবজনক যুগের সূচনা সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের আমলে হয়। সুলতান মহম্মদের আমলে তা চূড়ান্ত সীমায় ওঠে। মহম্মদের আমলে সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। কিন্তু মহম্মদের সময় থেকেই সুলতানি সাম্রাজ্যের অপরাহ্ন আরম্ভ হয়। ফিরোজ তুঘলকের পর ক্রমে তুঘলক সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায়।

সাম্রাজ্যের বিশালতা

  • (১) সুলতানি সাম্রাজ্যের বিশালতা ছিল এর পতনের একটি বড় কারণ। চতুর্দশ শতকে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত। দিল্লী থেকে বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করা ছিল খুবই কঠিন।
  • (২) কেন্দ্রে সুলতানী শাসন দুর্বল বা শিথিল হলে প্রাদেশিক শাসনকর্তারা দূরত্ব ও যোগাযোগের অসুবিধার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনভাবে আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করত। তাছাড়া সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি থাকায় কোনো ঐক্য ছিল না। এই ভগ্নপ্রবণ সাম্রাজ্যকে ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হয় নি।

দাক্ষিণাত্য নীতি

  • (১) আলাউদ্দিন খলজি এই বিস্তৃত সাম্রাজ্যকে দিল্লী থেকে শাসন করা যাবে না বুঝেছিলেন। এজন্য তিনি দক্ষিণের রাজ্যগুলিকে সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেন নি। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন তুঘলক দক্ষিণের রাজ্যগুলিকে প্রত্যক্ষ শাসনে আনার চেষ্টা করে ভুল করেন।
  • (২) সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকও তাঁর পিতার পথ ধরে দক্ষিণে প্রত্যক্ষ শাসন স্থাপনের জন্য দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। দক্ষিণে এই শাসনতান্ত্রিক পরীক্ষা সফল হয় নি। মহম্মদের রাজত্বকালেই দক্ষিণে বিজয়নগর ও বাহমণী রাজ্যের উদ্ভব হয়।
  • (৩) দক্ষিণের বিদ্রোহ দমন ও প্রত্যক্ষ শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য তুঘলক সুলতানির প্রভূত শক্তি ক্ষয় হয়। এর ফলে উত্তরে তাদের শক্তি কমে যায়। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণের রাজ্যগুলি বিচ্ছিন্ন হয় এবং পরে উত্তরে তুঘলক শাসনের পতন ঘটে।

মহম্মদ বিন তুঘলকের দায়িত্ব

তুঘলক সুলতানির পতনের জন্য সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের দায়িত্ব বিশেষভাবে ছিল। যেমন –

  • (১) মহম্মদ তার শাসননীতির দ্বারা অভিজাত ও উলেমাদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করেন। এজন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়।
  • (২) মহম্মদ এমন সব উদ্ভট পরিকল্পনা ও সংস্কার চালু করেন, যার ফলে রাজকোষের অর্থ ক্ষতি হয় এবং সুলতানি শাসনের প্রতি লোকের আস্থা নষ্ট হয়।
  • (৩) তিনি রাজধানী দিল্লী হতে দেবগিরিতে স্থানান্তর করে শাসকশ্রেণীর সমর্থন হারান।
  • (৪) মহম্মদের আমলে বাংলা ও দক্ষিণের রাজ্যগুলি সুলতানি সিংহাসনের হাতছাড়া হয়। মহম্মদ দক্ষিণের বিদ্রোহী রাজ্যগুলিকে দমন করে দিল্লীর অধীনে আনার আশা ত্যাগ করেন।
  • (৫) গুজরাট ও সিন্ধুতে মালিক তাঘি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। মহম্মদ তার মৃত্যুকালে এক বিদ্রোহে পূর্ণ, ভঙ্গুর সাম্রাজ্য তার উত্তরাধিকারীর জন্য রেখে যান।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের দায়িত্ব

  • (১) মহম্মদের পর ফিরোজ শাহ তুঘলক নমনীয় নীতি নিয়ে শাসন পরিচালনা করার ফলে শাসন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দেখা দেয়। যতদিন খান-ই-জাহান মকবুল তার উজীর ছিলেন, তিনি শক্ত হাতে শাসনদণ্ড পরিচালনার দ্বারা ফিরোজের সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন।
  • (২) তার পরে কোনো উপযুক্ত মন্ত্রী না থাকায় এবং ফিরোজের দুর্বল নীতির জন্য সাম্রাজ্যের দ্রুত ভাঙ্গন ঘটে। সরকারি কর্মচারীরা স্ব স্ব প্রধান হয়ে ওঠে। ফিরোজ নগদ বেতনের বদলে জাগীর দান করায় কর্মচারীরা আরও বেশি দুর্নীতিপরায়ণ ও স্বার্থপর হয়।
  • (৩) জাগীরগুলি বংশানুক্রমিক হলে অযোগ্য লোকেরা সরকারী পদ দখল করে। ফিরোজ শাহ কৃষির উন্নতির জন্য চেষ্টা করেন। তিনি কৃষকের ওপর করের হার কমিয়ে দেন। কিন্তু কর্মচারীদের দুর্নীতির দরুন তার এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
  • (৪) ফিরোজ সুলতানি বাহিনীর শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেন। তিনি সেনাদের নগদ বেতন দানের পরিবর্তে জাগীরের রাজস্ব থেকে তাদের প্রাপ্য বেতন নিতে নির্দেশ দেন। এজন্য সেনাদলে প্রচুর বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
  • (৫) সেনাদলে নিয়মিত হাজিরা, আরজ এবং হুলিয়া প্রথা না থাকায় দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। সুলতানি শাসনের মেরুদণ্ড সুলতানি সেনাদল ফিরোজ রক্ষায় ব্যর্থ হন। তিনি বাংলার বিদ্রোহ দমন করতে না পেরে কার্যত বাংলার বিদ্রোহী নেতা সিকন্দার শাহের স্বাধীনতা স্বীকার করেন।
  • (৬) তিনি শাসনকার্যে উলেমাদের হস্তক্ষেপের অধিকার দিলে সুলতানি শাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। মোট কথা, ফিরোজের শাসনকালে সুলতানি সিংহাসনের ক্ষমতা ও মর্যাদা দারুণভাবে কমে যায়। এইভাবে তুঘলকশাহীর পতনের পথ প্রস্তুত হয়।

ফিরোজের জাগীর প্রথা প্রবর্তন ও তার কুফল

  • (১) ফিরোজ জাগীর প্রথা প্রবর্তন করে তুঘলক শাসনের পতন ডেকে আনেন। আলাউদ্দিন ও মহম্মদ ইক্তা বা জাগীর প্রথা লোপ করে কর্মচারীদের নগদ বেতন দেওয়ার নিয়ম করেন। নগদ বেতন দানের জন্য তারা রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন।
  • (২) ফিরোজ শাহ ধর্মীয় গোড়ামি বশত ও জনপ্রিয়তা লাভের জন্য এই সকল বাড়তি কর লোপ করে শরিয়ত সম্মত ৪টি কর চালু করেন। এর ফলে সরকারের রাজস্বের পরিমাণ কমলে, তিনি বেতনের পরিবর্তে জাগীর দানের নিয়ম করেন।
  • (৩) এ দিকে জাগীরগুলি বংশানুক্রমিক হয়ে যায়। তার ফলে জাগীরধারী কর্মচারীরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ভুলে নিজ নিজ জাগীরে স্বাধীনভাবে শাসন করতে থাকে। অধিকন্তু তারা জাগীরগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে বাড়তি রাজস্ব আদায় করে ফুলে ফেঁপে ওঠে। সুলতানের পক্ষে কর্তব্যে অবহেলাপরায়ণ কর্মচারীদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয় নি।

ফিরোজের উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতা

  • (১) ফিরোজের উত্তরাধিকারীরা ছিলেন অত্যন্ত অযোগ্য শাসক। তারা সিংহাসন নিয়ে গৃহযুদ্ধে শক্তি ক্ষয় করেন। সিংহাসনে বসার পর আমোদ-প্রমোদে সময় নষ্ট করেন।
  • (২) আমীর ও মালিকদের নিয়ন্ত্রণে এনে তাদের ক্ষমতা কমাবার কোনো চেষ্টা তারা করেন নি। তাদের দুর্বলতার সুযোগে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশ একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অভিজাতশ্রেণীর ক্ষমতা লোভ ও বিদ্রোহ

  • (১) দিল্লী সুলতানির পতনের জন্য সুলতানি অভিজাতদের অযোগ্যতা অনেক পরিমাণে দায়ী ছিল। সুলতানি যুগের অভিজাতরা ছিল ক্ষমতালোভী, ষড়যন্ত্রপরায়ণ।
  • (২) মহম্মদ তুঘলক অভিজাতদের দমন করার চেষ্টা করায় তারা তার বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহের দ্বারা সুলতানি শাসনকে দুর্বল করে ফেলে। ফিরোজ তুঘলক অভিজাতদের তোষণ নীতির দ্বারা সন্তুষ্ট রাখেন। তাদের বিভিন্ন জাগীর দিয়ে, অভিজাতদের দুর্নীতি সহ্য করে তিনি কোনোক্রমে শাসন চালিয়ে যান।
  • (৩) ফিরোজের আমল থেকে অভিজাতরাই সিংহাসনে প্রার্থী নির্বাচনের প্রথাকে বলবৎ করে। এর ফলে অভিজাতশ্রেণীর হাতের লোককে সিংহাসনে বসান হয়। তাছাড়া মালিক কাফুর বা খান-ই-জাহানের মতো যোগ্য অভিজাত প্রশাসক তুঘলক শাসনের শেষের দিকে দেখা যায়নি।

উত্তরাধিকার তত্ত্ব

  • (১) দিল্লী সুলতানির পতনের জন্য সিংহাসনের উত্তরাধিকারী স্থির করার প্রথা ছিল ভীষণভাবে দায়ী। বংশানুক্রমিকভাবে সিংহাসনে বসার দাবী জোরালো না হওয়ার ফলে, মৃত সুলতানের পুত্রগণ তথা নিকট আত্মীয়রা সিংহাসন লাভের জন্য গৃহযুদ্ধে রত হতেন।
  • (২) অভিজাত শ্রেণী তাদের পছন্দ মতো লোককে সিংহাসনে বসাবার জন্য চাপ দিত। এর ফলে অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তি অভিজাতদের সহায়তা নিয়ে সিংহাসনে বসত।
  • (৩) তাছাড়া অভিজাতদের মধ্যে ছিল তুর্কী, তাজিক, হিন্দুস্থানী প্রভৃতি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী এবং দাস কর্মচারীগণ। তারা নিজ নিজ গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য সিংহাসনের উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে হস্তক্ষেপ করত।

তৈমুর লঙের আক্রমণ

তুঘলক বংশের শাসনের শেষ দিকে ভারতে তৈমুরলঙ্গের আক্রমণ ঘটে। তৈমুরের আক্রমণের প্রাক্কালে তুঘলক সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙে যায়। দিল্লী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল নিয়ে এই সাম্রাজ্যের ভগ্নাবশেষ বিদ্যমান ছিল। তৈমুরের আক্রমণে সেই অংশটুকুও বিধ্বস্ত হয়। দিল্লী নগরী লুঠ করে তৈমুর ফিরে যান। এরপর তুঘলকশাহীর পতন ঘটে।

উপসংহার :- তুঘলক বংশের পতনের পর দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সৈয়দ ও লোদী বংশ দিল্লি সুলতানিকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

(FAQ) সুলতানি সাম্রাজ্যের পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন সুলতান বংশানুক্রমিক জাগীর প্রথা চালু করেন?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

২. দিল্লির কোন সুলতান খামখেয়ালী ছিলেন?

মহম্মদ বিন তুঘলক।

৩. দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন কে?

কুতুবউদ্দিন আইবক।

৪. দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান কে ছিলেন?

ইব্রাহিম লোদী।

Leave a Comment