ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরে অনুষ্ঠিত ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি নীতি গুলি প্রসঙ্গে ন্যায্য অধিকার নীতির দিক হিসেবে সমর্থক, উদ্দেশ্য, রাজবংশের পুনরাধিকার, ভৌগোলিক সংজ্ঞা, সমভাবে প্রযোজ্য নয়, নেতৃবর্গের নিজস্ব স্বার্থ, ক্ষতিপূরণ নীতি হিসেবে অস্ট্রিয়ার প্রাপ্তি, প্রাশিয়ার প্রাপ্তি, রাশিয়ার প্রাপ্তি, ইংল্যান্ডের প্রাপ্তি, শক্তিসাম্য নীতি হিসেবে নীতির মূল কথা, ফ্রান্সের উপর প্রয়োগ ও রাষ্ট্রবেষ্টনী সম্পর্কে জানবো।

ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি

সময়কালনভেম্বর ১৮১৪ – নভেম্বর ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ
স্থানভিয়েনা
সভাপতিপ্রিন্স মেটারনিখ
উদ্দেশ্যনেপোলিয়ন পরবর্তী ইউরোপের পুনর্গঠন
মূল নীতিন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য
ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি

ভূমিকা:- ইউরোপের পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবর্গ প্রধানত তিনটি নীতি গ্রহণ করেন। এই নীতিগুলি হল –

  • (১) ন্যায্য অধিকার নীতি,
  • (২) ক্ষতিপূরণ নীতি এবং
  • (৩) শক্তিসাম নীতি।

(১) ন্যায্য অধিকার নীতি

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলনের অন্যতম প্রধান নীতি ছিল ন্যায্য অধিকার নীতি। এই নীতির বিভিন্ন দিকগুলি হল –

(ক) সমর্থক

ন্যায্য অধিকার নীতির পক্ষে সর্বাপেক্ষা জোরালোসমর্থক ছিলেন ফরাসি প্রতিনিধি ট্যালিরান্ড এবং অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ।

(খ) উদ্দেশ্য

এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপে যথাসম্ভব প্রাক্-বিপ্লব যুগের পুনঃপ্রবর্তন। এই নীতি অনুসারে ফরাসি বিপ্লবের আগে যে রাজা বা রাজবংশ যেখানে রাজত্ব করতেন সেখানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।

(গ) রাজবংশের পুনরাধিকার

এই নীতির ফলে ফ্রান্সে বুরবোঁ শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের যে রাজ্যসীমা ছিল তাই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। স্পেন, সিসিলি ও নেপলস্ তাঁকে বুরবো বংশের আরেক শাখা কর্তৃত্ব ফিরে পায়।

(ঘ) ভৌগোলিক সংজ্ঞা

হল্যান্ডে অরেঞ্জ বংশ, স্যাভয়, জেনোয়া, সার্ডিনিয়া ও পিডমন্টে স্যাভয় বংশ এবং মধ্য ইতালিতে পোপের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।এইভাবে ইতালি আবার একটি ‘ভৌগোলিক সংজ্ঞায়’ পরিণত হয়। এই নীতি অনুসারেই উত্তর ইতালি ও জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

(ঙ) সমভাবে প্রযোজ্য নয়

এই নীতি কিন্তু সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হয় নি। ভেনিস ও জেনোয়ায় প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নি। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে বিলুপ্ত জার্মান রাজ্যগুলি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নি।সেখানে অস্ট্রিয়ার সভাপতিত্বে ৩৯টি জার্মান রাজ্য নিয়ে একটি ‘বুণ্ড’ বা রাজ্য সমবায় গঠিত হয়।

(চ) নেতৃবর্গের নিজস্ব স্বার্থ

বেলজিয়ামকে জোর করে হল্যাণ্ডের সঙ্গে এবং নরওয়েকে ডেনমার্কের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সুইডেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। সুতরাং ন্যায্য অধিকার নয়— নেতৃবর্গ নিজ স্বার্থ দ্বারাই পরিচালিত হয়েছিলেন।

(২) ক্ষতিপূরণ নীতি

নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপের বহু রাষ্ট্র, বিশেষত ইংল্যান্ড, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, সুইডেন প্রভূত ক্ষতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ক্ষতিপূরণ নীতি অনুসারে তারা বেশ কিছু অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।যেমন –

(ক) অস্ট্রিয়ার প্রাপ্তি

আস্ট্রিয়া উত্তর ইতালিতে লম্বার্ডি ও ভেনেশিয়া, পোল্যান্ডের অংশবিশেষ, টাইরল ও ইলিরিয়ান প্রদেশগুলি লাভ করে। মধ্য ইতালির পার্মা, মডেনা ও টাস্কেনিতে অস্ট্রিয়ার হ্যাপস্বার্গ বংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া, নবগঠিত জার্মান কনফেডারেশনের নেতৃত্বও অস্ট্রিয়ার হাতে আসে।

(খ) প্রাশিয়ার প্রাপ্তি

প্রাশিয়া পায় স্যাক্সনির উত্তরাংশ পোজেন, থর্ন, ডানজিক, রাইন অঞ্চল ও পশ্চিম পোমেরেনিয়া।

(গ) রাশিয়ার প্রাপ্তি

ফিনল্যান্ড, তুরস্কের বেসারাবিয়া এবং পোল্যান্ডের বৃহদংশলাভ করে রাশিয়া। এই সময় থেকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে রুশ প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

(ঘ) ইংল্যান্ডের প্রাপ্তি

ইংল্যান্ড ইউরোপীয় মহাদেশের বাইরে কিছু সামরিক ও বাণিজ্য-কেন্দ্র লাভ করে। সেগুলি হল – ভূমধ্যসাগরের মাল্টা দ্বীপ, আইওনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, হেলিগোল্যান্ড, কেপ কলোনি, ত্রিনিদাদ, মরিশাস ও সিংহল।

(৩) শক্তিসাম্য নীতি

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত তিনটি মূল নীতির মধ্যে অন্যতম নীতি ছিল শক্তিসাম্য নীতি। এই নীতির বিভিন্ন দিকগুলি হল –

(ক) নীতির মূল কথা

শক্তিসাম্য নীতির মূল কথা হল আগামীদিনে ফ্রান্স যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠে ইউরোপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে এবং বিজয়ী শক্তিবর্গের মধ্যে কেউ যাতে একে অন্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

(খ) ফ্রান্সের উপর প্রয়োগ

এই নীতি অনুসারে ফ্রান্সের সীমানাকে বিপ্লব-পূর্ব সীমারেখায় ঠেলে দেওয়া হয়, ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে সেখানে পাঁচ বছরের জন্য মিত্রপক্ষের সেনাদল মোতায়েন করা হয়। এই সেনাদলের খরচ ফ্রান্সের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ফ্রান্সকে ৭০ কোটি ফ্রাঙ্ক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়।

(গ) রাষ্ট্রবেষ্টনী

ইউরোপের নিরাপত্তার তাগিদে ফ্রান্সের চারপাশে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। যেমন –

  • (i) ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে,
  • (ii) ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তে রেনিস প্রদেশ বা রাইন জেলাগুলিকে প্রাশিয়ার সঙ্গে,
  • (iii) ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বে কয়েকটি জেলাকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এবং
  • (iv) ফ্রান্সের দক্ষিণে স্যাভয় ও জেনোয়াকে পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত করে ফ্রান্সের চারপাশে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়, যাতে ফ্রান্স কখনোই ইউরোপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে।

উপসংহার:- ভিয়েনা সম্মেলনে তিনটি মূল নীতি গ্রহণ করা হলেও সেগুলি সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হয় নি। প্রকৃতপক্ষে সম্মেলনের প্রধান নেতৃবর্গ নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির দিকটিতেই যথাসম্ভব আলোকপাত করেছিলেন।

(FAQ) ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভিয়েনা সম্মেলন কখন অনুষ্ঠিত হয়?

নভেম্বর ১৮১৪ – নভেম্বর ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ।

২. ভিয়েনা সম্মেলন কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরে।

৩. ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি কে ছিলেন?

প্রিন্স মেটারনিখ।

৪. ভিয়েনা সম্মেলন মূল নীতি গুলি কি ছিল?

ন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য নীতি।

Leave a Reply

Translate »