প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা প্রসঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান, ক্ষয়ক্ষতি, বঞ্চনা, শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে জানবো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ
ইতালির যোগদানইঙ্গ-ফরাসি পক্ষে
প্যারিসের শান্তি সম্মেলন১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ
ফ্যাসিস্ট দলবেনিতো মুসোলিনি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা

ভূমিকা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে এক গভীর হতাশা নেমে আসে। সমগ্র ইতালি এক ঘোরতর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়। ঘোরতর রাজনৈতিক অস্থিরতা, শোচনীয় সামাজিক দুর্দশা, গভীরতর অর্থনৈতিক সংকট, দাগা, লুঠতরাজ ও শ্রমিক ধর্মঘট সমগ্র ইতালিকে সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌঁছে দেয়। এইসব ঘটনা ইতালির প্রচলিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিমূলে প্রবল আঘাত হানে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান

জার্মান ভীতি নয় – অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য থেকে কিছু রাজ্যাংশ পাওয়ার আশায় ইতালি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে। লন্ডনের গোপন চুক্তি দ্বারা ইতালি ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষে যোগদান করে।

ইতালির আশা

ইতালি আশা করেছিল যে, যুদ্ধের শেষে তাকে আড্রিয়াটিক সাগরের তীরে ট্রিয়েস্ট, ট্রেনটিনো, ডালমাশিয়া অঞ্চল, ফিউম বন্দর ও আলবানিয়া দেওয়া হবে। এই স্থানগুলি পেলে আড্রিয়াটিক উপসাগরে ইতালির একাধিপত্য স্থাপিত হতে পারত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি

এই যুদ্ধে ইতালির ৭ লক্ষ সেনা নিহত এবং ১২ লক্ষ সেনা আহত হয়। যুদ্ধে ইতালির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১,২০০ কোটি ডলার।

প্যারিসের শান্তি চুক্তি

যুদ্ধান্তে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ইঙ্গ-ফরাসি চক্রান্তে ইতালি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। উইলসনের আদর্শবাদের উপর ভিত্তি করে শান্তি আলোচনা চলে। তাতে সকল প্রকার গোপন চুক্তি অবৈধ বলে বিবেচিত হয়। এছাড়া শান্তিচুক্তিকালে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি আদর্শের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আকাঙ্খিত স্থান লাভে ব্যর্থ

ইতালি কিছু রাজ্যাংশ পেলেও সে তার বহু আকাঙ্ক্ষিত আড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলে অবস্থিত ফিউম বন্দর ও আলবানিয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এই স্থানগুলি নবগঠিত রাজ্য যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়।

বঞ্চনা

আফ্রিকার উপনিবেশগুলি বণ্টনের ব্যাপারেও ইতালিকে বঞ্চিত করা হয়। এর ফলে ইতালিবাসীর মনে চরম ক্ষোভ ও হতাশার সঞ্চার হয়। তারা ভার্সাই সন্ধি ও মিত্রশক্তিবর্গ সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয় এবং ইতালির প্রচলিত সরকারের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠে।

শোচনীয় আর্থিক অবস্থা

যুদ্ধোত্তর ইতালিতে শোচনীয় অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখা দেয়। যেমন –

(১) মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যাভাব

কৃষি-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। দেশে প্রবল খাদ্যাভাব ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দুষ্প্রাপ্য ও অগ্নিমূল্য হয়ে ওঠে। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ১৯১৯ সালে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার ৪ গুণ বৃদ্ধি পায়।

(২) বেকার সমস্যা

যুদ্ধশেষে সেনাবাহিনী ভেঙে দিলে বেকার সমস্যা জটিলতর রূপ ধারণ করে এবং কর্মচ্যুত সেনাদের অনেকেই দস্যুবৃত্তিতে যোগ দেয়। এই সময় বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই মিলিয়ন।

(৩) বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি

যুদ্ধের পর ইতালির বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধের পর এই ঋণদান বন্ধ হলে ইতালির অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। বৈদেশিক বাণিজ্যে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছিল। এক কথায়, ইতালির অবস্থা তখন অতি শোচনীয় হয়ে পড়ে।

সাম্যবাদী ভাবধারার প্রভাব

এই অবস্থায় রাশিয়ার বলশেভিক ভাবধারা ইতালিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বেকার যুবক ও শ্রমিকরা সমাজতন্ত্রী দলে যোগদান করতে থাকে। ১৯২০-১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ইতালির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়।

কলকারখানা দখল

ইতালির শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের সময় ও দ্রব্যমূল্য হ্রাস প্রভৃতি দাবিতে কলকারখানায় ধর্মঘট করতে থাকে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে শিল্প ধর্মঘটের সংখ্যা ছিল ১,৮৭১। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,০৭০। বহু স্থানে শ্রমিকরা নিজেরাই কলকারখানা দখল করে নেয়।

ধর্মঘট ও লুটতরাজ

কৃষকরা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে, জমিদারদের ভূ-সম্পত্তি দখল করে এবং তাদের হাতে বহু জমিদার প্রাণ হারায়। ডাকঘর, রেল সহ সর্বত্র ধর্মঘট শুরু হয়। অবস্থার সুযোগ নিয়ে সমাজবিরোধীরা দেশের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক লুঠতরাজ শুরু করে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুঠতরাজ, ধর্মঘট প্রভৃতি দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়।

দুর্বল উদারপন্থী সরকার

শিল্পপতি, জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজতন্ত্রীদের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ইতালির দুর্বল উদারপন্থী সরকারের উপর আস্থা হারায়। তারা এমন এক শক্তিশালী সরকার চাইছিল, যে সরকার তাদের স্বার্থরক্ষায় সক্ষম।

রাজনৈতিক অস্থিরতা

যুদ্ধোত্তর ইতালিতে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বলেও কিছু ছিল না। যেমন –

(১) কমিউনিস্ট পার্টি গঠন

এই সময় ইতালিতে তিনটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায় – সমাজবাদী, ক্যাথলিক পপুলার পার্টি এবং উদারপন্থী বা লিবারেল। সমাজবাদীদের একটি শাখা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠন করে।

(২) ছটি মন্ত্রীসভা

এই তিন দল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক চালালেও তাদের পক্ষে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় নি। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইতালিতে অন্তত ছয়টি মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং এর সবগুলিই ছিল কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা।

প্রধানমন্ত্রীর অক্ষমতা

প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সেসকো নিত্তি বা জিওভানি জিওলিত্তি কারো পক্ষেই ইতালির কোনও একটি সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব হয় নি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণ শ্রদ্ধা হারায়।

উপসংহার:- সমগ্র জাতি সম্পূর্ণ নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হয়। জাতীয় জীবনের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি নামে এক নেতার আবির্ভাব হয়। তিনি ও তাঁর ফ্যাসিস্ট দল ইতালিকে নববলে বলীয়ান করে নতুন পথে পরিচালিত করেন।

(FAQ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯১৪-১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ।

২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি কোন পক্ষে যোগদান করে?

লণ্ডনের গোপন চুক্তি দ্বারা ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষে।

৩. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে কোন দলের উত্থান হয়?

ফ্যাসিস্ট দল।

৪. ফ্যাসিস্ট দলের নেতা কে ছিলেন?

বেনিতো মুসোলিনি।

Leave a Reply

Translate »