তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি প্রসঙ্গে তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, নেতৃত্বের শ্রেণি চরিত্র, কৃষক বিদ্রোহের উপাদান, মাঞ্চু শাসনের বিরোধিতা, তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে আধুনিকতা, সাম্যবাদ, তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে সামরিক-অসামরিক সংগঠন, নৈতিক চরিত্র, তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে চিনা প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন ও তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে বিতর্ক সম্পর্কে জানবো।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি

ঐতিহাসিক ঘটনাতাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি
বুর্জোয়া বিপ্লবমানবেন্দ্রনাথ রায়
সাদৃশ্যফরাসি বিপ্লব
শ্রেণিচরিত্রউলফগাঙ ফ্রাঙ্ক
কৃষক বিদ্রোহজাঁ শ্যেনো
প্রজাতন্ত্রের স্বপ্নকার্ল মার্কস
তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি

ভূমিকা :- সমাজবিজ্ঞানী মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর বিখ্যাত Revolution and Counter Revolution in China গ্রন্থে তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “বহু কলঙ্কিত, ভ্রান্ত ভাবে বিশ্লেষিত এবং স্বল্পবোধ্য তাইপিং বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে চীনের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে উত্তরণ ঘটেছিল”। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সাথে তাইপিং বিদ্রোহের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। কারণ, ফরাসি বিপ্লবের মতো তাইপিং বিদ্রোহেরও নেতৃত্ব দিয়েছিল বুর্জোয়াশ্রেণী এবং পরবর্তী স্তরে কৃষকরা এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব

  • (১) আধুনিক ঐতিহাসিকেরা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, তাইপিং বিদ্রোহের সময় চীনে অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের মতো বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে ওঠে নি। চীনের জেন্ট্রির এই বিদ্রোহে কোনো ভূমিকাই ছিল না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা বিদ্রোহীদের ক্ষোভের শিকার হয়েছিলেন।
  • (২) তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই তাইপিং বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিলেন। ঐতিহাসিকেরা যথার্থই বলেছেন যে, তাইপিং বিদ্রোহকে কোনোমতেই বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব হিসাবে আখ্যায়িত করা সমীচীন হবে না এবং ফরাসি বিপ্লবের সাথে এই বিদ্রোহের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে নেতৃত্বের শ্রেণিচরিত্র

জার্মান পণ্ডিত উলফগাঙ ফ্রাঙ্ক বলেছেন, তাইপিং বিদ্রোহের নেতৃত্বের দিকটি ঠিকমতো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই বিদ্রোহের প্রথম সারির সব নেতাই প্রায় উঠে এসেছিলেন দরিদ্র শ্রেণী থেকে। বিদ্রোহের নেতৃত্ব বিদ্রোহের শ্রেণীচরিত্র প্রতিফলিত করেছিল। দরিদ্র কৃষক, খনি-মজুর, জলদস্যু প্রভৃতিরা তাইপিং বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে কৃষক বিদ্রোহের উপাদান

  • (১) জাঁ শোনোও তাইপিংদের নেতৃত্বের প্রশ্নটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, একদল দরিদ্র, হতাশ, জীবনযুদ্ধে পরাজিত ব্যক্তি ঈশ্বর ভক্ত সমিতি গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিলেন। শোনো তাইপিং বিদ্রোহের মধ্যে কৃষক বিদ্রোহের উপাদান খুঁজে পেয়েছেন।
  • (২) তাইপিং বিদ্রোহ দক্ষিণ চিনের আরম্ভ হবার পর বিদ্রোহীরা মধ্যচিন ধরে ইয়াংসি নদীর নিম্ন উপত্যকার দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সেই সময় ‘মহতী শান্তি’ প্রতিষ্ঠাকারী সৈন্যদের অর্থাৎ তাইপিং বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল একের পর এক স্বতঃস্ফূর্ত কৃষক বিদ্রোহ। বিদ্রোহীরা অত্যাচারী জমিদার এবং জনস্বার্থবিরোধী রাজপুরুষদের নিহত করেছিল।
  • (৩) জমির দলিল থেকে আরম্ভ করে ঋণপত্র ও মহাজনের কাছে রক্ষিত যাবতীয় নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটি সমসাময়িক উপাখ্যান থেকে জানা যায় যে, তাইপিং সৈন্যরা যখন কোনো ধনী বা প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির বাড়ি আক্রমণ করত, তখন সেই সমস্ত পরিবারের সদস্যরা তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র তিন ফুট গর্ত করে সেগুলি মাটির নীচে লুকিয়ে রাখতেন।
  • (৪) ধনীদের থেকে লুণ্ঠিত দ্রব্য এলাকার দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হত। দরিদ্র কৃষকেরা একটি বিষয় স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে, তাইপিংদের শাসন চীনে প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটবে। সম্রাটের সৈন্যবাহিনী বিদ্রোহীদের দমন করার উদ্দেশ্যে কোনো অঞ্চলে এসে উপস্থিত হলে, তারা প্রাথমিক বাধা পেত স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে।
  • (৫) যে সমস্ত এলাকা তাইপিং বিপ্লবীরা দখল করে নিয়েছিলেন, সেসব এলাকার নিহত বা পলাতক ভূস্বামীদের জমিগুলি ভাড়াটে চাষিদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল। কিয়াংসুর দক্ষিণে এবং আনহুইতে ভূমিকরের হার প্রচুর পরিমাণে হ্রাস করা হয়েছিল। এই সমস্ত অঞ্চলের ভাড়াটে চাষিদের উৎপাদনের একটা বিরাট অংশ জমির খাজনা দিতে চলে যেত।
  • (৬) এই সমস্যা থেকে তাঁরা নিষ্কৃতি পেলেন। কিয়াংসুর দক্ষিণ অংশে তাইপিং বিপ্লবীরা এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াটে চাষিরা খাজনা দিতে অস্বীকার করেন এবং ভূস্বামীদের আক্রমণ করে তাদের বাড়িঘর অগ্নিদগ্ধ করেন।
  • (৭) মূলত কৃষকদের চাপের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৮৬০-৬১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কিয়াংসুর সর্বত্র, বিশেষত, যে অঞ্চলগুলি তাইপিংদের দখলে ছিল, জমির খাজনার হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা হয়েছিল। সেদিক থেকে তাইপিং বিদ্রোহকে একটি চিহ্নিত করা অযৌক্তিক হবে না কৃষক অভ্যুত্থান হিসাবে।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে মাঞ্চু বিরোধিতা

  • (১) তাইপিং বিদ্রোহের মাঞ্চু-বিরোধী ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল চিনকে মাঞ্চুদের অপশাসন থেকে মুক্ত করা। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাইপিং বিদ্রোহের তিন প্রধান নেতা হুং শিউ চুয়ান, ফেং উন-শান এবং ইয়াং শিউ-চিং যে মাঞ্চু-বিরোধী জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন, সেই জেহাদ ছিল জাতীয়তাবাদী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত।
  • (২) তাঁরা তাঁদের জেহাদে বিদেশি তার্তার বংশোদ্ভূত মাঞ্চু শাসকদের অপদার্থতার কথা তুলে ধরে বিশ্বের দরবারে চীনের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার জন্য মাঞ্চুদের সরাসরি অভিযুক্ত করেছিলেন। নানকিং-এ তাইপিং রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টিরও একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল।
  • (৩) চতুর্দশ শতকে যখন মিং বংশীয় রাজারা মোঙ্গল আধিপত্যের হাত থেকে চীনকে মুক্ত করে চীনের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন, তখন তাঁদেরও রাজধানী ছিল নানকিং। তাইপিং-এর জাতীয়তাবাদী চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই ওয়েই চ্যাং-হুই-এর মতো ধনী জমিদার এবং শি ডা-কাই-এর মতো বিক্ষুব্ধ পণ্ডিত তাইপিং বিদ্রোহে যোগ দেন।
  • (৪) ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাইপিং বিদ্রোহীদের দ্বারা অধিকৃত বিশাল সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ব্যাপারে এই ধরনের দেশপ্রেমিক পণ্ডিতেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিদ্রোহের জন্মস্থল কোয়াংসি প্রদেশের দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে এ ধরনের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব ছিল না।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে আধুনিকতা

  • (১) তাইপিং বিদ্রোহের ক্ষেত্রে আধুনিকতার সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল। একদিকে কৃষক কল্পরাজ্য ও মাঞ্চু-বিরোধী জাতীয়তাবাদ প্রভৃতি প্রথাগত ধ্যানধারণার সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক ধারণার সংমিশ্রণ ঘটেছিল তাইপিং বিদ্রোহের মধ্যে। বিদ্রোহীরা মাঞ্চু শাসনের অবসান ঘটিয়ে সিংহাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান নি। “মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য” প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁরা একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন।
  • (২) হুং শিউ চুয়ান দীর্ঘদিন ক্যান্টনে থাকার সুবাদে পাশ্চাত্যের আধুনিকতা ও খ্রিস্টধর্মের সাথে পরিচিত হন। তাইপিং ধর্মের ক্ষেত্রেও খ্রিস্টধর্মের পরিষ্কার প্রভাব ছিল এবং তাইপিং নেতৃত্বের মধ্যে পশ্চিমিদের উৎকর্ষের কারণ অনুসন্ধানের একটা তাগিদ ছিল। একদিকে সামাজিক মুক্তি এবং অন্যদিকে আধুনিক কৌশল আয়ত্ত করার জন্য তাঁরা উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন।
  • (৩) হুং রেন-গান নামে হুং শিউ চুয়ানের এক দূর-সম্পর্কের ভাই ক্যান্টনে ও হংকং-এ থাকার সুবাদে বিদেশিদের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাইপিং-এর রাজধানী নানকিং-এ প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন।
  • (৪) তিনি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক ডাক-ব্যবস্থা, ব্যাঙ্ক ও রেলব্যবস্থা প্রভৃতি প্রবর্তন করার জন্য ও ধর্মীয় মঠগুলিকে হাসপাতালে রূপান্তরিত করার জন্য কতকগুলি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাইপিং স্বর্গরাজ্যের পতন ঘটেছিল বলে তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়নি।
  • (৫) তাছাড়া, তাইপিংদের পৌত্তলিকতার তীব্র বিরোধিতা এবং নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের ঘোষণার মধ্যেও আধুনিকতার সুস্পষ্ট ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদার আসনে বসিয়ে তাইপিং-রা কনফুসীয় ঐতিহ্যের বিরোধিতা করেছিলেন। নতুন তাইপিং ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে তাঁদের আধুনিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে সাম্যবাদ

  • (১) তাইপিং বিপ্লবীরা প্রাথমিক সাফল্যের পর নানকিং-এ যখন তাঁদের “স্বর্গীয় রাজধানী” প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁরা “The Land System of the Heavenly Kingdom” নামে একটি দলিল প্রকাশ করেন। ঐতিহাসিক ইম্যানুয়েল সু এই দলিলকে “এক ধরনের তাইপিং সংবিধান” নামে অভিহিত করেছেন।
  • (২) জে. সি. চেং প্রণীত Chinese Sources for the Taiping Rebellion গ্রন্থে দলিলটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই দলিল থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাইপিংদের মধ্যে সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ব্যাপারে একটি স্পষ্ট ধারণা ছিল। তাইপিং স্বর্গরাজ্যে জমি ও সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
  • (৩) উক্ত দলিলে বলা হয়েছিল, স্বর্গের নীচে সমস্ত জমি স্বর্গের নীচের যাবতীয় মানুষ একত্রিত হয়ে চাষ করবে। স্বর্গরাজ্যের রাজা হুং শিউ চুয়ান নিজেকে যীশুখ্রিস্টের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বলে ঘোষণা করে পশ্চিমিদের সাথে চীনাদের সমপর্যায়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন।
  • (৪) এই ধর্মীয় সমতার বিষয়টির সাথে প্রায় সমসাময়িক কালে সংঘটিত মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অঞ্চলের “ব্ল্যাক থ্রাইস্ট” আন্দোলনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এই আন্দোলনকারীরা শ্বেতকায়দের সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তাইপিংদের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সে-সময় কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের কাছ থেকে তাঁরা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আদায় করেছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে নৈতিক চরিত্র

  • (১) তাইপিংদের নীতিজ্ঞান ছিল অসামান্য। নৈতিক চরিত্র গঠনের বিষয়টিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলেই তাইপিং স্বর্গরাজ্যে আফিমের নেশা, জুয়া খেলা, গণিকাবৃত্তি, নারীদের সাথে ব্যভিচার প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাছাড়া জনকল্যাণমূলক কর্তব্যের প্রতিও তাইপিংদের প্রবল আগ্রহ ছিল।
  • (২) শরণার্থী ও দরিদ্রদের ত্রাণ দেবার কাজে তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সু-চাও অঞ্চলে ভূস্বামীদের প্রতিহিংসাপরায়ণ আক্রমণের ফলে যে সমস্ত দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাদের তাইপিংদের তরফ থেকে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছিল। দরিদ্রদের মধ্যে ১ লক্ষ তাম্রমুদ্রা বিলি করেছিলেন তাইপিংরা।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে সামরিক-অসামরিক সংগঠন

  • (১) তাইপিং বিদ্রোহীদের সামরিক এবং অসামরিক সংগঠনের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য ছিল না। যাঁরা কৃষিকার্যে অংশ নিতেন তাঁরাই আবার সৈন্যের দায়িত্ব পালন করতেন। তাইপিং কৃষক-সৈন্যদের সঙ্গে মধ্যযুগের ইউরোপের কৃষক বিদ্রোহের সৈন্যদের সাদৃশ্য দেখা যায়।
  • (২) ইস্রায়েল এস্টেইন হুং শিউ চুয়ানের সঙ্গে মধ্যযুগের ইউরোপের সামন্ততন্ত্র বিরোধী সংগ্রামের বিভিন্ন কৃষক নেতার, যথা – ইংল্যান্ডের জন বুল, জার্মানির থমাস মুয়েঞ্জার এবং আধুনিক চেকোস্লোভাকিয়া অঞ্চলের জান হাস প্রমুখের মিল খুঁজে পেয়েছেন।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে চিনা প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন

তাইপিং অভ্যুত্থানের সমসাময়িককালে কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চীনা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব হবে চীনা প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি বিষয়ে বিতর্ক

  • (১) বস্তুত তাইপিং অভ্যুত্থান একটি অসমাপ্ত ও অপূর্ণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব না কৃষক বিদ্রোহ তা নিয়ে বিতর্ক থেকে গেছে। তাইপিং বিপ্লবীরা তাঁদের প্রচারে বা ইস্তাহারে কৃষি বিপ্লবের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসেন নি। কিন্তু বিদ্রোহীরা অধিকাংশই এসেছিলেন কৃষক পরিবার থেকে।
  • (২) রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু যখন তাইপিং বিপ্লবীদের দমন করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন বিপ্লবীরা অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছিলেন কৃষকদের কাছ থেকে। মাঞ্চু রাজতন্ত্রের বিরোধিতা, চীনে প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে আক্রমণ এবং কনফুসীয় পন্থার দ্বারা পরিচালিত সনাতন সমাজ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আঘাত তাইপিং অভ্যুত্থানকে চিনের ইতিহাসে এক অভিনব স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
  • (৩) কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, কৃষকস্বার্থে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচী এবং সর্বোপরি একটি কৃষক কল্পরাজ্য গড়ে তোলার বাসনা অবশ্যই তাইপিং বিদ্রোহকে একটি সামন্ততন্ত্র বিরোধী সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের রূপ দিয়েছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা তাইপিং-এর অভিজ্ঞতাকে আধুনিক চীনের ইতিহাসে প্রথম কৃষিবিপ্লব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

উপসংহার :- এ কথা সত্যি যে, চীনের বিদ্যমান সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলিকে তাইপিংরা ভেঙে ফেলতে পারেননি। তথাপি সাধারণ মানুষের জীবন সহজতর করার জন্য তাঁরা যে আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়েছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

(FAQ) তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তাইপিং বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে চিনা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন কারা?

কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস।

২. তাইপিং বিদ্রোহকে কৃষক বিদ্রোহ বলেছেন কে?

জাঁ শ্যেনো।

৩. তাইপিং বিদ্রোহকে বুর্জোয়া বিপ্লব বলেছেন কে?

সমাজবিজ্ঞানী মানবেন্দ্রনাথ।

Leave a Comment