প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের কারণ, মুদ্রা সংকট দূরীকরণে পদক্ষেপ, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটি ও তার সুপারিশ সম্পর্কে জানবো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ
রয়েল কমিশন১৯১৩ খ্রি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ১৯১৪-১৯১৮ খ্রি
ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটি১৯১৯ খ্রি
নতুন নোট১ ও ২.৫০ টাকা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ

ভূমিকা :- ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের মুদ্রা ও অর্থ বিভাগের উদ্যোগে রয়েল কমিশন গঠিত হয়। কিছুদিন পরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার এই বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষকে জড়িয়ে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতের অর্থনৈতিক সংকটের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নীতিতে কিছু পরিবর্তন ঘটাতে বাধ্য হয়।

ঔপনিবেশিক অর্থনীতি সম্পর্কে সুমিত সরকারের মন্তব্য

অধ্যাপক সুমিত সরকারের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ

ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং কিছু কিছু স্থানে দুর্ভিক্ষের সময়ও উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় করে। এরূপ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের দারিদ্র্য ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের কারণ

বিভিন্ন কারণে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। যেমন –

(১) যুদ্ধজনিত ব্যয়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অন্তত ১২৭ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ ব্যয় হয়। সামরিক খাতে ভারতের ব্যয় বৃদ্ধি পায় অন্তত ৩০০ শতাংশ।

(২) মুদ্রাসংকট

যুদ্ধের খরচ মেটাতে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে অর্থ বা সোনা পাঠানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইংল্যান্ডে স্বর্ণ রপ্তানির ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকায় যে পরিমাণ সোনা ভারতের প্রাপ্য ছিল তা ভারতে ব্রিটেন পাঠায় নি। সেকারণে স্বর্ণমুদ্রার সংকট দেখা দেয়। এদিকে টাকা তৈরির জন্য রূপোর চাহিদা বাড়লেও ভারতে রূপোর জোগান হ্রাস পায়। এভাবে যুদ্ধের কারণে ভারতে মুদ্রাব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয়।

(৩) রূপোর মূল্যবৃদ্ধি

রুপোর চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর দামও বাড়তে থাকে। লন্ডনের বাজারে প্রামাণিক ১ আউন্স রুপোর দাম ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে যেখানে ছিল ২৫-২৭ পেন্স, সেখানে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এই দাম ৫৮ পেন্স ছাড়িয়ে যায়। টাকা তৈরির জন্য ভারত সরকারকে ১৯১৬ থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উচ্চমূল্যে প্রচুর পরিমাণ রূপো ক্রয় করতে হয়।

(৪) রূপোর মুদ্রা তৈরিতে লোকসান

রুপোর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে রুপোর টাকার বাহ্যিক মূল্য (Face value) রূপোর টাকার ধাতুর মূল্যের চেয়ে কমে যায়। অর্থাৎ রুপোর টাকার বাহ্যিক মূল্যের চেয়ে সেই টাকা গলিয়ে রুপো বিক্রি করলে বেশি দাম পাওয়া যেতে থাকে। ফলে রুপোর টাকা তৈরি করলে সরকারের লোকসান হয়। সরকার ভারতীয়দের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে এই অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ নেয়। শিল্প ও বাণিজ্যের ওপর করের বোঝা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। আয়করের ওপর সর্বাধিক বোঝা চাপানো হয়। ১৯১৯-২০ খ্রিস্টাব্দে সরকারি আয়ের ১১.৭৫ শতাংশই সংগ্রহ করা হয়েছিল আয়কর থেকে।

মুদ্রাসংকট দূরীকরণে পদক্ষেপ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিণামে ভারতে রূপোর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সেই কারণে সৃষ্ট মুদ্রাসংকট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ভারতের ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এগুলি হল –

  • (১) ভারত থেকে রূপোর মুদ্রা ও রূপোর রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়।
  • (২) রুপোর মুদ্রা গলিয়ে বিক্রি করা বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়।
  • (৩) ১ ও ২.৫০ টাকার কাগজের নোট চালু করা হয়। কাগজের নোটের প্রচলন বাড়ানো হয়।
  • (৪) টাকা তৈরির ক্ষেত্রে রুপোর ব্যবহার হ্রাস করে নিকেলের খুচরো পয়সা চালু করা হয়।
  • (৫) আমেরিকা ও কানাডা থেকে সোনা কিনে এনে বোম্বাইতে স্বর্ণমুদ্রা তৈরি করে মূদ্রার চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়।
  • (৬) রিজার্ভ বিহীন নোট চালুর উর্ধ্বসীমা ১৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ কোটি টাকা করা হয়।

মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে মুদ্রাব্যবস্থায় যে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তা দুর করার জন্য পরামর্শ গ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়। স্যার ব্যাবিংটন স্মিথের সভাপতিত্বে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ব্যাবিটেন স্মিথ কমিটি নামে এই কমিটি গঠিত হয়।

(১) ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটির সুপারিশ

যুদ্ধ-পরবর্তী ভারতের মুদ্রাসংকট দূর করার উদ্দেশ্যে এই কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করে। ব্যারিংটন স্মিথ কমিটি সুপারিশ করে যে –

  • (ক) ১ টাকাকে স্টার্লিং-এর সঙ্গে যুক্ত না করে সরাসরি সোনার দামের সাথে যুক্ত করা হোক।
  • (খ) টাকাকে ২ সিলিং মূল্যের সোনার সমান মূল্য ধরে নেওয়া হোক।
  • (গ) ব্রিটিশ স্বর্ণমুদ্রাকে ১০ টাকার সমান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হোক।
  • (ঘ) সোনা আমদানি ও রপ্তানির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হোক।
  • (ঙ) স্বর্ণমুদ্রা তৈরির জন্য বোম্বাইতে টাঁকশাল তৈরি করা হোক।

(২) ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটির সুপারিশের কার্যকারিতা

সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করে ব্যাবিংটন কমিটির সুপারিশগুলি কার্যকরী করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিলে সারা পৃথিবীতেই দ্রব্যমূল্য কমে যায়। এই মন্দার ফলে ভারতেও রপ্তানিমূল্য হ্রাস পায়। ভারতীয় পণ্যের রপ্তানিমূল্য যেখানে ১৯১৯-২০ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৩৩০ কোটি টাকা, সেখানে ১৯২০-২১ খ্রিস্টাব্দে এই মূল্য কমে দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি টাকা।

উপসংহার :- ব্যাবিটেন স্মিথ কমিটির সুপারিশ কার্যকরী করার ফলে ভারতের অর্থনৈতিক বাজার চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রার সরবরাহ সংকোচন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়।

(FAQ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতের মুদ্রা ও অর্থ বিভাগের উদ্যোগে রয়েল কমিশন গঠিত হয় কখন?

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে।

২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯১৫-১৯১৮ খ্রি।

৩. ব্রিটিশ সরকার মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে কখন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর।

৪. কখন কার সভাপতিত্বে ব্যাবিংটন স্মিথ কমিটি গঠিত হয়?

স্যার ব্যাবিংটন স্মিথ।

Leave a Comment