প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ প্রসঙ্গে বস্ত্র শিল্প, লোহা ও ইস্পাত শিল্প, পাট শিল্প, কয়লা শিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র পরিবহণ, বাগিচা শিল্প, সিমেন্ট শিল্প ও অন্যান্য শিল্প সম্পর্কে জানবো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ
টিসকো১৯০৭ খ্রি
ইসকো১৯১৮ খ্রি
প্রথম পাটকল১৮৫৫ খ্রি
প্রথম কয়লাখনিরানিগঞ্জ
বাঙালি শিল্পপতিস্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ

ভূমিকা :- ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে এবং ব্রিটিশ-উদ্যোগে ভারতে আধুনিক শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। পাশাপাশি ভারতীয় পুঁজিও শিল্পের বিকাশে অংশ নিতে শুরু করে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পর ভারতে শিল্পের আরও প্রসার ঘটে।

বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ ঘটে। এইসব শিল্পগুলি সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল–

(ক) বস্ত্রশিল্প

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের সুতিবস্ত্র বিকাশের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) ভারতীয় শিল্পপতিদের আধিপত্য

সুতিবস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে ইউরোপীয় ও ভারতীয় পুঁজিপতিদের আধিপত্য একইরকম থাকলেও বিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই শিল্পে ভারতীয় শিল্পপতিরা একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

(২) বস্ত্র রপ্তানি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই ভারত বিশ্বের অন্যতম বস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিল। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারত বস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছিল। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বস্ত্রশিল্পে অন্তত ৪৬ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল।

(৩) বস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ

বস্ত্রশিল্পে মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণ ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অন্তত ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন নতুন বস্ত্রকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বোম্বাইয়ে ৮৫টি কাপড়ের কল স্থাপিত হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে মোট ৩৩৫টি সুতোকলের মধ্যে ৩২২টি ছিল ভারতীয় মালিকানাধীন। বাকি মাত্র ৯টি কল ছিল ইউরোপীয় মালিকানাধীন।

(খ) লোহা ও ইস্পাত শিল্প

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইংল্যান্ডে উৎপাদিত লোহা ও ইস্পাত ভারতে সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সরকার ভারতে লৌহ ইস্পাত শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্যোগী হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল–

(১) টিসকো

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জামশেদজি টাটা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামশেদপুরের টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (TISCO)-তে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিশুদ্ধ ইস্পাত উৎপাদন শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকার এই কোম্পানির সমস্ত উৎপাদন কিনে নেয়। ফলে এই কোম্পানিতে ইস্পাতের উৎপাদন যেখানে ১৯১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে ৩১ হাজার টন ছিল সেখানে ১৯১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার টন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে এই কারখানার সম্প্রসারণ ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে এই সংস্থার উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৮ লক্ষ টন।

(২) ইসকো

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠা প্রথম গুরুত্বপূর্ণ লৌহ-ইস্পাত কারখানা হল আসানসোলের হীরাপুরের কাছে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি (IISCO)। এখানে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে উৎপাদন শুরু হয়ে যায়।

(৩) অন্যান্য কারখানা

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ভদ্রাবতীতে ‘মহীশূর আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দ্য স্টিল কর্পোরেশন অব বেঙ্গল’ (SCOB)। টাটার সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে বিড়লা, ঠাকুরদাস প্রমুখ শিল্পপতি লৌহ ইস্পাত শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করেন।

(গ) পাট শিল্প

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে পাট শিল্পের বিকাশের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) পুঁজি বিনিয়োগ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রধানত বিদেশি মূলধনের সহায়তায় ভারতে পাট শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই শিল্পে কিছু কিছু ভারতীয় পুঁজিরও বিনিয়োগ শুরু হয়। ভারতীয় শিল্পপতিদের মধ্যে বিড়লা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এবং হুকুম চাঁদ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে পাটকল প্রতিষ্ঠা করেন।

(২) পাটচাষের জমি

বাংলায় যেখানে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ৮ লক্ষ ৫০ হাজার একর জমিতে পাট চাষ হত, সেখানে ১৯১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে পাটচাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩১ লক্ষ ৫০ হাজার ৪০০ একর।

(৩) গঙ্গার তীরে কেন্দ্রিকতা

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুগলির রিষড়ায় ভারতের প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়। পরবর্তী ৬০ বছরে গঙ্গা নদীর উভয় তীরে ও অন্যত্র অসংখ্য পাটকল গড়ে ওঠে। কলকাতা থেকে চুঁচুড়া পর্যন্ত গঙ্গার দুই তীর বাংলার ডাল্ডি নামে পরিচিত হয়েছিল।

(৪) পাটকলের সংখ্যা

বিংশ শতকের শুরুতে ভারতে পাটকলের সংখ্যা ছিল ৩৬টি। ১৯১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতে পাটকলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪টি এবং এগুলিতে প্রায় ২ লক্ষ ১৬ হাজার কর্মী কাজ করত। ১৯৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩টি।

(৫) পাটজাত পণ্যের চাহিদা

১৯১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে ভারত থেকে ২কোটি ৫ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের পাট বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতের পাটজাত দ্রব্য অস্ট্রেলিয়ার সমগ্র বাজার এবং আমেরিকার বাজারের একটি বড়ো অংশ দখল করতে সক্ষম হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের প্রয়োজনে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা বহুগুণে বেড়ে যায়। ফলে ভারতের পাটকলগুলিতে দিবারাত্র কাজ চলতে থাকে।

(ঘ) কয়লা

ভারতে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে রানিগঞ্জে সর্বপ্রথম কয়লাখনি আবিষ্কৃত হয়। ভারতে রেলপথ স্থাপন এবং লোহা ও ইস্পাত শিল্পের বিকাশের ফলে কয়লা শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন কয়লাখনিতে উৎপাদন শুরু হয়। এইসব কয়লাখনিগুলি নিয়ে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান মাইনিং ফেডারেশন গড়ে ওঠে। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে মোট উৎপাদিত কয়লার প্রায় ৫৪.০৫ শতাংশ পূর্ব ভারতের কয়লা খনিগুলি থেকেই উত্তোলিত হত। কয়লা শিল্পে প্রধানত বিদেশি পুঁজিরই প্রাধান্য ছিল।

(ঙ) জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র পরিবহণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র পরিবহণের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলির একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। এই ক্ষেত্র দুটিতে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ক্ষেত্র দুটিতে ভারতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। লোহা ও ইস্পাত এবং অন্যান্য ভারী শিল্পের প্রসার ঘটলে তার ওপর ভিত্তি করে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভারতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অগ্রগতি ঘটে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় মালিকানায় ‘সিন্ধিয়া নেভিগেশন কোম্পানি’ গড়ে ওঠে। বিশিষ্ট গুজরাটি শিল্পপতি ওয়ালচাঁদ হীরাচাঁদ জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র পরিবহণে প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করেন।

(চ) বাগিচা শিল্প

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে চা, কফি, আখ প্রভৃতি বাগিচা শিল্পেরও যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে। –

(১) চা শিল্প

চা শিল্পে যথেষ্ট মূলধন বিনিয়োগের ফলে এই শিল্পের অগ্রগতি ঘটে। আসাম, বাংলা, কাছাড়, তরাই অঞ্চল, ডুয়ার্স, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাবের কাংড়া, দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি ও অন্যান্য অঞ্চলে চা শিল্পের বিকাশ ঘটে। ভারতের চা বাগিচার মোট আয়তন ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৫ লক্ষ ২০ হাজার একর। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে এই আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৭ লক্ষ ৭ হাজার ৭৩৩ একর।

(২) কফি শিল্প

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে যথেষ্ট কফি উৎপাদিত হত। ১৯১০-১২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রায় ২ লক্ষ ৩ হাজার একর জমিতে কফি চাষ হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। সরকার ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সাময়িকভাবে কফি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে আরও উৎকৃষ্ট কফি উৎপাদনে চাষিদের উদ্যোগী করে তোলে।

(৩) চিনি শিল্প

আখ উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে ভারতে বিশ শতকের সূচনায় চিনি শিল্প গড়ে ওঠে। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সর্বপ্রথম চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে ৩০টি চিনিকলে ১ লক্ষ ৫৮ হাজার টন চিনি উৎপন্ন হত। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে চিনি শিল্প সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ায় তা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে চিনিকলের সংখ্যা ছিল ১৬১টি।

(ছ) কাগজ শিল্প

বিংশ শতকের সূচনায় কাগজ শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় এবং নতুন নতুন কাগজের কল প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ভদ্রাবতীর মহীশূর পেপার মিল’ (১৯৩৯ খ্রি.) এবং হায়দ্রাবাদের শিরপুর পেপার মিল’ (১৯৩৮ খ্রি.)। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাগজ শিল্পে সংরক্ষণ নীতি চালু থাকায় এই শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি ঘটে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভারতে ১৬টি কাগজের কল ছিল এবং সেগুলির বার্ষিক উৎপাদনের মোট পরিমাণ ছিল ২০ লক্ষ হন্দর।

(জ) সিমেন্ট শিল্প

বিংশ শতকের শুরুতে ভারতে সিমেন্ট শিল্পের সূচনা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সিমেন্টের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনও বাড়াতে হয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সিমেন্টের উৎপাদন ছিল ২ লক্ষ ৬৪ হাজার টন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লক্ষ টন। ১০টি সিমেন্ট কোম্পানি একত্রিত হয়ে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘অ্যাসোসিয়েটেড সিমেন্ট কোম্পানি’ (ACC) গড়ে তোলে। ফলে এই শিল্পের পরিচালনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

(ঝ) অন্যান্য শিল্প

ব্যাংকিং শিল্প: এই সময় ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যাংকগুলির পাশাপাশি ভারতীয় মালিকানাধীনে বেশ কয়েকটি ব্যাংক গড়ে ওঠে। ব্যাংকগুলি বিভিন্ন শিল্পে পুঁজি সরবরাহ করে শিল্পের বিকাশে সহায়তা করে।

(ঞ) আলোচ্য সময়কালে ভারতে চর্বি, পশম, মদ, দেশলাই, রাসায়নিক, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি শিল্পেরও অগ্রগতি ঘটে। এ ছাড়া চাল, ময়দা, কাঠ, সোরা, চামড়া প্রভৃতির প্রক্রিয়াকরণের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে।

বিভিন্ন ভারতীয় শিল্পসংস্থা ও শিল্পপতি

বিভিন্ন ব্রিটিশ শিল্পসংস্থা ভারতে শিল্পের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এই সংস্থাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যান্ড্রু ইউলস্, বার্ডস্, মার্টিন বার্নস, ডানলপ, শ ওয়ালেস, ডানকান ব্রাদার্স প্রভৃতি। তবে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিংশ শতকের প্রথম থেকে ইংরেজ শিল্পপতিদের সঙ্গে ভারতীয় শিল্পপতিরাও সমানতালে শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করতে থাকেন। যেমন –

(১) জামশেদজি টাটা

ভারতীয় শিল্পপতিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিলেন জামশেদজি টাটা। ভারতীয়দের মধ্যে তিনি লোহা ও ইস্পাত শিল্প গঠনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেন।

(২) গুজরাটি শিল্পপতিগণ

গুজরাটি শিল্পপতিদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ওয়ালচাঁদ হীরাচাঁদ, পুরুষোত্তম দাস ঠাকুরদাস, আম্বালাল সারাভাই প্রমুখ। ওয়ালচাঁদ হীরাচাঁদ খনি, বিমা, সিমেন্ট, মোটরগাড়ি নির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে মূলধন বিনিয়োগ করেন।

(৩) মাড়োয়ারি শিল্পপতিগণ

মাড়োয়ারি শিল্পপতিদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হুকুম চাঁদ প্রথমে আফিম ও খাদ্যশস্যের ব্যাবসায় যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি হুগলি নদীর তীরে একটি পাটকল স্থাপন করেন।

(৪) বাঙালি শিল্পপতিগণ

বাঙালি শিল্পপতিদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিলেন স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি লোহা ইস্পাত শিল্পে মূলধন বিনিয়োগ করেন।

(৫) দেশীয় রাজ্যের শিল্পোদ্যোগ

মহীশূর, বরোদা, কোচিন প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যগুলি সরকারি উদ্যোগে শিল্পের প্রসার ঘটায়। মহীশূরের দেওয়ান বিশিষ্ট ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ এম. বিশ্বেশ্বরায়ার উদ্যোগে মহীশূরে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। ভদ্রাবতী লোহা ও ইস্পাত কারখানার প্রতিষ্ঠা তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

(৬) ইংরেজদের সহযোগী ভারতীয় শিল্পপতি

এই সময় বেশ কিছু ভারতীয় শিল্পপতি ইংরেজ শিল্পপতিদের সহযোগী হিসেবে শিল্পের প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন। শ-ওয়ালেস কোম্পানির সহযোগী তাঁরাচাদ ঘনশ্যাম দাস, ব্যালি ব্রাদার্সের সহযোগী গোয়েঙ্কা, গ্রাহাম ব্রাদার্সের সহযোগী ঝুনঝুনওয়ালা, অ্যান্ড্রু ইউলের সহযোগী ভাটিয়া প্রমুখ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

বিভিন্ন শিল্প বিকাশের প্রভাব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ ঘটে। এর ফলে –

(১) ভারতীয় শিল্পপতিদের উদ্ভব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ভারতে যে শিল্পায়ন শুরু হয়েছিল তাতে ভারতীয় শিল্পপতিদের আত্মপ্রকাশ ও প্রয়াস ছিল চোখে পড়ার মতো।

(২) কুটিরশিল্পের ধবংস প্রাপ্তি

শিল্পায়নের দ্বারা উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেও এর দ্বারা সাধারণ ভারতবাসীর কোনো অর্থনৈতিক উন্নতি হয় নি। বরং আধুনিক শিল্পের আঘাতে দেশের গ্রামীণ কুটিরশিল্প ধ্বংস হলে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

(৩) নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা

শিল্পায়নের ফলে ভারতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আরও কিছু নতুন নগরীর প্রতিষ্ঠা হয়। বিভিন্ন শহরে জনসংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।

(৪) শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব

বড়ো বড়ো শিল্পকারখানাগুলিতে প্রচুর মানুষ কাজে নিযুক্ত হলে সমাজে হতদরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়।

(৫) শ্রমিক আন্দোলন

বঞ্চিত ও নিপীড়িত এই শ্রমিক শ্রেণি পরবর্তীকালে সংগঠিত হয়ে সরকার বা মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংঘ গঠন করে আন্দোলন গড়ে তোলে।

(৬) বামপন্থী রাজনীতির প্রসার

শ্রমিকদের সমর্থনে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কর্মধারার প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়।

উপসংহার :- ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের দেশে শিল্পের বিকাশে যথেষ্ট উদ্যোগী ছিল না। অবশ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সীমিত পরিমাণে শিল্পায়নের সূচনা হয়।

(FAQ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে বস্ত্র রপ্তানিতে ভারতের স্থান কত ছিল?

দ্বিতীয়।

২. কে কখন টিসকো প্রতিষ্ঠা করেন?

জামসেদজি টাটা ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে।

৩. কখন কোথায় ইসকো প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে আসানসোলের হীরাপুরের কাছে।

৪. কখন কোথায় ভারতের প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়?

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুগলির রিষড়ায়।

৫. বাংলার ডান্ডি কাকে বলা হয়?

গঙ্গা নদীর দুই তীর।

৬. ভারতে অসংখ্য পাটকল গড়ে ওঠে কোথায়?

গঙ্গা নদীর দুই তীরে।

Leave a Comment