প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের শিল্পায়ন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের শিল্পায়ন প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের প্রভাব, সীমিত শিল্পায়ন, ১৯১৪-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে ভারতে শিল্পের অগ্রগতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়নে সরকারি উদ্যোগ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পোদ্যোগের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল সম্পর্কে জানবো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের শিল্পায়ন

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়ন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ১৯১৪-১৯১৮ খ্রি
শিল্প বিপ্লবইংল্যান্ড
শিল্প কমিশন১৯১৬ খ্রি
মন্টেগু চেমসফোর্ড আইন১৯১৯ খ্রি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ১৯৩৯-৪৫ খ্রি
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের শিল্পায়ন

ভূমিকা :- ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর থেকে শুরু করে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত ভারতে ব্রিটিশ সরকার যে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিল তার ফলে ভারতের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

উপনিবেশ থেকে ক্ষতিপূরণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিটিশ সরকার তার উপনিবেশগুলি থেকেই এই ক্ষতিপূরণ করার নীতি গ্রহণ করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ

ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং কিছু কিছু স্থানে দুর্ভিক্ষের সময়ও উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় করে। এরূপ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের দারিদ্র্য ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায়।

ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের প্রভাব

ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের দেশে শিল্পের বিকাশে যথেষ্ট উদ্যোগী ছিল না। তখন ব্রিটেনের ‘শিল্পবিপ্লব’-এর প্রভাবে সরকার ভারতকে ব্রিটেনের শিল্পকারখানাগুলির জন্য কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করে। ব্রিটেনের কারখানাগুলিতে উৎপাদিত উন্নত ও তুলনায় সস্তা শিল্পজাত বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য ভারতের বাজারগুলি দ্রুত দখল করতে সক্ষম হয়। ফলে ভারতের দেশীয় কুটিরশিল্পজাত পণ্যের বিক্রি ভীষণভাবে কমে যায় এবং দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় শুরু হয়, যা অবশিল্পায়ন নামে পরিচিত। এর পরিণতিতে দেশের অগণিত শিল্পী-কারিগর বেকার হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সীমিত শিল্পায়ন

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে এবং ব্রিটিশ-উদ্যোগে ভারতে আধুনিক শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। পাশাপাশি ভারতীয় পুঁজিও শিল্পের বিকাশে অংশ নিতে শুরু করে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পর ভারতে শিল্পের আরও প্রসার ঘটে।

১৯১৪-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে ভারতে শিল্পের অগ্রগতি

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে ভারতে শিল্পের মোটামুটি অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। এই সময় ভারতে শিল্পায়নের কয়েকটি কারণ ছিল। এই কারণ গুলি হল –

(১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেনের কলকারখানাগুলি যুদ্ধ সংক্রান্ত কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা ভারতে শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে জাপান ও আমেরিকা ভারতের বাজার দখলে এগিয়ে এলে তা প্রতিরোধ করতে সরকার ভারতীয় শিল্পপতিদের কিছু কিছু সুযোগ সুবিধা দিতে শুরু করে।

(২) সংরক্ষণ নীতি

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পর সরকার বিভিন্ন শিল্পের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে। ফলে সীমিতভাবে হলেও ভারতে শিল্পায়নে অগ্রগতি ঘটে।

(৩) মহামন্দার প্রভাব

১৯২৯-১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ফলে ব্রিটেনে শিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এই সুযোগে ভারতে শিল্পের প্রসার ঘটতে শুরু করে।

(৪) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, অথচ যুদ্ধের প্রয়োজনে শিল্পজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে ভারতে শিল্পের বিকাশ সম্ভব হয়ে ওঠে।

(৫) ভারতীয় শিল্পপতিদের উদ্যোগ

প্রথমদিকে ভারতের শিল্পের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় মূলধনের বিনিয়োগ হয়েছিল। কিন্তু বিংশ শতকের শুরু থেকে বিভিন্ন ভারতীয় শিল্পপতি শিল্পায়নে মূলধন বিনিয়োগ করতে শুরু করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়নে সরকারি উদ্যোগ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন থেকে ভারতে শিল্পজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিলে ব্রিটিশ সরকার ভারতে শিল্পের বিকাশে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগ গুলি হল –

(১) শিল্প কমিশন নিয়োগ

ভারতীয় শিল্পের প্রসার ও ব্যাবসাবাণিজ্যে ভারতীয় মূলধন বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিচার করার উদ্দেশ্যে ভারত সরকার ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার টমাস হল্যান্ড এর নেতৃত্বে একটি শিল্প কমিশন গঠন করে।

(২) কমিশনের সুপারিশ

শিল্প কমিশন ভারতে শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারকে ‘উৎসাহমূলক হস্তক্ষেপ’ নীতি গ্রহণের সুপারিশ করে। কমিশন ভারতে শিল্পের অগ্রগতির প্রয়োজনে সরকারকে যে সকল পরামর্শ দেয় সেগুলি হল-

  • (i) যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি,
  • (ii) সর্বভারতীয় ও প্রাদেশিক শিল্পবিভাগ প্রতিষ্ঠা,
  • (iii) কারিগরি শিক্ষার প্রসার,
  • (iv) বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি চাকরিগুলির সুষ্ঠু সমন্বয় প্রভৃতির উদ্যোগ নিতে হবে।

(৩) মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টে শিল্প স্থাপনের সুপারিশ

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টেও ভারতে শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। যদিও মন্টেগু-চেমসফোর্ডের সুপারিশ আইন হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে।

(৪) সংরক্ষণ নীতি

ভারতীয় শিল্পপতি ও জাতীয়তাবাদীদের চাপে সরকার ভারতীয় শিল্পগুলিকে বিদেশি শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শিল্পে সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে। লোহা, ইস্পাত, কাগজ, সুতিবস্ত্র, চিনি, লবণ, দেশলাই প্রভৃতি শিল্পপণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কিছুটা কমানো হয়। এর ফলে ভারতে শিল্পবিকাশের অনুকূল পরিবেশ গড়ে ওঠে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পোদ্যোগের বৈশিষ্ট্য

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে ভারতে যে শিল্পায়ন সংঘটিত হয়। তার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই বৈশিষ্ট্য গুলি হল –

(১) প্রযুক্তিশিক্ষার অভাব

এই পর্বে সরকার ভারতে শিল্পোদ্যোগ শুরু করলেও, ভারতীয়দের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষার প্রসারে সরকার বিশেষ চেষ্টা করে নি।

(২) ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে ভারতীয়দের পিছিয়ে থাকা

প্রযুক্তিগত পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে ভারতীয়রা রেল-ইঞ্জিন, মোটরগাড়ি, জাহাজ, এরোপ্লেন প্রভৃতি শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে নি।

(৩) পশ্চিম ভারতে দেশীয় শিল্পের অগ্রসরতা

ভারতে শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিম ভারতে পারসি, গুজরাটি, মাড়োয়ারি প্রভৃতি বণিকরা যে সাহস দেখাতে পেরেছিল পূর্ব ভারতের ধনীরা তা পারে নি। ফলে পশ্চিম ভারতে দেশীয় পুঁজিতে শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল।

(৪) ভারতীয় শিল্পপতি শ্রেণির উদ্ভব

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতে শিল্পের বিকাশে কিছু ভারতীয় ধনী ব্যক্তি ও উদ্যোগী মানুষ যুক্ত হলে ভারতীয় সমাজে শিল্পপতি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।

(৫) ইউরোপীয় পুঁজির কেন্দ্রস্থল

এই পর্বে ভারতে ইউরোপীয় পুঁজি সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল পূর্ব ভারতের কলকাতায়।

(৬) ভারতীয় পুঁজির কেন্দ্রস্থল

এই পর্বে ভারতীয় পুঁজিপতিদের পুঁজি বিনিয়োগের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল বোম্বাই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পায়নের ফলাফল

সীমিত শিল্পায়নের পর বিভিন্ন প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন –

(১) ভারতীয় শিল্পপতিদের উদ্ভব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ভারতে যে শিল্পায়ন শুরু হয়েছিল তাতে ভারতীয় শিল্পপতিদের আত্মপ্রকাশ ও প্রয়াস ছিল চোখে পড়ার মতো।

(২) কুটিরশিল্পের ধ্বংস প্রাপ্তি

শিল্পায়নের দ্বারা উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেও এর দ্বারা সাধারণ ভারতবাসীর কোনো অর্থনৈতিক উন্নতি হয় নি। বরং আধুনিক শিল্পের আঘাতে দেশের গ্রামীণ কুটিরশিল্প ধ্বংস হলে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

(৩) নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা

শিল্পায়নের ফলে ভারতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আরও কিছু নতুন নগরীর প্রতিষ্ঠা হয়। বিভিন্ন শহরে জনসংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।

(৪) শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব

বড়ো বড়ো শিল্পকারখানাগুলিতে প্রচুর মানুষ কাজে নিযুক্ত হলে সমাজে হতদরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়।

(৫) শ্রমিক আন্দোলন

বঞ্চিত ও নিপীড়িত এই শ্রমিক শ্রেণি পরবর্তীকালে সংগঠিত হয়ে সরকার বা মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংঘ গঠন করে আন্দোলন গড়ে তোলে।

(৬) বামপন্থী রাজনীতির প্রসার

শ্রমিকদের সমর্থনে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কর্মধারার প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়।

উপসংহার :- প্রকৃতপক্ষে ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার এদেশে শিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ভারতকে একটি নিছক কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করে। তাই প্রথমদিকে ব্রিটিশ নীতির ফলে ভারতের কুটিরশিল্প ধ্বংস হয় এবং শিল্পী ও কারিগররা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীকালে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং ইউরোপীয় ও ভারতীয় উদ্যোগে ভারতে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের বিকাশ ঘটে।

(FAQ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের শিল্পায়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯১৪-১৯১৮ খ্রি।

২. শিল্প বিপ্লব প্রথম কোথায় হয়?

ইংল্যান্ডে।

৩. শিল্প কমিশন গঠন করা হয় কখন?

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে।

৪. মন্টেগু চেমসফোর্ড আইন পাশ করা হয় কখন?

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে।

৫. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল কত?

১৯৩৯-৪৫ খ্রি।

Leave a Comment