দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব

গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে সংগঠক, বিজেতা, ক্ষাত্রশক্তির অবক্ষয়, উচ্চশ্রেণির নৈতিক অবক্ষয়, রাজ্য বিস্তার নীতির অভাব, পরধর্মসহিষ্ণুতা, নৈতিক চরিত্র, সংস্কৃতিতে অবদান ও কিংবদন্তির বিক্রমাদিত্য সম্পর্কে জানবো।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব

বিষয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
রাজা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
পূর্বসূরি রামগুপ্ত
উত্তরসূরি প্রথম কুমারগুপ্ত
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব

ভূমিকা :- গুপ্তবংশে যে কয়েকজন জন শ্রেষ্ঠ রাজা গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্থাপন, বিস্তার ও সংগঠনের জন্য কাজ করেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাদের মধ্যে অন্যতম।

সংগঠক

সমুদ্রগুপ্তকে যদি গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তারকর্তা বলা যায় তবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে এই সাম্রাজ্যের সংগঠক বলা চলে। সাম্রাজ্য স্থাপন করা যেমন কঠিন কাজ, সাম্রাজ্যকে স্থায়ী করার জন্য সংগঠন করাও সেরূপ কঠিন কাজ। সেদিক থেকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সমুদ্রগুপ্তের কাজের পরিপুরক কাজ করেন।

বিজেতা

  • (১) বিজেতা হিসেবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পিতার গৌরবকে ম্লান করতে পারেননি। ডঃ গয়াল দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সমালোচনা করে বলেছেন যে, তিনি মাত্র কয়েকজন দুর্বল, হীনবল রাজাকে পরাস্ত করে তার কাজ সমাপ্ত করেন।
  • (২) পিতার আরও কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য তিনি দাক্ষিণাত্যে নতুন করে অভিযান করেননি। তিনি সিন্ধু উপত্যকা জয়ের কোনো চেষ্টা করেননি। সমুদ্রগুপ্ত তাঁর প্রত্যক্ষ শাসিত অঞ্চলের চারদিকে সামন্ত রাজ্যের যে বলয় স্থাপন করেন, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মোটামুটি তাই অক্ষুণ্ণ রাখেন।
  • (৩) তিনি কেবলমাত্র পশ্চিম ভারতের শক-ক্ষত্রপদের পরাস্ত করে সাম্রাজ্য সীমা কিছুটা বৃদ্ধি করেন। তিনি “সিংহ বিক্রম” উপাধি নেন। এই উপাধি অর্থবহ ছিল। কারণ, গুজরাটের সিংহ-সঙ্কুল অঞ্চল জয় করে হয়ত তিনি এই উপাধি নেন।
  • (৪) কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন যে, এই সময় শক শক্তি এতই হীনবল হয়েছিল যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে এজন্য বেশী আয়াস করতে হয়নি। মোট কথা, সমর-বিশারদ ও বিজেতা হিসেবে এককালে তাকে যে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হত, এখন গবেষকরা তাতে আপত্তি করেছেন।

ক্ষাত্রশক্তির অবক্ষয়

ডঃ গয়াল বলেছেন যে, রোমান বাণিজ্য হতে ও দক্ষিণ ভারত হতে আনীত সম্পদ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ভোগ করেছিলেন। তার ফলে তার ক্ষাত্রশক্তি স্তিমিত হয়ে যায়। তিনি বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করে অনেকটা ক্ষমা ও প্রসাদগুণের চর্চায় মন দেন। উত্তর-পশ্চিমে দৃঢ়ভাবে গুপ্ত শাসন প্রসার ও গঠন না করে তিনি যে ভুল করেন, তার ফলে পরবর্তীকালে হূণরা ভারতে সহজে ঢুকে পড়ে। সমুদ্রগুপ্ত শাস্ত্র ও শস্ত্র উভয় বিদ্যার চর্চা করে যে তেজদীপ্ত শাসন স্থাপন করেন, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলের ঐশ্বর্য ও বিলাসে তার কার্যকারিতা কমে যায়।

উচ্চশ্রেণীর নৈতিক অবক্ষয়

এই যুগের অভিজাতরাও হয়ে উঠেন বিলাসী। তারা অভিনয় কলা, নৃত্যকলা প্রভৃতির রসাস্বাদনে ব্যাপৃত থাকেন। কিন্তু সমরবিদ্যা ও রাষ্ট্রনীতির চিন্তা তাদের মন থেকে অনেকটা দূরে সরে যায়। এ যুগের কবি কালিদাস তাই তার নাটকে বিলাস-বহুলতার স্বপ্নজাল ছড়িয়ে দিয়েছেন। ইন্দুমতীর স্বয়ম্ভর সভার বর্ণনায়, অথবা রঘুর পাদ বন্দনার রচনায় কবি খুব বেশী অতিশয়োক্তি করেন নি।

রাজ্য বিস্তার নীতির অভাব

  • (১) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে ডঃ মজুমদার মন্তব্য করেছেন যে, “তিনি তাঁর পুত্রের জন্য যে শান্তিপূর্ণ ও সুসংগঠিত সাম্রাজ্য রেখে যান তা নিশ্চয়ই চন্দ্রগুপ্তের বিরাট সামরিক প্রতিভা, যোগ্য রাষ্ট্র পরিচালনা ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়।
  • (২) একথা সত্য যে, সমুদ্রগুপ্তের কাছ থেকে যে উত্তরাধিকার পান দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তা অক্ষুণ্ণ রাখেন। তিনি এই সাম্রাজ্যে উপযুক্ত শাসন ব্যবস্থা গঠন করেন। কিন্তু এর বেশী তিনি কিছু করেননি। ইতিহাস তাঁকে যে সুযোগ দিয়েছিল তার পূর্ণ সম্ভাবহার তিনি করেননি।
  • (৩) ভারতের অভ্যন্তরে গুপ্ত সম্রাটদের কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পিতার কাছে থেকে পাওয়া সীমান্ত নিয়েই মোটামুটি সন্তুষ্ট থাকেন। এই সীমান্ত বাড়াবার কোনো চেষ্টা তিনি করেননি।
  • (৪) একমাত্র শকরাজ্য জয় ছাড়া তাঁর প্রকৃত সাফল্য তেমন কিছু ছিল না। যদি মেহরৌলী লিপির বিবরণকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয় তবে ডঃ গয়ালের মতে বাহ্লীকদেশ বা নিম্ন সিন্ধু জয়ের কৃতিত্ব সমুদ্রগুপ্তেরই প্রাপ্য, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নয়। কারণ এখানে “চন্দ্র” কোনো নাম হিসেবে নয়, বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ফা-হিয়েনের বিবরণ

  • (১) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময় প্রজারা সুখে, শান্তিতে ছিল একথা ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সমর্থিত হয়। চুরি, ডাকাতি প্রায় অজ্ঞাত ছিল। তবে চন্দ্রগুপ্তের বর্ণাশ্রম ধর্মাশ্রিত শাসন ব্যবস্থায় জাতিভেদ প্রথার তীব্রতা ছিল।
  • (২) ফা-হিয়েন বলেছেন যে, চণ্ডাল প্রভৃতি পঞ্চম সম্প্রদায়কে গ্রাম বা শহরের বাইরে বাস করতে হত। মৌর্যযুগের মত গুপ্ত পুলিশের দাপট গুপ্ত যুগে ছিল না। সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতা অনেকটা ছিল। লোকে যেখানে খুশী যেতে পারত।

পরধর্মসহিষ্ণুতা

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন ধর্মসহিষ্ণুতা নীতির অনুরাগী। তিনি নিজে বৈষ্ণব ধর্মের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর আমলে বৌদ্ধধর্মেরও প্রসার ঘটেছিল। তাঁর অন্যতম সেনাপতি আম্রকর্দব ছিলেন বৌদ্ধ।

নৈতিক চরিত্র

  • (১) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তার পিতার মত বহুগুণের আধার ছিলেন কি না তা সঠিক জানা যায়নি। যদি মেহরৌলীর লৌহলিপি তারই হয় তবে তাঁর দেহ সৌন্দর্য ছিল বলা চলে। তাঁর একটি মুদ্রায় “রূপ কৃতি” অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে। অনেকের মতে, এর দ্বারা তার দেহ সৌন্দর্যের কথা বোঝান হয়। তবে ভারতীয় প্রথা অনুসারে পুরুষের দেহ সৌন্দর্যের জন্য গর্ব প্রকাশ নিম্ন রুচির পরিচয় বলে অনেকে মনে করেন।
  • (২) দেবীচন্দ্রগুপ্তম নাটকের বর্ণনা অনুসারে তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে হত্যা করে তার পত্নীকে বিবাহ করেন। ডঃ মজুমদার এই কাজকে রুচি বিরুদ্ধ মনে করে বিশ্বাসের অযোগ্য বলেছেন। কিন্তু অনেক পণ্ডিত এই ঘটনা সত্য বলে মনে করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মুদ্রায় একই আসনে বসা রাজা-রাণীর মূর্তি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নৈতিক সম্মান ও উন্নত রুচির পরিচয় দেয় না বলে অনেকে মনে করেন। তবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বপক্ষে বলা চলে যে, তাঁর সিংহচিহ্নিত মুদ্রা তাঁর গুজরাট জয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে।

গুপ্ত সংস্কৃতিতে অবদান

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলেই গুপ্ত রেনেসাঁস বা বিখ্যাত গুপ্ত সভ্যতার সূচনা হয়। সম্ভবত অমর কবি কালিদাস ছিলেন তার সমকালীন। কিংবদন্তীর নবরত্নের কয়েকজন রত্ন বা বিদ্বান তাঁর রাজসভায় ছিলেন। গুপ্তযুগে সাহিত্য, শিল্প, ভাস্কর্য সকল ক্ষেত্রে যে আশ্চর্য সৃজনী প্রতিভা বিকশিত হয় তার পশ্চাতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের অবদান নিশ্চয়ই ছিল।

সীমাবদ্ধ সংস্কৃতি

  • (১) রোমিলা থাপারের মতে, গুপ্তযুগের সভ্যতা ছিল সমাজের ওপর তলার লোকের জন্য সৃষ্ট। সমাজের অধঃপতিত নিম্নশ্রেণীর লোকদের সঙ্গে এর সম্পর্ক তেমন ছিল না বলা চলে। সংস্কৃত ভাষা ছিল শিক্ষিত উচ্চ শ্রেণীর ভাষা। লোকের মুখের ভাষা ছিল প্রাকৃত। গুপ্তরা এই ভাষা পরিহার করেন।
  • (২) তবে যে কোনো রেনেসাঁসের ক্ষেত্রেই সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে তার বিকাশ ঘটে। গুপ্ত রেনেসাঁসের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। এজন্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত দায়ী হতে পারেন না।

কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্য

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে অনেকে কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্য বলে মনে করেন। কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্যের উপাধি ছিল “শকারি” এবং তাঁর রাজসভায় নবরত্ন ছিলেন। যেহেতু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক রাজাকে পরাস্ত করেন এবং কালিদাস তাঁর সময় জীবিত ছিলেন সেজন্য অনেকে বলেন যে, পরে তাকে নিয়ে যে কিংবদন্তী গড়ে ওঠে তা থেকে বিক্রমাদিত্যের কাহিনী বা কিংবদন্তী সৃষ্টি হয়।

উপসংহার :- দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব তার রাজ্যজয়ের দ্বারা স্থাপিত না হলেও, শিল্প, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকরূপে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন। তাঁর কীর্তি অনেকাংশে তাঁর পিতার অপেক্ষা জনমানসে বেশী স্থান পেয়েছে। কিংবদন্তী তাকে শকারি বিক্রমাদিত্য আখ্যা দিয়ে অমরত্ব দিয়েছে।

(FAQ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

২. শকারি কাকে বলা হত?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

২. কোন গুপ্ত সম্রাটকে বিক্রমাদিত্য বলে মনে করা হয়?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

৩. দেবী চন্দ্রগুপ্তম কার লেখা নাটক?

বিশাখদত্ত।

৪. কোন গুপ্ত রাজা শকদের পরাজিত করেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »