তিন সম্রাটের চুক্তি

১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত তিন সম্রাটের চুক্তি প্রসঙ্গে, চুক্তির পটভূমি হিসেবে অস্ট্রিয়ার শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজনীয়তা, রাশিয়া-জার্মান মৈত্রী, অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ, চুক্তির উদ্দেশ্য, চুক্তির মূল পরিকল্পক, বিসমার্কের কর্তৃত্বহীনতা, ফ্রান্স-জার্মানি সম্পর্ক হিসেবে রাশিয়ার বিরোধিতা, বিসমার্কের আশঙ্কা, চুক্তির ব্যর্থতা, চুক্তির ভাঙ্গন হিসেবে বলকান সমস্যা, রাশিয়া-অস্ট্রিয়ার স্বার্থ, বার্লিন সন্ধি সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

তিন সম্রাটের চুক্তি

ঘটনাতিন সম্রাটের চুক্তি
সময়কাল২২ অক্টোবর, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ
স্বাক্ষরকারী দেশজার্মানি, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া
উদ্যোক্তাবিসমার্ক
রাশিয়ার জারদ্বিতীয় আলেকজান্ডার
তিন সম্রাটের চুক্তি

ভূমিকা:- বিসমার্কের প্রভাবে জার্মান সম্রাট কাইজার প্রথম উইলিয়ম, অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রান্সিস যোসেফ এবং রুশ জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২২শে অক্টোবর তিন সম্রাটের চুক্তি বা ‘ড্রেইকাইজারবুন্ড’ স্বাক্ষর করেন।

তিন সম্রাটের চুক্তির পটভূমি

তিন সম্রাটের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট ছিল নিম্নরূপ –

(১) অস্ট্রিয়ার শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজনীয়তা

বলকান অঞ্চলে রুশ অগ্রগতি রোধ করার জন্য অস্ট্রিয়ার একজন শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজন ছিল। এই কারণে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে মিত্রতা স্থাপনে বিসমার্ক সফল হন।

(২) রাশিয়া-জার্মান মৈত্রী

বিসমার্ক পূর্বেই রাশিয়ার মিত্রতা লাভ করেন। রাশিয়া ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধির কৃষ্ণসাগর-সম্পর্কিত শর্তগুলি লঙ্ঘন করে এই মৈত্রীর পুরস্কার লাভ করেছিল।

(৩) অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ

এই অবস্থায় অভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের দোহাই দিয়ে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার সম্রাটদের মধ্যে তিন সম্রাটের চুক্তি গড়ে ওঠে। এটি কোনও লিখিত চুক্তি বা দলিল নয়, এটি তিন দেশের মধ্যে গোপন বোঝাপড়া মাত্র।

তিন সম্রাটের চুক্তির উদ্দেশ্য

  • (১) আপাতদৃষ্টিতে এই মৈত্রীর উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা, নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে বলকান সমস্যার সমাধান এবং বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের অগ্রগতি রোধ করা।
  • (২) কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ করে রাখা। ইংল্যান্ড যাতে কোনোভাবেই ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ না হয়, সেদিকেও বিসমার্ক নজর দেন।
  • (৩) জার্মানির কোনও ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য না থাকায় ইংল্যান্ডও খুশি থাকে। এক কথায় বলা যায় যে, এই চুক্তির দ্বারা ফ্রান্স মিত্রহীন হয় এবং জার্মানির শক্তি অব্যাহত থাকে।

মূল পরিকল্পক

সেডানের যুদ্ধের পর ফ্রান্সকে মিত্রহীন করে রাখার ব্যাপারে বিসমার্কের যতটা প্রশংসা করা হয়, ঠিক ততটা প্রশংসা তাঁর প্রাপ্য কিনা এ নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। যেমন –

(১) গ্ৰেনভিলের মন্তব্য

ঐতিহাসিক গ্ৰেনভিল তাঁর ‘Europe Reshapsed’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, তিন সম্রাটের চুক্তির প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট আন্দ্রেসি। সুচনায় বিসমার্ক এই ধরনের কোনও সন্ধির চেষ্টাই করেন নি। পরে যখন তিনি বুঝতে পারেন যে এই ধরনের সন্ধির ফলে ফ্রান্স মিত্রহীন হয়ে পড়বে, তখনই তিনি আন্দ্রেসি-র উদ্যোগকে সফল করতে সক্রিয় হন।

(২) বিসমার্কের কৃতিত্বহীনতা

ইংল্যান্ডকে ফ্রান্সের কাছ থেকে দূরে রাখার ব্যাপারে বিসমার্কের কোনও কৃতিত্ব নেই। ইংল্যান্ড তার নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির জন্যই ইউরোপীয় রাজনীতির জটিলতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

(৩) টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, তখনও ইংল্যান্ড ফ্রান্সকেই ইউরোপীয় শক্তিসাম্যের পক্ষে বিপদ বলে ভাবতে অভ্যস্ত ছিল। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির উত্থানের ফলে যে ইউরোপের শক্তিসাম্য বদলে গেছে, ইংল্যান্ড তখনও তা বুঝতে পারে নি।

ফ্রান্স-জার্মানি সম্পর্ক

এই সময় ফ্রান্স-জার্মান সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। যেমন –

(১) সদ্ভাব বজায়

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তিন সম্রাটের চুক্তি করার পরেও বিসমার্ক ফ্রান্সের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে সচেষ্ট হন। প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সের সঙ্গে রাজতন্ত্রী অস্ট্রিয়া বা রাশিয়ার মৈত্রী সম্ভব নয়। এই কারণে ফ্রান্সে যাতে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকে, সে সম্পর্কেও তিনি সচেষ্ট হন।

(২) রাশিয়ার বিরোধিতা

রুশ মন্ত্রী গোরচাকফ এই চুক্তির বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, এই চুক্তির দ্বারা ইউরোপে জার্মান আধিপত্যের পথ প্রশস্ত হবে।

(৩) বিসমার্কের আশঙ্কা

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি তিয়ের-এর পতন ঘটে এবং রাজতন্ত্রী ম্যাকমোহন ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি হন। এই সময় ফ্রান্সের নব-নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ফ্রান্সের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ফরাসি পার্লামেন্টে একটি বিল আনলে বিসমার্ক শঙ্কিত হন।

(৪) যুদ্ধের আতঙ্ক

বিসমার্কের ধারণা হয় যে, ফ্রান্সের সামরিক শক্তি জার্মানির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। এই কারণে তিনি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আক্রমণ চালাবার সংকল্প করেন। একে ‘যুদ্ধের আতঙ্ক’ বলা হয়।

(৫) রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের অভিপ্রায়

রুশ মন্ত্রী গোরচাকফ ঘোষণা করেন যে, জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করলে রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকবে না। ইংল্যান্ডও জার্মানির কাছে প্রতিবাদপত্র পাঠায়।

(৬) দেকাজের মন্তব্য

ফরাসি মন্ত্রী দেকাজে ইউরোপের বিভিন্ন শক্তিকে বোঝান যে, ফ্রান্সের আত্মরক্ষা এবং ইউরোপে শক্তিসাম্য রক্ষার জন্য ফ্রান্সের সামরিক শক্তির আধুনিকীকরণ দরকার এবং এর দ্বারা ইউরোপের শান্তি সুদৃঢ় হবে।

তিন সম্রাটের চুক্তির ব্যর্থতা

এই ‘যুদ্ধাতঙ্ক’ থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, তিন সম্রাটের চুক্তি সফল হয় নি, আত্মরক্ষার স্বার্থে ফ্রান্স তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতই এবং বিসমার্ক বুঝতে পারেন যে, ফ্রান্সকে চিরদিন দুর্বল করে রাখা যাবে না।

তিন সম্রাটের চুক্তিতে ভাঙন

বিভিন্ন কারণে তিন সম্রাটের চুক্তিতে ভাঙন ধরে। যেমন –

(১) বলকান সমস্যা

বলকান সমস্যাকে কেন্দ্র করে এই চুক্তি কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়। ঐতিহাসিক ল্যাঙ্গার বলেন, বিসমার্ক এই ভেবে চিন্তিত হন যে, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বাধলে তিন সম্রাটের চুক্তি ধ্বংস হবে এবং তাতে ফ্রান্সের মিত্রহীনতা দূর হবে।

(২) রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার স্বার্থ

বলকান অঞ্চলে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার স্বার্থ প্রবলভাবে পরস্পর-বিরোধী ছিল এবং এর কোনও শান্তিপূর্ণ সমাধান একপ্রকার অসম্ভব ছিল। বিসমার্ক মনে করেন যে, এই অঞ্চল থেকে তুরস্ককে বিতাড়িত করে অঞ্চলটি অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে ভাগ করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে। ইংল্যান্ড এই ব্যাপারে প্রবল আপত্তি জানালে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

(৩) বার্লিন সন্ধি

বলকান সমস্যার সমাধান এবং যুদ্ধ এড়াবার জন্য বিসমার্ক বার্লিনে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। যদিও তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তিন সম্রাটের চুক্তি-কে রক্ষা করা। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বার্লিনের চুক্তি বা সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

তিন সম্রাটের চুক্তির ভাঙন

রুশ জার অভিযোগ করেন যে, বিসমার্ক এই চুক্তিতে অস্ট্রিয়ার প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন, রুশ স্বার্থরক্ষার কোনও চেষ্টা করেন নি। রুশ মন্ত্রী গোরচাকফ আরও একধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন যে, “জার্মানি রাশিয়ার কাঁধে চড়েই এত বড়ো হয়েছে, অথচ এজন্য জার্মানি রাশিয়ার প্রতি আদৌ কৃতজ্ঞ নয়।” রাশিয়া তিন সম্রাটের চুক্তি বর্জন করলে তা ভেঙে যায়।

উপসংহার:- ফ্রান্সকে মিত্রহীন করে রাখার উদ্দেশ্যে বিসমার্কের অভিনব পন্থা ছিল তিন সম্রাটের চুক্তি। কিন্তু অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার স্বার্থ প্রবলভাবে বিরোধী হওয়ায় এই চুক্তির সাফল্য ছিল অলীক কল্পনা।

(FAQ) তিন সম্রাটের চুক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কার উদ্যোগে তিন সম্রাটের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?

২২ অক্টোবর, ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে, বিসমার্ক।

২. তিন সম্রাটের চুক্তিতে কারা স্বাক্ষর করে?

জার্মানির সম্রাট কাইজার প্রথম উইলিয়ম, অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রান্সিস যোসেফ এবং রুশ জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

৩. বার্লিন চুক্তি কখন স্বাক্ষরিত হয়?

জুলাই, ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »