সর্বশুভকরী পত্রিকা

সর্বশুভকরী পত্রিকা প্রসঙ্গে সর্বশুভকরী পত্রিকার কণ্ঠদেশে শ্লোক, সর্বশুভকরী পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য, সর্বশুভকরী পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা, সর্বশুভকরী পত্রিকার মাসিক চাঁদা, সর্বশুভকরী পত্রিকায় প্রবন্ধ প্রকাশ, সর্বশুভকরী পত্রিকার প্রকৃত মালিক, সর্বশুভকরী সভায় গণ্ডগোল, সর্বশুভকরী পত্রিকার তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা, সর্বশুভকরী পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার বিষয়, সর্বশুভকরী পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যার বিষয়, সর্বশুভকরী পত্রিকা বন্ধ ও পুনঃ প্রকাশ, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সর্বশুভকরী পত্রিকা ও সর্বশুভকরী পত্রিকার সমালোচনা সম্পর্কে জানবো।

সর্বশুভকরী পত্রিকা

ঐতিহাসিক পত্রিকাসর্বশুভকরী পত্রিকা
ধরণমাসিক পত্রিকা
ভাষাবাংলা
প্রকাশকালআগস্ট ১৮৫০ খ্রি
সম্পাদকমতিলাল চট্টোপাধ্যায়
সর্বশুভকরী পত্রিকা

ভূমিকা :- ১২৫৬ সালের ফাল্গুন মাসে কলকাতা ঠনঠনীয়ার রামচন্দ্র চন্দ্রের ৫৮ সংখ্যক ভবনে সর্বশুভকরী সভা স্থাপিত হয়। এই সভার সভ্যগণ ১২৫৭ সালের ভাদ্র মাসে (আগস্ট ১৮৫০) ‘সর্বশুভকরী পত্রিকা’ নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

সর্বশুভকরী পত্রিকার কণ্ঠদেশে শ্লোক

এই পত্রিকার কণ্ঠদেশে নিম্নোক্ত শ্লোকটি শোভা পেত। –

“অশ্বমেধসহস্রঞ্চ সত্যঞ্চ তুলয়া ধৃতম্।

অশ্বমেধসহস্রাত্তু সত্যমেবাতিরিচ্যতে।।”

সর্বশুভকরী পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য

এই পত্রিকা প্রচারের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রথম সংখ্যায় লেখা হয়েছে যে,

  • (১) “আমরা কয়েক জন বন্ধু একমতাবলম্বী হইয়া গত ফাল্গুন মাসে সর্বশুভকরী নামে এক সভা স্থাপন করিয়াছি। সভাসংস্থাপনের মুখ্য অভিপ্রায় এই যে, বহু কালাবধি আমাদিগের দেশে কতগুলি কুরীতি ও কদাচার প্রচলিত আছে তদ্বারা এতদ্দেশের বিষম অনিষ্ট ঘটিতেছে ও কালক্রমে সর্বনাশ ঘটিবারও সম্ভাবনা আছে। যাহাতে এই সমস্ত কুরীতি ও কদাচার চিরদিনের নিমিত্ত হতাদর ও দূরীভূত হয় সাধ্যানুসারে তদ্বিষয়ে যত্ন করা যাইবেক। কিন্তু এই সঙ্কল্পিত অসাধ্য সাধন বিষয়ে সর্বশুভকরী কত দূর পর্যন্ত কৃতকার্য্য হইতে পারিবেন তাহা জগদীশ্বর জানেন। আমরা এই যে দুঃসাধ্য মহৎ ব্যাপারে হস্তার্পণ করিবার মানস করিয়াছি পত্রিকা প্রচার তৎসমাধানের এক প্রধান উপায় বোধ হওয়াতে এই পত্রিকা প্রচার করিতে আরম্ভিলাম এবং ইহাকে সভার প্রতিরূপ স্বরূপ বিবেচনা করিয়া তদীয় সর্বশুভকরী নাম দ্বারাই ইহার নামকরণ করিলাম।”
  • (২) কি প্রাচীন কি মধ্য উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরি স্বীকার করা উচিত যে কৌলীন্য ব্যবস্থা, বিধবাবিবাহ প্রতিষেধ, অল্পবয়সে বিবাহ প্রভৃতি যে কতিপয় অতি বিষম অশেষদোষাকর কুৎসিত নিয়ম প্রচলিত আছে তৎসমুদায় নিরাকৃত হইলে এতদ্দেশের অনেক দূরবস্থা মোচন ও মঙ্গল লাভ হইতে পারে। উল্লিখিত বিষয়সমূহ দ্বারা কত প্রকার অনিষ্ট ঘটিতেছে ইহা প্রায় সকল লোকেরি হৃদয়ঙ্গম আছে। এবং এই পত্রিকাতেও ক্রমে ক্রমে তৎসমুদায় সবিস্তর প্রকটিত করা যাইবেক…।”

সর্বশুভকরী পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা

এই পত্রিকার প্রত্যেক সংখ্যার ১০ পৃষ্ঠা পরিমাণ একটি দীর্ঘ রচনা স্থান পেত।

সর্বশুভকরী পত্রিকার মাসিক চাঁদা

এই পত্রিকার মাসিক চাঁদা সম্বন্ধে পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় এই সম্পাদকীয় বিজ্ঞাপন মুদ্রিত হত – “এই পত্রিকার মূল্যের বিষয়ে সর্বশুভকরী সভা কোনো নিয়ম নির্ধারণ না করিয়া গ্রাহক মহাশয়দিগকে জানাইতেছেন, তাঁহারা শ্রদ্ধা করিয়া মাসিক চারি আনার অন্যূন যে কিছু দান করিতে ইচ্ছা করিবেন পত্র দ্বারা তাহা সম্পাদকের বিদিত করিবেন। তাহাদিগের সেই দান সৰ্বশুভকরী সাতিশয় আদরপূর্বক প্রতিগ্রহণ করিবেন।” – শ্রী মতিলাল চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদক৷

সর্বশুকরী পত্রিকায় প্রবন্ধ প্রকাশ

এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় “বাল্যবিবাহের দোষ” ও দ্বিতীয় সংখ্যায় “স্ত্রীশিক্ষা” নামে প্রবন্ধ আছে। প্রথমটি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ও দ্বিতীয়টি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের রচনা বলে শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন “বিদ্যাসাগর জীবনচরিতে’ উল্লেখ করেছেন।

সর্বশুকরী পত্রিকার প্রকৃত মালিক

প্রকৃতপক্ষে বিদ্যাসাগর ও মদনমোহনই এই পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, মতিলাল চট্টোপাধ্যায় নামে সম্পাদক ছিলেন। ‘রাজনারায়ণ বসুর আত্মচরিতে’ প্রকাশ পায় –

“ইনি (মদনমোহন তর্কালঙ্কার) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় ‘সর্ব্বশুভকরী’ নামে পত্রিকা বাহির করেন। এই পত্রিকাতে স্ত্রীশিক্ষার আবশ্যকতা বিষয়ে একটি প্রস্তাব তর্কালঙ্কার মহাশয় লিখিয়াছিলেন। স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক ঐরূপ উৎকৃষ্ট প্রস্তাব অদ্যাপি বঙ্গভাষায় প্রকাশিত হয় নাই। তর্কালঙ্কার মহাশয় বিল্বগ্রামের একজন ভট্টাচাৰ্য হইয়া সমাজ-সংস্কার কার্যে যেরূপ উৎসাহ প্রকাশ করিয়াছিলেন, তজ্জন্য তিনি সহস্র সাধুবাদের উপযুক্ত।”

সর্বশুকরী সভায় গণ্ডগোল

প্রথম দুই সংখ্যা সর্বশুভকরী পত্রিকা প্রকাশিত হবার পর সর্বশুভকরী সভায় গণ্ডগোল উপস্থিত হয়। সভার বীজস্বরূপ বাবু তারকনাথ দত্তের সাথে সভ্যগণ অকৌশল করলেন।

সর্বশুভকরী পত্রিকার তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা

এই পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা ১৮৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ও চতুর্থ সংখ্যা এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।

সর্বশুভকরী পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার বিষয়বস্তু

এই পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সমসাময়িক পত্রে এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় যে, “সর্বশুভকরী পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যায় মাংসাহারের বিরুদ্ধে যে এক সুদীর্ঘ ও যুক্তিসিদ্ধ প্রস্তাব প্রকাশ হইয়াছিল…।” (সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়, ৩ মার্চ ১৮৫১)

সর্বশুভকরী পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যার বিষয়বস্তু

এই পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সমসাময়িক পত্রে এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় যে, “আমরা গত দিবস বৈকালে ‘সর্বশুভকরী পত্রিকা’র চতুর্থ সংখ্যা প্রাপ্ত হইলাম, তাহা কেবল মদ্য এবং মাদকদ্রব্যে পরিপুরিত হইয়াছে।” (সংবাদ প্রভাকর পত্রিকা ২৬ এপ্রিল ১৮৫১)

সর্বশুভকরী পত্রিকা বন্ধ ও পুনঃ প্রকাশ

১৮৫১ সালেই ‘সৰ্বশুভকরী পত্রিকা’র প্রচার বন্ধ হয়। চার বছর পরে ১৮৫৫ সালে এই পত্রিকা পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সর্বশুভকরী পত্রিকা

বিলাতের ব্রিটিশ মিউজিয়নে এক খণ্ড ‘সর্বশুভকরী পত্রিকা’ আছে। সেটি “প্রথম খণ্ড। ৩য় সংখ্যা। শ্রাবণ ১২৬২। ইং আগষ্ট ১৮৫৫।” এর আখ্যা-পত্রে মুদ্রিত প্রবন্ধ-সূচি হল নিম্নরূপ –

  • (১) The present state of the Medical rolence of the Country;
  • (২) The Establishment of a Vernacular Library;
  • (৩) The Long Life;
  • (৪) The British Indian Association;
  • (৫) The new Law;
  • (৬) The Idleness;
  • (৭) The Price Current,

সর্বশুভকরী পত্রিকার সমালোচনা

১১ আগস্ট ১৮৫৬ সালে ‘সংবাদ প্রভাকরে’ ২য় খণ্ড, ৩য় সংখ্যা ‘সর্বশুভকরী পত্রিকা’র সমালোচনা প্রসঙ্গে গুপ্ত-কবি এইরূপ মন্তব্য করেন যে, “‘সর্বশুভকরী’ নাম্নী মাসিক পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা প্রাপ্ত হইয়া পাঠানন্তর পরমানন্দ লাভ করিলাম, ঐ পত্রের রচনা অতি উত্তম এবং তাহাতে উত্তম উত্তম প্রবন্ধ সকল প্রকটিত হইতেছে, প্রার্থনা করি এই ‘সর্বশুভকরী’ সৰ্ব্বশুভকরী হইয়া চিরস্থায়িনী হউক।”

উপসংহার :- আসলে সর্বশুভকরী সভার সদস্যরা তৎকালীন সমাজের সংস্কারের উদ্দেশ্যে সর্বশুভকরী মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন।

(FAQ) সর্বশুভকরী পত্রিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সর্বশুভকরী কি ধরনের পত্রিকা?

মাসিক পত্রিকা।

২. সর্বশুভকরী পত্রিকার সম্পাদক কে ছিলেন?

মতিলাল চট্টোপাধ্যায়।

৩. সর্বশুভকরী পত্রিকার প্রকৃত মালিক কারা ছিলেন?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মদনমোহন তর্কালঙ্কার।

৪. সর্বশুভকরী পত্রিকা প্রকাশিত হয় কখন?

আগস্ট ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক পত্রিকাগুলি

Leave a Comment