গুপ্ত যুগের ধর্মমত

গুপ্তযুগে ধর্মমত প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, স্মৃতিশাস্ত্র, সংস্কৃত ভাষা, নারীর অবস্থা, জাতিভেদ, হিন্দু ধর্মের পুনর্গঠন, হিন্দু ধর্মের লৌকিক চরিত্র, পূজা পদ্ধতি, পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত যুগের ধর্মমত

বিষয় গুপ্ত যুগের ধর্মমত
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ রাজা সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্ত যুগের ধর্মমত

ভূমিকা :- গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে বলে স্মিথ মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই মন্তব্যের কারণ হল গুপ্ত সম্রাটরা মৌর্য সম্রাটদের মত বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেননি।

ব্রাহ্মণ্য ধর্ম

সমুদ্রগুপ্ত অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেন। এর থেকে তার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ভগবান বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। কুমারগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্ত প্রভৃতির নাম থেকেই বুঝা যায় যে, দেবতা কার্তিকেয় ছিলেন এঁদের আরাধ্য পুরুষ। গুপ্ত রাজাদের মুদ্রায় পদ্মাসনা লক্ষ্মী বা গরুড়াসন বিষ্ণুর মূর্তি খোদিত দেখা যায়। গুপ্ত সম্রাটরা পরম ভাগবত উপাধি নিতেন। এর থেকেও অনেকে তাঁদের বিষ্ণুর প্রতি অনুরাগ লক্ষ্য করেন।

স্মৃতিশাস্ত্র

গুপ্ত যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মের স্তম্ভ স্মৃতিশাস্ত্রগুলির বেশীর ভাগ লিখিত হয়। নারদ, ব্যাস, দেবল, বৃহস্পতি স্মৃতি প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্রগুলি গুপ্ত যুগে রচিত হয়। এই সময় অষ্টাদশ পুরাণের পুনর্লিখন করা হয়।

সংস্কৃত ভাষা

বৈদিক যুগ থেকে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের বাহন হিসাবে সংস্কৃত ভাষা চলে আসছিল। গুপ্ত যুগে তা পুনরায় রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পায়।

জাতিভেদ

গুপ্ত সম্রাটদের শাসনকালে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা ছিল সমাজের শীর্ষস্থানে। জাতিভেদ প্রথার তীব্রতা ছিল। ফা-হিয়েনের রচনা থেকে দেখা যায় যে, চণ্ডাল ও পঞ্চমশ্রেণীদের গ্রাম বা শহরের বাইরে বাস করতে বাধ্য করা হত।

নারীর অবস্থা

এই সময় নারীদের অবরোধে রাখা হত। পুরুষের আধিপত্যে সমাজ চলত। নারীরা উপনয়ন অথবা বৈদিক শাস্ত্র পাঠের অধিকার হারান। সতীদাহ প্রথার প্রচলন হয়।

হিন্দু ধর্মের পুনঃর্গঠন

অনেকে বলেন যে, গুপ্ত যুগে হিন্দুধর্মের জাগরণ ঘটেছিল একথা বলা ঠিক নয়। গুপ্ত যুগে হিন্দুধর্মের পুনর্গঠন হয়েছিল একথা বলাই উচিত।

হিন্দু ধর্মের লৌকিক চরিত্র

গুপ্ত যুগে যে হিন্দুধর্ম দেখা যায় তার সঙ্গে বৈদিক হিন্দুধর্মের তফাৎ ছিল। বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, নাসত্য প্রভৃতি গুপ্ত যুগে উপেক্ষিত হত। তাদের স্থলে আসেন লৌকিক দেবতাগণ। যথা – শিব, বিষ্ণু, কার্তিকেয়, গণেশ, উমা-হৈমবতী বা দুর্গা, লক্ষ্মী প্রভৃতি।

পূজা পদ্ধতি

এই সময় পুজোর জন্য  নতুন বিধি-বিধান ও পদ্ধতি রচিত হয়। বৈদিক যুগের মত যাগ-যজ্ঞের ব্যবস্থা থাকলেও তার প্রাধান্য কমে যায়। তার স্থলে এই নব দেবতাদের পুজো ও তাদের প্রতি ভক্তিই মুক্তির উপায় বলে মনে করা হয়।

পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম

ভক্তিধর্মের প্রবলতা গুপ্ত যুগ হতে দেখা যায়। ভাগবত বা বৈষ্ণবধর্ম, শৈবধর্ম প্রভৃতি ভক্তিধর্মকে লোকধর্মে পরিণত করে। নতুন দেবতাদের মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য পুরাণের সাহায্য নেওয়া হয়। এজন্য গুপ্ত যুগের হিন্দুধর্মকে অনেকে ব্রাহ্মণ্য বা বৈদিক হিন্দুধর্ম না বলে পৌরাণিক হিন্দুধর্ম বলে থাকেন।

সমন্বয়বাদ ভক্তিধর্ম

গুপ্ত যুগের হিন্দুধর্মকে ডঃ আর. কে. মুখার্জী “পুরাতন ও নতুন ধর্মীয় আদর্শের সমন্বয়যুক্ত বিভিন্ন প্যাটার্ণের মোজাইক” বলেছেন। বৈদিক হিন্দুধর্মের কিছু কিছু আচার-অনুষ্ঠান বজায় থাকলেও, বৈদিক দেব-দেবীর উপাসনা লোপ পায়।

বিষ্ণু ও শিবের জনপ্রিয়তা

গুপ্ত যুগে ত্রিমূৰ্ত্তি যথা – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের ঐক্য কল্পনা করা হয়। বৈদিক দেবতা ব্রহ্মার সঙ্গে লৌকিক দেবতা বিষ্ণু ও শিবের মিলন ঘটান হয়। কার্যত ব্রহ্মা অপেক্ষা বিষ্ণু ও শিবেরই জনপ্রিয়তা বাড়ে।

স্ত্রী দেবতার জনপ্রিয়তা

গুপ্ত যুগে যেমন শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ে তার সঙ্গে শক্তি অর্থাৎ স্ত্রীদেবতার পুজোর জনপ্রিয়তাও বাড়ে। উমা, হৈমবতী, কালী প্রভৃতির পুজো জনপ্রিয়তা পায়। তন্ত্র ধর্মের প্রসারতা দেখা যায়। স্ত্রী-দেবতাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ দেবতাদের স্ত্রীরূপে কল্পনা করা হয়৷

ভক্তি ধর্মের বিকাশ

গুপ্ত যুগে ভক্তিধর্মেরও বিশেষ বিকাশ ঘটে। যদিও বৈদিক যাগযজ্ঞকে ত্যাগ করা হয়নি, তার পাশাপাশি ভক্তিবাদ বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

মূর্তি পূজা

গুপ্ত যুগে মূর্তিপুজোর ব্যাপক প্রচলন হয়। দেব-বিগ্রহ নির্মাণ এবং মন্দিরে বিগ্রহ স্থাপন করে পুজোর প্রচলন এই যুগে ব্যাপক হয়।

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম

গুপ্ত যুগে কেবলমাত্র হিন্দুধর্মের জাগরণ ঘটে এমন নয়। ফা-হিয়েন বলেছেন যে, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মও গুপ্ত যুগে জনপ্রিয় ছিল। গুপ্ত সম্রাটরা ধর্ম-সহিঞ্চুতা নীতি নিয়ে এই সকল ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। দক্ষিণ ভারতে জৈনধর্ম বিশেষ প্রসার লাভ করে।

উপসংহার :- গুপ্ত যুগে বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রে বহু পরিবর্তন ঘটেছিল। এই যুগে বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব হয়েছিল। তারা, অবলোকিতশ্বরের পুজো বৌদ্ধদের মধ্যে আরম্ভ হয়েছিল। বোধিসত্ত্বের উপাসনাও আরম্ভ হয়েছিল।

(FAQ) গুপ্তযুগে ধর্মমত সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

শ্রীগুপ্ত।

২. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম সার্বভৌম রাজা কে ছিলেন?

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।

৩. গুপ্ত সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?

সমুদ্রগুপ্ত।

৪. লিচ্ছবি দৌহিত্র এবং ভারতের নেপোলিয়ন কাকে বলা হয়?

সমুদ্রগুপ্ত।

৫. শকারি কে ছিলেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »