মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা, ব্রিটিশকে সাহায্য দান, পরিকল্পনা ও সংগঠনের অভাব, বিদ্রোহীদের মধ্যে ঐক্যের অভাব, লক্ষ্যহীন বিদ্রোহ, যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, উপযুক্ত ইংরেজ সেনাপতি, ইংরেজদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইংরেজদের কূটকৌশল, জনসমর্থন বঞ্চিত বিদ্রোহ ও বিদ্রোহীদের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে জানবো।

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ (Causes of Failure of the Revolt)

দুর্বল নেতাদ্বিতীয় বাহাদুর শাহ
দক্ষ ইংরেজ সেনাপতিলরেন্স, আউট্রাম, ক্যাম্পবেল, হ্যাভলক, হিউ রোজ
ইংরেজদের অস্ত্রকামান, গোলা-বারুদ, টেলিগ্রাফ যন্ত্র
ভারতীয়দের অস্ত্রমাস্কেট বন্দুক, লাঠি, ঢাল-তলোয়ার, বল্লম
মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

ভূমিকা :- ভারতের এক বিস্তৃত এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা এবং নেতৃবৃন্দের ত্যাগ, বীরত্ব ও আত্মদান সত্ত্বেও ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের মধ্যেই সমগ্র ভারতে আবার ইংরেজ কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার পশ্চাতে নানা কারণ বিদ্যমান ছিল। যেমন –

(ক) আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা

  • (১) এই বিদ্রোহ ভারতের কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল, ভারতের সর্বত্র সম্প্রসারিত হয় নি।
  • (২) কেবলমাত্র উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, রোহিলখণ্ড, অযোধ্য এবং বাংলা ও বিহারের পশ্চিমাঞ্চলেই বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ছিল।
  • (৩) নর্মদা নদীর দক্ষিণাঞ্চল, মাদ্রাজ, গুজরাট, বোম্বাই, সিন্ধুদেশ, কাশ্মীর, রাজপুতানা, পাঞ্জাব, মধ্যভারত এবং মধ্য ও পূর্ব বাংলা প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহের কোনও প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নি।

(খ) ব্রিটিশকে সাহায্যদান

  • (১) ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী বাঈ, নানাসাহেব, বাহাদুর শাহ, অযোধ্যার রাজপরিবার এবং কিছু ক্ষুদ্র নৃপতি ব্যতীত অপর কোনও রাজা এই বিদ্রোহে যোগ দেন নি।
  • (২) অন্যদিকে গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকার, হায়দ্রাবাদের নিজাম, পাতিয়ালা, সরহিন্দ, নাভা, ঝিন্দ, কাশ্মীরের রাজা গুলাব সিং, নেপালের রানা জঙ্গ বাহাদুর যোধপুরের রাজা-সহ রাজপুতানার নৃপতিগণ, ভূপালের নবাব, এবং অপরাপর বহু নৃপতি বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের নানাভাবে সাহায্য করেন।
  • (৩) শিখ, গোর্খা, রাজপুত ও মারাঠা – এই যোদ্ধা জাতিগুলি সেদিন বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করেছিল। এদের সাহায্য না পেলে ইংরেজদের অবস্থা যে ভয়াবহ হয়ে উঠত তাতে সন্দেহ নেই।
  • (৪) বিদ্রোহের পরবর্তীকালে লর্ড ক্যানিং বলেন যে, “ঝড়ের মুখে ঝড়ের প্রথম ধাক্কাগুলি এরা ঠেকিয়ে রেখেছিল, তাই এই বিদ্রোহ তার সব শক্তি নিয়ে আমাদের উড়িয়ে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে নি। এরা না থাকলে আমরা ভেসে যেতাম।”
  • (৫) সিন্ধিয়া বিদ্রোহে যোগ দিলে অন্য মারাঠা রাজ্যগুলিও যোগ দিত। সিন্ধিয়া সম্পর্কে ক্যানিং লিখছেন, “সিন্ধিয়া যদি বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগ দেন তাহলে কালই আমাদের ভারত ছেড়ে পালাতে হবে।”
  • (৬) কাশ্মীরের মহারাজা গুলাব সিং সম্পর্কে জেনারেল লরেন্স লেখেন, “১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে আমাদের অবস্থা যে অনেকটা মহারাজার দয়ার ওপর নির্ভর করছিল, তা বললে অত্যুক্তি হবে না।”
  • (৭) জন ব্রুশ নর্টন নামে সমসাময়িক জনৈক ইংরেজ লেখেন যে, “হায়দ্রাবাদ যদি বিদ্রোহ ঘোষণা করত তাহলে আমরা সারা দক্ষিণ ভারতের বিদ্রোহ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারতাম না।”
  • (৮) তিনি নেপাল সম্পর্কে বলেন যে, “এই সময় নেপালে কোনও মিত্রভাবাপন্ন রাজা না থাকলে অবস্থা ঘোরালো হয়ে উঠত।”
  • (৯) দেশীয় রাজ্যগুলির সক্রিয় সাহায্য ও সহানুভূতি যে ইংরেজদের বিদ্রোহ দমনে প্রভূত সাহায্য করেছিল সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই।

(গ) পরিকল্পনা ও কেন্দ্রীয় সংগঠনের অভাব

  • (১) সুচিন্তিত পরিকল্পনা, কেন্দ্রীয় সংগঠন এবং বিপ্লবীদের মধ্যে সংহতি ও ঐক্যবোধের অভাব এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ।
  • (২) সুনির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্য নিয়ে বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এই বিদ্রোহ শুরু হয় নি বা পরিচালিত হয় নি।
  • (৩) বাহাদুর শাহ, নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া তোপি, কুনওয়ার সিং প্রমুখ নেতৃবর্গ কখনোই একত্রে বসে কোনও ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা বা কর্মসূচি গ্রহণ করেন নি।
  • (৪)মহাবিদ্রোহের নেতৃবর্গ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যাতে একের সঙ্গে অন্যের কোনও সংহতি ছিল না। তাঁরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে সুচিন্তিত কর্মপদ্ধতি নিয়ে বিপ্লবে অংশগ্রহণ করতেন, তাহলে এই মহাবিদ্রোহের ফলাফল ভিন্নতর হত।
  • (৫) বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করেছিল।বাইরে থেকে ক্রমাগত সেনা ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম না এনে ইংরেজদের পক্ষে দিল্লি পুনর্দখল কখনোই সম্ভব ছিল না।
  • (৬) বিদ্রোহীদের দ্বারা অধিকৃত অতি-বিপদসঙ্কুল একটি পথ অতিক্রম করে ইংরেজরা পাঞ্জাব থেকে সেনা ও যুদ্ধ-সরঞ্জাম এনে দিল্লি পুনর্দখল করে।
  • (৭) ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ও সমন্বয়ের অভাবে বিদ্রোহীরা পাঞ্জাব থেকে আগত এই সেনাদলকে কোনও প্রকার বাধা দিতে ব্যর্থ হয়।
  • (৮) কলকাতা, সিন্ধুদেশ, নেপাল ও হায়দ্রাবাদ থেকে সেনা পাঠিয়ে ইংরেজ-পক্ষ লক্ষ্ণৌ, কানপুর ও এলাহাবাদ পুনর্দখল করে। তাদেরও কোনওভাবে বাধা দেওয়া হয় নি।
  • (৯)অন্যদিকে ইংরেজ-পক্ষ দিল্লি বা অন্যান্য স্থান অবরোধ করলে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ কিন্তু দিল্লি বা ঐ সব স্থানের বিদ্রোহীদের সাহায্যে এগিয়ে যান নি।
  • (১০) তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা ও কেন্দ্রীয় সংগঠনের অভাব বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ।

(ঘ) বিদ্রোহীদের মধ্যেঐক্যের অভাব

  • (১) বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনও ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে নি। বিদ্রোহের নেতা হিসেবেবাহাদুর শাহের মনোনয়ন মারাঠা, রাজপুত ও শিখরা ভালোভাবে মেনে নিতে পারে নি। মোগল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
  • (২) হায়দ্রাবাদের নিজামও ব্যাপারটি ভালোভাবে নেন নি।কারণ, মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার ফলেই তাঁর পূর্বপুরুষরা স্বাধীন হায়দ্রাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলেন।
  • (৩) আবার নানাসাহেবের নেতৃত্বে পেশোয়াতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণার ফলে মোগল বাদশা-সহ অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলি আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
  • (৪) হিন্দু-মুসলিম বিরোধ, বাদশাহ ও পেশোয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং এই ধরনের অসংখ্য বিবাদ-বিসম্বাদ বিদ্রোহীদের এমনভাবে বিভক্ত করে রেখেছিল যে, তাদের পক্ষে কোনও ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।
  • (৫) বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মৌলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন যে, নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্র ভারতীয়দের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।

(ঙ) লক্ষ্যহীন বিদ্রোহ

  • (১) বিদ্রোহীদের লক্ষ্যের মধ্যেও কোনস্থিরতা ছিল না। বিভিন্ন নেতা বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন।
  • (২) বাহাদুর শাহের লক্ষ্য ছিল মোগল শক্তির পুনরুদ্ধার, নানাসাহেব চাইতেন পেশোয়া পদের পুনঃ প্রতিষ্ঠা, লক্ষ্মীবাঈয়ের উদ্দেশ্য ছিল নিজ রাজ্যের পুনরুদ্ধার।

(চ) যোগ্য নেতৃত্বের অভাব

  • (১) বিদ্রোহীদের প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা সত্ত্বেও উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে তা “স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছৃঙ্খলা”-য় পরিণত হয়।
  • (২) বিদ্রোহীদের মধ্যে এমন একজন নেতাও ছিলেন না, যিনি পরস্পর-বিরোধী ও বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারতেন।
  • (৩) বাহাদুর শাহ, নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া তোপি, কুনওয়ার সিং প্রমুখ নিজ নিজ এলাকায় দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিলেও তাঁদের কোনও সর্বভারতীয় ভাবমূর্তি ছিল না এবং তাঁরা সর্বভারতীয় কোনও বিপ্লবে নেতৃত্ব দানের যোগ্যও ছিলেন না।
  • (৪) মহাবিদ্রোহের নেতারা কেউই দেশপ্রেমের তাগিদে বিদ্রোহে যোগ দেন নি, ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত পড়ার পরেই তাঁরা বিদ্রোহে যোগ দেন। বস্তুতপক্ষে, তাঁরা কেউই মহৎ ছিলেন না, তাঁদের ওপর মহত্ব আরোপিত হয়েছিল।
  • (৫) নানাসাহেব কানপুরে বিপ্লবের মূল সংগঠক ছিলেন না বা তাঁর বিশেষ কোনও সামরিক প্রতিভাও ছিল না। কানপুরের বিদ্রোহী সেনাদল বাদশাহের সাহায্যার্থে দিল্লি যেতে উদ্যোগী হলে তিনি বাধা দেন।এর মূলে ছিল বাদশাহের প্রতি তাঁর ঈর্ষা।
  • (৬) বিদ্রোহী নেতৃবৃন্দের মধ্যে সবচেয়ে অযোগ্য ও অপদার্থ ছিলেন দুর্বলচিত্ত ও স্বার্থান্ধ বাদশাহ বাহাদুর শাহ। বিদ্রোহীদের ওপর তাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বিদ্রোহের আদর্শেও তিনি বিশ্বাস করতেন না, নিছক ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি বিদ্রোহে যোগদান করেন।
  • (৭) মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব -এ অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও বাহাদুর শাহ ও তাঁর বেগম জিন্নৎ মহল সর্বদাই ইংরেজদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রেখে চলতেন।
  • (৮) বীরত্বের দিক থেকে তাঁতিয়া তোপি ও কুনওয়ার সিং অন্যান্য নেতাদের অতিক্রম করে গেলেও তাঁদের কর্মধারা সংকীর্ণ স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
  • (৯) বীরাঙ্গনা লক্ষ্মীবাঈয়ের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হলেও তিনি কিন্তু প্রথমে বিদ্রোহে যোগ দেন নি, বরং তিনি ইংরেজদের সাহায্যই করেছিলেন। বীরত্ব ও দৃঢ়তার জন্য স্মরণীয় হলেও রাজনৈতিক বা সামরিক সংগঠক হিসেবে তিনি কোনও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেন নি।
  • (১০) পাঞ্জাবের শাসক ও ইংরেজ সেনাপতি স্যার হেনরি লরেন্স বলেন যে, “সিপাহিদের মধ্যে যদি একজনও প্রতিভাবান নেতা থাকত, তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেত।”

(ছ) উপযুক্ত ইংরেজ সেনাপতি

নিজ নিজ এলাকায় নানাসাহেব, তাঁতিয়া তোপি, লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং ব্যক্তিগত কৃতিত্বের পরিচয় দিলেও ইংরেজ সেনাপতি লরেন্স, আউট্রাম, ক্যাম্পবেল, হ্যাভলক, হিউ রোজ, নিকলসন প্রমুখের তুলনায় তাঁরা কিছুই ছিলেন না। এই সব উপযুক্তসেনাপতির যোগ্য পরিচালনা, রণকৌশল এবং ইংরেজ বাহিনীর শৃঙ্খলা তাদের জয়কে সুনিশ্চিত করে তোলে।

(জ) আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র

  • (১) যুদ্ধাস্ত্র, সাজ-সরঞ্জাম, রণকৌশল ও শৃঙ্খলার দিক থেকে ভারতীয়দের অপেক্ষা ইংরেজ বাহিনী অনেক উন্নত ছিল। ইংরেজদের কামান, গোলা-বারুদ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, অর্থ, সৈন্য ও সম্পদের কোনও অভাব ছিল না।
  • (২) ভারতীয় বাহিনীর হাতে ছিল ‘মাস্কেট বন্দুক, লাঠি, ঢাল-তলোয়ার, বল্লম প্রভৃতি। এগুলির সাহায্যে কামান বা এনফিল্ড রাইফেলের গুলির মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না।

(ঝ) উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা

  • (১) আধুনিক বিজ্ঞানকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে ইংরেজরা যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে।
  • (২) আধুনিক ডাক, তার, রেল ও সমুদ্রের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সংবাদ আদান-প্রদান, সৈন্য চলাচল ও যুদ্ধাস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে তারা প্রভূত লাভবান হয়।
  • (৩) নৌশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার ফলে তাদের পক্ষে ইংল্যাণ্ড, পারস্য, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি স্থান থেকে সেনাবাহিনী ও যুদ্ধাস্ত্র আনা সহজতর হয়।
  • (৪) ইংরেজদের যুদ্ধজয়ে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থারগুরুত্ব খর্ব করা যায় না। যুদ্ধকালে লন্ডনের বিখ্যাত টাইমসপত্রিকা লিখছে যে, আবিষ্কারের পর এই প্রথম টেলিগ্রাফ সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
  • (৫) টেলিগ্রাফ না থাকলে প্রধান সেনাপতি তাঁর বিজয়ের অর্ধেকও অর্জন করতে পারতেন না। বিদ্রোহীরাও তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে টেলিগ্রাফের গুরুত্বকে স্বীকার করেছেন। ভারতীয় বাহিনী এই সব সুবিধা থেকে একেবারেই বঞ্চিত ছিল।

(ঞ) ইংরেজদের কূট কৌশল

  • (১) ইংরেজদের কূটকৌশলও ভারতীয়দের ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল। বিদ্রোহের সময় ভারতীয়দের ভীতি প্রদর্শন করে এবং প্রয়োজনে চাকরি ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে বিদ্রোহে যোগদান থেকে বিরত করা হয়।
  • (২) কূটকৌশলের সাহায্যে তারা উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের উপজাতি গোষ্ঠীসমূহ ও আফগানদের সাহায্য লাভে সক্ষম হয়।
  • (৩) দশ বছর আগে পাঞ্জাব জয় করা সত্ত্বেও তারা পাঞ্জাবি সেনাদের সাহায্যে বিদ্রোহ দমন করে। ১৮৪৩-৪৪ খ্রিস্টাব্দে লর্ড এলেনবরা সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ সিন্ধিয়া-কেও ইংরেজরা দলে টানে।
  • (৪) ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে সমৃদ্ধশালী প্রদেশ বেরার ছিনিয়ে নেওয়ার পরেও নিজাম ইংরেজদের সাহায্যদানে অগ্রসর হন।

(ট) জনসমর্থন-বঞ্চিত বিদ্রোহ

  • (১) বিদ্রোহীদের পক্ষে বিশেষ জনসমর্থন ছিল না। বিদ্রোহীদের লুণ্ঠন ও অত্যাচারের ফলে জনজীবনে প্রবল ভীতির সঞ্চার হয়।
  • (২) এই সময় গ্রামবাসীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল সুদখোর মহাজন শ্রেণী। স্বাভাবিকভাবেই এই শ্রেণী বিদ্রোহের বিরুদ্ধাচরণ করে।
  • (৩) বণিক সম্প্রদায়ও বিদ্রোহের বিরোধী ছিল।কারণ, বিদ্রোহের ব্যয় নির্বাহের জন্য তাদের ওপর জুলুম চলত এবং তাদের গুদামজাত খাদ্যশস্যও বিদ্রোহীদের জন্য বের করে দিতে হত।
  • (৪) কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের বৃহৎ ব্যবসায়ীরা ইংরেজদের পক্ষেই ছিল।কারণ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ব্রিটিশ বণিকদের সঙ্গে লেন-দেন তাদের পক্ষে লাভজনক ছিল।
  • (৫) বাংলা ও বিহারের জমিদার শ্রেণী বিদ্রোহের বিরোধী ছিল। ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল।কারণ, তাদের কাছে ইংরেজ ছিল আধুনিক সভ্যতা, সংস্কৃতি ও যুগের প্রতিনিধি। সিপাহি বিদ্রোহকে তারা প্রতিক্রিয়াশীলতার নামান্তর ব্যতীত অন্য কিছু ভাবতে পারে নি।

(ঠ) বিদ্রোহীদের বিশ্বাস ঘাতকতা

  • (১) মোগল সম্রাটের কিছু কর্মচারী ও সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতা বিদ্রোহীদের পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে।
  • (২) বাহাদুর শাহ এবং তাঁর বেগম জিন্নৎ মহল সর্বদাই ইংরেজদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখতেন। এছাড়া, একাধিক মোগল কর্মচারী ও সামরিক ব্যক্তি এ ধরনের কাজেলিপ্ত ছিলেন।

উপসংহার :- প্রভূত উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উদ্যম সত্ত্বেও এই সব নানা কারণে মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। আসলে এই ব্যর্থতা কোনও আকস্মিক ব্যাপার নয়, তা অনিবার্য ছিল।

(FAQ) মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ (Causes of Failure of the Revolt) সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মহাবিদ্রোহের সবচেয়ে অযোগ্য ও দুর্বল নেতা কে ছিলেন?

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ।

২. মহাবিদ্রোহের সবচেয়ে সফল নেতা কে ছিলেন?

রাণী লক্ষ্মীবাই।

৩. মহাবিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের আধুনিক অস্ত্র কি ছিল?

টেলিগ্রাফ।

Leave a Reply

Translate »