রাখি বন্ধন

রাখি বন্ধন উৎসব উপলক্ষে সবার আগে রাখি বাঁধা, ভাই-বোনের উৎসব, ২০২৩ সালে রাখি বন্ধন উৎসব, রাখি বন্ধনের শুভক্ষণ, রাখি বন্ধনের অনুষ্ঠান, পৌরাণিক রাখি বন্ধন, ইতিহাসে রাখি বন্ধন ও রাখি বন্ধনের দিন রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে জানবো।

রাখি বন্ধন

উৎসবরাখি বন্ধন
ধরণধর্মীয় উৎসব
পালনকারীবিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়
সময়শ্রাবণ বা ভাদ্র মাস
তিথিপূর্ণিমা
রাখি বন্ধন

ভূমিকা :- হিন্দুদের উৎসব জীবনে বারো মাসে তের পার্বণ। আর এই সব উৎসবের মধ্যে একটি অন্যতম উৎসব হল রাখি পূর্ণিমা বা রাখি বন্ধন। সাধারণত শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই রাখি বন্ধন উৎসব হয়।

সবার আগে গণেশকে রাখি বাঁধা

সবার আগে গণেশকে রাখি বাঁধুন। এর ফলে ভাই-বোনের মনোমালিন্য দূর হবে এবং পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।

ভাই-বোনের উৎসব রাখি বন্ধন

মূলত বোন ও দিদিরা তাদের ভাইয়ের সুরক্ষার জন্য হাতে রাখি বাঁধেন। তবে শুধু ভাই-বোনের মধ্যে এই উৎসব সীমাবদ্ধ নেই। যে কোনও ব্যক্তির মঙ্গল কামনায় তাদের হাতে রাখি বাঁধা যায়। গোটা ভারত জুড়ে উদযাপন হয় এই রাখি বন্ধন উৎসব।

২০২৪ সালে রাখি বন্ধন উৎসব

এই বছর রাখি পূর্ণিমা উৎসবের দিন হল ১৯ অগাস্ট, সোমবার। পূর্ণিমা তিথি লাগবে ১৯ অগাস্ট, ভোর ৩.০৪ এ এবং শেষ হবে ১৯ অগাস্ট রাত ১১.৫৫ এ। শুভ রক্ষা বন্ধন মুহূর্ত হল দুপুর ১:৪৬ থেকে বিকাল ৪.১৯ পর্যন্ত।

রাখি বন্ধনের শুভক্ষণ

ভদ্রাকাল ১৯ অগাস্ট রাত ১ তা ৩০ মিনিটে সমাপ্ত হবে। শাস্ত্র মতে ভদ্রাকালে ভদ্রা মুখের সময় বাদ দিয়ে অন্যান্য সময়ে রাখি বন্ধনের মতো শুভ কাজ করা যেতে পারে। এ বার ভদ্রা লেজ থাকবে সকাল ১০ টা ৫৩ মিনিট থেকে দুপুর ১২ টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে ভদ্রার দোষে দুষ্ট হবেন না। তবে ভদ্রা মুখের সময়ে ভুলেও রাখি বাঁধবেন না।

রাখীবন্ধন উৎসবের অনুষ্ঠান

  • (১) রাখি পূর্ণিমার দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতের কবজিতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এর পরিবর্তে ভাই বোনকে উপহার দেয় এবং সারাজীবন তাকে রক্ষা করার শপথ নেয়।
  • (২) ভাই-বোন পরস্পর পরস্পরকে মিষ্টি খাওয়ায়। উত্তর ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে সহোদর ভাইবোন ছাড়াও জ্ঞাতি ভাইবোন এবং অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যেও রাখীবন্ধন উৎসব প্রচলিত। অনাত্মীয় ছেলেকেও ভাই বা দাদা মনে করে রাখী পরানোর রেওয়াজ আছে।
  • (৩) এই উৎসব মূলত হিন্দুদের ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব হলেও মুসলিম, জৈন, বৌদ্ধ ও শিখরাও এই উৎসব পালন করে।

পৌরাণিক রাখি বন্ধন

রাখি বন্ধন সম্পর্কে কিছু পৌরাণিক কাহিনী আছে। যেমন –

(ক) কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর রাখি বন্ধন

  • (১) ভারতের মহাকাব্য মহাভারতে আছে, ১০০ টি অপরাধ করার পর যখন শ্রী কৃষ্ণ শিশুপালকে হত্যা করার জন্য যুদ্ধ করছিলেন, তখন শ্রী কৃষ্ণের তর্জনী কেটে রক্তপাত শুরু হয়েছিল। পঞ্চ পাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল কিছুটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এর ফলে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান।
  • (২) দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও কৃষ্ণ তাকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন। তিনি দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর পর পাশাখেলায় বিজয়ী কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে। কৌরবরা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। এইভাবেই রাখি বন্ধন অনুষ্ঠান প্রচলিত হয়।

(খ) বলিরাজা ও লক্ষ্মী দেবীর রাখি বাঁধা

  • (১) ভগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণের ভিত্তিতে বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান বিষ্ণু যখন রাজা বলিকে পরাজিত করে তিনটি জগতের অধিকার নিয়েছিলেন, তখন বলি আশীর্বাদ স্বরূপ ভগবান বিষ্ণুকে তাঁর প্রাসাদে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বিষ্ণু সেই অনুরোধ রাখতে গিয়ে বলির রাজ্যে আটকে পড়েন।
  • (২) স্ত্রী লক্ষ্মী স্বামী বিষ্ণুকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। লক্ষ্মী বলিকে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যতদিন না স্বামী ফিরে আসেন, ততদিন যেন বলি তাঁকে আশ্রয় দেন। রাজা বলা ছদ্মবেশী লক্ষ্মী দেবী কে আশ্রয় দিতে রাজি হন।
  • (৩) শ্রাবণ পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে দেবী লক্ষ্মী বলিরাজার হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। রাজা বলি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী আত্মপরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এরপর রাজা বলি মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাজা বলি বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথি উপলক্ষে বোনেরা রাখীবন্ধন উৎসব পালন করে।

(গ) সন্তোষী মার রক্ষা বন্ধন

  • (১) ১৯৭৫ সালের বলিউডের জনপ্রিয় জয় সন্তোষী মা চলচ্চিত্রে রক্ষাবন্ধন সংক্রান্ত একটি গল্প বলা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় রাখি বন্ধনের দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। এটি দেখে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়। কারণ, তাদের কোনো বোন ছিল না।
  • (২) দুই ছেলে বাবার কাছে একটা বোনের বায়না ধরে। তখন গণেশ তাঁর দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি কন্যার জন্ম দেন। এই কন্যাই হলেন গণেশের মেয়ে দেবী সন্তোষী মা। এরপর সন্তোষী মা শুভ ও লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন

(ঘ) যম ও যমুনার রাখি উৎসব

যমের অমরত্বের প্রার্থনা করে তাঁর বোন যমুনা তাঁর হাতে একটি রাখি পরিয়ে দেন। এরপরই যমরাজ কথা দেন যে যাঁর হাতে তাঁর বোন রাখি পরিয়ে দেবেন, তাকে তিনি স্বয়ং রক্ষা করবেন।

ইতিহাসে রাখি বন্ধন

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ-এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে রাখি বন্ধন অনুষ্ঠানের কয়েকটি ঘটনা চোখে পড়ে। যেমন –

(ক) আলেকজান্ডার ও পুরু রাজা

  • (১) একটি বিশেষ কিংবদন্তি অনুসারে ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন। এই সময় আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের ক্ষতি না করার জন্য।
  • (২) ঝিলমের রাজা পুরু ছিলেন কাটোচ রাজা। তিনি রাখিকে বিশেষ সম্মান করতেন। হিদাস্পিসের যুদ্ধকালে তিনি নিজে আলেকজান্ডারকে আঘাত করেন নি। শেষ পর্যন্ত পুরু এই যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হন।

(খ) সম্রাট হুমায়ুন ও রানি কর্ণাবতী

  • (১) একটি জনপ্রিয় গল্প অনুসারে চিতোর-এর রানি কর্ণাবতী ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে একটি রাখি পাঠিয়েছিলেন। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করলে অসহায় বিধবা রানি কর্ণাবতী হুমায়ুনকে একটি রাখি পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন।
  • (২) কর্ণাবতীর রাখি প্রেরণে অভিভূত হয়ে হুমায়ুন চিতোর রক্ষা করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। অবশ্য হুমায়ুনের সেনা পাঠাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাহাদুর শাহ রানির দুর্গ জয় করে নিয়েছিলেন।
  • (৩) বাহাদুর শাহের সেনাবাহিনীর হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য ৮ মার্চ ১৫৩৫ সালে রানি কর্ণাবতী ১৩,০০০ পুরস্ত্রীকে নিয়ে জহর ব্রত পালন করে আগুনে আত্মাহুতি দেন। চিতোরে পৌঁছে সম্রাট হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে দুর্গ থেকে উৎখাত করেন এবং কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রমজিৎ সিংকে সিংহাসনে বসান।
  • (৪) সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে রাখী প্রেরণের কথা অবশ্য জানা যায় না। কোনো কোনো ঐতিহাসিক রাখি পাঠানোর গল্পটির সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন। তবে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি রাজস্থানী লোকগাথায় এই রাখি প্রেরণ কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

(গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রাখী বন্ধন

  • (১) ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা করেন। ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেছিলেন। তিনি কলকাতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম ভাই-বোনকে আহ্বান করেছিলেন একতার প্রতীক হিসাবে রাখী বন্ধন উৎসব পালন করার জন্য।
  • (২) তৎকালীন সময়ে দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা চরম পর্যায়ে ছিল। আমরা আজ একবিংশ শতকে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করছি। কিন্তু ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একতা আনার জন্য রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হয়েছিল।
  • (৩) উনিশ শতকে বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম পর্যায়ে ছিল যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-এর কাছে ছিল অপরিমিত ভয়ের কারণ। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করবে।
  • (৪) সেই সময় রবীন্দ্রনাথ সহ ভারতের বিভিন্ন নেতা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিল এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯০৫ সালের জুন মাসে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গভঙ্গের উদ্দেশ্যে আইন পাশ করা হয়। এই আইন কার্যকরী করা হয় ১৬ ই অক্টোবর, ১৯০৫ সালে।
  • (৫) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়ে তোলা এবং ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করার জন্য আহ্বান করেন। এরপর থেকে শ্রাবণ মাসে হিন্দু ভাইবোনদের মধ্যে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হয়।

রাখি বন্ধনের দিন রবীন্দ্রনাথের গান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দিনটির উদ্দেশে একটি গান লিখেছিলেন –

“বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল –

পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।

বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ –

পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।

বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা –

সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।

বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন –

এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।”

উপসংহার :- ভাই-বোনের সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতেই বর্তমানে রাখি বন্ধন উত্‍সব পালন করে থাকি আমরা। রাখির সুতোয় আরও গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হয় ভাই-বোনের সম্পর্ক।

(FAQ) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমচন্দ্র কানুনগো সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হয় কোন মাসে?

শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসে।

২. কোন তিথিতে রাখি বন্ধন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়?

পূর্ণিমা তিথিতে।

৩. ভারতের ইতিহাসে রাখি বন্ধন কর্মসূচী কে পালন করেছিলেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর।

৪. কোন ঘটনার প্রতিরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন?

বঙ্গভঙ্গ।

৫. ২০২৩ সালের রাখি বন্ধন উৎসব কবে পালিত হবে?

৩০ আগস্ট, বুধবার।

Leave a Comment