ভারত রাশিয়া সম্পর্ক

ভারত রাশিয়া সম্পর্ক প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত রাধাকৃষ্ণান, বাণিজ্যিক চুক্তি, রুশ নেতৃবৃন্দের ভারত ভ্রমণ, সাহায্যের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক মিত্রতা, সামরিক চুক্তি, অর্থনৈতিক সাহায্য এবং ভারত-রুশ মৈত্রীর ফলাফল সম্পর্কে জানবো।

ভারত রাশিয়া সম্পর্ক

বিষয় ভারত রাশিয়া সম্পর্ক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু
রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বুলগানিন
রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূত ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান
ভারত রাশিয়া সম্পর্ক

ভূমিকা:- ভারত -এর স্বাধীনতা লাভের প্রথম দিকে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের তেমন কোনো সম্পর্কই ছিল না। স্ট্যালিন-শাসিত রাশিয়া ভারতের স্বাধীনতাকে ‘ভূয়া’ বলে মনে করত। স্ট্যালিনের ধারণা ছিল যে, ভারত ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিজোটের অনুগামী একটি রাষ্ট্র ব্যতীত অন্য কিছু নয়।

চীনকে স্বীকৃতি

১৯৪৯ সালের শেষদিক থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে। ভারত ‘গণ-প্রজাতন্ত্রী চীন’-কে স্বীকৃতি দেয় এবং জাতিপুঞ্জ -এ চীন -এর অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। এর ফলে ভারত সম্পর্কে রুশ ধারণার পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

রাষ্ট্রদূত রাধাকৃষ্ণান

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে কোরিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে ভারতের নিরপেক্ষ ভূমিকা রুশ নেতৃবৃন্দকে প্রভাবিত করে। বিশিষ্ট দার্শনিক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হলে দু’দেশের সম্পর্ক আরও মসৃণ হয়।

বাণিজ্যিক চুক্তি

রুশ রাষ্ট্রপ্রধান স্ট্যালিন একাধিকবার রাধাকৃষ্ণানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সময় ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার একটি বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদিত হয়।

পশ্চিমী শক্তিজোটে পাকিস্তানের যোগদান

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। পাকিস্তান পশ্চিমি শক্তিজোট SEATO এবং CENTO-তে যোগ দিলে ভারত-সোভিয়েত রাশিয়া যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং রাশিয়া ভারতকে যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

রুশ নেতৃবৃন্দের ভারত ভ্রমণ

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল রাশিয়া ভ্রমণে যান এবং সেখানে অভূতপূর্ব সমাদর লাভ করেন। ঐ বছর নভেম্বর মাসে রুশ প্রধানমন্ত্রী বুলগানিন এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিকিতা ক্রুশ্চেভ ভারতে আসেন।

অভূতপূর্ব সম্বর্ধনা

ভারতে তাঁরা যে বিপুল গণ-সম্বর্ধনা পান ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো বিদেশী নেতা তা পান নি। ভারতে অবস্থানকালে তাঁরা ঘোষণা করেন যে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া, তখনও পর্তুগীজদের দ্বারা গোয়া, দমন ও দিউ দখল করে থাকার তাঁরা তীব্র নিন্দা করেন।

সাহায্যের প্রতিশ্রুতি

ভারতের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল্যে তাঁরা আনন্দ প্রকাশ করেন এবং ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁরা নানা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।

রাজনৈতিক মিত্রতা

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে কাশ্মীর প্রশ্নে সোভিয়েত রাশিয়া সর্বদাই ভারতের পাশে আছে এবং জাতিপুঞ্জে বারংবার ‘ভেটো’ প্রদান করে রাশিয়া ভারতকে সাহায্য করেছে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে গোয়া, দমন, নিউ-এ পর্তুগীজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই স্থানগুলি ভারতভুক্ত করা হয়।

নিরপেক্ষ রাশিয়া

পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলি ভারতের নিন্দায় সোচ্চার হলে রাশিয়া ভারতের পাশে দাঁড়ায় এবং জাতিপুঞ্জেও ভারতকে সমর্থন করে। ১৯৫৯ সাল থেকে ভারত-চীন সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠতে শুরু করলে রাশিয়া নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ ভারতকে ‘বন্ধু’ এবং চীনকে ‘ভাই’ বলে বর্ণনা করেন।

হৃদ্যতা বৃদ্ধি

রাশিয়া তখন চীনকে সাহায্য করে ভারতকে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের দিকে যেতে বাধ্য করে নি। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়।

সামরিক চুক্তি

১৯৫৯ থেকে চীন-রুশ সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং এই বছরেই প্রথম ভারত-রুশ একটি সামরিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া ভারতে প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধের উপকরণ সরবরাহ করে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ভারত-চীন যুদ্ধ -এর পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া ভারতে প্রচুর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র পাঠায় এবং মিগ বিমান তৈরির ব্যাপারে ভারতকে সাহায্য করে।

অর্থনৈতিক সাহায্য

  • (১) ভারতের আর্থিক পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারেও রুশ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ভারতের শিল্পায়ন ও ভারী শিল্পোৎপাদনে রুশ সাহায্য ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। হিরাকুঁদ, কোরবা, ভাকরা ও অন্যান্য সাতটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল রুশ সাহায্যের ফল।
  • (২) প্রায় ৬৬টি শিল্পকেন্দ্র নির্মাণে ভারত রুশ সাহায্য পায়। রাঁচি ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা, ভিলাই লৌহ কারখানা, বারোনী তৈল শোধনাগার, মাদ্রাজ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ফ্যাক্টরি প্রভৃতি হল রুশ মিত্রতার নিদর্শন।

ভারত-রুশ মৈত্রীর ফলে দু’পক্ষই উপকৃত হয়। যেমন –

  • (১) ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের ফলে এশিয়া আফ্রিকার সদ্য-স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ারও বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় এবং পশ্চিমি শক্তিজোটের সঙ্গে না গিয়ে এই রাষ্ট্রগুলি রাশিয়ার সঙ্গেই সহযোগিতা করতে থাকে। এর ফলে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়া একটি সুবিধাজনক স্থান লাভ করে।
  • (২) ভারতের মত রাশিয়ারও চীনের সঙ্গে বিস্তৃত ও বিতর্কিত সীমান্ত ছিল। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার বন্ধুত্ব চীনকে কিছুটা সংযত রাখে।

উপসংহার:- রাশিয়া চারিদিকেই আমেরিকা-প্রভাবিত শক্তিজোট ও রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এই অবস্থায় ভারত সহ গোষ্ঠী-নিরপেক্ষ দেশগুলির বন্ধুত্ব রাশিয়াকে নিঃসন্দেহে যথেষ্ট সাহায্য করে।

(FAQ) ভারত রাশিয়া সম্পর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারত-চীন যুদ্ধের সময় ভারতকে সামরিক সাহায্য করে কোন দেশ?

রাশিয়া।

২. ভারতে আগত রুশ প্রধানমন্ত্রীর নাম কি?

বুলগানিন।

৩. রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত কে ছিলেন?

বা. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান।

Leave a Reply

Translate »