চোল অর্থনৈতিক জীবন

চোল অর্থনৈতিক জীবন প্রসঙ্গে গ্ৰামীণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ভূমি ব্যবস্থা, বিভিন্ন জীবিকা, ভূমি রাজস্ব, নগর জীবিকা, শিল্প ও বানিজ্য, নিগম ও ধনিক শ্রেণীর উদ্ভব সম্পর্কে জানবো।

চোল অর্থনৈতিক জীবন

বিষয় চোল অর্থনৈতিক জীবন
বংশ চোল বংশ
রাজধানী তাঞ্জোর
প্রথম রাজা বিজয়ালয়
শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোল
শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম কুলোত্তুঙ্গ
চোল অর্থনৈতিক জীবন

ভূমিকা :- দক্ষিণ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল চোল বংশ। এই বংশের রাজেন্দ্র চোল সাম্রাজ্যের চরম উন্নতি সাধন করেন। চোল অর্থনীতি ছিল বেশ স্বচ্ছল। চোল গ্ৰামগুলি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ।

গ্ৰামীন স্বয়ংসম্পূর্ণতা

চোল গ্রামগুলির স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা চোলদের গ্রামীণ অর্থনীতির স্বয়ং সম্পূর্ণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। গ্রামগুলিতে যা উৎপাদন হত তার দ্বারা প্রধানত গ্রামবাসীর প্রয়োজন মিটত। এজন্যই চোল গ্রামগুলি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। চোল রাজকর্মচারীরা গ্রামের শাসন ব্যবস্থার জন্য হস্তক্ষেপ করবার অবকাশ বেশী পেত না।

ভূমি ব্যবস্থা

  • (১) চোল গ্রামের জমিগুলিতে গ্রামবাসীদের যৌথ স্বত্ব থাকত। সমগ্র গ্রাম, গ্রামের জমির দেয় খাজনার জন্য দায়ী থাকত। গ্রামসভা গ্রামবাসীদের মধ্যে জমি বিলি করত। তবে কৃষক জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে জমি অধিকার করত ও আবাদ করত।
  • (২) সমগ্র গ্রামবাসী তাদের দেয় রাজস্ব সামন্ত রাজাকে অথবা রাজকর্মচারীকে আদায় দিত। কখনও কখনও মন্দিরের দেবত্র জমি কৃষকরা মন্দিরের প্রজা হিসেবে আবাদ করত। বেগার প্রথার প্রচলন ছিল।
  • (৩) মন্দিরের জমিতে কৃষকরা বেগার খাটত। মন্দিরের বিভিন্ন সেবা কাজ যথা পরিষ্কার রাখা, ফুল যোগান ইত্যাদির জন্য জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হত। অনেক সময় সামন্ত রাজারা সেনা শক্তি বাড়াবার জন্য সামরিক কাজের বিনিময়ে জমি দিত। ব্রাহ্মণরা নিষ্কর বা অগ্রহার জমি ভোগ করত।

বিভিন্ন জীবিকা

  • (১) গ্রামের সমাজে জমির ওপর স্বত্বের ভিত্তিতে গ্রামবাসীর সামাজিক মর্যাদা স্থির হত। নিজ জমির মালিক কৃষকের সঙ্গে ভূমিহীন বেগার খাটা কৃষকের সামাজিক মর্যাদার তারতম্য ছিল। ভূমিহীন কৃষক বা কৃষি শ্রমিকরা গ্রামসভার সদস্য হতে পারত না।
  • (২) ভূমিহীন শ্রমিকরা অপরের জমিতে খেটে বা জঙ্গলে কাঠ কেটে জীবিকার সংস্থান করত। কৃষকরা জঙ্গল কেটে বা জলা জমি সাফ করে নতুন আবাদযোগ্য জমি তৈরি করত। এছাড়া গো মহিষ প্রজনন, গো-মহিষ, ভেড়া প্রভৃতি পালন ছিল সহকারী উপজীবিকা।

ভূমি রাজস্ব

  • (১) চাষের জমিতে বছরে ২/৩টি ফসল ফলত। জমির ফসলের অনুপাতে জমির রাজস্ব ধার্য হত। চলতি রাজস্বের হার ছিল ফসলের ১/৩ ভাগ। এছাড়া গ্রামের স্থানীয় শাসনের জন্য নানা কর ও সেচ কর ছিল।
  • (২) গৃহ, জমি, পুষ্করিণী, খাল, মন্দিরের জমি ও শ্মশানে কোনো কর দিতে হত না। সাধারণ লোকে ডাল, ভাত, তরকারি খেত। মাংস ছিল ব্যয়বহুল। যাদের হাতে সংসার খরচ মিটিয়ে বাড়তি টাকা থাকত তারা পতিত জমিকে আবাদযোগ্য করত অথবা সেচের জন্য পুষ্করিণী খোদাই করত, অথবা মন্দিরে অর্থদান করত।

নগর জীবিকা

  • (১) একাদশ শতক থেকে চোল বাণিজ্যের বিস্তারের ফলে এক শ্রেণীর বণিক ও কারিগরের হাতে অর্থ জমতে থাকে। তারা ধনশালী শ্রেণীতে পরিণত হয়। এদের অর্থে ও প্রচেষ্টায় চোল রাজ্যে নগরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
  • (২) নগরবাসীর প্রয়োজন মেটাতে গ্রামের উৎপাদনকে কাজে লাগান হয়। গ্রামের লোক নগদ টাকার লোভে শহরে খাদ্যবস্তু ও দ্রব্যাদি চালান দিলে গ্রামের স্বয়ং-সম্পূর্ণতা নষ্ট হয়। চোল গ্রামগুলির প্রাচীন শান্ত, স্বচ্ছল, স্বয়ং-সম্পূর্ণ জীবনে ব্যাঘাত ঘটে।

শিল্প ও বাণিজ্য

  • (১) চোল কারিগরশ্রেণী উন্নত মানের বস্ত্র, ধাতু দ্রব্য, মৃৎপাত্র, লবণ রপ্তানির জন্য উৎপাদন করত। এছাড়া মশলা, দামী পাথর, চন্দন কাঠ, মুক্তা, হাতির দাঁতের জিনিষ, কর্পূর প্রভৃতি রপ্তানি হত। চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য মহাবলীপুরম, কাবেরীপত্তনম, কোরকাই, শালিয়ার বিখ্যাত ছিল।
  • (২) কুইলন বন্দর থেকে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। চীনের পশ্চিমে মোঙ্গল আক্রমণের ফলে স্থলপথে অর্থাৎ মধ্য এশিয়ার পথে চীনা বাণিজ্য বন্ধ হলে সমুদ্রপথে চোল রাজ্য হয়ে পশ্চিম এশিয়ায় চীনা পশম প্রভৃতি রপ্তানি হত। সেখান থেকে এই মাল ইউরোপে যেত।

চীন চোল রাজ্য থেকে মালের বিনিময়ে কর্পূর, চন্দন কাঠ, সূতী বস্ত্র, মশলা খরিদ করত। চোল রাজারা আরব দেশ থেকে উৎকৃষ্ট যুদ্ধের ঘোড়া আমদানি করতেন। মার্কোপোলোর মতে ভারতের পশু চিকিৎসার ভাল ব্যবস্থা না থাকায় এই ঘোড়াগুলি স্বল্পকালের মধ্যেই মারা পড়ত।

নিগম

  • (১) চোল বাণিজ্যের প্রসারের ফলে নিগম বা গিল্ড ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। স্থানীয় ক্ষুদ্র নিগমগুলির নাম ছিল নগরম, আর বৃহৎ নিগমগুলির নাম ছিল মণিগ্রামস। নিগমগুলি নির্দিষ্ট মূল্যে বণিকদের এক স্থানে মাল কিনে অপর স্থানে তা বিক্রি করতে দিত। বড় নিগমগুলি রপ্তানি বাণিজ্যে লিপ্ত থাকত।
  • (২) যদি অপর কোনো বণিক বা নিগম তাদের ক্ষতির চেষ্টা করত সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করত। শৈলেন্দ্র রাজবংশ নিগমগুলির চীনা বাণিজ্য হাত করার চেষ্টা করলে রাজেন্দ্র বাহুবলে শৈলেন্দ্ররাজকে দমিয়ে দেন।
  • (৩) রাজা, রাজপরিবারের লোক, ধনী কর্মচারীরা নিগমগুলিতে টাকা খাটাতেন এবং সুদ পেতেন। তারা নিগমে টাকা লগ্নী করার জন্যে বণিকদের কাছ থেকে উপঢৌকন পেতেন।

ধনিক শ্রেণীর উদ্ভব

বাণিজ্যের বিস্তারের ফলে চোল সাম্রাজ্যে বুর্জোয়া বণিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। তবে চোল সামন্তদের হাত থেকে এই বণিক শ্রেণী রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। এর কারণ হল যে, রাজা নিজেই বণিকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাণিজ্য কর্মে রত থাকতেন এবং তিনি বণিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন রচনা করতেন।

উপসংহার :- বহু ব্রাহ্মণও নিগমে অর্থ লগ্নী করে বাণিজ্যের ভাগীদার হত। তাছাড়া প্রাচীন ভারতে রাজতন্ত্র এমন একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠান ছিল যে, বুর্জোয়াশ্রেণী একে আঘাত করতে সাহস করে নি।

(FAQ) চোল অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চোলদের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

বিজয়ালয়।

২. চোলদের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম রাজেন্দ্র চোল।

৩. চোলদের শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম কুলোত্তুঙ্গ।

৪. চোলদের শেষ রাজা কে ছিলেন?

তৃতীয় রাজেন্দ্র।

৫। চোলদেল রাজধানী কোথায় ছিল?

তাঞ্জোর।

Leave a Reply

Translate »