পল্লব শিল্প ও সাহিত্য

পল্লব শিল্প ও সাহিত্য প্রসঙ্গে পল্লব শিল্পের বৈশিষ্ট্য, মহামল্ল রীতি, সপ্ত প্যাগোডা, রাজসিংহ শৈলী, তীর মন্দির, কৈলাসনাথ মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, অপরাজিত রীতি, ভাস্কর্য ও পল্লব সাহিত্য সম্পর্কে জানবো।

পল্লব শিল্প ও সাহিত্য

বিষয় পল্লব শিল্প ও সাহিত্য
বংশ পল্লব বংশ
রাজধানী কাঞ্চী
প্রথম রাজা শিবস্কন্দ বর্মন
শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম নরসিংহ বর্মন
শেষ রাজা অপরাজিত বর্মন
পল্লব শিল্প ও সাহিত্য

ভূমিকা :- পল্লব রাজারা রাজ্য বিস্তার করে যেমন তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিচয় দেন, তেমনি শিল্প, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার দ্বারা তাঁদের বিদগ্ধ মনের পরিচয় রাখেন।

পল্লব শিল্পের বৈশিষ্ট

  • (১) পল্লব শিল্প এমন একটি বিশেষ রীতি ও ভঙ্গিতে গঠিত হয়, যা ছিল পল্লব রাজাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে এই শিল্পের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে। সূক্ষ্ম শিল্পের কাজে ও সৌন্দর্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে পল্লবরা স্বকীয়তা দেখান।
  • (২) চোল শিল্পের বিরাটত্ব পরিত্যাগ করে তাঁর সৌন্দর্য ও সুষমার দিকে তাঁরা বেশী দৃষ্টি দেন। এই যুগের শিল্প ভাবনা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। ধর্মীয় বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করেই শিল্প বিকশিত হত। পল্লব শিল্পগুলি এজন্য দেবদেবীর মন্দির ও রথের আকারেই বিকশিত হত।
  • (৩) পল্লব শিল্পের বৈশিষ্ট্য ছিল গোটা একটি পাহাড়কে কেটে রথ বা মন্দিরের আকৃতিতে পরিণত করা এবং সেই মন্দিরের গায়ে ভাস্কর্যের কাজ। রোমিলা থাপার বলেছেন যে, বৌদ্ধ গুহা মন্দিরের অনুকরণে পল্লব পাহাড়-কাটা মন্দিরগুলি তৈরি হয়।
  • (৪) পল্লব মন্দিরগুলির নিজস্ব কিছু প্রকরণ ও রীতি ছিল। বিভিন্ন সময়ে এই রীতি ও ভঙ্গিমার বিবর্তন ঘটে। সুতরাং যদি আদপেই অনুকরণ করা হয়ে থাকে তা অন্ধ অনুকরণ ছিল না, একথা বলা চলে।
  • (৫) পল্লব যুগের মন্দির যারা নির্মাণ করেন তাদের শিল্প ভাবনায় বংশগত শিক্ষা ও দক্ষতা নিশ্চয়ই ছিল। তাদের পূর্ব-পুরুষরা দারুশিল্পে যে দক্ষতা দেখান, পল্লব শিল্পীরা পাথর খোদাইয়ের কাজে সেই দক্ষতা দেখান। পল্লব মন্দিরগুলি দু’ধরনের ছিল যথা, পাহাড় খোদাই করে মন্দির ও স্বাধীন, স্বতন্ত্র মন্দির।

মহেন্দ্র বর্মনের আমলে তৈরি মন্দির

  • (১) পল্লব রাজা মহেন্দ্র বর্মণের আমলের মন্দিরগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। সাধারণ স্তম্ভ ও মণ্ডপ যুক্ত মন্দির, বৌদ্ধ বিহারের অনুকরণে পাহাড় কেটে গুহা মন্দির। শেষের রীতি পল্লব স্থাপত্যে ও অনন্ত শায়ন ও ভৈরব কোন্ড মন্দিরের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
  • (২) স্তম্ভযুক্ত ভাস্কর্যের বিভিন্ন শৈলী মণ্ডপের উচ্চতা ৫০ ফুট। স্তম্ভগুলির ভাস্কর্য অসাধারণ এবং সিংহের আকারে খোদাই। এছাড়া একাম্বরনাথ মন্দিরের নির্মাণেও মহেন্দ্র রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। মহেন্দ্র রীতির বৈশিষ্ট্য ছিল পাহাড়ের ভিতরটি পুরো কেটে তার ভেতর গুহা মন্দির তৈরি। পাহাড়ের ছাদ ধরে রাখার জন্য ত্রিকোণ থাম অথবা গোলাকার থাম।

মহামল্ল রীতি

  • (১) মহামল্ল রীতি নরসিংহবর্মনের আমলে চালু হয়। এই রীতিকে একশিলা বা রথশৈলীও বলা হয়। মাদ্রাজের দক্ষিণে মহাবলীপুরমের পাচটি রথ এই রীতির পরিচয় দেয়। পুরা গ্রানাইট পাথরের পাহাড় কেটে সমুদ্রতীরে রথের আকৃতির মন্দির তৈরি করা হয়। গুহা মন্দির বা মণ্ডপগুলিও পাহাড় খোদাই করে তৈরি করা হয়।
  • (২) এছাড়া এই রীতি অনুসারে পাহাড় খোদাই করে গুহা মন্দির নির্মাণ করা হয়। এই গুহা মন্দিরগুলির মধ্যে ত্রিমূর্তি, বরাহ, দুর্গা প্রভৃতির গুহা মন্দির পাহাড় খোদাই করে তৈরি করা হয়। এই মণ্ডপগুলি মহেন্দ্র আমলের মণ্ডপ অপেক্ষা প্রশস্ত এবং উঁচু।

সপ্ত প্যাগোডা

  • (১) মহাবলীপুরমে মোট ৮টি রথ আছে। সাধারণত এই রথগুলিকে ‘সপ্ত প্যাগোডা’ নাম দেওয়া হয়। এই রথগুলির ৫টি রথ পঞ্চ পাণ্ডবের নামে ও একটি দ্রৌপদীর নামে, একটি গণেশের নামে। সব কটি রথ বা মন্দির হল শিব মন্দির।
  • (২) সহদেব, ভীম ও ধর্মরাজ রথের চূড়া পিরামিডের মত ধাপে ধাপে কোণা হয়ে গেছে এবং জানালাগুলি বৌদ্ধ চৈত্যের জানালার আদলে খোদাই করা। অর্জুন রথটিতে দ্রাবিড় শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। রথগুলি গড়ে লম্বায় ৪২ ফুট, চওড়ায় ৩৫ ফুট, উচ্চতায় ৪০ ফুট।
  • (৩) সমালোচকদের মতে, এই রথগুলির নির্মাণ দ্বারা পল্লব স্থাপত্যের একটি যুগের অবসান সূচিত হয়। রথগুলির ভেতর দিক অসম্পূর্ণ হলেও বাইরে অসাধারণ সূক্ষ্ম ভাস্কর্যের কাজ দেখা যায়।

রাজসিংহ শৈলী

  • (১) মহামল্ল যুগের পরে পল্লব স্থাপত্যে নতুন রীতির সৃষ্টি হয়। গুহামন্দির বা রথ মন্দিরের পরিবর্তে পাথর দিয়ে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মন্দির নির্মাণ আরম্ভ হয়। এই রীতিতে রাজসিংহ রীতির মন্দিরও তৈরি হয়। রাজসিংহ রীতি কাঞ্চীর পাথর সাজিয়ে নির্মিত কয়েকটি মন্দিরে দেখা যায়।
  • (২) মহাবলীপুরমেও এরূপ কয়েকটি মন্দির তৈরি করা হয়। কাঞ্চীর কৈলাসনাথ মন্দির হল এই রীতির প্রখ্যাত নিদর্শন। এছাড়া বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরেরও নাম উল্লেখ্য।
  • (৩) রাজসিংহ রীতির মন্দিরের সংখ্যা হল ছয়টি। তার মধ্যে আছে তিনটি তীর মন্দির – ঈশ্বর ও মুকুন্দ মন্দির এবং কাঞ্চীর কৈলাসনাথ ও বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দির এবং আর্কটের পনমলই মন্দির। এই মন্দিরগুলির মধ্যে অমরাবতীর শিল্পকলার প্রভাব দেখা যায়।

তীর মন্দির

তীর মন্দিরগুলির মধ্যে শিব ও বিষ্ণু মন্দির আছে। মন্দিরগুলি চারকোণা রথের আদলে তৈরি পিরামিডের মত বিমান আছে। বিমানগুলি ছন্দোবদ্ধ, শিল্পীর আবেগ যেন তাতে কীর্তিমতী।

কৈলাসনাথ মন্দির

কৈলাসনাথ মন্দির সর্বশ্রেষ্ঠ স্বতন্ত্র মন্দির। প্রধান মন্দিরের সংলগ্ন ৭টি মন্দির আছে। সিংহের মূর্তিযুক্ত স্তম্ভ ছাদকে ধরে রেখেছে। মন্দিরের বিমান সুউচ্চ, সুষম। মন্দিরের ভিত্তি গ্রানাইট পাথরের তৈরি।

বিষ্ণুর মন্দির

বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দির হল বিষ্ণুর মন্দির। এর বিভিন্ন অংশ ঘন সংবদ্ধ। মন্দিরের দ্রাবিড় শিল্পরীতিতে মার্জনা ও পরিশীলতার ছাপ সুস্পষ্ট।

অপরাজিত রীতি

পল্লব স্থাপত্যের শেষ ধাপে ছিল অপরাজিত রীতি। অপরাজিত পল্লব এই রীতির প্রবর্তন করেন। এই রীতির নিজস্ব কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। চোল শিল্পের অনুকরণে এই রীতি গঠিত হয়।

ভাস্কর্য

  • (১) ডঃ সরস্বতীর মতে, পল্লব বেঙ্গী বা অমরাবতীর ভাস্কর্য শৈলীর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তবে বেঙ্গীর তীব্র ভাবাবেগ পল্লব রীতিতে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হয়। তথাপি বেঙ্গীর দেহ সৌষ্টব, ভঙ্গী, সুষমা পল্লব রীতিতে স্থান পেয়েছে। কোনো কোনো মূর্তিতে দ্রাবিড় রীতির গুরুভার নিতম্ব, সরল ঘনরুচির মত সংবদ্ধ কেশদাম, স্ফুরিত ওষ্ঠাধরা নারীমূর্তি দ্রাবিড় রীতির সাক্ষ্য দেয়।
  • (২) পল্লব ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মহাবলীপুরমের “গঙ্গাবতরণের” রিলিফ। একদা এই রিলিফটিকে সমালোচকরা ভগীরথের গঙ্গা আনয়নের কাহিনীযুক্ত বলে মনে করতেন। কিন্তু অধুনা সমালোচকরা মত পালটে বলছেন যে, কিরাতার্জুনীয়ের পৌরাণিক কাহিনীটি এই রিলিফে খোদাই করা হয়েছে।
  • (৩) ভাস্কর্যের এই ফলকটি ৩০ গজ লম্বা ও ২৩ ফুট উঁচু। এতে অসংখ্য মানুষ ও জীবজন্তুর মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। পাহাড়ের গা কেটে এই রিলিফটি খোদাই করা হয়েছে। অনেকে এজন্য রিলিফটিকে পাথরের প্রাচীর চিত্র বলে অভিহিত করেন।
  • (৪) শিল্প সমালোচকরা এটিকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য বলে মনে করেন। মূর্তিগুলিতে মূল কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গতি এবং সংযমবোধ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তবে Joy de Vivre বা বাঁচার আনন্দ মূর্তি ও তার রেখার ছত্রে ফুটে উঠেছে।
  • (৫) মহাকাব্যের বিষয়বস্তুকে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জীব-জন্তুর মূর্তিগুলিতে গভীর মানবতাবোধের প্রকাশ ও শিল্প-সুষমার অভিব্যক্তি মিলিত হয়েছে। মহাবলীপুরমের এই ভাস্কর্য পট ছাড়া, গুহা মন্দিরগুলির দেওয়ালে ভাস্কর্যের কাজও অত্যন্ত উন্নত মানের।
  • (৬) কৃষ্ণ মণ্ডপে পশু পালকের রিলিফ, মহিষমর্দিনী মণ্ডপে দেবী দুর্গার সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ দৃশ্য, অনন্ত শয্যায় বিষ্ণুর মাথার ওপর ছত্র হিসাবে ফণাধারী শেষ নাগ, বরাহ অবতারের দৃশ্য প্রভৃতির রিলিফের ভাস্কর্য অতুলনীয়।
  • (৭) তাছাড়া বরাহ গুহার ভাস্কর্যমণ্ডিত থামগুলির কথাও ভোলা উচিত নয়। কিন্তু মহামল্ল গুহা ভাস্কর্যের এই প্রাণশক্তি তীরের রথগুলির ভাস্কর্যে আশ্চর্যরকমভাবে অনুপস্থিত। সেখানে মূর্তিগুলিতে এই আশ্চর্য গতিময়তা নেই, আছে জড়ত্ব, প্রাণময়তার বদলে প্রাণহীন মৃত স্নান সৌন্দর্য।
  • (৮) পল্লব ভাস্কর্য বেঙ্গীর ইন্দ্রিয়-পরায়ণা থেকে মুক্ত। পুরুষ মূর্তিগুলি যেন নারী-মূর্তি অপেক্ষা বেশী প্রাণবন্ত। কিন্তু এই মূর্তিতে নেই অজন্তা, এলোরার রহস্যঘন অতীন্দ্রিয়তা, আলোছায়ার খেলা।

পল্লব সাহিত্য

  • (১) পল্লব সভ্যতা কেবলমাত্র তার স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের মধ্যেই বিকশিত হয়নি। প্রাকৃত ও সংস্কৃত সাহিত্যের ক্ষেত্রেও পল্লব যুগে বিশেষ অগ্রগতি হয়। বিখ্যাত কবি ভারবি পল্লব সিংহবিষ্ণুর রাজসভায় ছিলেন। সংস্কৃত গদ্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার দণ্ডিন দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনের রাজসভায় ছিলেন।
  • (২) কাঞ্চী ছিল সংস্কৃত শিক্ষার এক পীঠস্থান। বিখ্যাত পণ্ডিত দিন্নাগ কাঞ্চীতে আসেন। কালিদাস, ভারবি, বরাহমিহির ছিলেন কাঞ্চীর বিদগ্ধজনের মানসিক খাদ্য। পল্লব রাজারা উন্নত রুচি সংস্কৃত সাহিত্য রচনার পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
  • (৩) দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের আমল থেকে তামিল সাহিত্যের প্রতিও পল্লব রাজারাম আনুকুল্য দেখান। বিখ্যাত বৈষ্ণব সন্ত তিরুমঙ্গলই তাঁর সমকালীন ছিলেন। মহেন্দ্ৰবৰ্মন মত্ত বিলাস প্রহসন নামে এক রূপক রচনা করেন। মহেন্দ্রবর্মন সঙ্গীতের বিষয়েও গ্রন্থ রচনা করেন।
  • (৪) তামিল কুরাল এই যুগে রচিত হয়। পল্লব যুগে চিত্রকলারও সমাদর ছিল। পদুকোট্রাই রাজ্যে পল্লব চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়।

উপসংহার :-  মোট কথা, উত্তর ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব মুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র তামিল সত্ত্বার বিকাশ তার শিল্প-সাহিত্যে, ধর্ম আন্দোলনে পল্লব যুগেই বিকাশ লাভ করে। আর্য ও দ্রাবিড় সংস্কৃতির মিলনে এই সত্ত্বার বিকাশ ঘটে।

(FAQ) পল্লব শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পল্লব যুগে সংস্কৃত শিক্ষার পীঠস্থান ছিল কোথায়?

কাঞ্চী।

২. পল্লবদের রাজধানী কোথায় ছিল?

কাঞ্চী।

৩. পল্লবদের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

প্রথম নরসিংহ বর্মন।

৪. মত্তবিলাস প্রহসন কে রচনা করেন?

প্রথম মহেন্দ্রবর্মন।

Leave a Reply

Translate »