শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি স্বাক্ষরের সময়কাল, স্বাক্ষরকারী দুই পক্ষ, শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে ফরাসিদের সাথে টিপুর যোগাযোগ, নিজামকে ইংরেজদের সামরিক সাহায্য প্রদান, নিজাম ও ইংরেজদের চুক্তি, তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ, টিপুর পরাজয়, টিপুর রাজধানী অবরোধ, শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি স্বাক্ষর, সন্ধির শর্ত, সন্ধির ফলাফল, সন্ধি স্বাক্ষরের জন্য লর্ড কর্ণওয়ালিসের সমালোচনা ও তার সমর্থনে বিভিন্ন বক্তব্য সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি (১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)

সময়কাল১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ
দুই পক্ষইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও টিপু সুলতান
ফলাফলটিপুর শক্তি খর্ব
শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি

ভূমিকা :- দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পর স্বাক্ষরিত ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি দ্বারা দু’পক্ষের বিবাদের কোনও অবসান হয় নি। এই সন্ধি একটি সাময়িক যুদ্ধ-বিরতি ছিল মাত্র। অচিরেই শুরু হয় তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ।

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির পটভূমি

এই সন্ধির পটভূমি ছিল নিম্নরূপ –

(১) টিপুর ফরাসিদের সাথে যোগাযোগ

যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে টিপু সুলতান ইংরেজদের শত্রু ফরাসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন এবং কনস্টান্টিনোপল, কাবুল, মরিশাস প্রভৃতি স্থানে দূত পাঠান।

(২) নিজামকে ইংরেজদের সামরিক সাহায্য প্রদান

গুন্টুর লাভের বিনিময়ে টিপুর দ্বারা অধিকৃত নিজামের কিছু রাজ্য নিজাম-কর্তৃক পুনরাধিকারের জন্য ইংরেজ কর্তৃপক্ষ নিজামকে সামরিক সাহায্য দেবেন—যদিও ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি দ্বারা ঐ স্থানগুলির ওপর টিপুর অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল।

(৩) নিজাম ও ইংরেজদের চুক্তি

বড়লাট কর্ণওয়ালিস নিজামের সঙ্গে এক সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং বলা হয় যে, ইংরেজদের প্রেরিত সেনাদল কোনও ইংরেজ মিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না।

(৪) তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে কর্ণওয়ালিস নিজামের কাছে ইংরেজদের মিত্ররাজ্য গুলির একটি তালিকা দেন—তাতে মহীশূরের নাম ছিলনা। স্বভাবতই টিপু সুলতান রুষ্ট হন এবং ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজদের মিত্ররাজ্য ত্রিবাঙ্কুর আক্রমণ করেন। ফলে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ শুরু হয়।

(৫) টিপুর পরাজয়

নিজাম ও মারাঠারা ইংরেজ পক্ষে যোগদান করে। দু’বছর ধরে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের পর ত্রি-শক্তি জোটের আক্রমণে টিপু কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

(৬) টিপুর রাজধানী অবরোধ

ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের মিত্রপক্ষ টিপু সুলতানের রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তম অবরোধ করে।

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি স্বাক্ষর

এই সংকটম  পরিস্থিতিতে টিপু সুলতান শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি (১৭৯২ খ্রিঃ) স্বাক্ষরে বাধ্য হন।

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির শর্ত অনুসারে,

  • (১) যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা এবং ইংরেজ, নিজাম ও মারাঠাদের নিজ রাজ্যের অর্ধাংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
  • (২) কৃষ্ণা থেকে পেনার নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা পায় নিজাম।
  • (৩) তুঙ্গভদ্রা নদীর সন্নিহিত অঞ্চল পায় মারাঠারা।
  • (৪) কুর্গ, মালাবার, মাদুরাই ও সালেম, দিন্দিগুল, বরামহল প্রভৃতি অঞ্চল কোম্পানির অধীনে থাকে।
  • (৫) ক্ষতিপূরণের টাকার জামিন হিসেবে টিপু তাঁর দুই পুত্রকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেন।

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির ফলাফল

অপমানজনক শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির ফলে ‘মহীশুর শার্দুল’ টিপুর শক্তি প্রবলভাবে খর্ব হয় এবং তাঁর পতন সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

কর্ণওয়ালিসের সমালোচনা

কোনও কোনও ঐতিহাসিক শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি সম্পাদনের জন্য কর্ণওয়ালিসের সমালোচনা করেছেন। যেমন –

(১) নতুন যুদ্ধের মুখোমুখি

তাঁদের মতে, এই যুদ্ধের পর সমগ্র মহীশূর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত না করে কর্ণওয়ালিস প্রচণ্ড ভুল করেন এবং এই কারণে লর্ড ওয়েলেসলিকে মহীশূরের বিরুদ্ধে আরেকটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে (চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ) অবতীর্ণ হতে হয়।

(২) সন্ধির শর্ত সহজ

বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি ডাণ্ডাস, সেনাপতি মনরো, থর্নটন কেউই এই সন্ধি মানতে পারেন নি। তাঁদের মতে অনেক সহজ শর্তে টিপুর সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

কর্ণওয়ালিসের সমর্থনে বক্তব্য

বলা বাহুলা, এই সব সমালোচনা বহুলাংশে অমূলক। কর্ণওয়ালিসের সমর্থনে বলার মতো অনেক কিছু আছে। যেমন –

(১) শ্রীরঙ্গপত্তম দখলে ব্যর্থ

তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের দুশ বছর পর কর্ণওয়ালিসের সমালোচনা করা যতটা সহজ, দুশ বছর আগে তা বাস্তবায়িত করা ততটা সহজ ছিল না। কর্ণওয়ালিস শ্রীরঙ্গপত্তম অবরোধ করেছিলেন —দখল করতে পারেন নি।

(২) গ্রীষ্মকাল আসন্ন

টিপু যদি আর কিছুদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন, তাহলে ইংরেজ-পক্ষ অসুবিধায় পড়ত। তখন গ্রীষ্মকাল আসন্ন প্রায় এবং এই কারণে বহু ইংরেজ সেনা তখন অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। মনে হয় এই বাস্তব কারণে কর্ণওয়ালিস এই চুক্তি সম্পাদনে বাধ্য হন।

(৩) মারাঠা ও নিজামের ঈর্ষা

এই সময় কোম্পানি সমগ্র মহীশূর দখল করলে কোম্পানির মিত্র মারাঠা ও নিজাম ঈর্ষান্বিত হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধাচারণ করতে পারত। তাতে হিতে বিপরীত হত।

(৪) পর্যাপ্ত সেনাবলের অভাব

কর্ণওয়ালিস অনুধাবন করেছিলেন যে, মহীশূর দখল করার পর সেখানে সুষ্ঠু প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মহীশূর রক্ষা করার মতো সেনাবল কোম্পানির নেই।

(৫) টিপুর ফরাসি সাহায্য লাভের সম্ভাবনা

সেই সময় ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দেয়। সে রকম হলে ভারতে টিপু সুলতান ফরাসি সাহায্য পেতেন, যা কোম্পানির পক্ষে ক্ষতিকর হত।

(৬) পিটের ভারত শাসন আইন পাশ

১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দের পিটের ভারত শাসন আইনে (Pitt’s India Act) কোম্পানিকে রাজ্য বিস্তার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

উপসংহার :- টিপু সুলতানের পক্ষে শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি ছিল অপমানজনক। তিনি রাজ্যের আভ্যন্তরীণ সংস্কার ও সেনাবাহিনী সুসংহত করে পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন।

(FAQ) শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি কবে স্বাক্ষরিত হয়?

১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে।

২. শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মহীশূরের টিপু সুলতান।

৩. শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি স্বাক্ষরের সময় বাংলার গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?

লর্ড কর্ণওয়ালিস।

৪. কোন সন্ধির মাধ্যমে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়?

শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Reply

Translate »