মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি

সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি প্রসঙ্গে সাময়িক ঝড়, লুন্ঠন ও হত্যা বিলুপ্ত, ভারতে রাজ্য স্থাপনে অনীহা, সাংগঠনিক প্রতিভার অভাব, লুন্ঠন নীতি, শাসনতান্ত্রিক প্রতিভার অভাব, ধর্মীয় উদ্দেশ্য বিচার, ধর্মযুদ্ধে অনাগ্ৰহ, আক্রমণকারী সম্পর্কে জানবো।

সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি

ঐতিহাসিক ঘটনাসুলতান মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি
সুলতানমামুদ
রাজ্যগজনী রাজ্য
ভারত আক্রমণ১০০০-১০২৭ খ্রি
সভাকবিউৎবি
সোমনাথ লুন্ঠন১০২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দ
সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি

ভূমিকা :- সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের দ্বারা ভারতে তার স্থায়ী অধিকার স্থাপিত হয় নি। সুলতান মামুদ ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনকে তার লক্ষ্য হিসেবে নেন নি।

সাময়িক ঝড়

ভারতীয় রাজাদের স্থায়ী বশ্যতা লাভ এবং তাদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায়ের তিনি কোনো চেষ্টা করেননি। বিজিত অঞ্চলে তিনি তার নিজের প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ার কোনো চেষ্টা করেননি। সুতরাং তার অভিযানগুলি ছিল সাময়িক ঝড়ের মত। তার কোন স্থায় ফল ছিল না।

লুন্ঠন ও হত্যা বিলুপ্ত

মামুদের অভিযান অবসিত হলে হিন্দুরা তাদের ভাঙা মন্দিরগুলি পুনরায় মেরামত করে নেয়, ভারতের উর্বরা শস্যক্ষেত্র শীঘ্রই জনসাধারণের হাতে নতুন ধনসম্পদ এনে দেয়। সুলতান মামুদের লুণ্ঠ ও হত্যার স্মৃতি ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ভারতে রাজ্য স্থাপনে অনীহা

  • (১) সুলতান মামুদের নিজের দিক থেকেও ভারতে রাজ্য স্থাপন করার কোনো ইচ্ছা দেখা যায় না। পাঞ্জাব ও মূলতান তিনি নিতান্ত প্রয়োজনবশত নিজ রাজ্যভুক্ত করেন। নতুবা ভারতে তার বিভিন্ন অভিযানে আসার পথ খোলা থাকত না।
  • (২) ভারতের বাইরে তিনি ইরাক থেকে কাস্পিয়ান সমুদ্র পর্যন্ত এক বিস্তৃত ভূভাগ জয় করে সেই অঞ্চলে নিজ আধিপত্য স্থাপনে ব্যস্ত থাকায় তাঁর পক্ষে ভারতে স্থায়ীভাবে রাজ্য বিস্তার করার কথা চিন্তা করা সম্ভব হয়নি।

সাংগঠনিক প্রতিভার অভাব

তিনি ছিলেন সমকালীন যুগের এক বিখ্যাত সমর বিশারদ সেনাপতি। যুদ্ধ জয়ের জন্য তার প্রতিভা নিয়োজিত ছিল। সাম্রাজ্য সংগঠনের প্রতিভা তাঁর মধ্যে দেখা যায় নি।

লুন্ঠন নীতি

  • (১) ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথের মতে, “সুলতান মামুদ ছিলেন এক ক্ষমতাশালী লুণ্ঠনকারী দস্যু (A brigand operating on a large scale)। ভারতবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করে, ভারতের ধনসম্পদ লুঠ করে তিনি ভারত ছেড়ে চলে যান। ভারতে তাঁর অভিযানের লক্ষ্য ছিল অবাধ লুণ্ঠন।
  • (২) তিনি প্রধানত মথুরা, কনৌজ প্রভৃতি সমৃদ্ধিশালী নগরগুলি অথবা সোমনাথের মত ধনরত্নপূর্ণ মন্দিরগুলি আক্রমণ করেন। যদিও তিনি পরাজিত হিন্দু রাজাদের ওপর বার্ষিক কর প্রদানের শর্ত আরোপ করেন, তিনি কখনও এই শর্তকে গুরুত্ব দেননি। সুতরাং বিচার করলে বোঝা যাবে যে, ধনরত্ন লুণ্ঠনই ছিল তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য।

শাসনতান্ত্রিক প্রতিভার অভাব

রাষ্ট্রনীতিবিদ হিসাবে সুলতান মামুদ, মহম্মদ ঘুরীর তুলনায় অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। ভারতের বাইরে তিনি যে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তাও তিনি শাসনতান্ত্রিক প্রতিভার অভাবে রক্ষা করতে পারেননি।

ধর্মীয় উদ্দেশ্য বিচার

  • (১) অনেকে সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের মধ্যে ইসলাম ধর্মের বিস্তারের চেষ্টা লক্ষ্য করে থাকেন। সুলতান মামুদের দরবারী ঐতিহাসিক উৎবি বলেছেন যে, “ভারত অভিযানের দ্বারা মামুদ ইসলামের প্রতি মহৎ কর্তব্য পালন করেন”।
  • (২) একথা সত্য যে, তিনি বেশ কিছু মন্দির ও দেবমূর্তি ধ্বংস করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মন্দির ও বিগ্রহ থেকে ধনরত্ন ও অলঙ্কার লুঠ করা। মামুদ বিভিন্ন অভিযানে সফল হলেও সাধারণভাবে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার কোনো চেষ্টা করেননি। এমন কি তার অধিকৃত সিন্ধু ও পশ্চিম পাঞ্জাবের হিন্দুদের তিনি ধর্মে হস্তক্ষেপ করেন বলে জানা যায় নি।

ডঃ মজুমদারের অভিমত

ডঃ আর. সি. মজুমদারের মতে “ভারতের ঐতিহাসিকদের কাছে মামুদ ছিলেন এক বিশুদ্ধ আক্রমণকারী মাত্র। ধর্মপ্রচার বা সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এদেশে আসেননি। তাঁর অভিযানগুলির উদ্দেশ্য ছিল। ভারতের ধনসম্পদ লুণ্ঠন এবং ভারতীয় শাসকশ্রেণীর নৈতিক ধ্বংসসাধন”।

সামরিক ঘাঁটি দখলে অনাগ্ৰহ

সুলতান মামুদ ভারত আক্রমণকালে কোনো সামরিক ঘাঁটি বা দুর্গ দখল করার চেষ্টা করেন নি। এই সকল সুরক্ষিত স্থানগুলিকে এড়িয়ে তিনি তার আক্রমণ পরিচালিত করেন। তিনি গ্রামাঞ্চলে তাঁর আক্রমণ পরিচালিত করেন নি। কারণ তাহলে তাঁর সেনাদলকে ছড়িয়ে দিতে হত।

ধর্মযুদ্ধে অনাগ্ৰহ

মামুদ মাঝে মাঝে জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা দ্বারা তিনি সুকৌশলে মধ্য এশিয়া থেকে কিছু সংখ্যক “গাজী” বা ধর্মযুদ্ধে আগ্রহী অবৈতনিক স্বেচ্ছাসৈন্য যোগাড় করতেন। প্রকৃত ধর্মযুদ্ধের জন্য তাঁর মাথা ব্যথা ছিল না।

আক্রমণকারী

ভিনসেন্ট স্মিথ সুলতান মামুদকে এক বর্বর, ধর্মান্ধ তুর্কী আক্রমণকারী বলেছেন। সুলতান মামুন মোটেই বর্বর প্রকৃতির লোক ছিলেন না। ভারতে তিনি হয়ত লুঠপাট চালান। কিন্তু গজনীতে তিনি সৌন্দর্যবর্ধন করেন।

উপসংহার :- সুলতান মামুদ গজনীতে শিক্ষা, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার রাজসভায় ছিলেন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত অলবিরুণী, বাইহাকী, উৎবি, প্রখ্যাত কবি ফিরদৌসী, আনসারী প্রমুখ। তিনি বহু প্রাসাদ ও মসজিদ নির্মাণ করেন এবং গজনীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন।

(FAQ) মামুদের ভারত অভিযানের প্রকৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সুলতান মামুদ কখন ভারত আক্রমণ করেন?

১০০০-১০২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

২. সুলতান মামুদ কতবার ভারত আক্রমণ করেন?

১৭ বার।

৩. সুলতান মামুদ সোমনাথ মন্দির লুন্ঠন করে কখন?

১০২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দে।

৪. “সুলতান মামুদ ছিলেন বড়মাপের লুঠেরা বা দস্যু” কে বলেছেন?

ঐতিহাসিক স্মিথ।

৫. সুলতান মামুদের সভাকবি কে ছিলেন?

উৎবি।

৬. শাহনামা কার লেখা?

ফিরদৌসী।

Leave a Comment