ফরাজি আন্দোলন

ফরাজি আন্দোলন -এর সময়কাল, প্রধান স্থান ও কেন্দ্র, উৎপত্তি, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, উদ্দেশ্য, আদর্শ, আন্দোলনের প্রসার, দুদমিঞার ভূমিকা, আন্দোলনের বিস্তার, দুদমিঞার মৃত্যু, নোয়া মিঞার ভূমিকা, আন্দোলনের গতিহীনতা, বৈশিষ্ট্য, চরিত্র, ব্যর্থতার কারণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ফরাজি আন্দোলন

সময়কাল১৮১৮-১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ
স্থানবাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল
নেতৃত্বহাজি শরিয়ত উল্লাহ, দুদু মিঞা, নোয়া মিঞা
ফলাফলব্যর্থতা
ফরাজি আন্দোলন

ভূমিকা :- উনিশ শতকে বাংলায় সংঘটিত কৃষকবিদ্রোহগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ফরাজি আন্দোলন (১৮২০-৬২ খ্রি.)। এই আন্দোলন প্রথমদিকে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলেও শেষদিকে এই আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।

ফরাজি আন্দোলনের সময়কাল

বাংলাদেশে ফরাজি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে এবং তা চলে ১৯০৬ খ্রিঃ পর্যন্ত।

ফরাজি আন্দোলনের প্রধান স্থান ওকেন্দ্র

ফরাজি আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিলো ফরিদপুরজেলার বাহাদূরপুর।পরেএই আন্দোলন খুলনা, যশোহর, ময়মনসিংহ, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও ঢাকাতে ছড়িয়ে পড়ে।

উৎপত্তি

‘ফরাজি’ কথার অর্থ হল ইসলাম-নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য বা ইসলাম ধর্মের আদর্শে বিশ্বাস।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

ফরিদপুর জেলার হাজি শরিয়ত উল্লাহ  ইসলাম ধর্ম সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ‘ফরাজি’ নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।

আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা

ফরিদপুর জেলার বাহাদুরপুর গ্রামের দরিদ্র জোলা পরিবারের অন্তর্গত হাজি শরিয়ত উল্লাহ ছিলেন ফরাজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।

উদ্দেশ্য

ফরাজি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য গুলি হল –

  • (১) ইসলাম ধর্মের মধ্যে অমুসলিম নানা প্রথা ও সংস্কার গুলি দূর করা।
  • (২) ইসলামকে তার বিশুদ্ধ রূপে প্রতিষ্ঠিত করা।
  • (৩) ভারতকে “দার উল হারব”বা শত্রুর দেশ থেকে “দার উল ইসলাম” বা মুসলমানের দেশে পরিনত করা।
  • (৪) বাংলা থেকে জমিদার, নীলকর ও মহাজনদের বিতাড়িত করা।

আদর্শ

হাজি শরিয়ত উল্লাহ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষকে ‘দার-উল-হারব’ বা ‘বিধর্মীর দেশ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি তাঁর অনুগামীদের কলমা (আল্লার প্রতি বিশ্বাস), নামাজ (আল্লার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা), রোজা (উপবাস), জাকাত (দানধ্যান), হজ (তীর্থযাত্রা) প্রভৃতি পালনের পরামর্শ দেন।

রাজনৈতিক রূপ

ফরাজি আন্দোলন শীঘ্রই রাজনৈতিকউদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। হাজি শরিয়ত উল্লাহ তাঁর অনুগামীদের জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।

আন্দোলনের প্রসার

আন্দোলন ফরিদপুর জেলায় শুরু হয় এবং তা ধীরে ধীরে ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোহর, ২৪ পরগনা প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

দুদু মিঞার ভূমিকা

শরিয়ত উল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহম্মদ মুসিন বা দুদু মিঞার নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র কৃষক আন্দোলনে শামিল হয়। তিনি ঘোষণা করেন যে, জমির মালিক আল্লাহ, তাই কৃষকরা অন্য কাউকে খাজনা দিতে বাধ্য নয়।

আন্দোলনের চরিত্র বদল

দুদু মিঞার নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন ধর্মীয়-সামাজিক আন্দোলন থেকে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।

বাসভবন আক্রমণ

দুদু মিঞা একটি শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তুলে অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বাসভবন আক্রমণ করেন।

ফরাজি খিলাফত গঠন

দুদু মিঞা ফরাজি খিলাফত নামে এক সুন্দর প্রশাসন গড়ে তোলেন। এই ব্যবস্থার শীর্ষে ছিলেন তিনি নিজে।তাকে ওস্তাদ এবং তার সাহায্যকারীদের খলিফা বলা হত।

শশীভূষণ চৌধুরীর অভিমত

ঐতিহাসিক ড. শশীভূষণ চৌধুরী বলেন যে, “দুদু মিঞা তার অনুগামীদের কাছে একাধারে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জ্বলন্ত প্রতীক ছিলেন।”

আন্দোলনের বিস্তার

  • (১) এই আন্দোলন ফরিদপুর ও ঢাকা থেকে বাখরগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোহর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ব্যাপক অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
  • (২) গোপন সরকারি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের ছয় ভাগের এক ভাগ জুড়ে এই আন্দোলন বিস্তৃত হয়। ১৮৩৯ থেকে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে।
  • (৩) ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে যে নিছক ধর্মীয় উদ্দেশ্যই নয়, ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ সাধন করে মুসলিম শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তাদের উদ্দেশ্য।
  • (৪) ডঃ অভিজিৎ দত্ত-র মতে, ফরাজিরা বাংলা থেকে ইংরেজদের উচ্ছেদ চেয়েছিল (“… desired the summary ouster of the English from Bengal”)।
  • (৫) দুদু মিঞার কার্যকলাপে বিচলিত হয়ে নীলকর ও জমিদাররা তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফরিদপুর জেলার কানাইপুরের জমিদার এবং ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুরের জমিদার জয়নারায়ণ ঘোষ ও মদননারায়ণ ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযান চালান।
  • (৬)এই অভিযানের ফলে কৃষকদের ওপর জমিদারের অত্যাচার হ্রাস পায় এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকদের ওপর দুধুমিঞার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
  • (৭) ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে ফরাজিরা ফরিদপুর জেলার পাঁচচরে ডানলপ সাহেবের নীলকুঠি আক্রমণ করে তা ভস্মীভূত করে দেয়। ডানলপের গোমস্তা কালীপ্রসাদকে তারা হত্যা করে। সরকারও তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

দুদু মিঞার কারাদণ্ড

১৮৩৮ থেকে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অন্তত চারবার তাঁকে বন্দি করা হয়, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবার মতো কাউকে পাওয়া যায় নি বলে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

দুদু মিঞার মৃত্যু

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সরকার তাঁকে আলিপুর জেলে বন্দি করে রাখে। কারাগারে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে এবং মুক্তিলাভের পর ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে বাহাদুরপুরে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

নোয়া মিঞার ভূমিকা

দুদু মিঞার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নোয়া মিঞা আন্দোলনকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় রূপ দেন। ক্রমে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।

হিন্দুদের আন্দোলন ত্যাগ

শরিয়ত উল্লাহ ও দুদু মিঞার উত্তরসূরি নোয়া মিঞার আমলে ফরাজি আন্দোলনের ধর্মীয় চরিত্র এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে হিন্দুরা এই আন্দোলন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

আন্দোলনের গতিহীনতা

ড. অভিজিৎ দত্ত বলেছেন যে, হিন্দু-বিরোধিতা, জোর করে অর্থ আদায়, নেতৃত্বের অভাব প্রভৃতির ফলে ফরাজি আন্দোলন তার গতি হারিয়ে ফেলে।

ফরাজি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

উনিশ শতকে হাজি শরিয়ত উল্লাহর নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন (১৮২০-৬২ খ্রি.) ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

(১)ইসলামের শুদ্ধিকরণ

বাংলায় ইসলামের শুদ্ধিকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথম ফরাজি আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের প্রবর্তক হাজি শরিয়ত উল্লাহ তাঁর অনুগামীদের পবিত্র কোরানের আদর্শগুলি মেনে চলার পরামর্শ দেন।

(২) রাজনৈতিক রূপ গ্রহণ

ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে ফরাজি আন্দোলন শুরু হলেও এই আন্দোলন শীঘ্রই রাজনৈতিক রূপ নেয়। অত্যাচারী ব্রিটিশ কোম্পানি, জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।

(৩) অত্যাচারের বিরোধিতা

ফরাজি আন্দোলনকারীরা অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বাসভবন আক্রমণ করে তাদের আধিপত্য ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়।

(৪) সংগঠন নির্মাণ

ইংরেজ বাহিনী, জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে সমগ্র ফরাজিদের সংগঠন গড়ে তোলা হয়।

(৫) পঞ্চায়েত ব্যবস্থা

দুদু মিঞা ইসলামের অনুকরণে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করেন।

(৬) মুসলিম প্রাধান্য

ফরাজি আন্দোলনে দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের সর্বাধিক প্রাধান্য দেখা যায়। আন্দোলনে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল না।

(৭) ইসলামীয় প্রাধান্য সর্বাধিক

ইসলামের আদর্শকে সামনে রেখে সংগঠিত ফরাজি আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তাই শেষপর্যন্ত এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ইসলামীয় প্রাধান্যই সবচেয়ে বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ফরাজি আন্দোলনের চরিত্র বা প্রকৃতি

উনিশ শতকে বাংলায় দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের মধ্যে ফরাজিআন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের চরিত্র বা প্রকৃতি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

(১) ধর্মীয় আন্দোলন

দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের উদ্যোগে পরিচালিত হলেও ফরাজি আন্দোলন ছিল মূলত একটি ধর্মীয় আন্দোলন। ইসলাম ধর্মের সংস্কারই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

(২) কৃষক আন্দোলন

ফরাজি আন্দোলনে দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখে কেউ কেউ একে কৃষক আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ মনে করেন যে, ফরাজি আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় যুক্ত থাকলেও এটি ছিল মূলত কৃষক আন্দোলন।

(৩) ব্রিটিশ-বিরোধিতা

কেউ কেউ মনে করেন যে, ফরাজি আন্দোলনকারীরা বাংলা থেকে বিদেশি ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল। ড. অভিজিৎ দত্ত মনে করেন যে, ফরাজি আন্দোলন জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণ বৈপ্লবিক রূপ দান করেছিল।

(৪) হিন্দু-বিরোধিতা

কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু দরিদ্র হিন্দুও ফরাজি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তবে ফরাজি আন্দোলনের হিন্দু-বিরোধিতা প্রকট হয়ে উঠলে হিন্দুরা শীঘ্রই আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়।

(৫)উদ্দেশ্যহীনতা

অধ্যাপক বিনয়ভূষণ চৌধুরী মনে করেন যে, ফরাজি আন্দোলন প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন থেকে কৃষক আন্দোলনে পরিণত হলেও আন্দোলনকারীরা জমিদারি প্রথা বা নীলচাষের বিলোপ চায়নি। তাদের ব্রিটিশ বিরোধিতাও ছিল ধোঁয়াটে।

ব্যর্থতার কারণ

এই আন্দোলনের ব্যর্থতার পশ্চাতে নানা কারণ ছিল। যেমন –

  • (১) সংকীর্ণতা :- এই আন্দোলন পূর্ব বাংলার একটি সংকীর্ণ স্থানে আবদ্ধ ছিল। ইংরেজ সরকার, নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি আন্দোলনকারীদের ছিল না।
  • (২) ধর্মীয় চেতনা :- সংকীর্ণ ধর্মীয় চেতনার ওপর ভিত্তি করে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ এর বিরোধী ছিল এবং তারা এই আন্দোলন দমনের জন্য হিন্দু জমিদারদের কাছে আবেদন জানায়।
  • (৩) হিন্দুদের ওপর আক্রমণ :- হিন্দু মন্দির আক্রমণ ও অন্যান্য কারণে হিন্দুরাও এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল। তিতুমিরের সম্প্রদায়ও এই আন্দোলনকে সমর্থন করে নি।
  • (৪) রাজনৈতিক চেতনাহীন :- বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক চেতনা, লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি স্পষ্ট ছিল না। দুদু মিঞার কার্যকলাপে ব্রিটিশ বিরোধিতার কোনও চিহ্ন ছিল না এবং জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের কোনও দাবি তারা জানায় নি।
  • (৫) দুর্বল শক্তি :- নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে দু-চারটি অভিযান এবং মামলা-মকদ্দমাতেই তাদের সব শক্তি শেষ হয়ে যায়।
  • (৬) দুদু মিঞার ব্যক্তিগত জীবন তিতুমির -এর মতো কলঙ্কশূন্য ছিল না। দুদু মিঞা ১৮টি বিবাহ করেন। তিনি বলপূর্বক অর্থ আদায় করে সেই অর্থ ব্যক্তিগত কাজে লাগাতেন – এমন বহু অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে। 
  • (৭) বল ও ভয় প্রদর্শন :- ফরাজিরা জনসাধারণকে ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক তাদের দলভুক্ত করত।
  • (৮) সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব :- দুদু মিঞার পর এই আন্দোলনের আর কোনও উপযুক্ত নেতা ছিল না।

গুরুত্ব

  • (১) অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ-এর মতে, ফরাজি আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মীয় ভাব যুক্ত হলেও মূলত তা ছিল একটি কৃষক আন্দোলন।
  • (২) জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে এবং তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা প্রচার করে দুদু মিঞা কৃষকদের নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
  • (৩) কেবল মুসলিমরাই নয়, হিন্দু কৃষকরাও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ডঃ বিনয় চৌধুরী বলেন যে, প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন থেকে কৃষক আন্দোলনে পরিণত হলেও ফরাজিরা জমিদারি প্রথা বা নীল চাষের বিলোপ চায় নি।
  • (৪) ডঃ অভিজিৎ দত্ত মনে করেন যে, ফরাজি আন্দোলন জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণ বৈপ্লবিক রূপ দান করেছিল।

উপসংহার :- ফরাজি আন্দোলন এক অর্থে কৃষক আন্দোলন হলেও এর মধ্যে ধর্মীয় প্রাধান্যই ছিল বেশি। তাই কেউ কেউ এই আন্দোলনকে মুসলিম সম্প্রদায়ের পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন।

(FAQ) ফরাজি আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ফরাজি আন্দোলনের সময়কাল কত ছিল?

১৮১৮-১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ।

২. ফরাজি আন্দোলন কোথায় হয়েছিল?

বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।

৩. ফরাজি আন্দোলনের নেতা কারা ছিলেন?

হাজি শরিয়ত উল্লাহ, দুদু মিঞা, নোয়া মিঞা।

৪. ফরাজি আন্দোলনের অপর নাম কী?

মিয়া আন্দোলন।

Leave a Reply

Translate »