ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি

ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি প্রসঙ্গে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক, তাদের কাজ, মাইনে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক প্রেরণের কারণ, বিদেশি নিযুক্ত ভারতীয় শ্রমিক, বিদেশে নিযুক্ত চিনা শ্রমিক , বিদেশে নিযুক্ত ভারতীয় ও চিনা চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে জানবো।

ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি

ঐতিহাসিক বিষয়ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি
কাজপ্রতিদিন ৯ ঘন্টা
মাইনেমাসে ৮ টাকা
ছুটিসপ্তাহে ১ দিন
কমিটি নিয়োগ১৮৩৮ খ্রি
আফিমের যুদ্ধ১৮৩৯-৪২ খ্রি:
ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি

ভূমিকা :- ব্রিটিশ শাসনকালে ভারত ও চিনের জনসংখ্যা ছিল বিপুল। এই জনসংখ্যার অধিকাংশই ছিল দরিদ্র। ঔপনিবেশিক শাসনকালে উভয় দেশের দরিদ্র শ্রেণি সীমাহীন দুর্দশার শিকার হয়। তা ছাড়া দেশে কাজের অভাব, ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি ঘটনা তাদের দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে তোলে।

চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক

কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে চুক্তিতে আবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণিকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক বলা হয়, যারা নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে বিদেশে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার চুক্তিতে আবদ্ধ হত। উনিশ শতকে বিদেশিরা দরিদ্র ভারতীয় ও চিনা শ্রমিকদের খুব সস্তায় শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করার উদ্যোগ নেয়। এদের মধ্যে সর্বাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশরা।

চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের কাজ

ইউরোপীয়দের বিভিন্ন উপনিবেশে এসব চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় ও চিনা শ্রমিকরা আখ ও অন্যান্য বাণিজ্যপণ্য উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত হত। আখ চাষ ছাড়াও তারা ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে খনিজ উত্তোলন, সেচের কাজ, অট্টালিকা, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ প্রভৃতি কাজে নিযুক্ত হত।

চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের মাইনে

বিদেশে কর্মরত এসব ভারতীয় ও চিনা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের মাসে মাইনে ছিল ৮ টাকা। এ ছাড়া তারা রেশন পেত। সাধারণভাবে এসব চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের প্রতিদিন ৯ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হত। তারা সামান্য খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, আশ্রয় ও ঔষধপত্র পেত।

চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক প্রেরণের কারণ

ব্রিটিশ-সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি তাদের বিভিন্ন উপনিবেশে বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজ চালাত। পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন্ন উপনিবেশে ভারত ও চিন থেকে বিপুল সংখ্যক চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক প্রেরণ করা হয়। উপনিবেশগুলিতে চুক্তিভিত্তিকে শ্রমিক প্রেরণের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন –

(১) ক্রীতদাসপ্রথার অবসান

ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি তাদের উপনিবেশগুলিতে ক্রীতদাস নিয়োগ করে বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজ সচল রাখত। ১৮৩৩ (মতান্তরে ১৮৩৪) খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যে ক্রীতদাসপ্রথার অবসান ঘটে। ফলে উপনিবেশগুলিতে শ্রমিকের সংকট দেখা দেয়।

(২) শ্রমিকের অভাব

ক্রীতদাসপ্রথার অবসানের ফলে পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিকের অভাবে উপনিবেশগুলিতে আখ চাষ ও চিনি উৎপাদনে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে উপনিবেশগুলির আখের জমির খামার মালিকরা ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যে তাদের প্রচুর পরিমাণে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।

(৩) সরকারি সিদ্ধাস্ত

চিনি শিল্পের বাজারে সংকট সৃষ্টি হলে ব্রিটিশ সরকার এই শিল্পের কাজ সচল রাখার উদ্দেশ্যে বহিরাগত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চিন থেকে বিপুল সংখ্যক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বিভিন্ন উপনিবেশে আখ চাষ ও চিনি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়।

বিদেশে নিযুক্ত ভারতীয় শ্রমিক

১৮২০-র দশক থেকে ব্রিটিশরা ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো শুরু করে। ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে শ্রমিক প্রেরণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় এবং তা চলে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে প্রেরণের বিষয়ে তদারকির উদ্দেশ্যে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে একটি কমিটি নিযুক্ত হয়। ভারতের বর্তমান বাংলা, আসাম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্য ভারত প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এসব শ্রমিক সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানো হত। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) বিদেশ যাত্রার পদ্ধতি

ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ শাসনকালে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যেমন –

(১) এজেন্সি সংস্থা

বিভিন্ন এজেন্সি বা সংস্থা এবং এসব সংস্থার এজেন্টরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করত এবং বিদেশে প্রেরণ করার যাবতীয় ব্যবস্থা করত।

(২) সার্জন নিয়োগ

শ্রমিকদের যাত্রাকালে প্রতিটি জাহাজে একজন করে মেডিকেল সার্জন নিযুক্ত হত। সমুদ্রযাত্রাকালে শ্রমিকদের চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তাদের নিয়োগের কাগজপত্রাদি রক্ষা করা এবং অন্যান্য দায়িত্ব তাকে পালন করতে হত।

(৩) যাত্রাকাল

ভারত থেকে বিদেশের বিভিন্ন স্থানে জাহাজগুলি পৌঁছোতে যথেষ্ট সময় লাগত। বন্দরে পৌঁছোনোর পর কর্মক্ষেত্রে পাঠানোর পূর্বে শ্রমিকদের অন্তত ১ সপ্তাহ সেখানে অপেক্ষা করতে হত।

(খ) নিয়মবিধি

চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের জন্য কিছু বিধিনিয়ম ছিল। যেমন –

(১) মেয়াদ

ভারতীয় শ্রমিকরা তাদের এজেন্টদেরসঙ্গে সাধারণত ৫ বছরের জন্য বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হত। মেয়াদ শেষে পুনরায় ৫ বছরের জন্য চুক্তি নবীকরণ করা যেত। যে বন্দর থেকে শ্রমিক বিদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করত, কাজের মেয়াদ শেষে তাকে আবার সেই বন্দরে ফিরে আসতে হত।

(২) নির্দেশনামা

কলকাতা থেকে ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশ প্রেরণের বিষয়ে ভারতের ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে একটি নির্দেশনামায় কিছু নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করে। এই নির্দেশনামা অনুসারে, বিদেশগামী শ্রমিক এবং তার প্রেরক এজেন্টকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে হাজির হয়ে শ্রমিকের কাজের মেয়াদ সম্পর্কে লিখিত চুক্তি করতে হত। এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শ্রমিকরা ঘোষণা করত যে, তারা স্বেচ্ছায় বিদেশে কাজে যাচ্ছে।

(গ) প্রথম পর্বের যাত্রা

ব্রিটিশরা ইউরোপীয় দেশগুলির বিভিন্ন উপনিবেশ, যেমন – ভারত মহাসাগরে মরিশাস, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ত্রিনিদাদ, গুয়ানা, সুরিনাম, ফিজি প্রভৃতি স্থানে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিককে কাজে পাঠায়। এ ছাড়া গ্রানাডা, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট কিটস্, সেন্ট ভিনসেন্ট, নাটাল প্রভৃতি স্থানেও বহু ভারতীয় শ্রমিককে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) যাত্রার সূচনা

১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ভারতীয় শ্রমিকদের মরিশাস-এ প্রেরণ করা হয়। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৩ হাজার ১২ জন ভারতীয় শ্রমিক পণ্ডিচেরি ও কারিকল থেকে বিদেশে পাড়ি দেয়। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মরিশাসে অন্তত ২৫ হাজার ভারতীয় শ্রমিক প্রেরণ করা হয়। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে শ্রমিক প্রেরণে সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

(২) শ্রমিক প্রেরণে গতি

১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মরিশাস-এ অন্তত ৩ লক্ষ শ্রমিক পাড়ি দিয়েছিল। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ থেকে মরিশাস এ শ্রমিক প্রেরণের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ভারত থেকে বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ আরও বাড়তে থাকে। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ভারত থেকে ৩৪,৫২৫ জন শ্রমিক মরিশাস-এ পৌঁছায়। এই শ্রমিকদের একটি বড়ো অংশই পূর্ব ভারত থেকে, বিশেষ করে কলকাতা থেকে যাত্রা করে।

(ঘ) সরকারি অনুমতি

  • (১) ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে প্রেরণের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। এ বছর ধাঙড় সম্প্রদায়ের ১১,৫৪৯ জন কুলি শ্রমিক মরিশাস এ আসে। জামাইকা, ব্রিটিশ গুয়েনা ও ত্রিনিদাদে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ, গ্রানাডায় ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ, সেন্ট লুসিয়ায় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ এবং নাটালে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে চুক্তিবন্ধ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি বৈধ হয়।
  • (২) ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ৫,২৫,৪৮২ জন চুক্তিবদ্ধ ভারতীয় শ্রমিক ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশগুলিতে পাড়ি দেয়। এভাবে ইউরোপের উপনিবেশগুলির জন্য ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

(ঙ) মহিলা শ্রমিক

  • (১) ভারতীয় শ্রমিকরা বিদেশে পারিবারিক জীবন কাটাতে পারলে তারা সেখানে আরও দীর্ঘদিন থাকার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, এই উদ্দেশ্যে পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরও বিদেশে শ্রমিক হিসেবে প্রেরণের চেষ্টা চালানো হয়।
  • (২) প্রথমদিকে পুরুষ শ্রমিকদের সংখ্যার অনুপাতে চুক্তিবদ্ধ মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। মরিশাসে যাওয়া ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ৪,৩০৭ জন এবং ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ১,৮৪০ জন ছিল মহিলা শ্রমিক ছিল।
  • (৩) ১৮৫৬-৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বিদেশে প্রেরণযোগ্য মোট শ্রমিকের ২৫ শতাংশ মহিলা শ্রমিক পাঠানো যাবে। এর পরের বছর ঘোষণা করা হয় যে, চুক্তিবদ্ধ মহিলা শ্রমিকদের চেয়ে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ৩ গুণের বেশি হবে না। এসব পদক্ষেপের ফলে বিদেশে প্রেরিত চুক্তিবদ্ধ মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

বিদেশে নিযুক্ত চিনা শ্রমিক

ঊনবিংশ শতকে ভারতে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেরূপ প্রত্যক্ষ বিদেশি শাসন চিনে প্রতিষ্ঠিত না হলেও চিনে বিভিন্ন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা চিনের দেশীয় বৈধ শাসনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। চিনের বহু দরিদ্র মানুষ চুক্তির ভিত্তিতে বিদেশে শ্রমিকের কাজে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি চিন থেকেও বিপুল সংখ্যক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিককে তাদের বিভিন্ন উপনিবেশে পাঠায়। সেসব উপনিবেশে চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বিভিন্ন উৎপাদনমূলক ও নির্মাণকাজে নিয়োগ করে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি আর্থিক দিক থেকে প্রচুর লাভবান হয়।

(ক) শ্রমিক রপ্তানির সূত্রপাত

  • (১) চিনে কিং বংশের (১৬৪৪-১৯১২ খ্রি.) রাজত্বকালের প্রথমার্ধে সেখানকার বাসিন্দাদের বাণিজ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বিদেশেযাত্রা নিষিদ্ধ ছিল। এই আইন ভঙ্গকারীদের কঠোর শাস্তিদানের বিধান ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও চিনা শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার ঘটনা আটকানো যায় নি।
  • (২) আফিমের যুদ্ধের (১৮৩৯-৪২ খ্রি.) পর ব্রিটিশ শক্তি দক্ষিণ-পূর্ব চিনের অভ্যন্তরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এর পর থেকে তারা চিনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শ্রমিকদের সংগ্রহ করে। এই শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদে তাদের বিদেশে কাজে পাঠানো শুরু করে।

(খ) শ্রমিক চুক্তি ও যাত্রা

  • (১) বিদেশে কাজে পাঠানোর পূর্বে চিনের শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের এজেন্টরা চুক্তিতে আবদ্ধ হত। এই চুক্তিতে শ্রমিকদের গন্তব্যস্থল, কাজের মেয়াদ, মজুরি, চিকিৎসার সুবিধা দান প্রভৃতি উল্লেখ থাকত। চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকরা ৫ থেকে ৮ বছরের মেয়াদে বিদেশে কাজে যাওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হত।
  • (২) আর্নল্ড জে. মিঘার চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের এক প্রকার ক্রীতদাসদের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্রিটিশ সরকার তাদের নব-অধিকৃত ত্রিনিদাদ উপনিবেশে জনসংখ্যাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে চিন-সহ এশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে সেখানে শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
  • (৩) ত্রিনিদাদ ছাড়াও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, কিউবা প্রভৃতি স্থানে চিনের শ্রমিকদের প্রেরণ করা হত। চিনের রাজার আপত্তিতে এবং ব্রিটিশদের পক্ষে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের প্রেরণ খুব ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে চিন থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের আমদানি বন্ধ ঘোষণা করে।

(গ) শ্রমিকদের পেশা

  • (১) ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ হলে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন উপনিবেশে আখ চাষ, চিনি উৎপাদন ও অন্যান্য শ্রমসাধ্য কাজে লোকের অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার চিন থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের পাঠিয়ে আফ্রিকান ক্রীতদাসদের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করে।
  • (২) উপনিবেশগুলিতে শ্রমিকরা পৌঁছানোর পর অধিকাংশ শ্রমিককে বিভিন্ন চিনি উৎপাদন কেন্দ্রে পাঠানো হত। অবশিষ্ট শ্রমিকরা অন্যান্য কৃষিকাজ, অট্টালিকা নির্মাণ, কারিগরি ক্ষেত্র প্রভৃতিতে নিযুক্ত হত। চিনের শ্রমিকরা ত্রিনিনাদে ভয়ানক অবস্থার মধ্যে বসবাস করত।
  • (৩) কিছু কিছু শ্রমিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও স্বদেশে ফিরতে না পেরে দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বসবাস করতে বাধ্য হত। যারা ত্রিনিদাদে থেকে যেত তারা দোকানদার, কসাই, ভূতোর, মালি প্রভৃতি পেশা গ্রহণ করে জীবনধারণ করত।

(ঘ) যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত চিনের শ্রমিকদের তিনটি ধাপে ত্রিনিদাদ-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। যেমন –

(১) প্রথম ধাপ

চিনের ম্যাকাও, পেনাং, ক্যান্টন প্রভৃতি স্থান থেকে ২০০ জন চিনা শ্রমিক সংগ্রহ করে ‘ফরটিচিউড’ নামক জাহাজে করে তাদের ত্রিনিদাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ১৯২ জন শ্রমিক ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর প্রথম ধাপে ত্রিনিদাদে পৌঁছোয়। চুক্তির মেয়াদ পূরণ হওয়ার পর ১৯২ জনের মধ্যে ২৩ জন ত্রিনিদাদে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অবশিষ্ট শ্রমিকরা ‘ফরটিচিউড’ জাহাজে করে চিনে ফিরে আসে।

(২) দ্বিতীয় ধাপ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যে ক্রীতদাসপ্রথার অবসানের পরবর্তীকালে ১৮৫৩ থেকে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চিনের গুয়াংডং প্রদেশের বহু শ্রমিককে দ্বিতীয় ধাপে বিদেশে পাঠানো হয়। ত্রিনিদাদে ছাড়াও আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি দেশেও চিনের শ্রমিকদের পাঠানো হয়। এই পর্বে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ছাড়াও বেশ কিছু স্বাধীন চিনা স্বেচ্ছায় ত্রিনিদাদে পেশার সন্ধানে আসে।

(৩) তৃতীয় ধাপ

ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক প্রেরণ বেশ কিছুকাল বন্ধ রাখে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে চিনা শ্রমিক প্রেরণের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চিন থেকে ফ্রান্স ১ লক্ষ ৪০ হাজার শ্রমিক নিয়োগ করে। এই পর্বে শ্রমিক ছাড়াও প্রচুর ব্যাবসায়ী, দোকানদার প্রভৃতি পেশার মানুষও আরও লাভের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। চিনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় (১৯৪৬-১৯৪৯ খ্রি.) সেখানকার শ্রমিকদের অভিবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

বিদেশে নিযুক্ত ভারতীয় ও চিনা চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের অবস্থা

ভারত ও চিন থেকে বিপুল সংখ্যক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় শক্তিগুলির বিভিন্ন উপনিবেশে যাত্রা করে। দেশের দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পেতে এসব শ্রমিকরা বিদেশে পাড়ি দেয়। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকরা বিদেশের মাটিতে নানা দুর্দশার শিকার হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) চুক্তি ভঙ্গ

বহু শ্রমিককে ভালো বেতন, আরামদায়ক কাজে নিয়োগ, মাত্র তিন বছরের জন্য কাজে নিয়োগ প্রভৃতি বিভিন্ন আকর্ষণীয় শর্তের কথা বলে চুক্তিপত্রে সই করানো হত। কিন্তু পরবর্তীকালে মালিকপক্ষ চুক্তির এসব কোনো শর্তই রক্ষা না করে শ্রমিকদের ওপর সীমাহীন শোষণ ও নির্যাতন চালাত।

(২) পারিবারিক জীবনে ভাঙন

চুক্তিবদ্ধ বহু শ্রমিক অভাবের তাড়নায় বিদেশে পাড়ি দিলে অনেকের পারিবারিক জীবন ভেঙে পড়ে। তা ছাড়া বিদেশে বহু শ্রমিকের মৃত্যুর ফলে স্বদেশে তাদের পরিবারের সদস্যরা সীমাহীন দুঃখদুর্দশার শিকার হয়।

(৩) অমর্যাদা

সরকারি নথিপত্রে ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সাধারণভাবে ‘কুলি’ বলে চিহ্নিত করা হত। এর দ্বারা শ্রমিকদের প্রতি বিদেশিদের অমর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার প্রকাশ পেত।

(৪) অবহেলা

শ্রমিকরা এজেন্টদের কাছ থেকে যথেষ্ট অবহেলা পেত। শ্রমিকদের প্রভুরা কখনো-কখনো তাদের ওপর নির্যাতন চালাত। তাদের বিদেশে পাঠানোর সময় এজেন্টদের যতটা তাগিদ থাকত তাদের ফিরিয়ে আনার সময় তা থাকত না। ফলে ফেরার সময় সমুদ্রপথে বহু শ্রমিক চূড়ান্ত দুর্দশার শিকার হত।

(৫) অভাব

ভারত ও চিনের শ্রমিকরা খুবই সামান্য মজুরি পেত এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধা হত। প্রচুর পরিশ্রম করেও তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় পোশাক জুটত না। দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য বহু শ্রমিক পালিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করত, কিন্তু ধরা পড়ে বহু শ্রমিক জেলে আবদ্ধ হত।

(৬) মৃত্যু

সমুদ্রপথে যাত্রার সময় এবং নতুন অঞ্চলে গিয়ে নতুন আবহাওয়ায় অভ্যস্ত না হয়েও উপনিবেশগুলিতে প্রচুর শ্রমিকের মৃত্যু হত। নতুন দেশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বসবাসের ফলে শ্রমিকরা নানা রোগের শিকার হত। ফলে ডাইরিয়ার মতো রোগে প্রচুর শ্রমিকের মৃত্যু হত।

(৭) আইন পাস

শ্রমিকদের কল্যাণসাধন এবং মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধ করতে ব্রিটিশ সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে এ বিষয়ে একটি আইন (Act No. XIX of 1856 ) পাস করে জানায় যে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের নিরাপত্তার উপযুক্ত ব্যবস্থা না করে তাদের বিদেশে আনা যাবে না।

(৮) দেশত্যাগ

কোনো কোনো শ্রমিক চিরকালের মতো বিদেশেই থেকে যায়। ত্রিনিদাদের মতো কোনো কোনো সরকার সেই দেশে শ্রমিকদের বসবাসের সুযোগ করে দেয়। ফলে ওইসব উপনিবেশে ভারতীয় ও চিনাদের ছোটো ছোটো বসতি গড়ে ওঠে।

উপসংহার :- উপনিবেশ দেশের দরিদ্র পরিবারগুলির দুঃখদুর্দশার সীমা ছিল না। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় প্রভুরা ভারত ও চিনের বহু দরিদ্র শ্রমিককে চুক্তির ভিত্তিতে বিদেশে কাজে পাঠায়।

(FAQ) ভারত ও চিনের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক কাদের বলা হয়?

কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে চুক্তিতে আবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণিকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক বলা হয়, যারা নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে বিদেশে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার চুক্তিতে আবদ্ধ হত।

২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যে ক্রীতদাসপ্রথার অবসান ঘটে কখন?

১৮৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দে।

৩. ব্রিটিশরা ভারতীয় শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো শুরু করে কখন?

১৮২০-র দশক থেকে।

৪. আফিমের যুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

১৮৩৯-৪২ খ্রি:।

Leave a Comment