প্রাচীন ভারতে ধর্ম

প্রাচীন ভারতে ধর্ম প্রসঙ্গে, ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, পৌরাণিক হিন্দুধর্ম, পঞ্চোপাসনা, ভাগবত বৈষ্ণবধর্ম, শৈব সাধনা, শাক্ত ধর্ম, সূর্যের উপাসনা ও দক্ষিণ ভারতে ধর্ম সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতে ধর্ম

ঐতিহাসিক বিষয়প্রাচীন ভারতের ধর্ম
গৌতম বুদ্ধবৌদ্ধ ধর্ম
মহাবীরজৈন ধর্ম
ব্রাহ্মণ্য ধর্মহিন্দু ধর্ম
তামিল শৈব সাধকনায়নার
তামিল বৈষ্ণব সাধকআলবার
প্রাচীন ভারতে ধর্ম

ভূমিকা :- প্রাচীন ভারতে ধর্ম ব্যবস্থা একটি বিশেষ দিক দখল করে আছে। হরপ্পা সভ্যতার ধর্ম জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও এখানে অনেক নারী মূর্তি পাওয়া গেছে। আবার বৈদিক সভ্যতায় প্রকৃতি ও লিঙ্গ পূজার দৃষ্টান্ত রয়েছে।

প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম

  • (১) বুদ্ধের দেহত্যাগের কয়েক বছরের মধ্যেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মধ্যে মতভেদ প্রকট হয়। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন। কিন্তু তাঁর বংশধররা বৌদ্ধদর্শন সম্পর্কে বিরূপ ভাব দেখান।
  • (২) পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ক্ষমতা দখল করেই বৌদ্ধদের ওপর অত্যাচার চালান। অবশ্য বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা তিনি হ্রাস করতে পারেন নি। তবে বিভিন্ন বৌদ্ধগোষ্ঠী, যেমন – থেরবাদী, মহাসংঘিক, সর্বাস্তিবাদী প্রমুখ অন্তর্কলহে লিপ্ত থেকে এই ধর্মমতের ক্ষতি করেন।
  • (৩) কুষাণরাজ কণিষ্ক বৌদ্ধসংঘের অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানোর উদ্দেশ্যে চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি’ আহ্বান করেন। এখানেই ‘মহাযান বৌদ্ধধর্ম জন্ম নেয়। ফলে বৌদ্ধসংঘে ভাঙন দেখা দেয়। ‘মহাযান’ মতের প্রধান বিষয় হল বোধিসত্ত্বের কল্পনা। এই মতে, যে-কোনো ব্যক্তির মধ্যে বোধিচিত্তের বিকাশ ঘটলে তিনিই বোধিসত্ত্বের অধিকারী হন।
  • (৪) খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ‘পারমিতা’ মতবাদের উদ্ভব হয়। এতে বলা হয়, যে-কোনো বোধিসত্ত্ব যদি বুদ্ধত্ব লাভ করতে চান তাহলে তাকে দশটি ‘পারমিতা’র (গুণ) অধিকারী হতে হবে। আদি-বৌদ্ধদর্শনে বিশ্বাসীরা ‘হীনযান’ নামে পরিচিত হন। হীনযানীদের কাছে বুদ্ধ ছিলেন সর্বজ্ঞ পুরুষ, দেবগুণের অধিকারী, চিরন্তন ও শাশ্বত।
  • (৫) বিদেশে ধর্মপ্রচারের সূচনা করেন অশোক। পরে গ্রিক, পারসিক, শক ও কুষাণদের আমলে এই ধারা অব্যাহত থাকে। হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকে এদেশে বৌদ্ধধর্মকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে দেখতে পান। এই সময় বৌদ্ধধর্মের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
  • (৬) মায়াবিদ্যা ও অতীন্দ্রিয়বাদ বৌদ্ধধর্মকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। ফলে তৃতীয় একটি যান – ‘বজ্রযান’ পূর্ব ভারতে আবির্ভূত হয়ে বাংলা ও বিহারে প্রসার লাভ করে। বজ্রযানের দুটি প্রধান উপাদান ছিল ‘মন্ত্র’ ও ‘যন্ত্র’। মাতঙ্গী, পিশাচী, ডাকিনি, যোগিনী ইত্যাদি তুচ্ছ দেবদেবীরাও বজ্রযানে আদৃত হন। এই কারণে বজ্রযান ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম’ নামেও পরিচিত হয়।

প্রাচীন ভারতে জৈন ধর্ম

  • (১) গুপ্ত-পূর্ব যুগে জৈনধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল উত্তর ভারত। গুপ্তযুগে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি সাহিত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে জৈনধর্মের অবনতি দেখা দেয়। এই সময় জৈনধর্মের কেন্দ্রবিন্দু দক্ষিণ ভারতে সরে যায়। দক্ষিণের রাজকীয় আনুকূল্যে বড় ভাষাভাষী অঞ্চলে জৈনধর্ম জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
  • (২) মহীশূরের গঙ্গা রাজবংশ, বনবাসীর কদম্ববংশ, বাদামির চালুক্যবংশীয় রাজাগণ জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। দ্বিতীয় পুলকেশীর আশ্রিত রবিকীর্তি মেগুটির জৈনমন্দির নির্মাণ করেন। প্রাচীন তামিল সাহিত্যের রচনা থেকে অনুমান করা যায় যে, সুদূর দক্ষিণেও জৈনধর্মের জনপ্রিয়তা ছিল। সপ্তম শতকে বৈষ্ণব ও শৈবধর্মের উত্থান ঘটলে জৈনধর্ম ক্রমশ ক্ষীণবল হয়ে পড়ে।

প্রাচীন ভারতে পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম

  • (১) প্রাচীন ভারতে বৈদিকযুগের পর ব্রাহ্মণ্যযুগের আবির্ভাব ঘটে। ব্রাহ্মণ্যযুগকে দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বের কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক। দ্বিতীয় পর্বের সূচনা গুপ্তযুগে। প্রথম পর্বে ব্রাহ্মণ্যধর্মের ওপর বৌদ্ধ, জৈন ও অনার্যদের ধর্মাচরণের প্রভাব দেখা যায়। এই সময় শিব, বিষ্ণু প্রমুখ মুখ্য দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন।
  • (২) এই যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে অভিহিত করা হয়। অবশ্য বহু পরে অষ্টম শতকে আরবগণ ‘হিন্দু’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। তবে দীর্ঘ অতীত থেকে নানা রীতিনীতি, জীবনচর্চা দেবদেবী, দর্শনতত্ত্ব ও সাধনার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেহেতু এই ধর্মমতের বিকাশ, তাই একে ‘সনাতন হিন্দুধর্ম’ আখ্যা দেওয়া হয়।

প্রাচীন ভারতে পঞ্চোপাসনা

  • (১) বর্তমান হিন্দুধর্মের প্রধান পাঁচটি ধারা হল বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গাণপত্য। একত্রে এদের বলা হয় ‘পঞ্চোপাসনা’। ভগবদ্গীতা ও ভাগবতপুরাণের মাধ্যমে প্রচারিত এই একেশ্বরবাদী ধর্ম প্রাথমিকভাবে ‘ভাগবত ধর্ম’ নামে পরিচিত হয়।
  • (২) এই নামটি বৈষ্ণবধর্মের সাথে বেশি যুক্ত হলেও, বাস্তবে শাক্ত, শৈব ইত্যাদি অন্যান্য ধারাগুলিও ভাগবত ধর্মের অন্তর্ভুক্ত। বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গাণপত্য – এই পঞ্চোপাসনার পাঁচ প্রধান দেবতা হলেন যথাক্রমে বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্য ও গণপতি।

প্রাচীন ভারতে ভাগবত বৈষ্ণবধর্ম

শক, সাতবাহন ও কুষাণরাজাদের লিপি ও মুদ্রা থেকে সেকালে ভাগবত বৈষ্ণবধর্মের অস্তিত্ব জানা যায়। চতুর্থ শতকে বৈষ্ণবধর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গুপ্ত রাজারা, পল্লবরাজ বিষ্ণুগোপ, মৌখরীরাজ অনন্ত বর্মন প্রমুখ এই ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

প্রাচীন ভারতে শৈব সাধনা

শৈব সাধনারও সূত্রপাত প্রাক্-বৈদিকযুগে। হরপ্পা সভ্যতায় যোগাসনে উপবিষ্ট মূর্তিকে পশুপতি শিবের আদিরূপ বলা যায়। প্রাচীন মাতৃকা-আরাধনার রীতি, শৈবধর্ম ও তন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে শাক্তধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে।

প্রাচীন ভারতে শাক্ত ধর্ম

শক্তির উপাসনা থেকেই ‘শাক্ত’ মতবাদের বিকাশ। শক্তির দেবী কালী, তারা, ধূমাবতী, দুর্গা, উমা ইত্যাদি নানা নামে কল্পিত হন। শক্তি আরাধনাকে কেন্দ্র করে ‘তন্ত্রাচার’ ধর্মের অঙ্গীভূত হয়েছে।

প্রাচীন ভারতে সূর্যের উপাসনা

সূর্যের উপাসনা প্রাচীন ভারতে প্রচলিত থাকলেও, এদেশে জাঁকজমকপূর্ণ সৌরসাধনার আমদানি হয়েছে ইরান থেকে। দ্বাদশ শতকের গোবিন্দপুর লেখতে সূর্য উপাসক মগ-দের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতে ভক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত

গুপ্তযুগের পরবর্তীকালে গণেশ পূজার বিস্তৃতি ঘটে। এদের পাশাপাশি কার্তিকেয়, ব্রহ্মা, সরস্বতী প্রমুখ দেবদেবী এবং যক্ষ, নাগ, গন্ধর্ব, বিচার প্রমুখ নিম্নশ্রেণির দেবতা পূজিত হন। এই পাঁচটি সম্প্রদায়ের মধ্যে আচার-অনুষ্ঠানের পার্থক্য থাকলেও সবকটি ধর্মমত মূলত ভক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

দক্ষিণ ভারত ধর্ম

  • (১) এই সময় দক্ষিণ ভারতে ধর্মভাবনার দুটি মূল ধারা ছিল – বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের তত্ত্ব প্রচার এবং ভক্তিবাদের প্রচার। ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রচারে প্রধান ভূমিকা নেন শংকরাচার্য, কুমারিল ভট্ট, মাধবাচার্য প্রমুখ। অন্যদিকে ভক্তিবাদের প্রচারে নেতৃত্ব দেন কুলশেখর, অন্দল, অপ্পর, সুন্দরমুর্তি প্রমুখ। ভক্তিবাদ ও হিন্দুধর্ম-তত্ত্বের মধ্যে সেতু রচনা করেন বৈষ্ণব আচার্য রামানুজ।
  • (২) কুমারিল ভট্ট সপ্তম শতকে মীমাংসা দর্শন ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, বেদ অপৌরুষেয় এবং সন্দেহের ঊর্ধ্বে। বেদান্ত-দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শংকরাচার্য। ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে কেরলের এক নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। শংকরাচার্য প্রচার করেন, ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়; ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, জগৎ মিথ্যা।
  • (৩) নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য শংকরাচার্য ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলি হল পূর্বে পুরীতে গোবর্ধন মঠ, পশ্চিমে দ্বারকায় সারদা মঠ, উত্তরে বদ্রিনাথে যোশী মঠ এবং দক্ষিণে মহীশূরে শৃঙ্গেরী মঠ।
  • (৪) উত্তর ভারত থেকে বৈদিক-সংস্কৃতির সাথে সাথে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম দক্ষিণ ভারতে প্রবেশ করে। শৈবধর্ম ও বৈষ্ণবধর্ম ছিল একান্তভাবে ভক্তিনির্ভর। তামিল শৈব সাধকগণ ‘নায়নার’ এবং বৈষ্ণব সাধকগণ ‘আলবার’ নামে পরিচিত ছিলেন।
  • (৫) নায়নার সাধকদের মধ্যে অপ্পর, সুন্দমূর্তি, তিরমল ছিলেন বিখ্যাত। আলবার সাধকদের মধ্যে সুপরিচিত ছিলেন কুলশেখর, অন্দল প্রমুখ। এই দুই সম্প্রদায় নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র সহযোগে ধর্মপ্রচার করেন। এঁদের মতে যাগযজ্ঞ মূল্যহীন, ঈশ্বরের সান্নিধ্যলাভের একমাত্র পথ হল অখণ্ড ভক্তি ও প্রেম।

উপসংহার :- একাদশ শতকে বৈষ্ণব-আচার্য রামানুজ শংকরাচার্যের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেন যে, জ্ঞান মুক্তিলাভের অন্যতম পথ, একমাত্র পথ নয়। বিশুদ্ধ ভক্তি ও আত্মসমর্পণ মুক্তির পথ দেখায়। তাঁর অনুগামীরা ‘শ্রীসম্প্রদায়’ নামে পরিচিত হন। দক্ষিণ ভারতে শৈবধর্ম প্রচার করে ‘লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়।’ এই সম্প্রদায়ের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন বাসভ।

(FAQ) প্রাচীন ভারতে ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৌদ্ধ ধর্মকে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলেন কে?

সম্রাট অশোক।

২. মেগুটির জৈন মন্দির নির্মাণ করান কে?

রবিকীর্তি।

৩. বর্তমান হিন্দু ধর্মের প্রধান পাঁচটি ধারা কি কি?

বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গাণপত্য।

৪. তামিল শৈব সাধকরা কি নামে পরিচিত ছিল?

নায়নার।

৫. তামিল বৈষ্ণব সাধকরা কি নামে পরিচিত ছিল?

আলবার।

Leave a Comment