প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা

প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা প্রসঙ্গে মৌর্যযুগে জাতি প্রথা, মৌর্যোত্তর যুগে জাতি প্রথা, গুপ্ত যুগে জাতি প্রথা, পাল যুগে জাতি প্রথা, সেন যুগে জাতি প্রথা, প্রাক মুসলিম পর্বে জাতি প্রথা ও দক্ষিণ ভারতে জাতি প্রথা সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা

ঐতিহাসিক বিষয়প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা
সাতটি শ্রেণিমেগাস্থিনিস
কৌলিন্য প্রথাবল্লাল সেন
বৌদ্ধরা পাষণ্ডসেন বংশ
করণরাজা ও রাজবৈদ্য
প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা

ভূমিকা :- ভারতে জাতি প্রথা ঠিক কোন সময় প্রকট হয় তা বলা কঠিন। তবে হরপ্পা সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতায় জাতি প্রথা ব্যাপক আকারে প্রকাশ ঘটে নি।

মৌর্য যুগে জাতি প্রথা

  • (১) মৌর্যযুগের সমাজ বর্ণাশ্রম-প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। বৈদিকযুগের চতুর্বর্ণের পাশাপাশি অনেক নীচ বর্ণের উদ্ভব ঘটে। বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ-সম্পর্ক ছিল, বিশেষত বৈশ্য ও শূদ্রদের মধ্যে। ফলে সমাজে মিশ্র বর্ণের সৃষ্টি হয়।
  • (২) গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস পেশার ভিত্তিতে তৎকালীন সমাজে সাতটি শ্রেণির উল্লেখ করেছেন। এরা হল দার্শনিক, কৃষক, পশুপালক, কারিগর, সেনানী, পরিদর্শক ও সভাসদ। মেগাস্থিনিস শ্রেণিভেদের কঠোরতার উল্লেখ করেছেন।
  • (৩) মৌর্যযুগে বর্ণভেদের পাশাপাশি জাতিভেদ প্রথার উদ্ভব ঘটে। তবে জাতিভেদের চরিত্রে পরিবর্তন ঘটেছিল। বংশ কৌলীন্যের পরিবর্তে অর্থকৌলীন্য এই সময় গুরুত্ব পায়। ফলে বৈশ্যদের মর্যাদা বাড়ে এবং শূদ্রদের মর্যাদার আরো অবনমন ঘটে।
  • (৪) তবে বিভিন্ন বর্ণের মানুষের জীবিকা গ্রহণের স্বাধীনতা ছিল। ফলে বাণিজ্য ও কারুশিল্পে যুক্ত হয়ে কিছু শূদ্র সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হতে পারেন। শূদ্রদের নীচে ছিল আদিবাসী উপজাতি, কৈবর্ত, চণ্ডাল, ঝাড়ুদার প্রভৃতি অস্পৃশ্যদের অবস্থান। এদের বলা হত ‘পঞ্চমজাতি’।

মৌর্যোত্তর যুগে জাতি প্রথা

মৌর্যোত্তর যুগে শক, পহ্লব, হুন প্রভৃতি বিদেশি জাতির আগমন ঘটলে স্মৃতিশাস্ত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। তবে দেশীয় ও বিদেশি জাতির সাঙ্গীকরণ আটকানো যায় নি। বিদেশি শাসকশ্রেণিকে ‘ব্রাত্য-ক্ষত্রিয়’ নাম দিয়ে ভারতীয় সমাজে যুক্ত করা হয়। ফলে ভারতে বর্ণ-সংকর জাতির সৃষ্টি হয়। যেমন, হুন উপজাতির সাথে ভারতীয়দের বৈবাহিক সূত্রে “রাজপুত জাতির উদ্ভব ঘটে।

গুপ্তযুগে জাতি প্রথা

  • (১) ড. রোমিলা থাপারের মতে, গুপ্তযুগে পেশা ও বর্ণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বর্ণচ্যুতরা পৃথকশ্রেণি বলে বিবেচিত হত। তবে শূদ্রদের মর্যাদা বেড়েছিল। আইনে শূদ্র ও ক্রীতদাসের জন্য পৃথক মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হয়।
  • (২) ব্রাহ্মণদের পবিত্রতার ওপর জোর দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণদের মধ্যে ‘দ্বিজ’ আখ্যা বহুল প্রচলিত হয়। বর্ণচ্যুতদের অপবিত্রতার বিষয়টিও কঠোর করা হয়। উপবর্ণগুলির মধ্যে মেলামেশায় বিশেষ কড়াকড়ি ছিল না। সামাজিক বিধিবিধানের ক্ষেত্রে মনুস্মৃতি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়।

পালযুগে জাতি প্রথা

  • (১) পালযুগে বাংলায় চতুর্বর্ণের দৃঢ় ভিত্তি শিথিল হয়। বর্ণ হিসেবে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের বিশেষ উল্লেখ ছিল না। সম্ভবত সপ্তম শতকে পাল রাজারা উচ্চবংশজাত না-হওয়ায় এবং ব্যাবসাবাণিজ্যের অবনতি ঘটায় যথাক্রমে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের গুরত্ব হ্রাস পায়। পরিবর্তে পালযুগে করণ-কায়স্থদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
  • (২) রাজা ও রাজবৈদ্যগণও নিজেদের ‘করণ’ বলে পরিচয় দিতেন। অনেক সময় ব্রাক্ষ্মণরাও করণবৃত্তি গ্রহণ করতেন। তখন বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিশেষ প্রভেদ ছিল না। অনেক গৃহী বৌদ্ধ ব্রাহ্মণদের অনুশাসন মেনে চলতেন। এই সময় বর্ণভেদের কঠোরতা অনেক হ্রাস পায়।

সেনযুগে জাতি প্রথা

  • (১) সেন বংশীয় রাজাদের আমলে বাংলায় বর্ণভেদের কঠোরতা ফিরে আসে। সেনরাজা বল্লাল সেন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য শ্রেণির মধ্যে ‘কৌলীন্য প্রথা’র প্রচলন করেন। এই যুগে বৌদ্ধদের ‘পাষণ্ড’ বলে নিন্দা করা হত। এতদিন সমাজে ছিল শুধু বর্ণভেদ, এই সময় বর্ণের মধ্যে ‘কুলভেদ’ শুরু হয়।
  • (২) ব্রাহ্মণ ছাড়া সকল বর্ণই তখন সংকর ও শূদ্র বর্ণের অন্তর্গত বলে বিবেচিত হয়। এদের আবার উত্তম, মধ্যম ও অধম বা অন্ত্যজ – এই তিনটি উপবর্ণে ভাগ করা হত। এই অনমনীয় কঠোরতার ফলে সেনযুগে ব্রাহ্মণরা অন্যান্য সামাজিক শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

প্রাক-মুসলিম পর্বে জাতি প্রথা

অষ্টম শতকে ভারতীয় সমাজে রাজপুত সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে তাতে সমাজজীবনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ড. সতীশচন্দ্রের মতে, বৃত্তি পরিবর্তন করে তখন বর্ণাক্রম পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তবে বর্ণভেদের কঠোরতা পূর্ববৎ বহাল ছিল।

দক্ষিণ ভারতে জাতি প্রথা

  • (১) আর্যসভ্যতা প্রসারের সূত্রে দাক্ষিণাত্যে বর্ণ ও জাতিভেদ প্রথার সূচনা হয়। জাতিভেদ প্রথা ক্রমে কঠোরতর হয় এবং সমাজে ব্রাহ্মণদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ ভারতের সমাজে ব্রাহ্মণ ও অ-ব্রাহ্মণ – এই দু-শ্রেণির উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যবর্তী ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের কোনো উল্লেখ নেই।
  • (২) ব্রাহ্মণরা প্রবল প্রতিপত্তি ও সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এঁরা রাষ্ট্রকে কর দিতে বাধ্য ছিলেন না। প্রশাসনের ওপরেও এঁদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। শূদ্ররা যথেষ্ট অবহেলিত ছিল।

উপসংহার :- প্রাচীন ভারতে বর্ণ ব্যবস্থা ছিল চরম প্রকৃতির। বর্ণব্যবস্থার হাত ধরে জাতিভেদ প্রথা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রভাব ছিল সব থেকে বেশি।

(FAQ) প্রাচীন ভারতে জাতিভেদ প্রথা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য সমাজে সাতটি শ্রেণির কথা কে বলেছেন?

মেগাস্থিনিস।

২. মেগাস্থিনিস রচিত গ্রন্থের নাম কি?

ইন্ডিকা।

৩. কৌলিন্য প্রথা কে চালু করেন?

বল্লাল সেন।

৪. কোন সময় বৌদ্ধদের পাষণ্ড বলে মনে করা হতো?

সেন যুগে।

Leave a Comment