আলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ

আলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ প্রসঙ্গে নব মুসলমান, ইলখানি মোঙ্গল, আফগানিস্তান অধিকার, মোঙ্গলদের প্রথম অভিযান, দ্বিতীয় অভিযান, তৃতীয় অভিযান, চতুর্থ অভিযান, পঞ্চম অভিযান, শেষ অভিযান ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানবো।

আলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ

ঐতিহাসিক ঘটনাআলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ
সুলতানআলাউদ্দিন খলজি
প্রথম অভিযান১২৯৭ খ্রিস্টাব্দ
শেষ অভিযান১৩০৬ খ্রিস্টাব্দ
মোঙ্গল নেতাআমির তার্ঘি, ইকবালমন্দ
আলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ

ভূমিকা :- মধ্য এশিয়ার মোঙ্গল উপজাতি দীর্ঘদিন ধরে দিল্লীর সুলতানি সাম্রাজ্য আক্রমণের চেষ্টা করে। বলবন মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বহু ব্যবস্থা নেন।

নব মুসলমান

সুলতান জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজির আমলেও কয়েকবার মোঙ্গল আক্রমণ হয়। জালালউদ্দিন বহু মোঙ্গলকে বন্দী করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেন। তাদের নাম হয় নব মুসলমান

ইলখানি মোঙ্গল

চেঙ্গিজের পৌত্র হলাগু খান পারস্য দেশ জয় করে ইলখাঁ বংশের আধিপত্য স্থাপন করেন। ইলখানি মোঙ্গলরা বলবনের আমল থেকে সুলতান জালালউদ্দিন খলজির আমল পর্যন্ত ভারতে আক্রমণ চালায়।

আফগানিস্তান অধিকার

আলাউদ্দিনের আমলে মধ্য এশিয়ার অক্ষু উপত্যকায় মোঙ্গল সেনাপতি দেবা খান আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি ইলখানি মোঙ্গলদের হাত থেকে আফগানিস্তান অধিকার করেন।

মোঙ্গল অভিযান

দেবা খানের নির্দেশে আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে ভারতে ৪টি (মতান্তরে ৬টি) মোঙ্গল অভিযান পাঠান হয়।

প্রথম অভিযান

১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম অভিযানে মোঙ্গল সেনাপতি কাদার খানের নেতৃত্বে পাঞ্জাব ও সিন্ধু আক্রমণ করে। আলাউদ্দিনের সেনাপতি জাফর খান ও উলুগ খান জলন্ধরের যুদ্ধে তাদের পরাস্ত করেন। বহু মোঙ্গল বন্দী হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

দ্বিতীয় অভিযান

এর পরে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আরও একটি মোঙ্গল আক্রমণ জাফর খান ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিরোধ করেন। জাফর খানের এই সাফল্যে আলাউদ্দিন তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হন।

তৃতীয় অভিযান

  • (১) ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল নেতা কুতলু খাজা এক বিরাট বাহিনীসহ আক্রমণ করেন। এই তৃতীয় আক্রমণ থেকে মোঙ্গল সেনাপতিরা তাদের রণকৌশল বদল করে। সীমান্তে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে লড়াই করার পরিবর্তে সরাসরি রাজধানী দিল্লী আক্রমণ করে।
  • (২) তারা সুলতানি সরকারকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কুতলু খাজা সরাসরি দিল্লীর দিকে ছুটে আসেন এবং দিল্লীর উপকণ্ঠে এসে যান। এর ফলে দিল্লীতে ভয়ানক আতঙ্ক দেখা দেয়। সুলতান নিজে, জাফর মান ও উলুগ খান সেনাদল নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে দিল্লীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
  • (৩) জাফর খানের অসাধারণ সাহস ও বীরত্বের ফলে মোঙ্গল বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়। কিন্তু পলায়মান মোঙ্গল সেনার পিছু নিয়ে আক্রমণ করার সময় জাফর খাঁ নিহত হন।

চতুর্থ অভিযান

  • (১) এরপর ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে মালিক তার্ঘির নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী পুনরায় আক্রমণ চালায়। এই সময় আলাউদ্দিন রাজপুতানার চিতোর দুর্গ আক্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। মোঙ্গল সেনাপতি আমীর তার্ঘি পুনরায় সরাসরি দিল্লী দখল করে সুলতানি সরকারকে ক্ষমতা চ্যুত করার চেষ্টা করেন।
  • (২) তার্ঘি দিল্লী নগরকে চারদিক থেকে অবরোধ করেন এবং দিল্লীতে খাদ্য ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করেন। এমন কি দিল্লীর ভেতর ঢুকে মোঙ্গল বাহিনী লুঠপাঠ চালায়।

তার্ঘির পশ্চাৎপ্রসরণ

কয়েকটি কারণে তার্ঘির মোঙ্গল বাহিনী শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। যেমন –

  • (১) আলাউদ্দিন তাঁর প্রাসাদ ও শাসন কেন্দ্রকে সুরক্ষিত করে সুশিক্ষিত সেনাদল দ্বারা দৃঢ়ভাবে আত্মরক্ষা করেন। আলাউদ্দিনের ব্যূহ ভেদ করা মোঙ্গলদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়।
  • (২) আলাউদ্দিন প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের দিল্লীর দিকে সেনাদল সহ আসতে নির্দেশ দিলে মোঙ্গল বাহিনীর বেষ্টিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
  • (৩) নব মুসলমান বা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত মোঙ্গলদের আলাউদ্দিন হত্যা করার হুমকি দেন।
  • (৪) মোঙ্গল সেনা অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়েছিল, দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না।

পঞ্চম অভিযান

  • (১) চতুর্থ অভিযান বিফল হলে ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল সেনাপতি আমির তার্ঘি, খাজা তাস প্রমুখ একযোগে আক্রমণ চালান। এই সময় মোঙ্গল সেনাপতিরা দিল্লী ও সুরক্ষিত দুর্গগুলিকে এড়িয়ে গ্রাম ও নগরে ব্যাপক লুণ্ঠন দ্বারা সুলতানি সরকারকে ক্ষতিগ্রস্থ করার নীতি নেন।
  • (২) মোঙ্গল সেনা যমুনা পার হয়ে দোয়াব ও গঙ্গা উপত্যকায় লুঠপাট ও অগ্নি সংযোগ চালাতে থাকে। আলাউদ্দিনের সেনাপতি মালিক কাফুর ও গাজি মালিক মোঙ্গল সেনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করে দেন। মালিক তার্ঘি ও খাজা তাস নিহত হন।

শেষ অভিযান

১৩০৬ খ্রিস্টাব্দে শেষ মোঙ্গল অভিযান ইকবালমন্দের নেতৃত্বে পরিচালিত হলে মালিক কাফুর ও গাজি মালিক এই বাহিনীকে বিদায় করেন। মালিক তার্ঘির অভিযানের পরে আলি বেগ, তারতাখ প্রমুখ মোঙ্গল সেনাপতিরা আরও কয়েকবার আক্রমণ চালিয়ে বিফল হন।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা

  • (১) আলাউদ্দিন মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেন। তিনি দিল্লীর চারদিকে নতুন প্রাচীর তৈরি করেন। দিল্লীতে সিরি দুর্গ পুনঃনির্মাণ করা হয়। মোঙ্গোলদের আসার পথের ধারে বলবনের আমলের পুরাতন দুর্গগুলির সংস্কার এবং নতুন দুর্গ নির্মাণ করা হয়।
  • (২) এই দুর্গগুলিতে অভিজ্ঞ, সাহসী সেনাদের বাধাদানের জন্য রাখা হয়। আলাউদ্দিন তাঁর সেনাদলের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সামরিক শিক্ষার ওপর জোর দেন। আলাউদ্দিনের দৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থার ফলে মোঙ্গল আক্রমণের তীব্রতা কমে যায়। ক্রমে মোঙ্গোলরা উৎসাহহীন হয়ে পড়ে।
  • (৩) গাজি মালিক আফগানিস্থানে প্রতি আক্রমণ চালিয়ে মোঙ্গল আক্রমণের সম্ভাবনা বিনষ্ট করেন। এই প্রতিবিধানমূলক ব্যবস্থা বেশ কার্যকরী হয়। মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধে জয়ী হয়ে আলাউদ্দিন নিরাপদ হয়ে দাক্ষিণাত্য অভিযানে মন দিতে পারেন।

উপসংহার :- মোঙ্গল আক্রমণের ভয়ে ভারত -এর বিভেদকামী শক্তিগুলি আলাউদ্দিনকেই পরিত্রাতা হিসেবে ভাবতে বাধ্য হয়। তারা সুলতান আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে সাহস করে নি। আলাউদ্দিন এক বিরাট সেনাদলের মালিক হয়ে এবং মোঙ্গল যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাঁর স্বৈরতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করেন।

(FAQ) আলাউদ্দিন খলজির সময় মোঙ্গল আক্রমণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আলাউদ্দিনের সময় কতবার মোঙ্গল আক্রমণ হ?

৬ বার।

২. আলাউদ্দিনের সময় কোন কোন মোঙ্গল নেতা ভারত আক্রমণ করে?

কাদার খান, কতলু খাজা, মালিক তার্ঘি, খাজা তাস, ইকবালমন্দ।

৩. আলাউদ্দিনের সময় প্রথম মোঙ্গল আক্রমণ কার নেতৃত্বে হয়?

কাদার খান ১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে।

৪. আলাউদ্দিনের সময় শেষ মোঙ্গল অভিযান কার নেতৃত্বে হয়?

ইকবালমন্দ।

Leave a Comment