ইলতুৎমিসের সমস্যা

ইলতুৎমিসের সমস্যা প্রসঙ্গে কুবাচার আধিপত্য বিস্তার, তাজউদ্দিনের দাবি, আলি মর্দান খলজির স্বাধীনতা ঘোষণা, হিন্দু রাজাদের আন্দোলন, সহকর্মী সেনানায়কদের বিদ্রোহ ও সমস্যা সমূহের সমাধান সম্পর্কে জানবো।

ইলতুৎমিসের সমস্যা

ঐতিহাসিক ঘটনাইলতুৎমিসের সমস্যা
সুলতানইলতুৎমিস
পূর্বসূরিকুতুবউদ্দিন আইবক
উত্তরসূরিরুকনউদ্দিন ফিরোজ
উজ্জয়িনী লুন্ঠনইলতুৎমিস
ইলতুৎমিসের সমস্যা

ভূমিকা :- ইলতুৎমিসের বাহুবলে ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক কৌশলে কুতুবউদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত সুলতানি সাম্রাজ্য আমাদের দেশ ভারতবর্ষ -এ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং একটি সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনস্থ হয়।

ইলতুৎমিসের সমস্যা সমূহ

সিংহাসনে আরোহণের সময় ইলতুৎমিসকে কয়েকটি সঙ্কটপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন –

(১) কুবাচার আধিপত্য বিস্তার

নাসিরউদ্দিন কুবাচা সিন্ধুদেশে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পাঞ্জাবের উপর তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে চেষ্টা করেন।

(২) তাজউদ্দিনের দাবি

গজনির সার্বভৌম শাসক হিসাবে তাজউদ্দিনও ভারতবর্ষ -এ তুর্কিদের দ্বারা অধিকৃত অঞ্চলের দাবি ছাড়তে প্রস্তুত ছিলেন না।

(৩) আলি মর্দান খলজির স্বাধীনতা ঘোষণা

কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আলি মর্দান খলজি বাংলাদেশ -এ তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কুতুবউদ্দিনই আলি মর্দান খলজিকে বঙ্গদেশের ‘শাসনকর্তা’ নিযুক্ত করেছিলেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পর দিল্লির প্রতি অখণ্ড আনুগত্য বিসর্জন দিয়ে আলি মর্দান খলজি নিজেকে ‘সুলতান আলাউদ্দিন’ বলে ঘোষণা করেন।

(৪) হিন্দু রাজাদের আন্দোলন

গোয়ালিয়র, রণথম্বোর প্রভৃতি রাজ্যের হিন্দু নরপতিগণও মুসলমানের শাসন স্বীকার করতে চাইছিল না। আরাম শাহের দুর্বল শাসনকালে, কালিঞ্জর, আজমির, গোয়ালিয়র, দোয়াব অঞ্চল ও বেয়ানাসহ সমগ্র পূর্ব রাজস্থান দিল্লির সুলতানের হাতছাড়া হয়ে যায়।

(৫) সহকর্মী সেনানায়কদের বিদ্রোহ

দিল্লির কয়েকজন সহকর্মী সেনানায়কও আরাম শাহের দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এর অর্থ, ইলতুৎমিসের সিংহাসনে আরোহণকে বৈধ হিসাবে স্বীকৃতি না দেওয়া।

ইলতুৎমিসের সমস্যার সমাধান

ইলতুৎমিস অসামান্য কর্মশক্তি ও বীরত্বের অধিকারী ছিলেন বলে এই দারুণ সঙ্কটে অবিচলিত থেকে উপরোক্ত সমস্যাগুলি অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে মোকাবিলা করে, দিল্লির শিশু সুলতানি সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। যেমন –

(ক) আমিরদের দমন

তিনি দিল্লির বিদ্রোহী আমিরগণকে দমন করে, দিল্লি ও সন্নিকটস্থ বদায়ুন, অযোধ্যা, বেনারস ও শিবালিকদের উপর মুসলমান আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।

(খ) তাজউদ্দিনের মোকাবিলা

  • (১) ইতিমধ্যে গজনির অধিপতি তাজউদ্দিন পাঞ্জাব অধিকার করে লাহোরে অবস্থান করছিলেন। তারপর তাজউদ্দিন খারাজিম শাহ কর্তৃক গজনি থেকে বিতাড়িত হলে, তাজউদ্দিন সিন্ধুর শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিনকেও পরাজিত করেন।
  • (২) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে এই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে উপেক্ষা না করে, ইলতুৎমিস সসৈন্যে লাহোর যাত্রা করেন। কে. কে. দত্তের মতে ১২১৬ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের নিকটস্থ এক যুদ্ধে ইলতুৎমিস তাজউদ্দিনকে পরাজিত ও বন্দি করেন। পরে বদায়ুনের কারাগারে তাজউদ্দিনের মৃত্যু হয়।

(গ) কুবাচা অধীনতা স্বীকারে বাধ্য

১২১৭ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুর শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন ইলতুৎমিসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে, তাঁর অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হন। তাই ড. হবিবুল্লাহ ইলতুৎমিসের এই বিজয়ের তাৎপর্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন এই জয়লাভে আইবকের আরব্ধ কাজ সমাপ্ত হয় এবং দিল্লির স্বাধীনতার শেষ বাধা ও মধ্য এশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে তার জড়িত থাকার অবস্থার চিরতরে অবসান ঘটায়। তত্ত্বগত দিক থেকে দিল্লি সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

(ঘ) মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ

  • (১) ইলতুৎমিস যখন সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত, তখন তাকে এক দারুণ সংকটের সম্মুখীন হতে হয়। এই সময় দুর্ধর্ষ মোঙ্গল জাতির নায়ক চেঙ্গিজ খান পলায়মান খিবার অধিপতি জালালউদ্দিন মঙ্গবর্নিকে অনুসরণ করতে করতে, একেবারে ভারতের সীমান্তে এসে উপস্থিত হন।
  • (২) ১২২০ খ্রিস্টাব্দে এই মোঙ্গলরা খারিজিম সাম্রাজ্য ধ্বংস করে। মঙ্গবর্নি ছিলেন খারাজিম সাম্রাজ্যের শেষ অধিপতি। এইভাবে মোঙ্গলরা এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করে। এই সাম্রাজ্য চীন থেকে ভূমধ্যসাগর এবং কাস্পিয়ান সাগর থেকে সিমুদরিয়া নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
  • (৩) খিবার অধিপতি পাঞ্জাবে আশ্রয় গ্রহণ করে, নাসিরউদ্দিন কুবাচার নিকট অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং ইলতুৎমিসের কাছ থেকে অনুরূপ সাহায্যের প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু সুচতুর ইলতুৎমিস তাঁকে সাহায্য দিয়ে চেঙ্গিজ খানের বিরাগভাজন হতে চাইলেন না। তাই অযথা সাহায্যে বিলম্ব-নীতি গ্রহণ করেন।
  • (৪) কারণ, কোনো রাজ্যচ্যুত সুলতান রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে, সেটা প্রত্যাখ্যান করা অসৌজন্যমূলক হবে, তা ইলতুৎমিসের অজানা ছিল না। আবার, সেই সময় এই সাহায্য দিলে চেঙ্গিজ খানের আক্রমণকে আহ্বান করা হত এবং দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের সর্বনাশ সাধিত হত।
  • (৫) যেহেতু ইলতুৎমিসের নীতি ছিল দিল্লিকে মধ্য এশিয়ার রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। সুতরাং ইলতুৎমিস অত্যন্ত ভদ্রভাবে এক প্রত্যাখ্যান-পত্র পাঠালেন যে, দিল্লির আবহাওয়া জালালউদ্দিনের স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকূল হবে না।
  • (৬) অগত্যা জালালউদ্দিন মঙ্গবর্নি ভগ্নমনোরথ হয়ে সিন্ধুর অধিপতি নাসিরউদ্দিন কুবাচাকে পরাজিত করে, সিন্ধু ও উত্তর গুজরাট লুণ্ঠন করে পারস্যে প্রস্থান করেন। এইরূপ পরিস্থিতিতে চেঙ্গিজ খান আর অগ্রসর না হয়ে ভারত ত্যাগ করেন।
  • (৭) ইলতুৎমিসের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিকৌশলের বলে, তাঁর শিশু সুলতানি সাম্রাজ্য এক মহাসঙ্কটের হাত থেকে মুক্তি পেল বটে ; কিন্তু মোঙ্গলরা ভারতবর্ষের কথা ভুলতে পারেনি। পরবর্তীকালে এই মোঙ্গল আক্রমণে ভারতবর্ষ সুদীর্ঘকাল ধরে বিব্রত হয়েছে।

(ঙ) কুবাচার উৎখাত

মোঙ্গলরা যখন অন্যত্র ব্যস্ত এবং চেঙ্গিজের প্রত্যাবর্তনের সুযোগে, ইলতুৎমিস মুলতান ও উচ থেকে কুবাচাকে উৎখাত করেন। কুবাচা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে গিয়ে সিন্ধুর জলে ডুবে মারা যান। এর ফলে, দিল্লির সুলতানি সীমান্ত সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

(চ) বঙ্গদেশের বিদ্রোহ দমন

  • (১) নাসিরউদ্দিন কুবাচার পরাজয়ের ফলে পশ্চিমের নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হয় এবং ইলতুৎমিস বঙ্গদেশের বিদ্রোহ দমনে মনোনিবেশ করেন। কুতুবউদ্দিন আইবকের মৃত্যুর পর থেকেই বঙ্গদেশ দিল্লির প্রভুত্ব মানতে অস্বীকার করে।
  • (২) আলি মর্দান খলজি বঙ্গদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন; কিন্তু তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইয়াজ নামে এক ব্যক্তি আলি মর্দানকে হত্যা করে ‘সুলতান গিয়াসউদ্দিন’ উপাধি গ্রহণ করে, বাংলা ও বিহারে স্বাধীনভাবে রাজ্যশাসন করছিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ ও মহানুভব শাসক। জনকল্যাণে তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
  • (৩) ইলতুৎমিস দিল্লির অধীনস্থ একটি রাজ্যকে, এইভাবে তার স্বাধীন অস্তিত্বকে বজায় রাখা’র ব্যাপারটা সহ্য করতে চাইলেন না। ১২২৫-২৬ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিস বঙ্গদেশ আক্রমণ করে, গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।
  • (৪) গিয়াসউদ্দিন বিনাযুদ্ধে দিল্লির অধীনতা স্বীকার করেন, কিন্তু ইলতুৎমিসের দিল্লি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, আবার তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তখন ইলতুৎমিসের জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসিরউদ্দিন অযোধ্যার ‘শাসক’ ছিলেন। অযোধ্যা থেকে নাসিরউদ্দিন ইয়াজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং তাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন।
  • (৫) এরপর ইলতুৎমিসকে বঙ্গদেশে বিদ্রোহ দমন করতে আর একবার আসতে হয়েছিল। নাসিরউদ্দিনের মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন জানিকে ‘শাসনকর্তা’ নিযুক্ত করা হয়। এইভাবে ইলতুৎমিস বঙ্গদেশ ও বিহারকে পুনরায় দিল্লির অধীনে আনতে সক্ষম হন।

(ছ) রাজপুতদের বিদ্রোহ দমন

  • (১) এই সময় দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের পক্ষে রাজপুতগণ খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাঁরা বরাবরই তাঁদের রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। সেই কারণে ইলতুৎমিস হারিয়ে যাওয়া রাজ্যগুলি পুনরাধিকার করতে সঙ্কল্প করেন।
  • (২) এই উদ্দেশ্যে ১২২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি রণথম্বোর পুনরধিকার করেন এবং ১২৩২ খ্রিস্টাব্দে গোয়ালিয়র দখল করেন। ১২৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি মালব আক্রমণ করে ভিলসার দুর্গ অধিকার করেন।
  • (৩) অতঃপর উজ্জয়িনী লুণ্ঠন করেন। মালবের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে ড. হবিবুল্লাহ ‘was little more than predatory raid’ লুণ্ঠনকারীর অভিযান ছাড়া কিছু নয় বলে অভিহিত করেছেন।

বৈধতা ও রাজকীয় মর্যাদা স্থাপন

  • (১) এই সময়েই ইলতুৎমিস লক্ষ্য করেন যে তুর্কি মালিক ও আমিররা তাঁর সমকক্ষতা ও সমান মর্যাদা দাবি করছেন। তখন তিনি তাঁর বৈধতা ও রাজকীয় মর্যাদা স্থাপনের জন্য খলিফার সঙ্গে দূত বিনিময় করেন। ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের খলিফা তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে, সম্মানসূচক উপাধিসহ তাঁর নিকট এক দূত প্রেরণ করেন।
  • (২) মুসলমান জগতের সার্বভৌম অধিপতি কর্তৃক এই অনুমোদনের ফলে, ইলতুৎমিসের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি অভাবনীয়রূপে বৃদ্ধি পায়। খলিফার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত, ইলতুৎমিস তাঁর মুদ্রায় নিজেকে খলিফার সেনাপতিরূপে বর্ণনা করেন।
  • (৩) তিনিই আরবি মুদ্রার অনুরূপ ১৭৫ গ্রাম ওজনের রুপোর টাকা চালু করেন। এডওয়ার্ড টমাস তাই বলেছেন, ইলতুৎমিসের রাজত্বকালেই দিল্লি সুলতানির প্রথম রৌপ্যমুদ্রা চালু হয়।

উপসংহার :- এইভাবে ইলতুৎমিস কুতুবউদ্দিনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে, অসুস্থ শরীরে দিল্লি ফিরে আসেন এবং ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে, দিল্লির শিশু সুলতানি সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ও সফল এক রাষ্ট্রনীতিবিদের ছাব্বিশ বছরের গৌরবময় শাসনকালের অবসান ঘটে।

(FAQ) ইলতুৎমিসের সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন সুলতান উজ্জয়িনী লুন্ঠন করেন?

ইলতুৎমিস।

২. সুলতান-ই-আজম উপাধি ধারণ করেন কে?

ইলতুৎমিস।

৩. সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কাকে বলা হয়?

ইলতুৎমিস।

৪. ইলতুৎমিস কাকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন?

রাজিয়া

Leave a Comment