সুলতান রাজিয়া

সুলতান রাজিয়া -র সিংহাসন লাভ, রাজত্বকাল, রাজিয়ার সামনে সমস্যা ও তার সমাধান, অভিজাতদের দমন, যুদ্ধ কৃতিত্ব, বিবাহ ও মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

সুলতান রাজিয়া

রাজত্ব১২৩৬ – ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ
জন্ম১২০৫ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিরুকনউদ্দিন ফিরোজ
উত্তরসূরিমুইজউদ্দিন বাহরাম
মৃত্যু১২৪০ খ্রিস্টাব্দ
সুলতান রাজিয়া

ভূমিকা :- ভারতের ইতিহাসে যে সকল নারী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসামান্য যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুলতান রাজিয়া।

ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য নারী

প্রাচীন মিশরে নেফারতিতি এবং ক্লিওপেট্রা; ভারতের সুলতান রাজিয়া, রাণী দুর্গাবতী, নূরজাহান প্রমুখ নারীর কথা জানা যায়, যাঁরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

দিল্লি সুলতানির উত্তরাধিকারী

পিতা ইলতুৎমিস (১২১১-০৬ খ্রি.) তাঁর জীবদ্দশায় কন্যা রাজিয়াকে দিল্লি সুলতানির উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

রুকনউদ্দিনের সিংহাসন লাভ

ইলতুৎমিসের মৃত্যুর পর দিল্লির গোঁড়া উলেমা শ্রেণি ও আমির ওমরাহরা ইলতুৎমিসের অপদার্থ পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসায়।

রাজিয়ার সিংহাসন লাভ

কিন্তু অযোগ্য ও অপদার্থ রুকনউদ্দিনের বিরুদ্ধে দিল্লির আমির ওমরাহদের মনে শীঘ্রই ক্ষোভ জমা হতে থাকে। শেষপর্যন্ত কতিপয় আমির-ওমরাহদের সাহায্যে রুকনউদ্দিনকে সিংহাসন চ্যুত করে রাজিয়া দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

রাজত্বকাল

তিনি ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

সমস্যা

দিল্লি সুলতানির সিংহাসনে বসেই রাজিয়া বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন।

(১) রাজিয়ার সিংহাসন লাভের বিরোধিতা

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী (ওয়াজির) ও রাজিয়া-বিরোধী চল্লিশ চক্রের অন্যতম নেতা মালিক মহম্মদ জুনাইদি রাজিয়ার সিংহাসন লাভের বিরোধিতা করেন।

(২) আঞ্চলিক শাসকদের দিল্লি অবরোধ

মুলতান, বদাউন, হানসি, লাহোর প্রভৃতি প্রদেশের আঞ্চলিক শাসনকর্তারা দিল্লি অবরোধ করে রাজিয়ার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলেন।

সমাধান

এরূপ সংকটজনক পরিস্থিতিতে রাজিয়া সুস্থ মস্তিষ্কে সমস্যা সমাধানের দিকে অগ্রসর হন।

  • (১) তিনি সুকৌশলে বিভিন্ন বিদ্রোহী আমির ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন।
  • (২) বিরোধী কবির খান, ইজ্জুদ্দিন, মহম্মদ সালারি প্রমুখকে তিনি নিজ পক্ষে আনতে সক্ষম হন।
  • (৩) রাজিয়ার বিরোধী মহম্মদ জুনাইদি পলাতক অবস্থায় নিহত হন।
  • (৪) রাজিয়া মুহজাবউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী এবং কুতুবউদ্দিন হাসান ঘুরি-কে প্রধান সেনাপতি (মালিক-ই লস্কর) পদে নিয়োগ করেন। এভাবে রাজিয়া নিজের সিংহাসন কণ্টকমুক্ত করে প্রশাসনকে শক্ত করেন।

প্রাদেশিক বিদ্রোহ দমন

রাজিয়া অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রাদেশিক শাসক ও আমলাদের বিদ্রোহ দমন করেন।

  • (১) প্রাদেশিক বিদ্রোহী নেতা নিজাম-উল-মুলক জুনাইদির বিদ্রোহ দমনের জন্য রাজিয়া তাঁকে হত্যা করেন। লাহোরের প্রাদেশিক শাসক কবীর খানের বিদ্রোহও তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করেন।
  • (২) ইতিহাসবিদ মিনহাজ উস-সিরাজের মতে, বাংলা থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সকল আমির ও প্রাদেশিক শাসকগণ রাজিয়ার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অভিজাতদের ক্ষমতা ধ্বংস

নিজের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করে রাজিয়া প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি দিল্লির তুর্কি আমির-ওমরাহ ও অভিজাতদের ক্ষমতা ধ্বংস করে একটি সুদক্ষ কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

যোদ্ধা রাজিয়া

বিদুষী ও বুদ্ধিমতী রাজিয়ার অস্ত্র চালনায় দক্ষতা, পুরুষের সাজে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হওয়া, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করা প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে দিল্লির তুর্কি অভিজাত শ্রেণি ও গোঁড়া মৌলবিরা তাঁর প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিলেন।

চল্লিশের চক্র ভঙ্গ

এই সময় রাজিয়া তুর্কি অভিজাতদের নিয়ে গঠিত তুর্কান-ই-চাহেলগান’ বা ‘চল্লিশের চক্র’ ভেঙে দিলে অভিজাতরা ক্ষুব্ধ হন বলে ড. কে. এ. নিজামি মনে করেন।

অতুর্কি মুসলিমদের গুরুত্ব

  • (১) রাজিয়া প্রশাসনের বিভিন্ন উচ্চপদে অসংখ্য অতুর্কি মুসলমানকে বসিয়ে তুর্কি অভিজাতদের ক্ষমতা ধ্বংস করার চেষ্টা করেন।
  • (২) শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য রাজিয়া তাজিক বা অতুর্কি অভিজাতদের নিয়ে নিজের অনুগত একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
  • (৩) ড. নিজামির মতে, “রাজিয়া তাঁর বিরোধী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করার বিষয়ে অসাধারণ রাজনৈতিক বিচক্ষণতার প্রমাণ রেখেছিলেন।”

ষড়যন্ত্র

দিল্লির আমির, ওমরাহ ও অভিজাতরা রাজিয়াকে সিংহাসনচ্যুত করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রে যোগ দেন।

যুদ্ধ ঘোষণা

অভিজাতদের নেতা বলবন এবং রাজপরিবারের প্রধান কর্মচারী আইতিগিনের সহায়তা নিয়ে পাঞ্জাবের ভাতিন্ডার শাসনকর্তা ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়া রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

পরাজয় ও বন্দি

রাজিয়া তাঁর সেনাপতি জামালউদ্দিন ইয়াকুৎ খাঁ-কে সঙ্গে নিয়ে ভাতিন্ডা দুর্গ অভিযান করেন। যুদ্ধে ইয়াকুৎ খাঁ নিহত হন এবং আলতুনিয়ার হাতে রাজিয়া বন্দি হন।

বাহরাম শাহের সিংহাসনলাভ

রাজিয়া বন্দি হলে তাঁর ভাই বাহরাম শাহ দিল্লির সিংহাসনে বসেন (১২৪০ খ্রি.)।

আলতুনিয়াকে বিবাহ

এই সময় আলতুনিয়াকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হলে প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি রাজিয়াকে বিবাহ করে সেনাদল-সহ দিল্লির দিকে যাত্রা করেন।

পরাজয়

কিন্তু বাহরাম শাহের বাহিনীর কাছে তাঁরা পরাজিত হয়ে ভাতিন্ডায় প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। এই সময় দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের নিজস্ব সেনাবাহিনীও তাঁদের ত্যাগ করে।

মৃত্যু

শেষপর্যন্ত পথিমধ্যে সুলতানি বাহিনীর হাতে আলতুনিয়া ও রাজিয়া উভয়েই নিহত হন (১২৪০ খ্রি.)।

কৃতিত্ব

সুলতান রাজিয়া যে প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা প্রশংসার দাবি রাখে।

  • (১) সমকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দিন সিরাজের মতে, রাজিয়া ছিলেন বুদ্ধিমতী, ন্যায়পরায়ণা, দয়ালু, বিদ্যোৎসাহিনী, প্রজাবৎসলা ও সমরকুশলা।
  • (২) ভারতে সুলতানি তথা মুসলিম শাসকদের মধ্যে রাজিয়াই ছিলেন একমাত্র নারী শাসক।
  • (৩) মধ্যযুগের একজন নারী হয়েও তাঁর স্বল্পকালের রাজত্বকালে তিনি যে শাসন দক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মানবিক অনুভূতির পরিচয় দিয়েছিলেন তা এককথায় অনন্য।

উপসংহার :- আধুনিক ঐতিহাসিক ড. কে. এ. নিজামি বলেছেন যে, “ইলতুৎমিসের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রাজিয়া ছিলেন শ্রেষ্ঠ।”

(FAQ) সুলতান রাজিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. রাজিয়া কথার অর্থ কী?

সন্তুষ্ট, ইচ্ছুক।

২. রাজিয়া কে ছিলেন?

সুলতান ইলতুতমিশের কন্যা ভারতের প্রথম মুসলিম শাসিকা।

৩. রাজিয়া কাকে বিবাহ করেন?

ভাতিন্ডার শাসনকর্তা আলতুনিয়াকে।

Leave a Reply

Translate »