মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর প্রসঙ্গে বাবর এর বিরুদ্ধে মতামত হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ শাসন, দুর্বল যোদ্ধা ও রাজনীতিজ্ঞ, ঐক্যবদ্ধ শাসন প্রবর্তনে অক্ষম, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ, শূন্য রাজ কোষ, বাবরের সমর্থনে মতামত হিসেবে স্বল্প সময়কাল, পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, আফগান ও রাজপুতদের ধ্বংস, সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন সিংহাসনে সার্বভৌমত্ব স্থাপন ও বংশধরদের জন্য উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া সম্পর্কে জানবো।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর

ঐতিহাসিক ঘটনামুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর
সাম্রাজ্যমুঘল সাম্রাজ্য
প্রথম রাজাজহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর
শ্রেষ্ঠ রাজাআকবর
শেষ রাজাদ্বিতীয় বাহাদুর শাহ
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর

ভূমিকা :- বাবরকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় কিনা এই বিষয়ে অনেকে বিতর্ক করেন। অনেকে বাবরের পক্ষে যেমন কথা বলেন অনেকেই আবার তার বিরুদ্ধেও মত প্রকাশ করেন।

বাবরের বিরুদ্ধে মতামত

একথা বলা হয় যে, বাবর যে সাম্রাজ্য স্থাপন করেন তা স্থায়ী হয় নি। হুমায়ুনের আমলে তা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। যদি আকবর পুনরায় রাজ্য জয় ও শাসন ব্যবস্থা গঠন না করতেন তবে ভারত ইতিহাসে মুঘল বিজয় একটি Episode বা উপাখ্যানে পরিণত হত। এক্ষেত্রে যুক্তি হল –

(১) ত্রুটিপূর্ণ শাসন

বাবরের শাসনব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ ছিল এতে সন্দেহ নেই। রাশব্রুক উইলিয়ানস মন্তব্য করেছেন যে, “বাবর তাঁর পুত্রের জন্য যে রাজতন্ত্র উত্তরাধিকার হিসেবে দেন তা কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় কার্যকরী ছিল, শান্তির সময় তা ছিল দুর্বল, কাঠামোহীন ও মেরুদণ্ডহীন”।

(২) দুর্বল যোদ্ধা ও রাজনীতিজ্ঞ

যোদ্ধা হিসেবে বাবর যত বড় হোন না কেন, সংগঠক ও শাসনব্যবস্থার স্থাপয়িতা হিসেবে তার কর্মকৃতি ম্লান ছিল। বাবর ছিলেন বিখ্যাত সেনাপতি ও সাহিত্যিক, রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে তার কৃতিত্ব উল্লেখ্য নয়।

(৩) ঐক্যবদ্ধ শাসন প্রবর্তনে অক্ষম

  • (ক) বাবর তাঁর বিজিত সাম্রাজ্যে কেন্দ্রীভূত, ঐক্যবদ্ধ শাসন প্রবর্তন করতে অপারগ হন। আরস্কিন (Arskine) নামে লেখকের মতে, বাবর কেবলমাত্র সামরিক জয় করেন। বিজিত রাজ্যে একই প্রকার আইন ছিল না।
  • (খ) প্রতি গ্রাম ও অঞ্চল স্থানীয় প্রথা অনুসারে শাসিত হত। স্থানীয় জাগীরদার ও শাসকরা নিজ ইচ্ছামত শাসনের ক্ষমতা পায়। বাবর তার সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন আমীর ও জাগীরদারের মধ্যে ভাগ করে দেন।

(৪) সমন্বয় সাধনে অক্ষম

শাসনকেন্দ্রগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করার কোনো ব্যবস্থা তিনি করেন নি। এর ফলে বাবরের অধীনে তাঁর সাম্রাজ্য স্বয়ং-শাসিত অঞ্চলের সমষ্টিতে পরিণত হয়।

(৫) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ

বাবর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে আইন-আদালত স্থাপন করে ন্যায়বিচার করার চেষ্টা করেন নি। ফলে সরকারী আইনগুলিকে কাজে পরিণত করা ও বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নি।

(৬) মজবুত কাঠামো স্থাপনে অক্ষম

রাষ্ট্রকে দৃঢ় করার জন্য যে মজবুত রাজস্ব, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা দরকার বাবর তা করেন নি।

(৭) শূন্য রাজকোষ

দিল্লী, আগ্রা ও গোয়ালিয়র জয়ের পর যে বিরাট ধনরত্ন তাঁর হাতে আসে তিনি তা তাঁর আমীর ও সেনাদলকে বিতরণ করেন। এর ফলে তাঁর রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।

(৮) হুমায়ূনের দুর্ভাগ্য

ঐতিহাসিকরা বলেন যে, “হুমায়ূনের দুর্ভাগ্যের জন্য বাবরই দায়ী ছিলেন।” বাবরের মৃত্যু হলে শূন্য রাজকোষ নিয়ে হুমায়ূন সেনাদল তৈরি করতে পারেন নি।

(৯) জনগণের আকর্ষণে অক্ষম

বাবর এমন কোনো জনহিতকর প্রশাসন বা প্রতি ব্যবস্থা স্থাপন করেন নি যে জনসাধারণ মুঘল শাসনের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। এই সকল ত্রুটির জন্য বাবরকে দক্ষ সেনাপতি বলা হলেও শ্রেষ্ঠ প্রশাসক ও রাষ্ট্রনীতিজ্ঞ বলা যায় না।

বাবরের সমর্থনে মতামত

বাবরের সমর্থনে কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে,

(১) স্বল্প সময়কাল

বাবর মাত্র ৪ বছর ভারতে ছিলেন। এই স্বল্প পরিসর সময়ের মধ্যে তিনি আফগান ও রাজপুত প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনে ব্যস্ত ছিলেন।

(২) মুঘলরা বিদেশি

ভারতের লোকেরা তখনও মুঘলদের বহিরাগত, বিদেশী বলে মনে করত। সুতরাং ভারতীয় জনসাধারণের বিভিন্ন প্রথা, আইন ও সংস্কারগুলির ভালমন্দ না বুঝে, বাবরের পক্ষে হঠাৎ কোনো প্রশাসনিক ও আইনগত সংস্কার চালু করা সম্ভব ছিল না।

(৩) পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই

শেরশাহ বা আকবরের মত ভারতীয় জীবন সম্পর্কে বাবরের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। সুতরাং এ ক্ষেত্রে তিনি সঙ্গতভাবে হস্তক্ষেপ না করার নীতি নেন।

(৪) সামরিক দিক

বাবরকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় না এই মত সম্পূর্ণভাবে গ্রহণীয় নয়। প্রশাসনিক দিক হতে তার ত্রুটির জন্য এই মত আংশিকভাবে গ্রহণীয়। কিন্তু সামরিক অর্থে তিনি ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

(৫) আফগান ও রাজপুতদের ধ্বংস

বাবর যদি পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধে আফগান ও রাজপুত শক্তিকে চূরমার না করতেন তবে আকবরের সাম্রাজ্য গঠনের সুযোগ কোনোদিনই হত না। আকবরের কৃতিত্ব খাটো না করেও ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য স্থাপয়িতা হিসেবে বাবরের কৃতিত্ব উল্লেখ্য।

(৬) মুঘল শক্তিকে ভারতমুখী করা

বাবর যদি মুঘল শক্তিকে ভারতমুখী না করতেন তবে তা মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য তাতার জাতির অর্ন্তযুদ্ধে ক্ষয় হয়ে যেত।

(৭) সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন

তিনি ভারতের পুরাতন মানচিত্রকে পাল্টে নতুন ভাবে গঠন করেন। ষোড়শ শতকের গোড়ায় ভারতের মানচিত্রে ক্ষুদ্র রাজ্য সমষ্টির মধ্যে যে শক্তি সাম্য ছিল তিনি তা ভেঙে উত্তর ভারতে এক সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।

(৮) আকবরের কাজ সহজ

রাজপুত ও আফগান শক্তিকে তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ ও ঘর্ঘরার যুদ্ধে দুর্বল করার ফলেই পরবর্তীকালে আকবরের কাজ অনেক সহজ হয়।

(৯) সিংহাসনে সার্বভৌমত্ব স্থাপন

তিনি উত্তর ভারতের এক বৃহৎ অঞ্চলকে জয় করে দিল্লী নগরকে রাজধানীর মর্যাদা দেন। তাছাড়া তিনি “পাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ ও সিংহাসনের সার্বভৌমত্ব স্থাপন করেন। এর ফলে মুঘল যুগে অভিজাতরা সুলতানি যুগের মত সিংহাসনের সমকক্ষতা দাবী করতে সাহস করেন নি।

(১০) বংশধরদের জন্য উত্তরাধিকার

বাবর তাঁর বংশধরদের জন্য যে উত্তরাধিকার রেখে যান তা নিতান্ত কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনি যে সাম্রাজ্য রেখে যান তা ছিল মধ্য এশিয়া, কাবুল, পাঞ্জাব থেকে বিহারের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

(১১) রাজবংশ স্থাপন

তিনি তৈমুর ও চেঙ্গীজদের রক্তধারা বহনকারী একটি রাজবংশ স্থাপন করেন, যার নিজস্ব মর্যাদাকে কোনো অভিজাত অগ্রাহ্য করতে সাহস করেন নি। তৈমুরের আড়ম্বরপ্রিয়তা ও চেঙ্গীজের সামরিক দক্ষতা এই রাজবংশধারাকে এক বিরল কৃতিত্ব ও গৌরব দান করে।

(১২) ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের বীজ বপন

বাবর ষোড়শ শতকের দুর্বল মানচিত্রকে ছিঁড়ে ফেলে কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় সাম্রাজ্যের বীজ বপন করেন।

(১৩) আক্রমণাত্মক রণকৌশল প্রবর্তন

বাবর ভারতের ঘুনধরা সামরিক সংগঠন ও যুদ্ধ কৌশলকে সমাধি দেন। তার পরিবর্তে তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং অশ্বারোহী সেনার আক্রমণাত্মক কৌশল চালু করেন।

(১৪) দ্রুতগামী চলমান বাহিনী

মধ্যযুগের গোড়ার দিকে দুর্গগুলিকে সামরিক ব্যুহ বলে মনে করা হত। বাবর দুর্গের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে দ্রুতগামী চলমান বাহিনী দ্বারা যুদ্ধ জয়ের প্রথা চালু করেন। সেনাদল দুর্গের পরিবর্তে তাবুর নীচে বাস করতে অভ্যস্ত হয়।

(১৫) দুই সংস্কৃতির সমন্বয়

বাবর তাঁর দরবারে তৈমুরের উত্তরাধিকারী হিসেবে এক বর্ণবহুল সংস্কৃতি চালু করেন। ডঃ ত্রিপাঠীর মতে, “বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্য কেবলমাত্র তার সামরিক শৌর্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, তার অন্যপ্রকার গুণও ছিল। অমুসলিম প্রজাদের প্রতি ধর্মসহিষ্ণুতা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মধ্য এশিয়ার সংস্কৃতির সমন্বয়।

(১৬) ধর্ম ও শাসন নীতি পৃথক

আকবরের মহত্বকে খর্ব না করেও বলা চলে যে তাঁর নীতির বীজ তার পিতামহ বপন করেন। কারণ তিনি ধর্মীয় নীতি থেকে তার শাসননীতিকে পৃথক রাখেন। তাঁর দুই পুত্র হুমায়ূন ও কামরানকে মেদিনী রায়ের দুই কন্যার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে তিনি আকবরের রাজপুত বিবাহ নীতির বীজ বপন করেন।

ডঃ শর্মার অভিমত

ডঃ এস আর শর্মার মতে, “বাবর একটি রাজবংশ এবং একটি রাষ্ট্রীক আদর্শের প্রবর্তন করেন।”

উপসংহার :- বাবর সিংহাসনে তার স্বর্গীয় অধিকার নীতি প্রতিষ্ঠার দ্বারা খলিফাতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করেন। তাঁর স্থাপত্য প্রীতি কম ছিল না। তুজুক-ই-বাবরী তার সাহিত্যপ্রীতির নিদর্শন। এইরূপ বর্ণবহুল, মৌলিক চরিত্রের লোক ভারত সম্রাটের আসন অলংকৃত করে প্রকৃতই ভারতে মুঘল যুগের উদ্বোধন ঘটান।

(FAQ) মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বাবর সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর।

২. পাদশাহ উপাধি গ্ৰহণ করেন কে?

বাবর।

৩. বাবর ভারতে কত বছর রাজত্ব করেন?

১৫২৬-১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৪ বছর।

৪. ভারতে প্রথম আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন কে?

বাবর।

Leave a Comment