দক্ষিণ ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা -র সূচনা, কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ, কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের বিভিন্ন দিক, কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের অবসান, কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধের বিভিন্ন দিক, কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধের ফলাফল, কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের বিভিন্ন দিক, প্যারিসের সন্ধি, প্যারিসের সন্ধির ও দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

দক্ষিণ ভারতে ইঙ্গ ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ১৭৪৬-৪৮ খ্রিস্টাব্দ
কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ১৭৪৯-৫৪ খ্রিস্টাব্দ
কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ১৭৫৬-৬৩ খ্রিস্টাব্দ
ফরাসি সেনাপতিদুপ্লে, কাউন্ট লালি
ইংরেজ সেনাপতিআয়ার কূট, রবার্ট ক্লাইভ
দক্ষিণ ভারতে ইঙ্গ ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

সূচনা :- ভারতে বাণিজ্যিক প্রাধান্য লাভের দ্বন্দ্বে ইংরেজ ও ফরাসিরা পরস্পর-বিরোধী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই দুই বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক প্রাধান্য লাভের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

কর্ণাটকের যুদ্ধ

ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধ করমণ্ডল উপকূলে সংঘটিত হয়। ইউরোপীয়রা করমণ্ডল উপকূলের নামকরণ করে কর্ণাট বা কর্ণাটক। এই কারণে এই যুদ্ধকে কর্ণাটকের যুদ্ধ বলা হয়।

দাক্ষিণাত্যে বাণিজ্য কুঠি

দক্ষিণ ভারতে মাদ্রাজ ও সেন্ট ফোর্ট জর্জ-এ ইংরেজ এবং পণ্ডিচেরিতে ফরাসিদের সুসজ্জিত বাণিজ্য কুঠি গড়ে ওঠে।

অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাশুরু হয় (১৭৪০-৪৮ খ্রিঃ)। এই যুদ্ধে ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্স দুই পরস্পর-বিরোধী দলে যোগদান করে। ইউরোপের যুদ্ধের সূত্র ধরে ভারতেও এই দুই বণিকগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

দাক্ষিণাত্যের পরিস্থিতি

সমকালীন দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক অবস্থা ও রাজন্যবর্গের দুর্বলতাও এই যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল। দাক্ষিণাত্যের বিবদমান শক্তিগুলি ইওরোপীয় বণিকদের সাহায্য গ্রহণে আগ্রহী ছিল। এর ফলে বিদেশি বণিকরা ভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, যার ফল ভারতের পক্ষে শুভ হয় নি।

কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ (১৭৪৬-৪৮ খ্রিঃ)

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংঘটিত কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের বিভিন্ন দিকগুলি হল–

(১) স্বাধীন কর্ণাটক

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতার সুযোগে অন্যান্য রাজ্যের মতো দাক্ষিণাত্যের হায়দ্রাবাদ ও কর্ণাটক রাজ্য স্বাধীন হয়ে পড়ে। আইনত কৰ্ণাটক ছিল হায়দ্রাবাদের নিজামের অধীনে, কিন্তু কর্ণাটকের নবাব দোস্ত আলি কার্যত স্বাধীনভাবেই রাজ্য চালাতেন।

(২) কর্ণাটকে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব

১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে সংঘর্ষে কর্ণাটকের নবাব দোস্ত আলির মৃত্যু ঘটলে কর্ণাটকের সিংহাসন নিয়ে এক গোলযোগ দেখা দেয়। নিজামের মনোনীত ব্যক্তি আনোয়ারউদ্দিন কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন। দোস্ত আলির জামাতা চাঁদা সাহেব সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার ছিলেন। তিনি বা তাঁর অনুগামীদের পক্ষে আনোয়ারউদ্দিনকে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

(৩) অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধ – ইঙ্গ ফরাসি দ্বন্দ্ব

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা ও ভারতের বাণিজ্য-ক্ষেত্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যেও যুদ্ধ শুরু হয়।

(৪) ফরাসি যুদ্ধ জাহাজ দখল

ফরাসি প্রতিনিধি দুপ্লে ভারতে এই ধরনের কোনও সংঘর্ষের বিরোধী ছিলেন এবং এ সম্পর্কে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় ইংরেজ নৌ-সেনাপতি কমডোর বার্নেট (Commodore Barnett) ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে কয়েকটি ফরাসি যুদ্ধজাহাজ দখল করে নিলে ভারতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

(৫) দুপ্লের নৌবহর বৃদ্ধি

ভারতে ফরাসিদের শক্তিশালী নৌবহর না থাকায় পণ্ডিচেরির ফরাসি শাসনকর্তা দুপ্নে (Dupliex) মরিশাসের ফরাসি গভর্নর লা বুরদনে (La Bourdonnais)-র কাছে কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাবার আবেদন জানান। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি আট-টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে উপস্থিত হন।

(৬) ইংরেজদের হুগলিতে পলায়ন

ফরাসি নৌবহরের শক্তিতে আতঙ্কিত হয়ে ইংরেজরা মাদ্রাজকে একরকম অরক্ষিত রেখেই মাদ্রাজ উপকূল ত্যাগ করে পূর্ব উপকূলের হুগলিতে আশ্রয় গ্রহণ করে।

(৭) ফরাসিদের মাদ্রাজ দখল

ইংরেজদের পলায়নের ফলে ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে পণ্ডিচেরির ফরাসি শাসনকর্তা দুপ্নে অতি সহজেই ইংরেজ বাণিজ্য কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটি মাদ্রাজ দখল করেন।

(৮) আনোয়ার উদ্দিনের নির্দেশ

মাদ্রাজ ছিল কর্ণাটক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত আনোয়ারউদ্দিনের শাসনাধীন অঞ্চল। বিপন্ন ইংরেজরা তাঁর শরণাপন্ন হলে তিনি দুপ্লেকে মাদ্রাজ থেকে সৈন্য অপসারণের নির্দেশ দেন। কূটকৌশলী দুপ্নে জানান যে, তাঁকে দান করার জন্যই ফরাসিরা মাদ্রাজ দখল করেছে।

(৯) সেন্ট থোমের যুদ্ধ

দুপ্নে তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আনোয়ারউদ্দিন ১০০০০ সৈন্য নিয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।মাইলাপুর বা সেন্ট থোমের যুদ্ধে (১৭৪৬ খ্রিঃ) ফরাসি বাহিনীর মাত্র ৯৩০ জন (২৩০ জন ইউরোপীয়) সৈন্যের কাছে নবাবের বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

(১০) সেন্ট থোমের যুদ্ধের গুরুত্ব

এই যুদ্ধ ছিল স্থলযুদ্ধে ইউরোপীয়দের কাছে ভারতীয়দের প্রথম পরাজয়। নানাদিক থেকে এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন –

  • (ক) ফরাসিদের এই সামরিক সাফল্য অশ্বারোহী বাহিনীর ওপর গোলন্দাজ বাহিনী ও সুশিক্ষিত পদাতিক সৈন্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করে।
  • (খ) এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, দাক্ষিণাত্য বা ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হল শক্তিশালী নৌবহর।
  • (গ) মুষ্টিমেয় ফরাসি সৈন্যর হাতে নবাবের বিরাট বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামরিক শক্তির অন্তঃসারশূন্যতা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে দেয়।
  • (ঘ) এই যুদ্ধ ইউরোপীয়দের চোখ খুলে দেয় এবং তারা বুঝতে পারে যে, চেষ্টা করলে অনায়াসেই তারা ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হবে।
  • (ঙ) ম্যালেসন বলেন যে, এই যুদ্ধের ফলে নিঃশব্দে কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হল যে, করমণ্ডল উপকূলে যুদ্ধরত দু’টি ইউরোপীয় শক্তির একটির দ্বারা ভারত বিজিত হবে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়ে ওঠে।
  • (চ) ঐতিহাসিক ফিলিপস্-এর মতে এই যুদ্ধের ফলে ভারতেবিদেশি আধিপত্য স্থাপনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং এরপর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি বণিকদের হস্তক্ষেপ না করার আর কোনও কারণ ছিল না।
  • (ছ) কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিক ডডওয়েল (Dodwell) বলেন যে, এই যুদ্ধ দুপ্লের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ক্লাইভের সাফল্যের জন্য রঙ্গমঞ্চ প্রস্তুত করে।

(১১) আই-লা-স্যাপেল -এর সন্ধি

১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে আই-লা-স্যাপেল এর সন্ধি (Treaty of Aix la-chapelle) দ্বারা ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে ভারতেও ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।

কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের অবসান

আই-লা-স্যাপেল -এরসন্ধির শর্তানুসারে দুপ্লে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাদ্রাজ ইংরেজদের ফিরিয়ে দেন। এইভাবে কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের অবসান হয়।

কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭৪৯-৫৪ খ্রিঃ)

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংঘটিত কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধের বিভিন্ন দিকগুলি হল–

(১) দুপ্লের স্বপ্ন

ভারতের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগে দুপ্লে ভারতে একটি সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আনোয়ার উদ্দিনের শোচনীয় পরাজয় তাঁকে আরও উৎসাহিত করে।

(২) যুদ্ধের সুযোগের আকাঙ্ক্ষা

আই-লা-স্যাপেলের সন্ধির শর্ত অনুসারে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজদের মাদ্রাজ প্রত্যার্পণে বাধ্য হন। তিনি নতুন করে যুদ্ধের সুযোগ খুঁজছিলেন।

(৩) হায়দ্রাবাদে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব

১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে হায়দ্রাবাদের নবাব নিজাম-উল্-মূলকের মৃত্যু হলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র নাসির জঙ্গ ও দৌহিত্র মুজাফ্ফর জঙ্গ-এর মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ শুরু হয়।

(৪) কর্ণাটকে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব

কর্ণাটকের সিংহাসন নিয়েও তখন আনোয়ারউদ্দিন ও চাঁদা সাহেবের মধ্যে বিবাদ চলছে। দাক্ষিণাত্যের এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে অংশগ্রহণ করে দুপ্নে তাঁর রাজনৈতিক বাসনা চরিতার্থ করতে সচেষ্ট হন।

(৫) চাঁদা সাহেব ও মুজাফফর জঙ্গকে সমর্থন

রাজনৈতিক বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি কর্ণাটকের সিংহাসনে চাঁদা সাহেব এবং হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে মুজাফ্ফর জঙ্গকে সমর্থন জানান।

(৬) অম্বুরের যুদ্ধ

এরপর চাঁদা সাহেব, মুজাফ্ফর জঙ্গ ও ফরাসি বাহিনী একত্রে আনোয়ারউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। ভেলোরের কাছে অম্বুরের যুদ্ধে (১৭৪৯ খ্রিঃ) আনোয়ারউদ্দিন নিহত হন এবং তাঁর পুত্ৰ মহম্মদ আলি ত্রিচিনোপলিতে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হন।

(৭) কর্ণাটকে ফরাসি শক্তি বৃদ্ধি

চাঁদা সাহেব কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন এবং এর ফলে কর্ণাটকে ফরাসি শক্তি অপ্রতিহত হয়ে ওঠে। কর্ণাটকে তারা নানা বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন করে এবং পণ্ডিচেরি সংলগ্ন ৮০টি গ্রাম তাদের হাতে যায়।

(৮) ইংরেজদের যুদ্ধ

ফরাসি শক্তিবৃদ্ধিতে ইংরেজদের মনে ভীতির সঞ্চার হয়।তাই তারা নাসির জঙ্গ ও মহম্মদ আলির পক্ষ সমর্থন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ইংরেজ-সাহায্যপুষ্ট নাসির জঙ্গের কাছে চাঁদা সাহেব পরাজিত হন এবং পণ্ডিচেরিতে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হন। অপরদিকে মুজাফ্ফর জঙ্গও নাসির জঙ্গের হাতে বন্দি হন।

(৯) দুপ্লের ভূমিকা

ইতিমধ্যে দুপ্লের নির্দেশে নাসিরজঙ্গ আততায়ীর হাতে নিহত হলে (১৬ই নভেম্বর, ১৭৫০ খ্রিঃ) মুজাফ্ফর জঙ্গ মুক্তিলাভ করেন। দুপ্লে তাঁকে হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে এবং চাঁদা সাহেবকে কর্ণাটকের নবাব পদে প্রতিষ্ঠিত করেন।

(১০) ফরাসি প্রাধান্য বিস্তার

কর্ণাটক ও হায়দ্রাবাদে নিজ প্রার্থী প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দাক্ষিণাত্যে দুপ্লে তথা ফরাসি প্রাধান্য বিস্তৃত হয় এবং দুপ্লে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

(১১) দুপ্লেকে গভর্নরের স্বীকৃতি

ফরাসি কোম্পানি নানাভাবে পুরস্কৃত হয় এবং মুজাফ্ফর জঙ্গ দুপ্লেকে দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণা নদী থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত রাজ্যাংশের ‘গভর্নর’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। মুসলিপত্তম-সহ পণ্ডিচেরি থেকে উড়িষ্যার উপকূলবর্তী অঞ্চল ফরাসিদের অর্পণ করা হয়। দুপ্লে ব্যক্তিগতভাবে বার্ষিক দশ হাজার পাউন্ড আয়ের একটি জায়গির ও প্রভূত অর্থ লাভ করেন।

(১২) হায়দ্রাবাদে ফরাসি সেনা মোতায়েন

ইতিমধ্যে মুজাফ্ফর জঙ্গ নিহত হলে (১৭৫১ খ্রিঃ) নিজাম-উল্‌-মূলকের তৃতীয় পুত্র সলাবৎ জঙ্গ-কে হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে বসানো হয়। নবাবের নিরাপত্তার তাগিদে ফরাসি সেনাপতি বুসি (Bussy)-র নেতৃত্বে হায়দ্রাবাদে একটি বিশাল ফরাসি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়— যদিও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নিজামের দরবারে ফরাসি প্রাধান্য অপ্রতিহত রাখা।

(১৩) ফরাসিদের চারটি জেলা লাভ

সেনাবাহিনীর ব্যয়নির্বাহের জন্য বুসি সলাবৎ জঙ্গের কাছ থেকে উত্তর সরকার নামে পরিচিত অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব উপকূলবর্তী চারটি জেলা (মুস্তাফানগর, এল্লোর, রাজমুন্দ্রি ও চিরাকোল) লাভ করেন।

(১৪) ফরাসি কোম্পানির চরম সাফল্য

এই সময় ফরাসি কোম্পানির শক্তি তুঙ্গে পৌঁছেছিল। দুপ্নে তাঁর কল্পনারও অতীত সাফল্য অর্জন করেছিলেন। ফরাসিরা ভারতীয় নৃপতিদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে কিছু স্বার্থসিদ্ধি করতে চেয়েছিল মাত্র, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, ভারতীয় শক্তিগুলি তাদের আজ্ঞাধীন দাসে পরিণত হয়েছে।

(১৫) ত্রিচিনোপলি দখলে ফরাসিদের অভিযান

আনোয়ার উদ্দিনের পুত্র মহম্মদ আলি তখনও ত্রিচিনোপলিতে অবস্থান করছিলেন। সামরিক ও বাণিজ্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটি দখলের জন্য ফরাসি বাহিনী অগ্রসর হলে মাদ্রাজের ইংরেজ শাসনকর্তা সান্ডার্স মহম্মদ আলির পক্ষ অবলম্বন করেন।

(১৬) ক্লাইড-এর আবির্ভাব

কেবলমাত্র ইংরেজ-পক্ষই নয়—মহীশূর, তাঞ্জোর ও গুটির মারাঠা-শাসকও মহম্মদ আলির সাহায্যে অগ্রসর হন। দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রবার্ট ক্লাইভ-এর আবির্ভাব হয়।

(১৭) আর্কট দখলের প্রস্তাব

দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের যখন জয়জয়কার, ত্রিচিনোপলিতে যখন ফরাসিদের অবরোধ চলছে, ঠিক তখনই তরুণ করণিক রবার্ট ক্লাইভ মসি ছেড়ে অসি ধরেন এবং কর্ণাটকের রাজধানী আর্কট আক্রমণের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে ইংরেজ বাহিনী আর্কট আক্রমণ করলে আর্কট রক্ষার জন্য ফরাসি বাহিনী ত্রিচিনোপলি থেকে সরে আসবে এবং তাতে ত্রিচিনোপলির ওপর থেকে চাপ কমবে।

(১৮) আর্কট দখল

মাত্র দু’শ ইংরেজ ও তিনশদেশীয় সৈনিক নিয়ে ক্লাইভ বিদ্যুৎ-গতিতে অরক্ষিত রাজধানী আর্কট দখল করে নেন। এর ফলে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয় এবং ফরাসিদের ক্রমাগত পরাজয় ঘটতে থাকে।

(১৯) ইংরেজদের ত্রিচিনোপলি দখল

ত্রিচিনোপলি থেকে সেনা সরে যাওয়ায় ফরাসিরা সেখানে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইংরেজ বাহিনী দুপ্লে ও চাঁদা সাহেবের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে ত্রিচিনোপলি অবরোধ-মুক্ত করেন।বন্দি চাঁদা সাহেবকে হত্যা করা হয় এবং মহম্মদ আলি কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন (১৭৫২ খ্রিঃ)।

(২০) ফরাসি প্রভাব হ্রাস

এরপর কর্ণাটকে ফরাসি প্রভাব অবলুপ্ত হয় এবং ইংরেজ প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের ইতিহাসে ইংরেজদের আর্কট দখল এক অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই যুদ্ধ সামরিক শক্তি হিসেবে ইংরেজদের সুনাম বৃদ্ধি করে এবং ফরাসি মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়।

(২১) দুপ্লের পদচ্যুতি

এর পরেও দুপ্লে আরও দু’বছর ধরে যুদ্ধ করে কোনও সুবিধা করতে পারেন নি। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি পদচ্যুত হয়ে ফ্রান্সে ফিরে যান এবং গোদেহু (Godehu) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

(২২) ইংরেজদের সাথে সন্ধি

ফরাসি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে দুপ্লের নীতি পরিবর্তন করে গোদেহু ইংরেজদের সঙ্গে এক সন্ধি স্বাক্ষর করেন (জানুয়ারি, ১৭৫৫ খ্রিঃ)। সন্ধির শর্ত অনুসারে ইংরেজ ও ফরাসি একে অন্যের অধিকৃত স্থানগুলি ফেরৎ দেয় এবং স্থির হয় যে, ভবিষ্যতে দেশীয় রাজন্যবর্গের বিবাদে কোনও পক্ষ হস্তক্ষেপ করবে না।

কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধের ফলাফল

  • (১) কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধের মতো দ্বিতীয় যুদ্ধও ছিল ফলহীন। এই যুদ্ধ ভারতেররাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় নি।
  • (২) এই যুদ্ধ কর্ণাটকে ফরাসি প্রাধান্যের অবসান ঘটালেও হায়দ্রাবাদে তারাই ছিলশক্তিশালী। গোদেহু স্বাক্ষরিত চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে ফরাসিদের স্বার্থ-বিরোধী ছিল। ম্যালেসন-এর মতে, এই চুক্তি ছিল ফরাসি জাতির পক্ষে অসম্মান জনক।
  • (৩) দুপ্লে-র মতে, গোদেহু ফরাসি জাতির ধ্বংস ও অসম্মানের ওপর এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। মিল বলেন যে, ইংরেজরা, যা তারা চেয়েছিল, এই চুক্তির দ্বারা তার সবই পেয়েছিল, আর ফরাসিরা যা পেয়েছিল, তার সবই হারিয়েছিল।
  • (৪) আর্কটের যুদ্ধের পর ফরাসিরা তাদের সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল না। সামরিক ও আর্থিক দিক থেকে তারা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সন্ধি আরও ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে তাদের রক্ষা করে।
  • (৫) এই সন্ধির পরেও দক্ষিণ ভারতে ফরাসিদের যা ছিল তা থেকে তাদের বার্ষিক আয় হত প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা। অপরপক্ষে, ইংরেজদের আয় হত বার্ষিক মাত্র এক লক্ষ টাকা।

কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৫৬-৬৩ খ্রিঃ)

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংঘটিত কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের বিভিন্ন দিকগুলি হল–

(১) ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে ভারতেও ইঙ্গ ফরাসি যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সূচনায় ইংরেজরা বাংলাদেশে ফরাসি ঘাঁটি চন্দননগর দখল করে নেয় (১৭৫৭ খ্রিঃ)। এর তিন মাস পরে পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলায় ইংরেজ শক্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

(২) কাউন্ট লালির ব্যর্থতা

১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট লালি পণ্ডিচেরির শাসনকর্তা হিসেবে ভারতে আসেন। তিনি মাদ্রাজ আক্রমণ করে ব্যর্থ হন।

(৩) বন্দিবাসের যুদ্ধ

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি আয়ার কূট বন্দিবাসের যুদ্ধে ফরাসি সেনাপতি লালিকেপরাজিত করেন। এই পরাজয়ের ফলে ফরাসিদের সর্বনাশ হয়ে যায়।

(৪) ভারতে ফরাসি শক্তির অবসান

এরপর ইংরেজ বাহিনী পণ্ডিচেরি অবরোধ করে দখল করে (১৭৬১ খ্রিঃ)। এরপর ফরাসি-অধিকৃত জিঞ্জি ও মাহে-র পতন ঘটে। এইভাবে ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ফরাসি শক্তির অবসান ঘটে।

প্যারিস-এর সন্ধি

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধি দ্বারা ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটলে ভারতেও দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।

প্যারিস-এর সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির শর্ত অনুসারে ফরাসিরা তাদের অধিকৃত স্থানগুলি ফিরে পেলেও তারা প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয় যে, ঐ স্থানগুলি কেবলমাত্র বাণিজ্য-কেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহৃত হবে— এগুলিতে কোনওভাবেই দুর্গ নির্মাণ বা সেনা মোতায়েন করা যাবে না।

উপসংহার :- দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ফরাসিদের ব্যর্থতার ফলে ভারতের রাজনীতিতে ফরাসি প্রভাব চিরতরে বিনষ্ট হল এবং দুপ্নের স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হল না। অন্যদিকে ভারতে ইংরেজদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি সুদৃঢ় হয় এবং তারা সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে অগ্রসর হয়।

(FAQ) দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাক্ষিণাত্যে কতগুলি কর্ণাটকের যুদ্ধ হয়?

তিনটি।

২. সেন্ট থোমের যুদ্ধ কখন কাদের মধ্যে হয়?

১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব আনোয়ার উদ্দিন ও ফরাসি বাহিনীর মধ্যে।

৩. বন্দিবাসের যুদ্ধ কখন কাদের মধ্যে হয়?

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ও ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে।

৪. কোন সন্ধি দ্বারা ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হয়?

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধি দ্বারা।

৫. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধে নিযুক্ত দুজন ফরাসি সেনাপতির নাম লেখ।

দুপ্লে ও কাউন্ট লালি।

৬. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধে নিযুক্ত দুজন ইংরেজ সেনাপতির নাম লেখ।

রবার্ট ক্লাইভ, আয়ার কূট।

Leave a Reply

Translate »