ব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য

ব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য প্রসঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকদের বাণিজ্য, ভারতের বাণিজ্যিক অবনতি, ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য, ভারতে কোম্পানির বণিকদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য, ভারতে বাণিজ্যে দস্তকের অপব্যবহার, বাণিজ্যে বাংলার রাজস্ব ব্যবহার ও ভারতে বাণিজ্যে কোম্পানির পণ্য ক্রয় পদ্ধতি সম্পর্কে জানবো।

ব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য

ঐতিহাসিক ঘটনাব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য
ফারুকশিয়ারের ফরমান১৭১৭ খ্রি
পলাশীর যুদ্ধ১৭৫৭ খ্রি
দস্তকছাড়পত্র
এজেন্সি ব্যবস্থা১৭৫৩ খ্রি
বোর্ড অফ ট্রেড১৭৭৪ খ্রি
ব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য

ভূমিকা :- সুদূর প্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় বণিকরা বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় ছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকদের বাণিজ্য

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশির যুদ্ধের পূর্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকরা ভারত থেকে পণ্যসামগ্রী কিনে। ইউরোপের বাজারে বেশি দামে তা বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করত।

ভারতের বাণিজ্যিক অবনতি

ভারতীয় বণিকরাও বাণিজ্য থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। কিন্তু পলাশির যুদ্ধের পর ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত ঘটায়। ভারতের বাণিজ্যিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং বাণিজ্যের ক্রমিক অবনতিও দেখা যায়।

ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য

  • (১) পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও দ্রুত তাদের ক্ষমতার প্রসার ঘটতে থাকে। এর ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের ব্যাবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়।
  • (২) তারা বাংলা থেকে অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের হঠিয়ে এখানে একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে লবণ, সুপারি ও তামাকের ব্যবসায় কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৩) এর ফলে দেশীয় বণিকরা এইসব পণ্যের বাণিজ্যিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহাল থাকে।

ভারতে কোম্পানির বণিকদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা বেআইনিভাবে ব্যক্তিগত বাণিজ্যে অংশ নিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে থাকে। যেমন –

(১) কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য

বাংলার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও তাঁর কাউন্সিলের সদস্যরা ব্যক্তিগত ব্যাবসায় যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছিলেন। মাদ্রাজ কাউন্সিলের সদস্যরাও এই বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

(২) বিলাসবহুল জীবন

কোম্পানির কর্মচারীদের বেতন কম হলেও ব্যক্তিগত বাণিজ্য থেকে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করতেন এবং অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘A New System of Geography’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, মাদ্রাজের গভর্নরের বেতন ছিল সাড়ে তিনশো পাউন্ড। কিন্তু তাঁর চালচলন ছিল স্বাধীন রাজার মতো।

(৩) সুদের ব্যাবসা

কোম্পানির কর্মচারীদের অনেকে আবার সুদের ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেক দেশীয় রাজাও তাঁদের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিতেন। ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তির মালিক হয়ে তাঁরা স্বদেশে ফিরে বিলাসব্যসনে জীবন কাটাতেন।

ভারতে বাণিজ্যে দস্তকের অপব্যবহার

  • (১) আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ফারুকশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী পাওয়া ‘দস্তক’-এর অপব্যবহার শুরু করে ইংরেজ কর্মচারীরা। দস্তকের অপব্যবহারের ফলে নবাব তাঁর প্রাপ্য বিপুল পরিমাণ শুল্ক থেকে বঞ্চিত হন।
  • (২) আবার অন্যদিকে দেশীয় বণিকরা নবাবকে শুল্ক দিয়ে বাণিজ্য করার ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। মিরকাশিম দস্তকের অপব্যবহার রোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

বাণিজ্যের বাংলার রাজস্ব ব্যবহার

পলাশির যুদ্ধের পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত থেকে রপ্তানিযোগ্য পণ্য কেনার জন্য ইংল্যান্ড থেকে মূল্যবান ধনরত্ন, বিশেষ করে সোনারুপো আমদানি করত। যুদ্ধের পর কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। যেমন –

(ক) বাংলার অর্থ পাচার

পলাশির যুদ্ধের পর থেকে কোম্পানি ইংল্যান্ড থেকে মূলধন আমদানি না করে বাংলা থেকে আদায় করা রাজস্বের একটি অংশ দিয়েই এদেশ থেকে মালপত্র কিনতে শুরু করে। এর ফলে বাংলা থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে যায়।

(খ) প্রেরিত অর্থের পরিসংখ্যান

  • (১) জেমস্ গ্রান্টের মতে, এই অর্থের পরিমাণ ছিল বার্ষিক ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক ব্যয় ও বাণিজ্যিক মূলধন হিসেবেও বাংলা থেকে বার্ষিক প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা যেত।
  • (২) কোম্পানি ১৭৬৫-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত থেকে ৪০ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের পণ্য ইংল্যান্ডে সরবরাহ করে। এটি ছিল বাংলার মোট রাজস্বের ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া কোম্পানি চিন থেকে সবুজ চা ও রেশম কিনে ইউরোপে রপ্তানি করত। এই বাবদ বাংলা থেকে বছরে ২৪ লক্ষ টাকা যেত।

(গ) ভারতের বাণিজ্যে বিলেতের সমৃদ্ধি

  • (১) ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হওয়ার ফলে ইংল্যান্ডের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। বড়োলাট লর্ড এলেনবরা ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে বিলাতের পার্লামেন্টে স্বীকার করেন যে, ভারত থেকে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের সামগ্রী ইংল্যান্ডে চালান হয়ে আসে। অথচ এর বিনিময়ে ভারত কিছু সামরিক সরঞ্জাম ছাড়া আর কিছুই পায় না।
  • (২) কোম্পানির এক পদস্থ কর্মচারী জন সুলিভ্যান বলেন যে, “আমাদের শাসন পদ্ধতি অনেকটা স্পঞ্জের মতো। গঙ্গার তীর থেকে সমস্ত দামি দামি সামগ্রী শুষে নিয়ে এসে তা টেমস নদীর পাড়ে নিওড়ে নেওয়া হয়।” বলা বাহুল্য, এই অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বণিকদের পক্ষে পেরে ওঠা কখনোই সম্ভব ছিল না।

ভারতে বাণিজ্যে কোম্পানির পণ্য ক্রয় পদ্ধতি

বাণিজ্যের জন্য কোম্পানির পণ্য ক্রয় পদ্ধতি ভারতীয় কারিগর ও বণিকদের জীবনকে বিষময় করে তোলে। যেমন –

(ক) চুক্তি ব্যবস্থা

১৭০০ থেকে ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি ‘চুক্তি ব্যবস্থা’ বা ‘কনট্রাক্ট সিস্টেম’ এর মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করত। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি দেশীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে চুক্তিবদ্ধ এবং চুক্তির সময় পণ্যমূল্যের শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ অর্থ অগ্রিম দিত। এই ব্যবসায়ীদের ‘দাদনি ব্যবসায়ী’ বলা হত। দাদনি ব্যবসায়ীরা এরপর উৎপাদকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহ করত।

(খ) এজেন্সি ব্যবস্থা

  • (১) চুক্তি ব্যবস্থায় কালক্রমে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি দেখা দেয়। ফলে ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি এজেন্সি ব্যবস্থা চালু করে। ১৭৫৩ থেকে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি তার নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করত।
  • (২) কোম্পানির কর্মচারীরাই এজেন্ট হিসেবে কাজ করত। এই সময়কাল ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ। তারা দস্তকের অপব্যবহার করে এবং বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে ব্যাবসা করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে।

(গ) উৎপাদকের প্রতি বঞ্চনা

  • (১) কোম্পানির কর্মচারীরা তাঁতি, নীলচাষি ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদকদের জোর করে দাদন দিত। দেশীয় এই উৎপাদকরা অতি সামান্য মূল্যে, এমনকি প্রচুর লোকসান করেও এই দাদন গ্রহণে বাধ্য হত। উৎপাদক তার পণ্য বিক্রির জন্য কোম্পানির কাছে নিয়ে গেলে, সেখানে তারা নানা ধরনের প্রবঞ্চনার শিকার হত।
  • (২) পণ্য উপযুক্ত মানের নয় বলে কোম্পানির কর্মচারীরা সেই পণ্য কোম্পানির পক্ষে গ্রহণ করত না, কিন্তু ওই পণ্যই আবার অতি সামান্য মূল্যে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্য কিনে নিত। উৎপাদক অন্যত্র বেশি দাম পেলেও সেখানে তার পণ্য বিক্রি করার অধিকার পেত না।

(ঘ) বোর্ড অব ট্রেড গঠন

  • (১) দেশীয় উৎপাদকের প্রতি বঞ্চনার ফলে দরিদ্র কৃষক ও কারিগরদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে এবং কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নানা সংকটের সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির পরিচালক সভা ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠন করে তার ওপর কোম্পানির বাণিজ্য সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব অর্পণ করে।
  • (২) বোর্ড অব ট্রেড এজেন্সি ব্যবস্থা বাতিল করে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে ‘চুক্তি ব্যবস্থা’ চালু করে। অবশ্য পণ্য ক্রয় ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে লর্ড কর্নওয়ালিশ পুনরায় ‘এজেন্সি ব্যবস্থা’ চালু করেন। এই ব্যবস্থা ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চালু ছিল। এর ফলে কোম্পানির কর্মচারী ও দালালদের অত্যাচার কিছুটা হলেও হ্রাস পায়।

উপসংহার :- ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ফলে ভারতের শিল্পী, কারিগর ও বণিকদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে যায়।

(FAQ) ব্রিটিশ ভারতে বাণিজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ফাররুখশিয়ারের ফরমান জারি করা হয় কখন?

১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. দস্তক কথার অর্থ কি?

ছাড়পত্র।

৩. কোম্পানি ভারতের বাণিজ্যে এজেন্সি ব্যবস্থা চালু করে কখন?

১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে।

৪. বোড অফ ট্রেড গঠিত হয় কখন?

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে।

৫. পলাশির যুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment