ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী

ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী গঠনে ক্যাপ্টেন লরেন্সের উদ্যোগ, ক্লাইভের উদ্যোগ, সেনাবাহিনী সম্পর্কে পার্সিভ্যাল স্পিয়ারের মন্তব্য, ওমিসির মন্তব্য, সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় অফিসারদের প্রাধান্য, সেনাবাহিনীতে নিয়োগে পছন্দ, সেনাবাহিনীতে সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি, সেনাবাহিনীতে নিয়োগে জাতপাতের বিষয়, সেনাবাহিনীতে বেতন ও ভাতা এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী

ঐতিহাসিক ঘটনাব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী
পলাশীর যুদ্ধ১৭৫৭ খ্রি
বাংলার নবাবসিরাজউদ্দৌলা
গোরখা জাতিনেপাল
যুদ্ধোপযোগী জাতিজাঠ, গোরখা, রাজপুত
ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী

ভূমিকা :- ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক প্রসার ও নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ইংরেজদের নিজস্ব সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। সীমা অলাভি মনে করেন যে, ভারতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোম্পানির সেনা নিয়োগের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সেনাবাহিনী গঠনে ক্যাপ্টেন লরেন্সের উদ্যোগ

দক্ষিণ ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাপ্টেন স্ট্রিঙ্কার লরেন্স ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয়দের নিয়ে এদেশে একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি ব্রিটেনের বাড়তি রাজকীয় নৌবাহিনী এদেশে নিয়ে আসেন।

সেনাবাহিনী গঠনে ক্লাইভের উদ্যোগ

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদদৌলাকে পরাজিত করার পর তিনিও ব্রিটেন থেকে নৌবাহিনী ভারতে এনে এদেশে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেন।

সেনাবাহিনী সম্পর্কে ওমিসির মন্তব্য

ডেভিড ওমিসি লিখেছেন যে, ভারতে ব্রিটিশ-রাজ ছিল একটি সেনা-সুরক্ষিত দুর্গের মতো।

সেনাবাহিনী সম্পর্কে পার্সিভ্যাল স্পিয়ারের মন্তব্য

পার্সিভ্যাল স্পিয়ার লিখেছেন, “সিভিল সার্ভিস গভর্নরের দক্ষিণ হস্ত হলে সেনাবাহিনী ছিল তাঁর বাম হস্ত।”

সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় অফিসারদের প্রাধান্য

  • (১) কর্নওয়ালিশের আমল থেকে কোনো ভারতীয়কে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে নিয়োগ করা হত না, সেখানে সর্বদা ইউরোপীয় অফিসাররা নিযুক্ত হতেন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে সেনাবিভাগে মাসিক ৩০০ টাকার বেশি বেতন পেত, এমন ভারতীয় সেনার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ জন।
  • (২) কোম্পানির ডিরেক্টররা পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অধিকাংশ ইউরোপীয় অফিসারকে নিয়োগ করতেন। ইউরোপীয় অফিসাররা ভারতীয় সেনাদের প্রশিক্ষণ দিত এবং ইউরোপীয় সেনাপতি বা কমান্ডার-ইন-চিফ ভারতীয় সিপাহিদের হুকুম দিত।

সেনাবাহিনীতে নিয়োগে পছন্দ

  • (১) কোম্পানির সাম্রাজ্যের সীমানাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকেরা নিযুক্ত হতে থাকে। সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রুটি খাওয়া কৃষকদের বেশি পছন্দ করা হত।
  • (২) উচ্চবর্ণীয়রা বিশেষ প্রাধান্য পেত। অযোধ্যার উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ও ধনী রাজপুত কৃষক, বিহারের ভূমিহারা ব্রাহ্মণ ও রাজপুতদের অধিক সংখ্যায় নিয়োগ করা হত।
  • (৩) পরবর্তীকালে বাংলার পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে কোম্পানির আধিপত্যের প্রসার ঘটলে সেখানকার পাহাড়ি উপজাতির মানুষকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বাহিনীতে নেপালের গোরখাদের নিয়োগ শুরু হয়। এরা শীঘ্রই সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।

সেনাবাহিনীতে সেনার সংখ্যাবৃদ্ধি

  • (১) ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতে কোম্পানির সিপাহিদের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার। এই সংখ্যা ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে ১ লক্ষ ৫৪ হাজারে এবং ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ২ লক্ষ ১৪ হাজারে পৌঁছোয়।
  • (২) উনিশ শতকের শুরুতে আইন করে ভারতে ২০ হাজার রাজকীয় সেনা মোতায়েন ও কোম্পানি কর্তৃক তাদের বেতনের কথা বলা হয়। প্রচুর সেনা নিয়োগের ফলে ভারতে ব্রিটিশদের খরচ অত্যন্ত বেড়ে যায়। আদায় করা রাজস্বের অন্তত ৪০ শতাংশই সেনাবাহিনীর পেছনে ব্যয় হত।

সেনাবাহিনীতে নিয়োগে জাতপাতের বিষয়

  • (১) সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতীয় জাতপাতের নিয়মকানুনগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হত। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সিপাহিরা ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পর থেকে সেনা নিয়োগের বিষয়ে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী সিপাহি জাতিগুলিকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
  • (২) ইংরেজদের অনুগত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঠান, পাঞ্জাবের জাঠ, উত্তর ভারতের রাজপুত, নেপালের গোরখা প্রভৃতি জাতিগুলিকে ‘যুদ্ধোপযোগী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব জাতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • (৩) ভারতের সামরিক বিষয় তদারকির উদ্দেশ্যে পিল কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশন সুপারিশ করে যে, বিভিন্ন জাতির মানুষ নিয়ে পাঁচমিশেলি ভারতীয় সেনাবাহিনী গঠন করা হবে।

সেনাবাহিনীতে বেতন ও ভাতা

কোম্পানির সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত ভারতীয় সেনারা নিয়মিত বেতন পেত। এ ছাড়া তারা অবসরকালীন ভাতা, অন্যান্য ভাতা, পুনর্বাসন ও অন্যান্য কিছু সুবিধা পেত। এর ফলে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব আন্তরিকভাবে পালন করেছিল। তবে ১৮২০-র দশকে তাদের বিভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা হ্রাস করা শুরু হলে তারা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।

সেনাবাহিনীর গুরুত্ব

  • (১) সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার ফলে এদেশে ইংরেজ কোম্পানির একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
  • (২) সেনাবাহিনী ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক সম্প্রসারণে সহায়তা করে। ফলে ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ, অর্থাৎ মাত্র একশো বছরের মধ্যে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতজয় সম্পন্ন করে।
  • (৩) ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সম্ভাব্য বিপদ বা সমস্যা থেকে কোম্পানির সাম্রাজ্যকে রক্ষা করত সেনাবাহিনী।
  • (৪) সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, শ্রমিক ধর্মঘট প্রভৃতি সেনারা নির্মমভাবে দমন করত।
  • (৫) বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়ে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
  • (৬) সেনারা ভারতীয় সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করত।

উপসংহার :- ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির প্রশাসনযন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাদের সেনাবাহিনী। এই সেনাবাহিনীর সাহায্যেই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে একচ্ছত্র শাসন কায়েম করে।

(FAQ) ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পলাশির যুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. পলাশির যুদ্ধের সময় বাংলার নবাব কে ছিলেন?

সিরাজউদ্দৌলা।

৩. গোরখা জাতির বসবাস কোথায় ছিল?

নেপালে।

৪. ভারতের কোন কোন জাতিকে ইংরেজরা যুদ্ধোপযোগী জাতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে?

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঠান, পাঞ্জাবের জাঠ, উত্তর ভারতের রাজপুত, নেপালের গোরখা প্রভৃতি জাতিকে।

Leave a Comment