ঐতিহাসিকের কাজ

ঐতিহাসিকের কাজ প্রসঙ্গে কেবলমাত্র তথ্য উপস্থাপন, বিশ্লেষণ অপ্রয়োজনীয়, বিশ্লেষণ বিরোধী যুক্তি, ঐতিহাসিক এর কাজ তথ্য বিশ্লেষণ ও তথ্য বিশ্লেষণের পক্ষে যুক্তি সম্পর্কে জানবো।

ঐতিহাসিকের কাজ

ঐতিহাসিক ঘটনাঐতিহাসিকের কাজ
জার্মান ঐতিহাসিকলিওপোল্ড-ভন র‍্যাঙ্কে
ব্রিটিশ ঐতিহাসিকজে বি বিউরি
হোয়াট ইজ হিস্ট্রিই এইচ কার
আরবদের সিন্ধু জয়৭১২ খ্রি
সিন্ধুদেশের রাজাদাহির
ঐতিহাসিকের কাজ

ভূমিকা :- বিশ শতকের শুরু থেকে ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি নিয়ে একটি বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিতর্কের বিষয় হল – ইতিহাস রচনার পদ্ধতি।

ঐতিহাসিকের কাজ

ইতিহাস রচনা সম্পর্কে ঐতিহাসিকের কাজ কি হবে? তাই নিয়ে দ্বিমত সৃষ্টি হয়। যেমন –

  • (১) এক দলের মত হল, ঐতিহাসিক হবেন সৎ, নিরপেক্ষ ও নির্মোহ। তাঁর কাজ হল কেবলমাত্র তথ্যনিষ্ঠ ঘটনার উপস্থাপনা করা, তথ্যের বিচারবিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা নয়।
  • (২) অপর দলের বক্তব্য হল, ঐতিহাসিকের কাজ কেবলমাত্র তথ্যের উপস্থাপনাই নয়, তথ্যের বিচারবিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা।

ঐতিহাসিকের কাজ কেবলমাত্র তথ্য উপস্থাপন

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই পন্থার বিভিন্ন দিকগুলি হল –

(ক) বিভিন্ন অভিমত

বিশিষ্ট জার্মান ঐতিহাসিক লিওপোল্ড-ভন র‍্যাঙ্কে-এর মতে, ঐতিহাসিকের কাজ হল ‘একনিষ্ঠভাবে ঘটনার উপস্থাপনা’ (‘Strict presentation of fact’)। ঐতিহাসিক মার্ক ব্লখের মতে, “ঐতিহাসিকের কাজ বিচার করা নয়, বোঝা।” ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জে. বি. বিউরি-ও এই মতের সমর্থক। তাঁর মতে, ইতিহাস হল একটি বিজ্ঞান। এর বেশিও নয়, কমও নয় (‘History is a science, no less and no more.’)।

(খ) বিশ্লেষণ অপ্রয়োজনীয়

এই মতের সমর্থকরা বলেন যে, ঐতিহাসিকের পক্ষে ঘটনার বিশ্লেষণের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করতে গেলেই ঐতিহাসিক তাঁর সীমা লঙ্ঘন করবেন – কখনও কম, আবার কখনও বেশি বলবেন। এতে তথ্যের বিকৃতি ঘটবে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক একই ঘটনার নানা ব্যাখ্যা করবেন। এর ফলে ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা থাকবে না।

(গ) বিশ্লেষণ বিরোধী যুক্তি

উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন –

(১) সংশয়বাদীদের মত

সংশয়বাদীরা মনে করেন যে, ইতিহাস আসলে মানুষকে কিছুই শেখায় না। যদি ইতিহাস কিছু না-ই শিখিয়ে থাকে, তবে ঐতিহাসিকের মূল্যায়নের কাজটিও একান্ত মূল্যহীন।

(২) বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা

ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন ঘটনার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার ফলে পাঠকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। যেমন – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী কে? – এই প্রশ্নে ঐতিহাসিকরা একমত নন। এই ব্যাপারে কেউ জার্মানিকে, কেউ রাশিয়াকে, কেউ আমেরিকাকে, আবার কেউ কেউ ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতিকে দায়ী করে থাকেন।

(৩) দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য

আবার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম-সংক্রান্ত আলোচনায় ভারতীয় ও ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যাখ্যার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। ফলে ইতিহাসচর্চায় নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়।

(৪) ঐতিহাসিকের দেশপ্রেম

আসলে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় ঐতিহাসিক কখনোই তার দেশপ্রেম ও মানসিকতাকে বিসর্জন দিতে পারেন না। এর ফলেই ঐতিহাসিক তথ্যের ভুলভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি নজরে আসে।

(ঘ) সিদ্ধান্ত

এই সব কারণে র‍্যাঙ্কে ও বিউরির অনুগামী ঐতিহাসিকরা চান কেবলমাত্র তথ্যের উপস্থাপনা – কোনো প্রকার ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ নয়। তাঁদের মতে, একমাত্র ‘Objective’ দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত ইতিহাসই এইসব বিকৃতি ও বিভ্রান্তি দূর করতে পারে।

ঐতিহাসিকের কাজ তথ্য বিশ্লেষণ

ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকের কাজ তথ্য বিশ্লেষণ সম্পর্কে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) লর্ড অ্যাক্টনের মত

লর্ড অ্যাক্টন প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, তথ্যের বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন ছাড়া ইতিহাসচর্চা অর্থহীন। ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নের ফলেই ‘নীরস শুষ্ক কাষ্ঠ’ তথ্যাদি প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো অবদান হল মানুষের মধ্যে সুস্থির চেতনার জাগরণ ঘটানো। একমাত্র তথ্যের বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

(২) ই এইচ কার-এর মত

ঐতিহাসিক ই. এইচ. কার লিখেছেন যে, “… ইতিহাস মূলত বর্তমানের চোখ দিয়ে ও তারই সমস্যার নিরিখে অতীতকে দেখা। আর ঐতিহাসিকের আসল কাজ নথিকরণ নয়, বরং মূল্যায়ন। তিনি যদি মূল্যায়ন না করেন তাহলে কোন্‌টা নথিবদ্ধ করার উপযুক্ত তা তিনি জানবেন কী করে?” অর্থাৎ ঐতিহাসিক তথ্যের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(৩) ব্যারাক্লাফ-এর মত

তাই অধ্যাপক ব্যারাক্লাফ লিখেছেন যে, “আমরা যে ইতিহাস পড়ি তা তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সঠিকভাবে বলতে গেলে তা তথ্যভিত্তিক নয়, বরং একগুচ্ছ স্বীকৃত অভিমত।”

বিশ্লেষণের পক্ষে যুক্তি

বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাসচর্চার সপক্ষে প্রধান যুক্তিগুলি হল –

(১) প্রয়োজনীয়তা

বিশ্লেষণধর্মী ইতিহাসচর্চার প্রবক্তারা মনে করেন যে, কেবলমাত্র তথ্যের বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নের ফলেই কোনো তথ্যের গুরুত্ব ও নানাদিক উন্মোচিত হতে পারে। কোনো বিপ্লব বা বিদ্রোহের বিবরণ পেশ করলেই ঐতিহাসিকের দায়িত্ব শেষ হয় না। এই বিবরণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগাতে পারে। অর্থাৎ মানুষকে বিপ্লবের কারণ বা প্রকৃতি সম্পর্কে কৌতূহলী করে তুলতে পারে। একমাত্র ঐতিহাসিকই এই কারণগুলি খুঁজে বের করতে পারেন এবং এই কারণগুলির আবিষ্কার ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

(২) মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের ব্যাখ্যা

এতদিন মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করা হত। সাম্প্রতিক ইতিহাসচর্চার ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণের ওপর গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে।

(৩) দাহিরের পরাজয়ের ব্যাখ্যা

আবার, ৭১২ খ্রিস্টাব্দে আরবীয় মুসলিমদের হাতে সিন্ধুদেশের রাজা দাহিরের পরাজয়ের জন্য এতদিন মুসলিম সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হত। সাম্প্রতিককালে বলা হয় যে, মুসলিম আক্রমণের বহু পূর্বেই ব্রাক্ষ্মণ রাজা দাহির বৌদ্ধ প্রজাদের আনুগত্য হারিয়ে তাঁর পতনকে সুনিশ্চিত করে তুলেছিলেন। বলা বাহুল্য, তথ্যের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ফলেই এইসব নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে।

উপসংহার :- সবশেষে বলা যায় যে, বিশ্লেষণ ও বিশ্লেষণ- বিরোধী গোষ্ঠী দু-পক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই যৌক্তিকতা আছে। দু-পক্ষকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট সতর্ক ও নিরপেক্ষ হতে হবে। কারণ, সাম্প্রতিককালে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা গুরুত্ব পাচ্ছে এবং এই সঙ্গে নানা মতাদর্শ ও গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটছে। এর ফলে তথ্যের বিকৃতি ঘটছে – নিজস্ব মতাদর্শ, বিশ্বাস, ধ্যানধারণা ইত্যাদি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের সময় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে ইতিহাসের তথ্যে বিকৃতি ধরা পড়ছে এবং ইতিহাসচর্চা খণ্ডিত হচ্ছে। এইসব সমস্যা সম্পর্কে সব ঐতিহাসিককে সতর্ক থাকতে হবে।

(FAQ) ঐতিহাসিকের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কার মতে ঐতিহাসিকের কাজ হল ‘একনিষ্ঠ ভাবে ঘটনার উপস্থাপনা’?

লিওপোল্ড-ভন র‍্যাঙ্কে।

২. কার মতে ‘ঐতিহাসিকের কাজ বিচার করা নয়, বোঝা’?

মার্ক ব্লখ।

৩. কার মতে ‘ইতিহাস একটি বিজ্ঞান। এর বেশিও নয় কমও নয়’?

ব্রিটিস ঐতিহাসিক জে বি বিউরি।

৪. আরবীয় মুসলিমরা সিন্ধুদেশ আক্রমণ করে কখন?

৭১২ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment