মামুদের কৃতিত্ব

সুলতান মামুদের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে সাংগঠনিক ক্ষমতা, সামরিক দক্ষতা, সংস্কৃতি প্রিয়তা, আইন শৃঙ্খলা স্থাপনকর্তা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভারতে প্রথম তুর্কী বিজেতা, ধর্মীয় গোড়ামির উর্ধে ও লুন্ঠনপ্রিয়তা সম্পর্কে জানবো।

সুলতান মামুদের কৃতিত্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাসুলতান মামুদের কৃতিত্ব
সুলতানমামুদ
রাজ্যগজনী রাজ্য
ভারত আক্রমণ১০০০-১০২৭ খ্রি
সভাকবিউৎবি
সুলতান মামুদের কৃতিত্ব

ভূমিকা :- গজনীর সুলতান মামুদ ছিলেন সমর-বিশারদ ব্যক্তি। তিনি যে বাহিনী গড়েন তা তুর্কী, আফগান, আরব এমন কি হিন্দুদের দ্বারা গঠিত ছিল। কিন্তু তিনি এই বাহিনীকে এমন সংগঠন করেন যে, এর মধ্যে কোনো বিভেদ ছিল না। সকল সেনাই তাকে সমানভাবে আনুগত্য দিত।

সাংগঠনিক ক্ষমতা

সুলতান মামুদের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা ছিল। তিনি তার বাহিনীর দ্বারা পশ্চিমে ইরাক থেকে উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল জয় করেন। সম্ভবত এই বর্হিভারতীয় অঞ্চলে ব্যস্ত থাকার জন্যই তিনি ভারতে স্থায়ীভাবে রাজ্য স্থাপনের কোনো চেষ্টা করেননি। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে মাত্র গজনী ও খোরাসন রাজ্য পান। নিজ বাহুবলে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন।

সামরিক দক্ষতা

  • (১) অনেকে বলেন যে, ভারতে তিনি কয়েকজন দুর্বল রাজপুত রাজাকে জয় করেন মাত্র। এর দ্বারা সুলতান মামুদের অসাধারণ সামরিক দক্ষতা প্রমাণিত হয় না। তাকে কোনোরূপ প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয় নি। কিন্তু একথা যুক্তিসহ নয়। ইরাণ ও মধ্য এশিয়ায় তিনি প্রকৃত ক্ষমতাশালী শক্তিগুলিকে পরাস্ত করে তাঁর রণপাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন।
  • (২) সুলতান মামুদ অশ্বারোহী সেনাকে একটি আক্রমণাত্মক যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি শত্রুর দুর্বলতাগুলি ভালভাবে লক্ষ্য করে সেই দুর্বল স্থানে আঘাত করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্মম ও নিষ্ঠুর। কিন্তু যুদ্ধকে তিনি যুদ্ধ হিসেবেই নিতেন।

সংস্কৃতিপ্রিয়তা

  • (১) ভারতবাসীর কাছে তিনি ধর্মোন্মত্ত আক্রমণকারী রূপে প্রতিভাত হলেও, ব্যক্তি হিসাবে সুলতান মামুদ ছিলেন বিবিধ গুণের অধিকারী। তিনি বিদ্বানদের সমাদর করতেন। তার দরবারে ছিলেন ঐতিহাসিক উৎবি, বৈহাকী, কারবী, ফার্সী কবি উজাবী, তুসী, আনসারী, ফারুকী এবং শাহনামা কাব্যের রচয়িতা বিখ্যাত ফিরদৌসী।
  • (২) মামুদ এঁদের অর্থ সাহায্য করতেন। গজনীতে মামুদ একটি বিখ্যাত মুসলিম পাঠকেন্দ্র, গ্রন্থাগার ও যাদুঘর স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে শিল্পীদের এনে গজনীর সৌন্দর্য বাড়াবার জন্য শিল্প সৃষ্টি করেন। বহু মসজিদ, প্রাসাদ, খানকা নির্মাণ করে গজনী নগরীকে সুশোভিত করেন। মামুদের চেষ্টায় গজনী নগরী ইসলামিক সংস্কৃতি চর্চার একটি বিখ্যাত কেন্দ্রে পরিণত হয়।

আইন শৃঙ্খলা স্থাপনকর্তা

মামুদ নিজ রাজ্যে কঠোর শৃঙ্খলা ও শান্তি রক্ষা করেন। তিনি প্রজাদের প্রতি ন্যায় বিচার করতেন। যুবরাজ মাসুদ এক বণিকের ঋণ পরিশোধ না করলে তিনি সাধারণ অপরাধীর মতই মাসুদকে দরবারে হাজির করিয়ে ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দেন। তাঁর সুশাসনে গজনী রাজ্যে কৃষি ও বাণিজ্যের উন্নতি হয়। মামুদ ছিলেন গোঁড়া সুন্নী মুসলমান। তাঁর স্বধর্মাবলম্বীরা তাকে “গাজী” আখ্যা দেন।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা

মাসুদ ব্যক্তিগত দিক থেকে ছিলেন ঘোর উচ্চাকাঙ্খী। তার ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ ছিল। তিনি কবি ফিরদৌসীকে প্রতি কবিতার জন্য একটি করে স্বর্ণ দিনার দিতে প্রতিশ্রুতি দেন। ফিরদৌসী যখন ১০০০ কবিতা সম্বলিত শাহনামা কাব্য রচনা করেন তখন মামুদ তাকে ১০০০ রৌপ্য দিনার দেন। ফিরদৌসী তা নিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত মামুদ নিতান্ত অনিচ্ছায় তাকে ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা পাঠান। কিন্তু তখন এই কবি দারিদ্রের জ্বালায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন।

ভারতে প্রথম তুর্কী বিজেতা

  • (১) ভারতবর্ষের ইতিহাসে সুলতান মামুদের স্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। সুলতান মামুদ ছিলেন ভারতের বুকে প্রথম তুর্কী বিজেতা। তিনি স্থায়ী সাম্রাজ্য স্থাপনের কোনো উদ্যোগ না দেখালেও পরবর্তীকালে ভারতে তুর্কী সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ তিনি তৈরি করেন।
  • (২) তুর্কী জাতির কাছে ভারতের দুর্বলতার খবর তাঁর আক্রমণের ফলে প্রচার হয়ে যায়। শাহী রাজ্যকে ধ্বংস করার ফলে তিনি মহম্মদ ঘুরীর ভারত আক্রমণের পথ খুলে দেন। তুর্কী সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সেনারা রণকৌশলে হীন একথা সুলতান মানুদের বিজয় প্রমাণিত করে।

ধর্মীয় গোড়ামির উর্ধে

  • (১) ভারত ইতিহাসে সুলতান মামুদকে নির্বিচারে হিন্দু মন্দির ধ্বংস ও দেবতাদের বিগ্রহ ভাঙার জন্য তাকে ধর্মান্ধ আগ্রাসনকারী বলে চিহ্নিত করা হয়। সুলতান মামুদের সভাসদ ঐতিহাসিক উৎবির মন্তব্য থেকে অনেকে এই ধারণার সমর্থন পান।
  • (২) কিন্তু মামুদ ধর্মীয় গোড়ামি নিয়ে ভারত আক্রমণ করেন একথা বলা চলে না। কারণ, তিনি হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার কোনো চেষ্টা করেননি। দার-উল-হারব বা অ-ইসলামের দেশকে দার-উল-ইসলাম বা ইসলামের রাজ্যে পরিণত করার তিনি কোনো চেষ্টা করেননি।
  • (৩) তিনি হিন্দু মন্দির ও বিগ্রহ ধ্বংস করেছেন একথা সত্য। কিন্তু তা অনেকাংশে ধনরত্নের লোভে তিনি করেন। বহু দশক ধরে হিন্দু মন্দিরগুলি পূজার্থীদের দেওয়া ধন-রত্ন ও দেব বিগ্রহগুলি বিভিন্ন অলঙ্কারে সজ্জিত ছিল।
  • (৪) সুলতান মামুদ প্রধানত এই সকল মূল্যবান দ্রব্যের লোভে হিন্দু মন্দিরগুলি ধ্বংস করেন। তাছাড়া ভারতের সম্পদ লুঠ করা তার ভারত অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল। যেহেতু মন্দিরগুলি ছিল ধন-সম্পদে পূর্ণ এজন্য তিনি এগুলি আক্রমণ করেন।

লুন্ঠনপ্রিয়তা

তিনি ভারতের নগর, গ্রাম, মন্দিরগুলি শুধুমাত্র লুঠ করেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কোনো নতুন সংস্কার প্রবর্তন বা ভাবধারা প্রচারের চেষ্টা তিনি করেননি। সুতরাং ভারতে তার অভিযানের পশ্চাতে কোনো মহৎ বা শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য ছিল না। এই অভিযানগুলি ছিল নিতান্তই গায়ের জোরে ভারত থেকে সম্পদ লুণ্ঠন মাত্র। এর দ্বারা ভারত ইতিহাসে কোনো স্থায়ী প্রভাব পড়েনি।

উপসংহার :- ধন-সম্পদের লোভে অপর সম্প্রদায়ের ধর্মস্থান লুঠ প্রশংসনীয় কাজ নয়। তাই ভারতবর্ষে সুলতান মামুদ লুণ্ঠনকারী বলেই আখ্যা পেয়েছেন। ঐতিহাসিক স্মিথের মতে, সুলতান মানুদ ছিলেন একজন বড়মাপের লুঠেরা বা দস্যু” (A brigand operating on a large Scale)।

(FAQ) সুলতান মামুদের কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সুলতান মামুদ কখন ভারত আক্রমণ করেন?

১০০০-১০২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

২. সুলতান মামুদ কতবার ভারত আক্রমণ করেন?

১৭ বার।

৩. “সুলতান মামুদ ছিলেন বড়মাপের লুঠেরা বা দস্যু।” – কে বলেছেন?

ঐতিহাসিক স্মিথ।

৪. সুলতান মামুদের সভাকবি কে ছিলেন?

উৎবি।

৫. শাহনামা কার লেখা?

ফিরদৌসী।

Leave a Comment